ইরানের পরমাণু কেন্দ্রে হামলায় নীরবতা আইএইএ'র বিশ্বাসযোগ্যতার পরীক্ষা
-
আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (IAEA)
পার্সটুডে-জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের অধিবেশনে রাশিয়ার পররাষ্ট্রমন্ত্রী সের্গেই ল্যাভরভ বলেছেন, 'ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থার (IAEA) বিশ্বাসযোগ্যতার ওপর অপূরণীয় আঘাত হেনেছে।'
পার্সটুডের প্রতিবেদনে বলা হয়, জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে রুশ পররাষ্ট্রমন্ত্রীর বক্তব্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় সামনে এনেছে: 'IAEA-এর সেফগার্ডের আওতায় থাকা ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা শুধু সামরিক পদক্ষেপ নয়, এটি এই আন্তর্জাতিক সংস্থার বিশ্বাসযোগ্যতার ওপরও অপূরণীয় আঘাত।' তিনি জোর দিয়ে বলেন, ইরানের বেসামরিক অবকাঠামো ও শান্তিপূর্ণ পারমাণবিক স্থাপনায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলা এমন সময় হয়েছে, যখন এসব স্থাপনা IAEA-এর নজরদারির আওতায় ছিল।
যদি এমন হামলার বিরুদ্ধে IAEA দৃঢ় ও স্পষ্ট প্রতিক্রিয়া না জানায়, তাহলে সেফগার্ড ও আন্তর্জাতিক যাচাই-বাছাইয়ের কার্যকারিতা নিয়েই প্রশ্ন উঠবে। এই প্রেক্ষাপটে যাকে ‘উপেক্ষা’ বলা হচ্ছে, সমালোচকদের মতে তা শুধু অজ্ঞতা নয় বরং এটি এমন একটি কাঠামোগত ও রাজনৈতিক নীরবতা, যা IAEA-এর কারিগরি দায়িত্বকে ক্ষমতার রাজনীতির হাতিয়ারে পরিণত করতে পারে।
IAEA তার সংবিধান অনুযায়ী একটি কারিগরি ও তদারকি সংস্থা; এটি কোনো নির্বাহী বা সামরিক প্রতিষ্ঠান নয়। সংস্থাটির শাস্তি দেওয়া, কোনো পক্ষকে আগ্রাসী হিসেবে ঘোষণা করা কিংবা সশস্ত্র সংঘাতে হস্তক্ষেপ করার ক্ষমতা নেই। ফলে কোনো দেশ বা জোট IAEA-এর সেফগার্ডের আওতাধীন পারমাণবিক স্থাপনায় হামলা করলে, বাস্তবে সংস্থাটি জাতিসংঘ নিরাপত্তা পরিষদের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে। কিন্তু বড় শক্তিগুলোর ভেটোর কারণে গুরুত্বপূর্ণ সংকটে নিরাপত্তা পরিষদ প্রায়ই অচল হয়ে পড়ে।
এছাড়া IAEA সদস্য দেশগুলোর আর্থিক সহায়তার ওপর নির্ভরশীল, বিশেষ করে পশ্চিমা শক্তিগুলোর ওপর। এই নির্ভরতা রাজনৈতিকভাবে রক্ষণশীল অবস্থান নেওয়ার প্রণোদনা তৈরি করতে পারে। ওয়াশিংটন ও তেল আবিবের সঙ্গে সংঘাত এড়ানোর আশঙ্কা, সংঘাতের পক্ষ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার উদ্বেগ এবং ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে প্রবেশাধিকার বজায় রাখার আগ্রহ-সব মিলিয়ে এমন নীরবতা তৈরি হতে পারে, যা সমালোচকদের কাছে সহযোগিতা বা উদাসীনতা হিসেবে প্রতীয়মান হয়।
IAEA হয়তো বলতে পারে, সামরিক হামলা তার এখতিয়ারের বাইরে। কিন্তু এই যুক্তি IAEA-এর কারিগরি নিরপেক্ষতা এবং তার তত্ত্বাবধানে থাকা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর নিরাপত্তার প্রতি উদাসীনতার মধ্যকার সীমারেখাকে অস্পষ্ট করে দিতে পারে।
IAEA-এর নিষ্ক্রিয় অবস্থানের গুরুতর পরিণতি হতে পারে। প্রথমত, এতে সংস্থাটির বিশ্বাসযোগ্যতা ক্ষয় হতে পারে। কোনো দেশ যদি তার পারমাণবিক স্থাপনা IAEA-এর তত্ত্বাবধানে রাখে, কিন্তু সেই স্থাপনায় হামলার ক্ষেত্রে কার্যকর কোনো সুরক্ষা না পায়, তাহলে স্বচ্ছতা ও সহযোগিতায় তার আগ্রহ কমতে পারে।
এটি সরাসরি পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থাকে ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে। কারণ দেশগুলো মনে করতে পারে, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিতে (NPT) থাকা এবং সেফগার্ড মেনে চলা তাদের নিরাপত্তা বাড়ানোর বদলে তাদের স্থাপনাগুলোকে হামলার ঝুঁকিতে ফেলতে পারে। দ্বিতীয়ত, এর ফলে ‘পারমাণবিক অস্পষ্টতা’ ও গোপনীয়তার প্রবণতা' বাড়তে পারে।
কোনো দেশ যদি মনে করে আন্তর্জাতিক নজরদারি তার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারছে না, তাহলে সেটি গোপন সক্ষমতা অর্জন, NPT থেকে বেরিয়ে যাওয়া কিংবা পারমাণবিক প্রতিরোধ ক্ষমতার দিকে এগিয়ে যেতে পারে।
তৃতীয়ত, এর ফলে পারস্য উপসাগর ও হরমুজ প্রণালিতে আঞ্চলিক অস্থিতিশীলতা বাড়তে পারে। ল্যাভরভের সতর্কতার মতো, সশস্ত্র সংঘাত অব্যাহত থাকলে নৌপরিবহন ও বৈশ্বিক বাণিজ্য ক্ষতিগ্রস্ত হতে পারে। একই সঙ্গে উপসাগরীয় দেশ, আরব দেশ ও ইরানের মধ্যে আস্থা তৈরির প্রয়োজনীয়তাও বাড়বে।
চতুর্থত, বৈশ্বিক দক্ষিণ ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে দূরত্ব আরও বাড়তে পারে। অনেক দেশ এই পরিস্থিতিকে দ্বৈত মানদণ্ডের উদাহরণ হিসেবে দেখে। তাদের মতে, সেফগার্ডের আওতাধীন ইরানের পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার ক্ষেত্রে গুরুতর আইনি প্রতিক্রিয়া দেখা না গেলেও, অন্য কিছু ইস্যুতে একই স্থাপনাগুলো পরিদর্শনের জন্য IAEA সর্বোচ্চ চাপ প্রয়োগ করছে।
মূল প্রশ্ন হলো-IAEA কি রাজনীতির ছায়া থেকে বেরিয়ে আবারও একটি কারিগরি ও নিরপেক্ষ সংস্থা হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করতে পারবে? এর উত্তর শুধু ইরানের পারমাণবিক ইস্যুর ভবিষ্যতের জন্য নয়, পুরো পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ ব্যবস্থার ভবিষ্যতের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ।
IAEA যদি সেফগার্ডের আওতাধীন পারমাণবিক স্থাপনায় বোমাবর্ষণের ঘটনায় নীরব থাকে, তাহলে এর মূল্য শুধু ইরান নয়, সেই সব দেশকেও দিতে হতে পারে যারা স্বচ্ছতা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতার মাধ্যমে নিজেদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে চায়।
সমাধানের পথ হিসেবে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, IAEA-এর মৌলিক নীতিতে ফিরে যেতে হবে-পারমাণবিক স্থাপনায় হামলার স্পষ্ট নিন্দা এবং সেফগার্ডের আওতাধীন স্থাপনাগুলোর সুরক্ষা ও নিরাপত্তার প্রতি সমর্থন।#
পার্সটুডে/এনএম /২৭
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।