পাকিস্তানের আন্তর্জাতিক সম্পর্কের ওপর হাফিজ সাঈদকে গৃহবন্দি করার প্রভাব
পাকিস্তানের জামায়াত উদ-দাওয়া গোষ্ঠীর প্রধান হাফিজ সাঈদ ও তার চার সহযোগীকে ছয় মাসের জন্য গৃহবন্দি করা হয়েছে। পাঞ্জাব প্রদেশের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় তার বিরুদ্ধে এই গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি করে। হাফিজ সাঈদের যে চার সহযোগীকে গৃহবন্দি করা হয়েছে তারা হলেন আব্দুল্লাহ ওবাইদ, জাফর ইকবাল, আব্দুর রহমান আবিদ ও কাজী কাশিফ। জামায়াত উদ-দাওয়া নিজেকে দাতব্য প্রতিষ্ঠান হিসেবে দাবি করলেও এটির লশকরে তৈয়্যেবা নামের একটি সামরিক শাখা রয়েছে।
২০০৮ সালের নভেম্বরে ভারতের বাণিজ্যিক রাজধানী হিসেবে পরিচিত নগরী মুম্বাইয়ে যে ভয়াবহ সন্ত্রাসী হামলা হয়েছিল সেটির পরিকল্পনাকারী হিসেবে লশকরে তাইয়্যেবাকে অভিযুক্ত করা হয়। ওই হামলাকে কেন্দ্র করে গত কয়েক বছর ধরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে গভীর মতবিরোধ চলে এসেছে। মুম্বাই-এর সন্ত্রাসী হামলায় বিদেশি পর্যটকসহ মোট ১৬৬ ব্যক্তি নিহত হয়েছিল।
ওই হামলায় জড়িত প্রায় সবাইকে তাৎক্ষণিক লড়াইয়ে হত্যা করতে সক্ষম হয় ভারতীয় নিরাপত্তা বাহিনী। কিন্তু আজমল কাসাব নামের এক বন্দুকধারী পুলিশের হাতে ধরা পড়ে। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়া শেষে ২০১২ সালে কাসাবের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তার মৃত্যুদণ্ড কার্যকর হওয়ার পর মুম্বাই হামলা নিয়ে সৃষ্ট সব জল্পনার অবসান হবে বলে অনেকে ধারণা করেছিলেন। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। ভারত সরকার এ ব্যাপারে শুরু থেকে যে দাবি করে আসছিল কাসাবের মৃত্যুদণ্ডের পরেও তাতে অটল থাকে। নয়াদিল্লি জানায়, পাকিস্তানকে হয় মুম্বাই হামলার মূল পরিকল্পনাকারী হাফিজ সাঈদের বিচার করতে হবে অথবা তাকে গ্রেফতার করে ভারতের কাছে হস্তান্তর করতে হবে। নয়াদিল্লির এই দাবির কারণে বিগত বছরগুলোতে প্রতিবেশী দুই দেশের মধ্যে শান্তি আলোচনার একাধিক উদ্যোগ ব্যর্থ হয়েছে।
মুম্বাই হামলার পর ভারতের পক্ষ থেকে হাফিজ সাঈদকে গ্রেফতারের জন্য ইসলামাবাদের ওপর প্রবল চাপ সৃষ্টি করার পর জামায়াত উদ-দাওয়ার প্রধান বেশ কিছুদিনের জন্য অজ্ঞাতবাসে চলে যান। সে চাপ কিছুটা কমে আসার পর এখন থেকে বছরখানেক আগে পলাতক অবস্থা থেকে বেরিয়ে এসে দাতব্য তৎপরতার নামে প্রকাশ্যে আগের মতো নিজের তৎপরতা শুরু করেন।
কিন্তু এবার হঠাৎ করে হাফিজ সাঈদ ও তার পাঁচ সহযোগীকে গৃহবন্দি করার ঘটনা থেকে বোঝা যায় পাকিস্তানের ওপর এ ব্যাপারে আন্তর্জাতিক চাপ তীব্র হয়েছে। কারণ, গত এক বছরে এই জঙ্গি নেতা প্রকাশ্যে তৎপরতা চালালেও তাকে গ্রেফতারের কোনো উদ্যোগ নেয়া হয়নি। অনেকে মনে করছেন, ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব গ্রহণের পর জামায়াত উদ-দাওয়া প্রধানকে গ্রেফতারের জন্য আগে থেকে ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী বিজেপি সরকারের পক্ষ থেকে যে চাপ ছিল তা তীব্র হয়েছে। অর্থাৎ চতুর্মুখী আন্তর্জাতিক চাপের কারণে এবার হাফিজ সাঈদকে গৃহবন্দি করতে বাধ্য হয়েছে ইসলামাবাদ সরকার।
ভারতের দাবির মুখে পাকিস্তান সরকার এই উগ্র জঙ্গি নেতার অনুপস্থিতিতে তার বিচার করে। কিন্তু সন্ত্রাস বিরোধী আদালত ঘোষণা করে, হাফিজ সাঈদের বিরুদ্ধে শাস্তি দেয়ার মতো কোনো দলিল প্রমাণ আদালতের হাতে নেই। ইসলামাবাদ এখন তাকে গৃহবন্দি করে একথা বোঝানোর চেষ্টা করছে যে, এই ব্যক্তির বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়া সত্ত্বেও শুধুমাত্র ওয়াশিংটন ও নয়াদিল্লিকে সন্তুষ্ট করার জন্য তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া হয়েছে।
যাই হোক, নওয়াজ শরীফের নেতৃত্বাধীন মুসলিম লীগ সরকার জামায়াত উদ-দাওয়া গোষ্ঠীর প্রধানকে গ্রেফতার করে নিজের আগের অবস্থান থেকে সরে আসতে বাধ্য হয়েছে। মার্কিন সরকার তাকে ধরিয়ে দিতে পারলে এক কোটি ডলার পুরস্কার ঘোষণা করেছে যাকে স্বাগত জানিয়েছে নয়াদিল্লি। ইসলামাবাদ এখন আশঙ্কা করছে, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প যে উগ্রবাদী নীতি গ্রহণের আভাস দিয়েছেন তাতে হয়তো হাফিজ সাঈদের বিরুদ্ধে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য হবে পাকিস্তান সরকার। কিন্তু ব্যক্তি হাফিজ সাঈদের ভাগ্যে যাই থাকুক না কেন তাকে গৃহবন্দি করার ফলে যুক্তরাষ্ট্র ও ভারতের সঙ্গে পাকিস্তানের সম্পর্কের যে উন্নতি হবে তাতে কোনো সন্দেহ নেই।#
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/৩১