ইরানের বিরুদ্ধে কেনো সংঘবদ্ধ অপপ্রচারে নেমেছে ইঙ্গ-মার্কিন-সৌদি-ইসরাইলি অক্ষ?
ইঙ্গ-মার্কিন সরকার ও ইহুদিবাদী ইসরাইলের সঙ্গে সুর মিলিয়ে ইরানের বিরুদ্ধে আবারও পুরনো অপপ্রচারে নেমেছে সৌদি শাসকগোষ্ঠী। এরই অংশ হিসেবে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল যোবায়ের বলেছেন, ইরান সন্ত্রাসবাদে সহায়তা দিচ্ছে এবং দেশটি মধ্যপ্রাচ্যের জন্য এক বড় সমস্যা!
গত বৃহস্পতিবার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ব্রুকিংস গবেষণা প্রতিষ্ঠানে এই দাবি করেন তিনি।
ইরান মধ্যপ্রাচ্যে সন্ত্রাস মোকাবেলার অন্যতম প্রধান অক্ষ হওয়া সত্ত্বেও সাম্প্রতিক সময়ে ইসলামী এই দেশটিকে সন্ত্রাসের সহযোগী বলে বার বার অপবাদ দিচ্ছে মধ্যপ্রাচ্যে মার্কিন ও পশ্চিমা শক্তিগুলোর সেবাদাস সৌদি শাসকগোষ্ঠী।
রাজতান্ত্রিক সৌদি শাসকগোষ্ঠী সাম্প্রতিক সময়ে নিজেকে ব্যাপক মাত্রায় সন্ত্রাস-বিরোধী হিসেবে তুলে ধরার চেষ্টা করছে। অথচ গত কয়েক দশক ধরে সন্ত্রাসী গোষ্ঠী আলকায়দা, তালেবান ও দায়েশ তথা আইএসআইএলসহ (আইএস) নানা তাকফিরি-ওয়াহাবি সন্ত্রাসী গোষ্ঠী গড়ে তোলা ও তাদের পরিপুষ্ট করার কাজে অন্যতম প্রধান ভূমিকা রেখেছে এই সৌদি শাসকগোষ্ঠী।
২০০৩ সাল থেকে ইরাকে নানা সন্ত্রাসী হামলার পেছনেও মদদ ছিল এই রাজতান্ত্রিক সরকারের। ইরাকে আইএসআইএল বা দায়েশকে লেলিয়ে দেয়ার ক্ষেত্রে সর্বাত্মক সৌদি সহযোগিতা ছিল লক্ষণীয়। সিরিয়ায়ও দায়েশসহ নানা ধরনের তাকফিরি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীকে সব ধরনের সহযোগিতা দিয়ে এসেছে অগণতান্ত্রিক সৌদি সরকার।
পর্যবেক্ষকরা বলছেন, মধ্যপ্রাচ্যের স্বাধীনচেতা দেশগুলোর বিরুদ্ধে আগ্রাসী নীতি জোরদারের লক্ষ্যেই সৌদি-মার্কিন অক্ষ এ জাতীয় ধ্বংসাত্মক প্রচারণায় নেমেছে।
সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী দাবি করছেন যে ইরান ইয়েমেনে হস্তক্ষেপ করছে এবং মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করছে। অথচ ইয়েমেন তিন বছর ধরে আকাশ, স্থল ও সমুদ্র পথে সৌদি সরকার এবং তার মিত্রদের মাধ্যমে অবরুদ্ধ হয়ে আছে।
প্রামাণ্য নানা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সৌদি আরব ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার ঘটনায় জড়িত ছিল এবং ওই ঘটনায় ব্যবহৃত ছিনতাই-করা-বিমানের ১৯ ছিনতাইকারীর মধ্যে ১৫ জনই ছিল সৌদি নাগরিক। অথচ আজকাল সৌদি কর্মকর্তারা দাবি করছেন ইরান ছিল ১১ সেপ্টেম্বরের হামলার সমন্বয়কারী।
আসলে নানা ধরনের ভুল ধামাচাপা দেয়ার জন্যই এ ধরনের উদ্ভট দাবি তুলছেন সৌদি কর্মকর্তারা। একই কারণে সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল যোবায়ের মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে এসে দেশটির প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের উন্মাদ-সুলভ আচরণের সঙ্গে তাল মিলিয়ে কাল্পনিক নানা কথা বলছেন।
সম্প্রতি কট্টর ইসরাইলপন্থী ও ইরান-বিদ্বেষী 'জন বোল্টন'কে মার্কিন জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টা হিসেবে নিয়োগ দিয়েছেন ট্রাম্প। সৌদি পররাষ্ট্রমন্ত্রী আদেল যোবায়ের এই নিয়োগের প্রশংসা করে বলেছেন, ইরানের ব্যাপারে বোল্টনের কঠোর নীতি খুবই যৌক্তিক। কিন্তু এ বিষয়ে মার্কিন দৈনিক হাফিংটন পোস্ট লিখেছে, বোল্টনকে দেখলে যে শব্দটি মনে আসে তা হল উন্মাদনা বা পাগলামি!
আসলে যোবায়েরসহ সৌদি শাসকগোষ্ঠীর নতুন ও অনভিজ্ঞ কর্মকর্তারা ইরান সম্পর্কে যা বলছেন তা মার্কিন সরকারের শিখিয়ে-দেয়া বুলি মাত্র। গত কয়েক বছর ধরেই সৌদি কর্মকর্তাদের নানা বক্তব্য ও আচরণে পরস্পর-বিরোধিতার মাত্রা বাড়তে দেখা গেছে। তাই তাদের মধ্যে এইসব একঘেয়ে পুরনো আচরণ ও দাবি আর বাগাড়ম্বর যতই বেশি দেখা যাবে ততই সৌদি আরবের কলঙ্ক জোরদার হতে থাকবে।
সৌদি সরকার যে নানা ধরনের উগ্রপন্থার উৎস তা আজ শিক্ষিত ও বুদ্ধিজীবী মহলে অতীতের চেয়ে অনেক বেশি স্পষ্ট। প্রখ্যাত মার্কিন চিন্তাবিদ ও তাত্ত্বিক নোয়াম চমস্কি বিশ্বব্যাপী উগ্রপন্থাগুলোর বিস্তারে সৌদি আরবের ভূমিকা তুলে ধরতে গিয়ে সম্প্রতি বলেছেন, সৌদি আরব কেবলই যে সন্ত্রাসীদের সাহায্য দিচ্ছে তা নয়, একইসঙ্গে দেশটির কথিত আলেম, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও ধর্মীয় শিক্ষালয়গুলো সৌদি আরবের প্রভাবিত বিশ্বের সব অঞ্চলে উগ্র চিন্তাধারা ছড়িয়ে দিচ্ছে।
বাস্তবতা হল সৌদি সরকারের উগ্র নীতি, ওয়াহাবি-তাকফিরিবাদ ও দখলদারিত্ব এখন তার নিজের দিকেই বুমেরাং হয়ে ফিরে আসছে। তাই যতদিন সৌদি শাসকগোষ্ঠী এ অঞ্চলে ইঙ্গ-মার্কিন-ইসরাইলি অক্ষের লক্ষ্যগুলোর সেবাদাসত্ব অব্যাহত রাখবে ততদিন এ অঞ্চলে শান্তি ফিরে আসবে না। #
পার্সটুডে/এমএএইচ/২৪