গল্প ও প্রবাদের গল্প (পর্ব ৩৭)
আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন গল্প। গল্পটি হিংসুকের মনোকষ্ট নিয়ে। যারা বিনা কারণে অন্য কোনো ভালো মানুষের উন্নতিতে হিংসা করে, তারা হিংসা করে ওই লোকের উন্নতিতে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে চায়।
অথচ যাকে হিংসা করা হয় সে কোনো কষ্ট ভোগ করে না যতোটা কষ্ট হিংসুকেরা ভোগ করে। গল্পটি এরকম: প্রাচীনকালে পণ্ডিততুল্য একজন জ্ঞানী শাসক ছিলেন। তাঁর মনের ভেতর অনেক রহস্য জমা ছিল। সেই রহস্যের কথা তিনি এমন কাউকে জানিয়ে দিতে চাইলেন যে সেই রহস্যের বিষয়টি নিজের ভেতর ধারণ করবে এবং মনে মনে লালন করে যাবে, জনসমক্ষে প্রকাশ করবে না। কিন্তু যখনই তিনি বিশ্বস্ত লোক নিয়ে ভাবতেন, নিজের আত্মীয় স্বজন, বন্ধু বান্ধব বা নিকটজনদের কাউকে বলবেন বলে ভাবতেন, তখনই দুশ্চিন্তায় পড়ে যেতেন।
মনে মনে ভাবতেন কাউকে রহস্যের কথাটা বললে তো সে জেনে যাবে তাঁর ভেতরের রহস্য, আর জনগণ যদি তাঁর গোপন রহস্যের কথা একবার জেনে ফেলে তাহলে তো জনগণের কাছে তাঁর মান- মর্যাদা বলতে আর কিছুই থাকবে না, সবই ধূলায় লুটিয়ে পড়বে। এমনকি তাঁকে এতোদিন মানুষ যেই দৃষ্টিতে দেখতো, যেভাবে জানতো, সেভাবে আর কেউ দেখবেও না, জানবেও না। তাহলে তো জনগণের মাঝে তাঁর ব্যক্তিত্বের আয়নাটুকু ভেঙ্গে কাঁচের মতো টুকরো টুকরো হয়ে যাবে। কিন্তু রহস্যের ব্যাপারটা নিজের ভেতরে আর ধরেও রাখা যাচ্ছে না। কী করা যায় .. কী করা যায় ... এরকম ভাবতে ভাবতে একদিন শাসক লোকটি সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললেন যে সবাইকে ডেকে বিষয়টা জানিয়ে দেবেন। সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাঁর কাছের লোকজন যারা ছিল তাদের কয়েকজনকে তাঁর কাছে ডাকলেন।
পণ্ডিত শাসক বললেন: “দ্যাখো! তোমরা সবাই আমার আপন! তোমাদের আমি বিশ্বাস করি। সে জন্যই আমি চাচ্ছি একটা গুরুত্বপূর্ণ বিষয় নিয়ে তোমাদের সাথে পরামর্শ করবো। আমার দৃঢ় বিশ্বাস আছে তোমাদের ওপর যে তোমরা কিছুতেই বিষয়টা নিয়ে কারো সাথে আলাপ করবে না,কাউকে জানাবে না, কাছের মানুষের সাথেও না। তোমরা কথা দাও সারা জীবন নিজেদের ভেতরে লুকিয়ে রাখবে রহস্যটা, কারো কাছে ফাঁস করবে না।”
একজন বললোঃ “হুজুর! আপনি আমাদের ওপর একশ’ ভাগ আস্থা ও বিশ্বাস রাখতে পারেন। আমরা আপনার জন্য প্রাণ পর্যন্ত উৎসর্গ করতে রাজি আছি! আর সামান্য একটা রহস্যের কথা তো ছাই।”
শাসক বললেনঃ "আমি দীর্ঘদিন ধরে নিজের ভেতর পুষে রাখা রহস্যটা তোমাদেরকে জানিয়ে একটু হালকা হতে চাচ্ছি। যদি শুনি তোমাদের কেউ রহস্যটা কারো কাছে ফাঁস করে দিয়েছো, তাকে নির্দয়ভাবে মেরে ফেলবো, কোনোভাবেই ক্ষমা করা হবে না"।
স্বজনদের সবাই কথা দিলো আর কথা পেয়ে পণ্ডিতও এক এক করে রহস্যটা তাঁর বিশ্বস্ত স্বজনদের কাছে ফাঁস করে দিলো। তারপর এক করে সবার দিকে তাকিয়ে বললোঃ “কথা না ভঙ্গকারীর জন্য অপেক্ষা করছে কঠিন মৃত্যু"। রহস্যের কথা ফাঁস করে দেওয়ার পরদিনই তা পুরো এলাকায় চাউর হয়ে গেল। শাসক যখন জানতে পারলেন-স্বজনরা কথা রাখে নি, মনে মনে বললেনঃ “আমার আপনজনেরা আমাকে কথা দিয়েও একটা দিনও রহস্যটা নিজেদের ভেতর পুষে রাখতে পারলো না। সুতরাং তাদের সবাইকে জল্লাদের হাতে সঁপে দেবো।”
শাসক রহস্য ফাঁসকারীদের হত্যা করার আদেশ দিলেন। ফাঁসকারীরা তো কান্নাকাটি শুরু করে দিলো। অনুনয় বিনয় করতে লাগলো। একজন বললোঃ “হে মহান শাসক! আমরা অন্যায় করে ফেলেছি, আমাদের ক্ষমা করে দিন! যাঁরা মহান তাঁরাই তো ক্ষমা করেন। আমরা জানি আমরা যে অন্যায় করেছি সে জন্যে আমাদের মাথা কেটে ফেলা উচিত। কিন্তু আপনি তো মহান শাসক! আপনি আমাদের ক্ষমা করে দিন! শয়তান আমাদেরকে প্রতারিত করেছে। আমরা কথা দিচ্ছি এমন ভুল আর হবে না।” কিন্তু শাসক বললেনঃ “চুপ করো! আগেও তোমরা কথা দিয়ে কথা রাখো নি। তোমরা জানতে কথা ভঙ্গ করার শাস্তি মৃত্যু। তারপরও কথা ভঙ্গ করেছো। তোমাদের ওপর আমার আর কোনো আস্থা নেই। তোমরা জনগণের কাছে আমাকে অপমান করেছো। এই বলে শাসক জল্লাদের দিকে তাকিয়ে বললেনঃ তরবারি হাতে নাও! আর একেক করে এই বিশ্বাসঘাতকদের সবার মাথা কেটে ফেল।”
মৃত্যুদণ্ড প্রাপ্তদের মধ্য থেকে এক বৃদ্ধ উঠে বললেনঃ “কেন আমাদের হত্যা করছো! তুমি নিজেই তো অন্যায়কারী।” শাসক বিস্ময়ের সাথে বললেনঃ “কীভাবে?” বৃদ্ধ বললেনঃ “হে মহান শাসক! তোমার অন্তর ছিল রহস্যের ধারায় পূর্ণ। তুমি ঐ ঝর্ণাপ্রবাহের মুখে বাঁধ না দিয়ে সেই বাঁধ বরং ভেঙ্গে দিয়ে কয়েকজনের মাঝে তা জারি করে দিয়েছো। ঝর্ণার সেই ধারা নদীতে পরিণত হলো আর নদীর জোয়ারে বন্যা দেখা দিলো। এখন এই বন্যাকে তুমি কী করে ঠেকাবে?”
শাসক বললেনঃ “কিন্তু আমি তো তোমাদের বিশ্বাস করেছিলাম। তোমরা আমার আপনজন। আমি কি জানতাম যে তোমরা বিশ্বাসভঙ্গ করবে!” বৃদ্ধ দারুণ জবাব দিলো।
বৃদ্ধ বললেনঃ “গুপ্তধন গোপন গোলাতেই রাখতে হয় আর গোপন রহস্য পুষতে হয় নিজের ভেতরেই। রহস্যের কথা মুখে না আনা পর্যন্তই নিয়ন্ত্রণ করা যায়, কিন্তু একবার মুখ খুললেই তা নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়।" শাসক গভীর মনোযোগ দিয়ে বৃদ্ধের কথাটা শুনে নিজের ভুল বুঝতে পারলেন। ভাবলেন, সত্যিই তো, যে রহস্য নিজেই পুষে রাখতে পারলাম না, আরেকজন পুষে রাখবে, সেটা ভাবি কী করে! এই ভেবে তাঁর নিকটজনদের উদ্দেশ্যে বললেনঃ “এই অভিজ্ঞ বৃদ্ধ যথার্থই বলেছেন। ভুলটা আসলে আমারই ছিল। তোমাদের কাছে আমার মনের গোপন রহস্য ফাঁস করা ঠিক হয় নি। তোমাদের সবাইকে ক্ষমা করে দিলাম। তবে তোমরা আর আমার স্বজন থাকবে না, কেবল এই বৃদ্ধ ছাড়া। কারণ এই বৃদ্ধ আমাকে পথ দেখিয়েছে।”
আপনারা কি কেউ বলতে পারেন-রহস্যটা কী ছিল? হ্যাঁ, যে কথাটা বলা হয় নি এবং যা নিয়ে আপনারা এখন ভাবতে বসেছেন .. তাকেই বলে রহস্য।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/মো.আবুসাঈদ/ ১২
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।