এপ্রিল ২৬, ২০২৩ ১৬:৫০ Asia/Dhaka

প্রিয় পাঠক ও শ্রোতাবন্ধুরা! সালাম ও শুভেচ্ছা নিন। আশা করি যে যেখানেই আছেন ভালো ও সুস্থ আছেন। ইরানের কালজয়ী গল্পের পসরা গল্প ও প্রবাদের গল্পের আজকের আসরে আমরা শুনবো চমৎকার একটি প্রাচীন প্রবাদের গল্প। গল্পটি এরকম: 

প্রাচীনকালের বণিকেরা তাদের মালামাল ঘোড়া কিংবা উটের পিঠে নিয়ে বাণিজ্যযাত্রা করতো। বণিক কাফেলা মাল বিক্রি করার জন্য এক শহর থেকে আরেক শহরে ঘুরে বেড়াতো। কিন্তু দীর্ঘ যাত্রার বাণিজ্যপথ তাদের জন্য নিরাপদ ছিল না। রাস্তার বাঁকে বাঁকে দস্যুদল ওঁৎ পেতে বসে থাকতো এবং সুযোগ বুঝে হামলা চালিয়ে মালামাল লুট করে নিয়ে যেত।

সেজন্য বণিকেরা চাইতো তাদের কাফেলাকে বড় করতে যাতে লুটেরার দল হামলা করতে সাহস না পায়। একদিন এরকম একটি বাণিজ্য কাফেলা এক শহর থেকে আরেক শহরের দিকে যাত্রা করলো। ব্যবসায়ীদের সবাই মোটামুটি বেশি বেশি মালামাল নিলো পরের শহরে বিক্রি করার জন্য। দিন দুয়েক যাবার পর কাফেলা পথের এমন এক বাঁকে গিয়ে পৌঁছলো যেখানে লুটেরাদের হামলার সম্ভাবনা বেশি। সেই আশঙ্কা কাজ করছিলো ব্যবসায়ীদের মাঝে। এরইমাঝে রাত ঘনিয়ে আসায় ভীতির পরিমাণ বেড়ে গেল। কাফেলার গাইড সবার উদ্দেশে বললো বাঁকে পৌঁছানোর আগেই যেন বিশ্রাম নেওয়ার জন্য ভালো একটা স্থান বেছে নেয়। পরদিন আলোর মাঝে ডাকাতির আশঙ্কা কম থাকবে,তখন পুনরায় যাত্রা শুরু করা যাবে। 

ব্যবসায়ীদের কাফেলা পরামর্শ অনুযায়ী তাদের ঘোড়া এবং উটের পিঠ থেকে মালামাল নামিয়ে মাটিতে রাখলো। সেইসঙ্গে ঘুমানোর প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র, খাবার-দাবারের আয়োজনসহ বিশ্রামের সকল আয়োজন করলো। কাফেলার পথ প্রদর্শক ব্যবসায়ীদের বললো: তোমাদের দামি জিনিসপত্র তাঁবু থেকে একটু দূরে পাথরের ভাঁজে ভাঁজে নিয়ে লুকিয়ে রাখো। তাহলে ডাকাতদল হামলা করলেও সেগুলোর নাগাল পাবে না। পরামর্শটা পছন্দ হলো ব্যবসায়ীদের। সবাই তাদের দামি মালামাল লুকিয়ে রাখার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়লো। ব্যবসায়ীদের মধ্যে একজনকে বেশ নিশ্চিন্ত মনে হলো। তার সঙ্গে দামি জিনিসপত্র থাকার পরও সে চুরির আশঙ্কা করলো না। সে বরং উল্টো অন্যদেরকে সাহায্য করতে লাগলো মালামাল লুকানোর কাজে।

সবাইকে মালামাল লুকানোর কাজে সাহায্য করার পর নিজের মাল-সামানা কাছেই, হাতের নাগালেই রেখে দিলো। ব্যবসায়ীরা রাতের খাবার খেলো। তারপর বিশ্রামে চলে গেল মনে একরাশ উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা নিয়ে। যে ব্যবসায়ী অন্য সবাইকে সাহায্য করেছিল সে বললো: এভাবে হবে কী করে। আমরা পালাক্রমে একজন করে জেগে থাকবো আর বাকি সবাই ঘুমোবে। কেউ জেগে না থাকলে পাহারা দেবে কে? সবাই তার কথায় রাজি হয়ে গেল। সে বললো: ঠিক তোমরা সবাই ঘুমাও! আমি দুই ঘণ্টা পর একজনকে জাগাবো আর আমি ঘুমাবো। সবাই রাজি হয়ে গেল এবং ক্লান্তির ভারে শ্রান্তির ঘুমে ঢলে পড়লো। ব্যবসায়ী একটু অপেক্ষা করে যখন নিশ্চিত হলো সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে। পা টিপে টিপে সবাইকে দেখে নিয়ে পথের বাঁকের দিকে গেল। সেখানে দেখতে পেল…। 
 
সাহায্যকারী ব্যবসায়ী পথের বাঁকের দিকে গিয়ে দেখতে পেলো অন্ধকার একটি ছায়া। সরবে সে বললো: তোমরা যদি চোর-ডাকাত হয়ে থাকো তাহলে আমার কথা শোনো। আমি একা! নিরস্ত্র। আমাকে তোমাদের সর্দারের কাছে নিয়ে যাও! তার সঙ্গে জরুরি আলাপ আছে। চোরেরা তার হাত পা বেঁধে তাদের সর্দারের কাছে নিয়ে গেল। সে সর্দারকে বললো: আমি একটি ব্যবসায়ী কাফেলার সঙ্গে এসেছি। যেখানে এদের সঙ্গে দেখা হয়েছে তার একটু পরেই শহরে যাবার ইচ্ছে ছিল। যাই হোক, তোমরা যদি আমাকে কথা দাও তাহলে আমি গোপন রহস্যটা তোমাদের জানাবো। সেটা হলো আমার মালামালে তোমরা যদি হাত না দাও এবং অন্যদের যেসব মালামাল তোমরা লুট করবে তার একটা অংশ যদি আমাকে দাও তাহলেই আমি রহস্যটা জানাবো। সর্দার রাজি হলো। ব্যবসায়ী তার কাফেলার কে কোথায় মাল লুকিয়েছে, সব জানিয়ে দিলো। 

তারপর দ্রুত সে কাফেলার কাছে ফিরে গেল। তার যাওয়া-আসায় দু'ঘণ্টার বেশি লেগে গেল। গিয়েই একজনকে জাগিয়ে তুলে বললো: আমার ঘুম পাচ্ছে, এবার তুমি পাহারা দাও! দুই ঘণ্টা পর তুমি আরেকজনকে জাগিয়ে তুলে পাহারা দিতে বলো। নতুন পাহারার আধা ঘণ্টার মধ্যেই লুটেরার দল হামলা করলে সে সবাইকে জাগিয়ে দিলো। চোরেরা মালামাল লুকিয়ে রাখার স্থানে গিয়ে সব লুট করে নিয়ে গেল। কিন্তু সাহায্যকারী ব্যবসায়ীর মালের ধারেকাছেও গেল না কেউ। সকালে ব্যবসায়ীরা আহাজারি করতে করেতে চলে যাবার জন্য প্রস্তুত হলো। কয়েকজন বললো: সামনের শহরে গিয়ে বন্ধু-বান্ধবের কাছ থেকে কিছু টাকা-পয়সা ধার নিতে হবে,চলো! কিন্তু একজনের মাল চুরি না হওয়ায় সবাই খুব অবাক হলো। কেউ বললো: ও ভালো মানুষমসবাইকে সেবা দিয়েছে, তার ফল পেয়েছে। 

কিন্তু দুষ্ট ব্যবসায়ী বললো: তোমাদের আহাজারি শুনতে খারাপ লাগছে। আমি বরং একাই সফর করবো। তার মালামাল ঘোড়া ও উটের পিঠে তুলে রওনা হলো। পথিমধ্যে চোরের সর্দারের সঙ্গে দেখা করে তার প্রাপ্য অংশ বুঝে নিলো। দু'একদিন পর ব্যবসায়ী কাফেলা শহরে পৌঁছলো। তাদের হাতে থাকা যার যার শেষ সম্বল বিক্রি করলো। ওই বাজারে দেখা হয়ে গেল তাদের সঙ্গী দুষ্ট ব্যবসায়ীর সঙ্গে। তার কাছে এমন কিছু জিনিসপত্র পাওয়া গেল যেগুলো তাদের চুরি হওয়া মালের অংশ। একজন সবাইকে সমবেত করে ব্যাপারটা উত্থাপন করলো। সবাই মিলে গেল কাজির কাছে। দুষ্ট ব্যবসায়ীর বিরুদ্ধে অভিযোগ করলো তারা। কাজি আদেশ দিলো অভিযুক্তকে গ্রেফতার করে তার কাছে হাজির করতে।

কাজি তাকে দেখেই বললো: আশ্চর্য! তুমিই তাহলে 'কাফেলারও বন্ধু আবার চোরেরও অংশীদার'। বেশ তো! এখন আমি এমন শাস্তির আদেশ দেবো যা দেখে আকাশে উড়ন্ত পাখিরাও কাঁদবে। এই ঘটনার পর থেকে যখনই কেউ নিজের স্বার্থে আপনজনদের সঙ্গে মোনাফেকি করে তাদের সম্পর্কে এই প্রবাদটি উচ্চারণ করে: 'কাফেলার বন্ধু চোরের অংশীদার।#

পার্সটুডে/এনএম/২৬/৬৪

মূল ফার্সি গল্পের রূপান্তর: নাসির মাহমুদ