জানুয়ারি ০২, ২০২৪ ১৫:২০ Asia/Dhaka

গত পর্বের আলোচনায় আমরা ওমর খৈয়ামের জন্মস্থান নিশাপুর শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য এবং এই শহরের নানা উত্থান-পতনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে বহি:শত্রুর আক্রমণ ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের কথা উল্লেখ করেছিলাম। আজকে আমরা ওমর খৈয়ামের যুগের শিক্ষা পদ্ধতি সম্পর্কে আলোচনা করবো।

মঙ্গোলদের আক্রমণের পর নিশাপুর এলাকা আরো বেশ ক'বার হামলা ও  অবরোধের শিকার হয়েছিল। উদাহরণস্বরূপ, ১৭৫১ সালে আফগানিস্তানে দুররানি শাসনের প্রতিষ্ঠাতা আহমদ শাহ দুররানির মাধ্যমে নিশাপুর জয়ের কথা উল্লেখ  করা যায়। ওই হামলায় সেখানে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ সংঘটিত হয়েছিল। এরপর বহু বছর ধরে এই শহরে বিশৃঙ্খলা বজায় ছিল। কাজার যুগে নিশাপুর তেমন কোনো সমৃদ্ধি অর্জন করতে পারেনি। ১৯৩৭ সালে রেজা খান পাহলভির শাসনামলে দেশের অঞ্চল বিভক্তির সময় নিশাপুর এলাকাটি খোরাসান ও সিস্তান প্রদেশের আঠারোটি উপশহরের একটিতে পরিণত হয়।

আমরা ওমর খৈয়ামের জন্মস্থান নিশাপুর শহরের ইতিহাস, ঐতিহ্য সম্পর্কে যে আলোচনা করেছি তা ছিল ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত। বর্তমানে ঐতিহাসিক নিশাপুর শহরটি খোরাসান রাজাভি প্রদেশের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ শহর যার মোট আয়তন ৩৩৭৭ বর্গ কিলোমিটার এবং এর জনসংখ্যা পাঁচ হাজার।

দীর্ঘ ইতিহাস জুড়ে, নিশাপুরের সমৃদ্ধি ও এর আয়তনের বিষয়টি ছাড়াও, জ্ঞানবিজ্ঞানের বিকাশ ও চর্চার ক্ষেত্রে এই এলাকাটি ছিল উপযুক্ত স্থান। অতীতকালে বহু সম্ভ্রান্ত পরিবার নিশাপুরে বাস করতেন যারা সর্বদাই ছিলেন ইরানসহ বহি:র্বিশ্বে জ্ঞানবিজ্ঞান এবং উন্নত সভ্যতা ও সংস্কৃতির পতাকাধারী। নিশাপুরের নাম এবং বিখ্যাত ব্যক্তিদের তালিকা এতই দীর্ঘ যে এই শহরের একজন প্রবীণ লেখক আল-হাকাম ১০০৯ খ্রিস্টাব্দের দিকে এই শহরের বিজ্ঞান ও সাহিত্য অঙ্গনের বিখ্যাত ব্যক্তিদের নামের তালিকা তুলে ধরে একটি তথ্যসমৃদ্ধ বই রচনা করেছিলেন। এই শহরের বিখ্যাত কিছু চিন্তাবিদ হলেন আত্তার নিশাপুরী, হাকিম ওমর খৈয়াম, মোয়াজি নিশাপুরী, আদিব নিশাপুরীসহ আরও অনেক পণ্ডিত ব্যক্তিত্ব।

নিশাপুর এমন একটি শহর যেখানে সভ্যতা ও সংস্কৃতির গন্ধ খুঁজে পাওয়া যায় যেটাকে কোনোভাবেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। 'হাকিম ওমর খৈয়াম'-এর মতো মহান চিন্তাবিদ ও বিশ্বখ্যাত মনীষীর সমাধি রয়েছে এই শহরে। তিনি এই শহরেই জন্মগ্রহণ করেছেন, বেড়ে উঠেছেন, জ্ঞানবিজ্ঞানের চর্চা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত এই শহরেই মৃত্যুবরণ করেছেন। হাকিম ওমর খৈয়াম-এর সমাধি নিশাপুরে অবস্থিত হওয়ায় এই এলাকাটি যেমন সারা বিশ্বের কাছে পরিচিত একটি নাম তেমনি খৈয়ামের স্মৃতিকেও ধারণ করে আছে এই এলাকাটি। যারা এই মহান ইরানি মনীষীর প্রতি আগ্রহী তারা নিশাপুরের সুন্দর শহর ভ্রমণে আসেন এবং ওমর খৈয়ামের সমাধি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শকরা সেই নিশাপুরের জন্য গর্ব করেন যেখানে খৈয়ামের মতো জগদ্বিখ্যাত ব্যক্তিত্ব লালিত পালিত হয়েছেন।

এ প্রসঙ্গে, এবারে আমরা ওমর খৈয়াম নিশাপুরীর শৈশব ও শিক্ষাজীবন নিয়ে কথা বলব।

ওমর খৈয়াম, যার পুরো নাম গিয়াস উদ্দিন আবু আল-ফাতহ উমর বিন ইব্রাহীম নিশাপুরী। ইরানের নিশাপুর শহরে ১০৪৮ খ্রিস্টাব্দে তিনি জন্মগ্রহণ করেন। 

খৈয়ামের পিতার নাম 'ইব্রাহিম' এবং তিনি চাদর বা তাঁবু নির্মাণের কাজ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। ফার্সি ভাষায় খৈয়াম শব্দের অর্থ তাঁবুর দর্জি অথবা তাঁবু বিক্রেতা।  এই কারণে, 'খৈয়াম' নামটি তার পুত্রের নামের একটি উপাধি হয়ে ওঠে এবং আজ পর্যন্ত সমগ্র বিশ্ব এই মহান মনীষীকে 'হাকিম ওমর খৈয়াম' নামেই চেনে। ওমর খৈয়াম শৈশব থেকেই অত্যন্ত বুদ্ধিমান ছিলেন এবং তাঁর সৃজনশীল শক্তি ও প্রতিভা সবার কাছে পরিচিত ছিল। ইব্রাহিম এমন একজন বাবা ছিলেন যিনি তার ছেলের লালন-পালন এবং শিক্ষার বিষয়ে অনেক যত্নবান ছিলেন। তিনি ছেলেকে কুরআন পড়া শিখিয়েছিলেন। ৫-৬ বছর বয়সে, ওমর খৈয়াম দুই বা তিন মাসের মধ্যে কুরআন পড়া শিখেছিলেন, তবে তিনি এর অর্থ জানতেন না। পিতা ইব্রাহিম তার সামান্য অক্ষরজ্ঞান দিয়ে তার ছেলেকে এর চেয়ে বেশি সাহায্য করতে পারেননি এবং পুত্রের সব প্রশ্নের উত্তর দিতে পারেননি। তাই তিনি তার সন্তানকে প্রাথমিক শিক্ষার্জনের জন্য মক্তবখানায় পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেন।

সে সময় জ্ঞানবিজ্ঞান ও সাহিত্যে নিশাপুর ছিল একটি অগ্রগামী শহর। এই শহরে ছিল মুসলিম সভ্যতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একাধিক গ্রন্থাগার। নিশাপুরের বিখ্যাত গ্রন্থাগারগুলোর মধ্যে, আমরা 'নিজামিয়ে' গ্রন্থাগার, মোহাম্মদ গাজ্জালীর ব্যক্তিগত গ্রন্থাগার, পাঁচ হাজার বই সহ 'আকীল মসজিদ' গ্রন্থাগার এবং 'সাদিয়াহ নিশাপুর বিদ্যালয়' গ্রন্থাগারের কথা উল্লেখ করতে পারি। 'বায়হাকি নিশাপুর বিদ্যালয়' নামে গ্রন্থাগার প্রতিষ্ঠা করেছিলেন ইরানি লেখক ও ইতিহাসবিদ আবুল হাসান বায়হাকি। ৫ম হিজরি মোতাবেক খ্রিস্টীয় ১১ শতাব্দীতে এটি ছিল এই শহরের একটি বিখ্যাত গ্রন্থাগার। ওই সময়ের ধর্মীয় জ্ঞানার্জন ও জ্ঞানবিজ্ঞানের বিভিন্ন শিক্ষার সাথে পরিচিত হওয়ার জন্য নিশাপুরের সব স্তরের মানুষ তাদের সন্তানদেরকে বিভিন্ন মক্তবখানায় পাঠাতো। খ্রিস্টীয় ১১ শতকের  দিকে ইরানে যদিও আধুনিক যুগের মতো কোনো স্কুল বা শিক্ষাকেন্দ্র ছিল না, তবে শহরের আলেম বা ধর্মীয় ব্যক্তিত্বদের মাধ্যমে পরিচালিত এসব মক্তবে শিশুদেরকে শিক্ষা দেওয়া হতো।

সে সময় এ জাতীয় শিক্ষাকেন্দ্রগুলোকে সাধারণত বেসরকারি ও সরকারি এই দুই ভাগে ভাগ করা হতো । বেসরকারি শিক্ষাকেন্দ্রগুলো ছিল সমাজের অভিজাত শ্রেণীর জন্য আর সরকারি শিক্ষাকেন্দ্রগুলো ছিল সাধারণ মানুষের জন্য। প্রতিটি পাড়ায় বা মহল্লায় মক্তব খানার ব্যবস্থা ছিল। এই ব্যবস্থা ১৯২৫ থেকে ১৭৮৯ সাল পর্যন্ত  ইরানে কাজার সময়কালের শেষ পর্যন্ত বিদ্যমান ছিল। এরপর  ইরানে শিক্ষার কাঠামো ধীরে ধীরে পরিবর্তিত হয় এবং আধুনিক স্কুল বা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলো মক্তব খানার জায়গা করে নেয়।

ওমর খৈয়ামের যুগে মক্তবখানাকেন্দ্রিক শিক্ষাব্যবস্থার প্রচলন ছিল। পুত্রের লেখাপড়ার জন্য ওমর খৈয়ামের বাবার প্রথম পছন্দ ছিল 'মৌলভী কাজী মোহাম্মদ'-এর মক্তবখানা। এই মক্তবখানায় অনেকগুলো শ্রেণীকক্ষ ছিল যেখানে শিশুদেরকে প্রাথমিক শিক্ষা দেয়া হতো। শিক্ষার আরো উচ্চতর পর্যায়ে গিয়ে এই কেন্দ্রগুলোতে বাচ্চাদেরকে ফারসি শব্দভাণ্ডার, আরবি ভাষা, ধর্মীয় রীতিনীতি, পাটিগণিতের মৌলিক বিষয়, আইনশাস্ত্র এবং সামান্য কিছু সাহিত্য শেখানো হত। #

পার্সটুডে/রেজওয়ান হোসেন/২

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।

ট্যাগ