রংধনু আসর: ওমর খৈয়ামের জন্ম বার্ষিকী
রংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আজ আমরা এমন এক বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ব্যক্তিত্বের জীবন ও কর্ম নিয়ে আলোচনা করব বিশ্বসাহিত্য কিংবা ইতিহাসে যার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা রয়েছে। তিনি ছিলেন একাধারে কবি, গণিতজ্ঞ, শিক্ষক, জ্যোতির্বিদ, চিকিৎসক, দার্শনিক, সুফী এবং চার লাইনবিশিষ্ট কবিতা রুবাই-এর স্রষ্টা।
রুবাই-এর কথা শুনেই তোমরা হয়ত বুঝতে পারছো- আমরা কার কথা বলছি! হ্যাঁ, তোমরা ঠিকই ধরেছ, আমরা ইরানের বিখ্যাত মনীষী ওমর খৈয়ামের কথা বলছি। ১৮ মে হচ্ছে ওমর খৈয়ামের জন্মবার্ষিকী। এ উপলক্ষে ইরানের রাজধানী তেহরানসহ কবির জন্মস্থান নিশাপুরে পালিত হয়েছে বিশেষ উৎসব। এসব অনুষ্ঠানে বিশিষ্ট চিন্তাবিদ, গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা ওমর খৈয়ামের অবদান, চিন্তাধারা, কবিতা এবং তার জীবনের কিছু গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে আলোচনা করেছেন। এ উপলক্ষে আমরাও একটি বিশেষ অনুষ্ঠান প্রচারের সিদ্ধান্ত নিয়েছি।
এ অনুষ্ঠানে ওমর খৈয়ামের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে আলোচনার পাশাপাশি তাঁর লেখা কয়েকটি রুবাইয়ের বাংলা অনুবাদ শোনাব। আর সবশেষে থাকবে একটি গানসহ বাংলাদেশে গাজীপুরের এক বন্ধুর সাক্ষাৎকার। অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।
ইরানের প্রথম সারির কবিদের মধ্যে হাকিম ওমর খৈয়াম সারা বিশ্বেই অত্যন্ত জনপ্রিয়। বিশেষ করে, গত দুই শতকে তিনি পশ্চিমা দেশগুলো কবি হিসেবে অসাধারণ জনপ্রিয়তা অর্জন করেছেন। তার নামে পাশ্চাত্যে গড়ে উঠেছে অনেক ফ্যান-ক্লাব এবং সভা-সমিতি। কয়েক বছর আগে ইরান সফরের সময় রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট ভ্লাদিমির পুতিন খৈয়ামের কবিতার প্রতি তার গভীর অনুরাগের কথা জানান।
ওমর খৈয়াম হিজরী পঞ্চম শতকের শেষের দিকে তৎকালীন পারস্যের খোরাসান প্রদেশের নিশাপুর শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পূর্ণ নাম আবুল ফাত্হ ওমর ইবনে ইবরাহীম আল খৈয়াম। খৈয়াম শব্দের অর্থ 'তাঁবু নির্মাতা'। তাঁর বংশের কেউ হয়ত এ পেশায় যুক্ত ছিলেন তাই এ শব্দটি তাঁর নামে সাথে যুক্ত হয়েছে।
ওমর খৈয়াম ছোট বেলা থেকেই খুব মেধাবী ও বুদ্ধিমান ছিলেন। তার স্মরণ শক্তি ছিল অত্যন্ত প্রখর। যেকোনো জটিল বই কয়েকবার পড়লেই তাঁর মুখস্থ হয়ে যেত। গণিতের প্রতি ছিল তাঁর বিশেষ আকর্ষণ। জ্ঞান চর্চার প্রতি তিনি এতই মনোযোগী ছিলেন যে, কোনো বই হাতে পেলেই তিনি তা পড়ে শেষ করে ফেলতেন। অবশ্য তিনি প্রতিটি কাজে মহান আল্লাহর সাহায্য চাইতেন। তাইতো দেখা যায়, একজন খাঁটি মুসলমান হিসেবে তিনি মানুষের কল্যাণের জন্য তার জীবনের মূল্যবান সময় ব্যয় করে গেছেন।
বন্ধুরা, এ পর্যায়ে আমরা ওমর খৈয়ামের জীবনের নানা দিক, অবদান ও প্রভাব সম্পর্কে খানিকটা আলোচনা করব। আমরা আগেই বলেছি, তিনি ছিলেন একাধারে উচ্চ পর্যায়ের দার্শনিক, গণিতবিদ, জ্যোতির্বিদ, বিজ্ঞানী, লেখক ও কবি। তিনিই সুলতান জালালউদ্দিন মালিক শাহ'র অনুরোধে রাজকীয় মানমন্দির প্রতিষ্ঠা করেন। এ সময় সুলতান তাকে একটি নির্ভুল সৌর বর্ষপঞ্জি তৈরির অনুরোধ করলে মাত্র সাতজন সহকর্মী নিয়ে অল্পদিনের মধ্যে তিনি তা তৈরি করতে সক্ষম হন। সুলতান জালাল উদ্দিন মালিক শাহ'র নাম অনুসারে এর নাম দেয়া হয় আত তারিখ আল জালালী অব্দ। হিজরী ৪৭১ সালের ১০ই রমজান থেকে এ বর্ষপঞ্জী চালু হয়। এ সময় ওমর খৈয়াম একটি নতুন গ্রহও আবিস্কার করেন। এর নাম দিয়েছিলেন 'জালাল'।
অনেকেই মনে করেন, ওমর খৈয়ামের অবদান সবচেয়ে বেশী বীজ গণিতে। তিনিই প্রথম বীজগণিতের সমীকরণগুলোর শ্রেণী বিন্যাসের চেষ্টা করেন। জ্যামিতির সমাধানে বীজগণিত আর বীজগণিতের সমাধানে জ্যামিতি পদ্ধতি তাঁর অভূতপূর্ব আবিস্কার। আজ থেকে প্রায় এক হাজার বছর আগে বীজগণিতের যেসব উপপাদ্য এবং জ্যোতির্বিদ্যার তত্ত্ব ওমর খৈয়াম দিয়ে গেছেন সেগুলো এখনও গণিতবিদ এবং মহাকাশ গবেষক ও জ্যোতির্বিদদের গবেষণায় সূত্র হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে। আসলে খৈয়াম নিজ যুগে মূলতঃ গণিতবিদ ও জ্যোতির্বিদ হিসেবেই খ্যাত ছিলেন এবং তিনি নিজেও তাই মনে করতেন। এছাড়া, চিকিৎসা বিজ্ঞানী হিসেবেও তিনি বেশ সুনাম অর্জন করেছিলেন।
তবে, ওমর খৈয়াম তাঁর বিখ্যাত 'রুবাইয়াত'-এর জন্যেই বিশ্বসাহিত্যে চিরস্মরণীয় হয়ে থাকবেন। বন্ধুরা, তোমরা হয়তো জানতে চাচ্ছো 'রুবাইয়াত' আবার কী? তোমাদের জানার জন্য বলছি, রুবাইয়াত হচ্ছে চার পঙক্তির সুরেলা ফার্সি কবিতা। রুবাই শব্দের বহুবচন হলো 'রুবাইয়াত। রুবাইয়াত ১ম, ২য় ও ৪র্থ পঙক্তিতে মিলযুক্ত চতুষ্পদীতে লেখা। এ জাতীয় এক হাজারেরও বেশি কবিতা তিনি রচনা করেন। পৃথিবীর রূপরস, বুলবুলির গান, টিউলিপ ফুল, গোলাপের সুবাস, বসন্তের সমীরণ, উষার আলো, জোৎস্নার রাত প্রভৃতি বিষয় তার কবিতায় বার বার ঘুরে এসেছে।
১৮৫৯ সালে বিখ্যাত ইংরেজ কবি এডওয়ার্ড ফিটজিরান্ড সর্বপ্রথম তাঁর রুবাই-এর অনুবাদ প্রকাশ করেন। এই অনুবাদের ফলেই ইংরেজিসহ ইউরোপের অন্যান্য ভাষাভাষী অঞ্চলে খৈয়ামের কাব্যখ্যাতি ছড়িয়ে পড়ে। এ অনুবাদের মাধ্যমে ফিটজেরাল্ড নিজেও খ্যাতিমান হন। ওমর খৈয়াম সম্পর্কে ফিটজেরাল্ড বলেছেন, 'কবিতা না রচনা করলে তিনি হয়ত গণিতজ্ঞ হিসেবেই অমর হয়ে থাকতেন।
অন্যদিকে, বাংলাদেশের জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম রুবাইয়াত সম্পর্কে লিখেছেন, ওমরের রুবাইয়াত বা চতুষ্পদী কবিতা চতুষ্পদী হলেও তার চারটি পদই ছুটেছে আরবী ঘোড়ার মতো দৃপ্ত তেজে সমতালে- ভণ্ডামি, মিথ্যা বিশ্বাস, সংস্কার, বিধি-নিষেধের পথে ধূলি উড়িয়ে- তাদের বুক চূর্ণ করে।
এখানে একটি কথা বলে রাখি আর তা হলো, কবি কাজী নজরুল ইসলাম ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াত থেকে প্রায় দুইশটি রুবাই বাংলায় অনুবাদ করেছেন। 'রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম' নামক বইটির ভূমিকায় তিনি লিখেছেন, "খেজুর-গাছের রস যেমন তার মাথা চেঁছে বের করতে হয়, ওমর খৈয়ামের রুবাইয়াতও বেরিয়েছে তার মস্তিষ্ক থেকে। প্রায় হাজার বছর আগে এত বড় জ্ঞানী কবি কী করে জন্মাল, তা ভেবে অবাক হতে হয়। ওমরকে দেখে মনে হয়, কোনো বিংশ শতাব্দীর কবিও বুঝি এত মডার্ণ হতে পারেন না। আজকাল পৃথিবীর কোনো মডার্ণ কবিই তার মত মডার্ণ নন, তরুণও নন। ওমর আজ জগতের অপরিমাণ শ্রদ্ধা পাচ্ছেন- তবু মনে হয়, আরো চার পাঁচ শতাব্দী পরে তিনি আরো বেশি শ্রদ্ধা পাবেন- যা পেয়েছেন তার বহু সহস্র গুণ।"
বন্ধুরা, আসরের এ পর্যায়ে আমরা কবি নজরুলের অনুবাদ করা রুবাইয়াত-ই-ওমর খৈয়াম বই থেকে কয়েকটি রুবাই শুনব।
১. ধরায় প্রথম এলাম নিয়ে বিস্ময় আর কৌতূহল,
তারপর – এ জীবন দেখি কল্পনা, আঁধার অতল।
ইচ্ছা থাক কি না থাক, শেষে যেতেই হবে, তাই বলি–
এই যে জীবন আসা-যাওয়া আঁধার ধাঁধার জট কেবল!
২. ‘ঘুমিয়ে কেন জীবন কাটাস?’ কইল ঋষি স্বপ্নে মোর,
‘আনন্দ-গুল প্রস্ফুটিত করতে পারে ঘুম কি তোর?
ঘুম মৃত্যুর যমজ-ভ্রাতা, তার সাথে ভাব করিসনে,
ঘুম দিতে ঢের পাবি সময় কবরে তোর জনম-ভোর।’
৩. স্রষ্টা যদি মত নিতে মোর – আসতাম না প্রাণান্তেও,
এই ধরাতে এসে আবার যাবার ইচ্ছা নেই মোটেও।
সংক্ষেপে কই, চিরতরে নাশ করতাম সমূলে
যাওয়া-আসা জন্ম আমার, সে-ও শূন্য শূন্য এ-ও!
৪. একদা মোর ছিল যখন যৌবনেরই অহংকার
ভেবেছিলাম- গিঁঠ খুলেছি জীবনের সব সমস্যার।
আজকে হয়ে বৃদ্ধ জ্ঞানী বুঝেছি ঢের বিলম্বে,
শূন্য হাতড়ে শূন্য পেলাম – যে আঁধারকে সে আঁধার!
বন্ধুরা, ওমর খৈয়ামের লেখা কয়েকটি রুবাইয়ের বাংলা অনুবাদ শুনলে। আশা করি ভালো লেগেছে। বিশ্বখ্যাত এ মনীষী ১২২৩ সালে ৭৯ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। মৃত্যুর আগে তিনি তার ছাত্রদের শেষবারের মত বিশেষ কোনো উপদেশ দেয়ার জন্য ডাকেন। এরপর তিনি ভালোভাবে ওজু করে এশার নামায আদায় করেন। নামাযের শেষ সেজদায় গিয়ে তিনি কাঁদতে কাঁদতে বলতে থাকেন, "হে আল্লাহ! আমি তোমার কাছে ক্ষমা চাচ্ছি। তোমার দয়া ও করুণার গুণে আমাকে মাফ করে দাও।"
এরপর তিনি আর মাথা তোলেননি। সেজদা অবস্থাতেই মহান প্রভূর কাছে চলে যান।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২০