মে ২৩, ২০১৭ ১৬:০৭ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৮৩ থেকে ৮৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৮৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  تِلْكَ الدَّارُ الْآَخِرَةُ نَجْعَلُهَا لِلَّذِينَ لَا يُرِيدُونَ عُلُوًّا فِي الْأَرْضِ وَلَا فَسَادًا وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ (83)

“সেই পারলৌকিক আলয়- আমি তাদের জন্যই নির্ধারিত করেছি- যারা পৃথিবীতে উদ্ধত ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না, (পরকালে) শুভ পরিণাম সংযমীদের জন্যই।” (২৮:৮৩)

আগের পর্বে আল্লাহর অবাধ্য হওয়ার কারণে মুসা (আ.)’র এক সময়ের সাহাবী কারুনের ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। ওই ঘটনা থেকে একটি সার্বজনিন শিক্ষণীয় বিষয় তুলে ধরা হয়েছে এ আয়াতে। বলা হচ্ছে- যারা নিজেদেরকে অন্যের চেয়ে বড় ভাবে এবং সাধারণ মানুষকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে তাদের জেনে রাখা উচিত কিয়ামতের দিন তারা জান্নাতে যেতে পারবে না। কারণ, জান্নাত হচ্ছে পবিত্র আত্মার অধিকারী মুত্তাকিদের স্থান।

সম্পদ ও ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা স্বেচ্ছাচারী ও অহংকারী হয়। এ ধরনের মানুষ নিজেরা যেমন দুনিয়ায় বিপর্যয় সৃষ্টি করে তেমনি তাদের সম্পদও সমাজে ফ্যাসাদ ও বিপর্যয় ছড়িয়ে পড়ার কারণ হয়। ইতিহাসে এসেছে, হযরত আলী (আ.) ক্ষমতায় থাকা অবস্থায় জনগণকে বলতেন:  আমি যেমন ক্ষমতাকে আত্মম্ভরিতার হাতিয়ার বানাইনি তেমনি সম্পদশালী লোকরাও  যেন নিজেদের সম্পদকে অন্যের ওপর প্রভাব বিস্তারের হাতিয়ার না বানায়।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. সম্পদশালী প্রত্যেক ব্যক্তি সমাজে বিপর্যয় সৃষ্টি করে না। যে ব্যক্তি সম্পদ ও ক্ষমতাকে ব্যবহার করে অহংকার ও বড়াই করে বেড়ায় তার কারণে ফ্যাসাদ সৃষ্টি হয়।

২. সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুত্তাকি যে বিনয়ী এবং কোনো অবস্থায়ই নিজেকে অন্যের চেয়ে বড় মনে করে না এবং অহংকারী হয় না।

সূরা কাসাসের ৮৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:

  مَنْ جَاءَ بِالْحَسَنَةِ فَلَهُ خَيْرٌ مِنْهَا وَمَنْ جَاءَ بِالسَّيِّئَةِ فَلَا يُجْزَى الَّذِينَ عَمِلُوا السَّيِّئَاتِ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (84)   

“যে কেউ সৎকাজ করে, সে তার কর্ম অপেক্ষা অধিক ফল পাবে, আর যে মন্দকাজ করে, সে তো শাস্তি পাবে কেবল কর্মের অনুপাতে।” (২৮:৮৪)

এই আয়াতে কিয়ামতের দিন আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কার ও শাস্তি পাওয়ার সার্বজনিন বিধানের কথা উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ তার সৎকর্মশীল বান্দাকে পুরস্কার দেবেন নিজের দয়া ও মহানুভবতার ভিত্তিতে; বান্দার সৎকাজের পরিমাণের ভিত্তিতে নয়। এ কারণে সৎকর্মশীল বান্দাকে পুরস্কার দেয়া হবে তার কাজের চেয়ে বহুগুণ বেশি। হাদিসে এসেছে, এই পরিমাণ কখনো হবে ১০ গুণ, কখনো ১০০ গুণ, কখনো ৭০০ গুণ আবার কখনোবা গুণে শেষ করা যাবে না।

স্বাভাবিকভাবেই মহান আল্লাহর দয়া ও মহানুভবতা বান্দার মনের ইচ্ছার স্বচ্ছতার ওপর নির্ভর করে। এ কারণে কিয়ামতের দিন দেখা যাবে, একই রকম সৎ কাজ করে বিভিন্ন বান্দা বিভিন্ন রকম পুরস্কার পাচ্ছেন।

কিন্তু খারাপ কাজের শাস্তি দেয়ার সময় আল্লাহ ন্যায়বিচার করবেন এবং যে ব্যক্তি যতটুকু খারাপ কাজ করবে তাকে ততটুকু শাস্তি দেবেন। সেই সঙ্গে ওই খারাপ কাজের পরিণতিও বিবেচনায় আনা হবে। যেমন- কখনো কখনো একজন মানুষের একটি খারাপ কাজের পরিণতিতে শত শত বছর ধরে মানুষকে কষ্ট পেতে হয়।

মজার ব্যাপার হলো- এই আয়াতে একথা বলা হয়নি যে, আল্লাহ তায়ালা গোনাহগার ব্যক্তিদের শাস্তি দেবেন। বরং তিনি বলেছেন, পৃথিবীতে তাদের কর্মের পরিণতিতে তাদেরকে শাস্তি দেয়া হবে। অর্থাৎ তারা দুনিয়াতে যেসব খারাপ কাজ করেছে তারই ভিত্তিতে কিয়ামতের দিন তারা শাস্তি পাবে। কিয়ামতের দিন পাপী ব্যক্তির শাস্তির জন্য সে নিজেই দায়ী থাকবে অন্য কেউ নয়।

এ আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ভালো কাজ যেই করুক না কেন তা সবাই পছন্দ করে এবং তার জন্য দুনিয়া ও আখেরাতে রয়েছে পুরস্কার।

২. শুধু সৎকর্ম করাই যথেষ্ট নয়। সেইসঙ্গে এই সৎকর্মকে কেয়ামত পর্যন্ত পৌঁছাতেও হবে। পাপকাজ, কারো উপকার করে খোটা দেয়া, লোক দেখানোর উদ্দেশ্যে ভালো কাজ করা এবং গীবত ও অহংকারের মতো কাজ মানুষের সৎকাজকে ধ্বংস করে দিতে পারে; ফলে তা কেয়ামত পর্যন্ত পৌঁছায় না।

৩. মহান আল্লাহ সৎকাজের পুরস্কার দেবেন বহুগুণ কিন্তু পাপী ব্যক্তিদের শাস্তি দেবেন পাপ কাজের সমপরিমাণ।

সূরা কাসাসের ৮৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّ الَّذِي فَرَضَ عَلَيْكَ الْقُرْآَنَ لَرَادُّكَ إِلَى مَعَادٍ قُلْ رَبِّي أَعْلَمُ مَنْ جَاءَ بِالْهُدَى وَمَنْ هُوَ فِي ضَلَالٍ مُبِينٍ (85)

“নিঃসন্দেহে যিনি তোমার জন্য কুরআনকে করেছেন- বিধান, তিনি তোমাকে অবশ্যই স্বদেশে ফিরিয়ে আনবেন। (হে নবী আপনি) বলুন- আমার প্রতিপালক ভালো জানেন- কে সৎপথের নির্দেশ এনেছে এবং কে স্পষ্ট বিভ্রান্তিতে আছে।” (২৮:৮৫)

এই আয়াত থেকে শুরু করে সূরা কাসাসের শেষ আয়াত পর্যন্ত আল্লাহ তায়ালা বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে কথা বলেছেন এবং তাঁকে মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দিয়েছেন। মক্কার মুশরিকদের মধ্যে ধনী ও প্রভাবশালী ব্যক্তিরা কাউকে বিশ্বনবী (সা.)’র প্রতি ঈমান আনতে দিচ্ছিল না। তাদের নিষেধ অমান্য করে যদি কেউ ইসলাম কবুল করে ফেলত তাহলে কুরাইশ নেতারা তাদের ওপর অকথ্য নির্যাতন চালাতো। এক পর্যায়ে তারা বিশ্বনবীসহ তাঁর প্রতি ঈমান আনা মুষ্টিমেয় লোকদেরকে অবরুদ্ধ করে রাখে। টানা তিন বছর ধরে অবরুদ্ধ থাকা অবস্থায় মুসলমানদের জীবনে চরম দুর্বিষহ অবস্থা সৃষ্টি হয়। কিন্তু এরপরও ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে শিরকের অবস্থায় ফিরিয়ে নিতে না পেরে কুরাইশ অধিপতিরা মহানবীকে হত্যা করার সিদ্ধান্ত নেয়। এ অবস্থায় আল্লাহ তায়ালা বিশ্বনবী (সা.)কে মদীনায় হিজরত করার নির্দেশ দেন।

নিজের জন্মভূমির পাশাপাশি মক্কায় ছিল আল্লাহর ঘর কাবা শরীফ। এ কারণে আল্লাহর নবী মক্কায় থেকে যেতে চেয়েছিলেন। অন্যদিকে ইসলামের প্রচার ও প্রসারের লক্ষ্যে তাঁকে মদীনায় চলে যেতে হচ্ছিল। এই আয়াতে বিশ্বনবীকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: যে আল্লাহ আপনার প্রতি কুরআন নাজিল করেছেন এবং হিজরত করার নির্দেশ দিচ্ছেন, তিনিই আপনাকে এই প্রতিশ্রুতি দিচ্ছেন যে, আপনাকে আপনার জন্মভূমিতে ফিরিয়ে আনা হবে। এমন এক অবস্থায় আপনার প্রত্যাবর্তন হবে যখন মুশরিকরা নয় বরং মক্কার অধিপতি হবেন আপনি ও আপনার সঙ্গী ঈমানদার ব্যক্তিরা। আয়াতের পরবর্তী অংশে আরো বলা হয়েছে: যারা আপনার রেসালাতের বাণী প্রত্যাখ্যান করে এবং এই অন্যায় পথে অটল থাকতে চায় তাদেরকে বলুন: তোমরা আমার রেসালাতের বাণী অস্বীকার করলেও আমার আল্লাহ ভালো করেই জানেন কে তাঁর পক্ষ থেকে হেদায়েতের বাণী নিয়ে এসেছে এবং কে বিপথগামী ও সৎপথ গ্রহণ করতে প্রস্তুত নয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কুরআন নাজিল শুরু হওয়ার পর মুশরিক নেতাদের বিরোধিতার কারণে বিশ্বনবীকে মদীনায় হিজরত করতে হয়। কিন্তু মহান আল্লাহ তাঁকে আবার সসম্মানে মক্কায় ফিরিয়ে আনার প্রতিশ্রুতি দেন। পরবর্তীতে এই প্রতিশ্রুতির হুবহু বাস্তবায়ন ঘটে।

২. শুধুমাত্র নামাজ আদায় ও রোজা রাখাই ফরজ কাজ নয় বরং কুরআন তেলাওয়াত ও এই মহাগ্রন্থের শিক্ষা প্রচার ও মানুষকে কুরআনের দিকে দাওয়াত দেয়াও অবশ্য পালনীয় কর্তব্য।#