মে ২৩, ২০১৭ ১৬:১৮ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৮৬ থেকে ৮৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৮৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَمَا كُنْتَ تَرْجُو أَنْ يُلْقَى إِلَيْكَ الْكِتَابُ إِلَّا رَحْمَةً مِنْ رَبِّكَ فَلَا تَكُونَنَّ ظَهِيرًا لِلْكَافِرِينَ (86)

“এবং (হে রাসূল) তুমি আশা করোনি যে, তোমার প্রতি কিতাব অবতীর্ণ হবে। এ তো কেবল তোমার প্রতিপালকের অনুগ্রহ। সুতরাং তুমি কখনও অবিশ্বাসীদের সহায় হয়ো না।” (২৮:৮৬)

এর আগের আয়াতে মহান আল্লাহ তাঁর রাসূলকে এই প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, মক্কা থেকে মদীনায় হিজরত করার পর একদিন তাঁকে আবার কাফেরদের বিরুদ্ধে বিজয়ীর বেশে মক্কায় ফিরিয়ে আনা হবে। আর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে, আপনি যেমন বিজয়ীর বেশে মক্কায় প্রত্যাবর্তনের আশা করেননি কিন্তু আল্লাহ সে ব্যবস্থা করেছেন তেমনি রাসূল হিসেবে মনোনিত হয়ে ঐশী বাণী লাভ করার কথাও আপনি কোনোদিন কল্পনা করেননি কিন্তু আল্লাহ তায়ালা নিজ অনুগ্রহে আপনাকে রাসূল হিসেবে মনোনিত করেছেন। কাজেই আপনি কোনোদিন কাফের ও মুশরিকদের অন্যায় দাবির কাছে নতি স্বীকার করবেন না। কারণ, তা হবে ওদের প্রতি বড় ধরনের সাহায্য। আপনি বরং দৃঢ়তার সঙ্গে ওদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করুন এবং বিষয়টি জনগণকে জানিয়ে দিন।

এই সূরার প্রথম দিকের কিছু আয়াতে আমরা দেখেছি, হযরত মূসা (আ.) আগুন এনে পরিবারের সদস্যদের শরীর উষ্ণ করার লক্ষ্যে তুর পাহাড়ে গিয়েছিলেন। কিন্তু তিনি পাহাড়ে যে আগুন দেখেছিলেন সেটি ছিল মূলত আল্লাহর নূর। সেখানে হযরত মূসা নবুওয়াত লাভ করেন। বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)ও হেরা পর্বতের গুহায় এক আল্লাহর ধ্যানে মগ্ন থাকা অবস্থায় জিবরাইল (আ.)’র মাধ্যমে নবুওয়াত প্রাপ্তির সুসংবাদ লাভ করেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. কাফেররা আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনার পেছনে যেসব অজুহাত তুলে ধরতো তার একটি ছিল ওহী কেন তাদের প্রতি নাজিল হয় না? এ প্রশ্নের উত্তরে পবিত্র কুরআনে বলা হয়েছে, সর্বশ্রেষ্ঠ মানব ও শেষ নবী সারাজীবন পবিত্র জীবনযাপন করার পরও যেখানে আল্লাহর কাছ থেকে নবুওয়াত লাভের আশা করেননি সেখানে আকণ্ঠ পাপে নিমজ্জিত কাফেরদের কাছে ওহী নাজিল হওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।

২. যেসব কথা ও কাজে কাফের ও মুশরিকরা শক্তিশালী হয় সেসব কাজ করা নবী-রাসূলদের জন্য নিষিদ্ধ।

সূরা কাসাসের ৮৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَا يَصُدُّنَّكَ عَنْ آَيَاتِ اللَّهِ بَعْدَ إِذْ أُنْزِلَتْ إِلَيْكَ وَادْعُ إِلَى رَبِّكَ وَلَا تَكُونَنَّ مِنَ الْمُشْرِكِينَ (87)  

“তোমার প্রতি আল্লাহর আয়াত অবতীর্ণ হওয়ার পর ওরা যেন তোমাকে কিছুতেই সেগুলো হতে বিমুখ না করে। (এবং জনগণকে) তুমি তোমার প্রতিপালকের দিকে আহ্বান করো এবং কিছুতেই অংশীবাদীদের অন্তর্ভূক্ত হয়ো না।” (২৮:৮৭)

আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এখানে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে আল্লাহ তায়ালা বলছেন, আপনি কাফেরদের পৃষ্ঠপোষক হবেন না। কারণ, ঐশী বাণী প্রচার বন্ধ করে দেয়া কিংবা একত্ববাদের প্রতি মানুষকে দাওয়াত দেয়ার কাজে গড়িমসি করা হলে কাফের ও মুশরিকরা শক্তিশালী হবে। ইতিহাসে এসেছে, বিশ্বনবী যখনই মানুষের সামনে কুরআনের আয়াত তুলে ধরতেন এবং তাদেরকে একত্ববাদের দাওয়াত দিতেন তখন মুশরিকরা তাকে কবি, পাগল ও যাদুকরসহ নানা মিথ্যা অপবাদ দিতো। এই আয়াতে বলা হচ্ছে: শত্রুদের মিথ্যা অপবাদ ও অপমানজনক আচরণে ভয় পেয়ে নিজের দায়িত্ব পালন থেকে পিছপা হবেন না। কারণ, তা করলে আপনিও মুশরিকদের অন্তর্ভূক্ত হবেন এবং আল্লাহর কাছে মুশরিকদের সঙ্গে আপনার কোনো পার্থক্য থাকবে না।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ইসলামের শত্রুরা শিরক ও কুফরের বিস্তার ঘটানোর ক্ষেত্রে নবী-রাসূলদের বিরুদ্ধে পর্যন্ত পরিকল্পনা প্রণয়ন করতে পিছ পা হয়নি। যুগ যুগ ধরে শত্রুদের এই ইসলাম বিরোধী তৎপরতা অব্যাহত রয়েছে। এ কারণে আমাদেরকেও ইসলামের বাণী প্রচার করার ক্ষেত্রে সক্রিয় হতে হবে।

২. নবী-রাসূলরা সরাসরি মহান আল্লাহর তত্ত্বাবধানে প্রশিক্ষিত হন এবং তারা যাতে সঠিকভাবে রেসালাতের দায়িত্ব পালন করতে পারেন সেজন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রতিনিয়ত দিক-নির্দেশনা আসে।

৩. একত্ববাদের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে নবী-রাসূলগণ কুফর ও শিরকের বিরুদ্ধে লড়াইকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিতেন।

সূরা কাসাসের ৮৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَا تَدْعُ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آَخَرَ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ كُلُّ شَيْءٍ هَالِكٌ إِلَّا وَجْهَهُ لَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (88)

“এবং তুমি আল্লাহর সঙ্গে অন্য কোনো উপাস্যকে ডেকো না। তিনি ব্যতীত অন্য কোনো উপাস্য নেই। আল্লাহর সত্ত্বা ব্যতীত সব কিছুই ধ্বংসশীল। বিধান তাঁরই। তাঁরই দিকে তোমরা প্রত্যাবর্তিত হবে।” (২৮:৮৮)

আগের কয়েকটি আয়াতে দাওয়াতের বাণী প্রচারের ক্ষেত্রে বিশ্বনবীকে ঢিলেমি করতে নিষেধ করা হয়েছে। তারই ধারাবাহিকতায় সূরা কাসাসের এই শেষ আয়াতে বলা হচ্ছে: একত্ববাদে বিশ্বাসী কোনো ঈমানদার মানুষই আল্লাহর সঙ্গে অন্য কাউকে শরীক করতে পারে না। কারণ, সে জানে- আল্লাহ ছাড়া আর সব কিছুই ধ্বংসশীল। কাজেই আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য প্রতিটি কাজ করতে হবে একনিষ্ঠভাবে। এ ছাড়া, সৃষ্টিজগতের ওপর পরিপূর্ণ আধিপত্য রয়েছে একমাত্র মহান আল্লাহর; কাজেই ইবাদতও করতে হবে একমাত্র তাঁরই।

এই আয়াতে আল্লাহ ছাড়া জগতের আর সব কিছুকে ধ্বংসশীল বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আজ হোক অথবা কাল প্রত্যেক সৃষ্টিকে ধ্বংস হয়ে যেতে হবে। আজ বিভিন্ন প্রাণীকে যে জীবন্ত দেখা যাচ্ছে তাতে তাদের নিজেদের কোনো কৃতিত্ব নেই। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে দেয়া শক্তি তাদেরকে নড়াচড়া করার ক্ষমতা যোগাচ্ছে। এই শক্তি কেড়ে নিলেই তারা ধ্বংস হয়ে যাবে।

আগের আয়াতে শিরকের যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার ব্যাখ্যা দিতে গিয়ে এই আয়াতে বলা হচ্ছে: আল্লাহ ছাড়া অন্য কোনো উপাস্যকে ডাকার অর্থই শিরক। অবশ্য ওহাবিরা বিশ্বনবী ও তার আহলে বাইএক ওসিলা করে আল্লাহকে ডাকাকে শিরক বলে উল্লেখ করে। অথচ প্রকৃতপক্ষে আল্লাহর মনোনিত এসব আওলিয়াকে ওসিলা করা শিরক নয়। কারণ, কেউই রাসূলুল্লাহ (সা.) বা আলী (আ.) কিংবা অন্য কোনো আউলিয়াকে আল্লাহর মোকাবিলায় নিজস্ব শক্তিতে বলীয়ান বলে মনে করে না। বরং দ্বীন ইসলাম প্রচারের ক্ষেত্রে এসব মহান ব্যক্তির অবিস্বরণীয় অবদানের কারণে অনেকে তাদেরকে ওসিলা করে আল্লাহকে ডাকে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তি আল্লাহ ছাড়া  অন্য কোনো মাবুদকে ডাকে না। যেসব ফেরাউনি শক্তি দুনিয়ায় সম্পদ ও ক্ষমতার দম্ভ করে বেড়ায় তাদেরকে মোকাবিলা করে এ ধরনের ঈমানদার মানুষ।

২. পার্থিব দুনিয়া এবং এর উপরিস্থিত প্রতিটি জিনিস ধ্বংস হয়ে যাবে। এর বিপরীতে চিরস্থায়ী থাকবেন মহান আল্লাহ ও তার সত্ত্বা।

৩. মৃত্যুর মাধ্যমে আমরা ধ্বংস হয়ে যাই না; বরং এক আল্লাহর দিকে আমাদের প্রত্যাবর্তন ঘটে।

(সূরা আল-কাসাস সমাপ্ত)