সূরা আনকাবুত; আয়াত ৮-১৩ (পর্ব-২)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৮ থেকে ১৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৮ ও ৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَوَصَّيْنَا الْإِنْسَانَ بِوَالِدَيْهِ حُسْنًا وَإِنْ جَاهَدَاكَ لِتُشْرِكَ بِي مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ فَلَا تُطِعْهُمَا إِلَيَّ مَرْجِعُكُمْ فَأُنَبِّئُكُمْ بِمَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (8) وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُدْخِلَنَّهُمْ فِي الصَّالِحِينَ (9)
"আমি মানুষকে তার পিতামাতার সাথে সদ্ব্যবহার করার আদেশ দিয়েছি। তবে ওরা যদি তোমাকে আমার সাথে এমন কিছু শরীক করতে বাধ্য করতে চায় যার সম্পর্কে তোমার কোনো জ্ঞান নেই, তুমি তাদের মেনো না। আমার নিকট তোমাদের প্রত্যাবর্তন। অতঃপর আমি তোমাদের জানিয়ে দেবো- তোমরা কি করেছিলে।" (২৯:৮)
"যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে, আমি অবশ্যই তাদেরকে সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত করব।" (২৯:৯)
ইসলামের প্রাথমিক যুগে মক্কার কিছু যুবক মূর্তিপূজা বাদ দিয়ে বিশ্বনবী (সা.)’র প্রতি ঈমান এনেছিলেন। কিন্তু তাদের পিতামাতা মুশরিক ছিল বলে তাদেরকে ইসলাম ত্যাগ করে তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে ফিরে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছিল। এমনকি কোনো কোনো মা তার সন্তানকে মূর্তিপূজায় ফিরিয়ে নেয়ার জন্য অনশন ধর্মঘট পর্যন্ত শুরু করেছিল। ওই মায়ের আশা ছিল তাকে না খেয়ে থাকতে দেখলে তার সন্তান ইসলাম ত্যাগ করবে। কিন্তু এরপরও তার নওমুসলিম সন্তান ইসলাম ত্যাগ করেননি।
এই আয়াতে পিতামাতার পক্ষ থেকে চাপের মুখে থাকা ওইসব যুবকের পাশাপাশি কাফের ও মুশরিক পরিবারের সব মুসলমানকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: যদি কখনো পারিবারিক বন্ধন ও ধর্মীয় বন্ধনের মধ্যে মতবিরোধ দেখা দেয় তাহলে পিতামাতার আদেশ অমান্য করে হলেও ধর্মরক্ষা করতে হবে। মা-বাবার প্রতি ভালোবাসার আকর্ষণকে প্রাধান্য দিয়ে আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরিক করা যাবে না। তবে এখানে মনে রাখতে হবে, পিতামাতার প্রতি সম্মান বজায় রাখতে হবে এবং তাদের সঙ্গে বেয়াদবি করা যাবে না। আল্লাহর সঙ্গে যে কাউকে শরিক করা যাবে না- এই বিষয়টি তাদেরকে অত্যন্ত নম্রভাবে বুঝিয়ে বলতে হবে। সেইসঙ্গে পিতামাতা কাফের বা মুশরিক হলেও তাদের সেবা করতে হবে।
পরের আয়াতে পিতা-মাতা ও সন্তান নির্বিশেষে পরিবারের সব সদস্যকে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: দুনিয়াতে তোমাদের প্রতিটি কাজ আল্লাহ রেকর্ড করে রাখছেন এবং একদিন তোমাদেরকে এর হিসাব দিতে হবে। যারা ঈমান এনেছে ও সৎকর্ম করেছে কিয়ামতের দিন তারাই আল্লাহর পবিত্র ও সালেহ বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. যেকোনো মূল্যে পিতা-মাতার সেবা ও তাদের সঙ্গে সদ্ব্যবহার করতে হবে। তারা কাফের হলেও আল্লাহর এই আদেশ মানতে হবে।
২. কাউকে শিরক করতে বলার অর্থ অযৌক্তিক ও অজ্ঞতাপূর্ণ কাজ করতে বলা। কারণ, শিরকের কোনো যৌক্তিক ও বৈজ্ঞানিক ভিত্তি নেই।
৩. সঠিক পথ নির্বাচনের ক্ষেত্রে সন্তানকে স্বাধীনতা দিতে হবে। মুশরিক পিতামাতা তাদের ঈমানদার সন্তানকে শিরকের পথে চলতে বাধ্য করতে পারবে না।
সূরা আনকাবুতের ১০ ও ১১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمِنَ النَّاسِ مَنْ يَقُولُ آَمَنَّا بِاللَّهِ فَإِذَا أُوذِيَ فِي اللَّهِ جَعَلَ فِتْنَةَ النَّاسِ كَعَذَابِ اللَّهِ وَلَئِنْ جَاءَ نَصْرٌ مِنْ رَبِّكَ لَيَقُولُنَّ إِنَّا كُنَّا مَعَكُمْ أَوَلَيْسَ اللَّهُ بِأَعْلَمَ بِمَا فِي صُدُورِ الْعَالَمِينَ (10) وَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ آَمَنُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْمُنَافِقِينَ (11)
"মানুষের মধ্যে কেউ কেউ বলে- আমরা আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছি, কিন্তু আল্লাহর পথে যখন ওরা কষ্ট পায়, তখন ওরা মানুষের পীড়নকে আল্লাহর শাস্তির মতো গণ্য করে (ও ঈমান পরিত্যাগ করে) এবং তোমার প্রতিপালকের নিকট হতে (তোমার প্রতি) কোনো সাহায্য ও বিজয় আসলে ওরা বলতে থাকে- আমরা তো তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম। মানুষের অন্তরে যা আছে, আল্লাহ কি তা সম্যক অবগত নন?" (২৯:১০)
"আল্লাহ অবশ্যই জানেন- কারা বিশ্বাসী এবং কারা প্রতারক ও মুনাফেক।" (২৯:১১)
আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই দুই আয়াতে এমন কিছু কথিত মুমিনের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যারা শুধুমাত্র আরাম-আয়েশ ও সুখে থাকা অবস্থায় ঈমানদার থাকে। কিন্তু যখনই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয় যেখানে ঈমান রক্ষা করা কষ্টসাধ্য তখন ঈমান পরিত্যাগের পাশাপাশি মুমিনদের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করে। কিন্তু যখনই বিপদ কেটে যায় এবং মুমিনরা বিজয় অর্জন করে বা আবার ক্ষমতায় আসে তখন নিজেদেরকে মুমিনদের হিতাকাঙ্ক্ষী হিসেবে পরিচয় দেয়। তখন তারা বলে, আমরা সব সময় তোমাদের সঙ্গেই ছিলাম; কাজেই আজ তোমাদের এ বিজয়েও আমাদের অংশগ্রহণ ছিল।
পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ প্রতিটি মানুষের অন্তরের খবর রাখেন। তিনি জানেন, ঈমান রক্ষার জন্য কারা নিজেদের প্রাণ পর্যন্ত বিসর্জন দিতে প্রস্তুত এবং কারা সামান্য বিপদ দেখলেই ঈমান পরিত্যাগ করে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি বিষয় হচ্ছে:
১. কিছু মানুষের ঈমান শুধু মুখে প্রকাশ পায়; অন্তরে প্রবেশ করে না। কাজেই কেউ নিজেকে ঈমানদার দাবি করলেই তার কথা বিশ্বাস করা যাবে না। কঠিন ও বিপদের দিনগুলোতেই খাঁটি ঈমানদার ব্যক্তিদের চেনা সম্ভব।
২. ঈমানদার ব্যক্তিকে অনেক সময় চরম বিপদের মুখোমুখি হতে হয়। প্রকৃত মুমিন ব্যক্তিরা এ ধরনের বিপদের দিনে ধৈর্য ধরে এবং আল্লাহর সাহায্য চায়।
৩. মুনাফেক হচ্ছে সুযোগ-সন্ধানী ব্যক্তি। বিপদের সময় ও কঠিন দিনে সে পালিয়ে থাকে এবং বিজয়ের দিনে সে নিজের ডেরা থেকে বেরিয়ে এসে বিজয়ী জনতার কাতারে মিশে যায়। সে নিজেকে মুমিনদের সহযোগী দাবি করে যুদ্ধজয়ের গনিমাত বা ক্ষমতার অংশ দাবি করে বসে।
এই সূরার ১২ ও ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لِلَّذِينَ آَمَنُوا اتَّبِعُوا سَبِيلَنَا وَلْنَحْمِلْ خَطَايَاكُمْ وَمَا هُمْ بِحَامِلِينَ مِنْ خَطَايَاهُمْ مِنْ شَيْءٍ إِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ (12) وَلَيَحْمِلُنَّ أَثْقَالَهُمْ وَأَثْقَالًا مَعَ أَثْقَالِهِمْ وَلَيُسْأَلُنَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ عَمَّا كَانُوا يَفْتَرُونَ (13)
"অবিশ্বাসীরা বিশ্বাসীদের বলে- তোমরা আমাদের পথ ধরো, (তাহলে) আমরা তোমাদের পাপের বোঝা বহন করব। কিন্তু ওরা তো তোমাদের পাপের বোঝার কিছুই বহন করবে না, ওরা অবশ্যই মিথ্যাবাদী।" (২৯:১২)
"এবং নিঃসন্দেহে ওরা নিজেদের পাপের বোঝা এবং তার সাথে আরও কিছু পাপের বোঝা বহন করবে এবং ওরা (আল্লাহ ও তার রাসূল সম্পর্কে) যে মিথ্যা উদ্ভাবন করে সে সম্পর্কে কিয়ামত দিবসে অবশ্যই ওদের প্রশ্ন করা হবে।" (২৯:১৩)
মক্কার মুশরিকরা মুমিন ব্যক্তিদেরকে বিভ্রান্ত করে শিরকের পথে নিয়ে যেতে চাইত। এই আয়াতে বলা হচ্ছে- তারা ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে বলত: তোমরা আমাদের পথে অর্থাৎ তোমাদের পূর্বপুরুষদের পথে ফিরে এসো এবং রাসূলের পথ অনুসরণ করো না। যদি এই পথে ফিরে আসো এবং এটা সঠিক পথ হয় তাহলে তো পার পেয়ে গেলে। আর যদি এই পথ ভ্রান্ত পথ হয়ে থাকে তাহলে আমরা তোমাদের পাপের বোঝা বহন করব এবং তোমাদের কোনো ক্ষতি হবে না। আয়াতের পরের অংশে আল্লাহ বলছেন: তারা নির্ভেজাল মিথ্যা বলছে। কারণ, পুরস্কার ও শাস্তি দেয়ার মালিক হচ্ছেন একমাত্র আল্লাহ। কোনো মানুষের পক্ষে অন্য কারো পাপের বোঝা বহন করা সম্ভব নয়। অবশ্য মুশরিক ব্যক্তির কথায় বিভ্রান্ত হয়ে কেউ যদি শিরকের পথে পা বাড়ায় তাহলে তাকে বিচারের মুখোমুখি হতে হবে। সেইসঙ্গে বিভ্রান্ত ব্যক্তির পাপের বোঝা যার কথায় সে বিভ্রান্ত হয়েছে তার ঘাড়ে চাপিয়ে দেয়া হবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:
১. শত্রুরা সব সময় মুমিনদের পেছনে লেগে থাকে। কখনো নির্যাতন চালিয়ে আবার কখনো মিথ্যা প্রলোভন দিয়ে মুমিনদেরকে কুফর ও শিরকের পথে নিয়ে যেতে চায়।
২. ইসলামের বিশ্বদর্শনে এক ব্যক্তি অন্য কারো পাপের বোঝা বহন করতে পারে না। এমনকি কেউ একথাও বলার অধিকার রাখে না যে, তুই পাপ কাজ কর- দায় আমার।
৩. বিভ্রান্ত ব্যক্তিকে বিপথে পরিচালিত করার জন্য বিভ্রান্তকারী ব্যক্তিকে শাস্তি দেয়া হবে। তবে এর ফলে বিভ্রান্ত ব্যক্তির পাপ এতটুকু কমবে না।#