সূরা আর-রুম; আয়াত ১৪-১৯ (পর্ব-৩)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ১৪ থেকে ১৯ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১৪, ১৫ ও ১৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَيَوْمَ تَقُومُ السَّاعَةُ يَوْمَئِذٍ يَتَفَرَّقُونَ (14) فَأَمَّا الَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ فَهُمْ فِي رَوْضَةٍ يُحْبَرُونَ (15) وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآَيَاتِنَا وَلِقَاءِ الْآَخِرَةِ فَأُولَئِكَ فِي الْعَذَابِ مُحْضَرُونَ (16)
"এবং যেদিন কিয়ামত হবে সেদিন মানুষ (পরস্পরের কাছ থেকে) বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়বে।" (৩০:১৪)
"যারা বিশ্বাস করেছে ও সৎকাজ করেছে, তারা (জান্নাতের) ফুল বাগানে আনন্দে থাকবে।" (৩০:১৫)
"এবং (অন্যদিকে) যারা সত্য প্রত্যাখ্যান করেছে ও আমার নিদর্শনাবলী ও পরকালের সাক্ষাৎ অস্বীকার করেছে, তারাই শাস্তি ভোগ করতে থাকবে।" (৩০:১৬)
এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: কিয়ামতের দিন সব মানুষকে দুই ভাগে ভাগ করা হবে। এর একভাগে থাকবে মহান আল্লাহর ঈমানদার ও সৎকর্মশীল বান্দারা। আর অন্যদলে থাকবে আল্লাহকে অস্বীকারকারী কাফের ও মুশরিকরা। পৃথিবীতে আমরা বয়স, শিক্ষা, লিঙ্গ, বর্ণ, ভাষা কিংবা ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি, ক্ষমতা ইত্যাদির বিচারে মানুষকে বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত করি। কিন্তু কিয়ামতের দিন এসব মানদণ্ডের কোন মূল্য থাকবে না। সেদিন একমাত্র যে বিষয়টি মানুষের ভাগ্য নিয়ন্ত্রণ করবে তা হলো ঈমান ও কুফ্র। পৃথিবীতে ঈমানদার ব্যক্তিরা সৎকাজ করেছে এবং কাফেররা মন্দ কর্মে লিপ্ত ছিল। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- জান্নাতে প্রবেশের জন্য শুধুমাত্র ঈমান যথেষ্ট নয় সেইসঙ্গে সৎকর্মও অপরিহার্য। অন্যদিকে জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হওয়ার জন্য কুফ্র বা আল্লাহকে অস্বীকারই যথেষ্ট। কারণ, আল্লাহকে অস্বীকার হচ্ছে নিজের প্রতি মানুষের সবচেয়ে বড় জুলুম। যে আল্লাহ মানুষের অস্তিত্ব সৃষ্টি করেছেন তাকেই যখন মানুষ অস্বীকার করে বসে তখন এর চেয়ে বড় জুলুম আর কিছু হতে পারে না।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:
১. কিয়ামত হচ্ছে খারাপ ও অপরাধী লোকদের কাছ থেকে উত্তম ও পবিত্র মানুষের আলাদা হওয়ার দিন।
২. সেই সৎকাজ আল্লাহর কাছে মূল্যবান যা তাঁকে সন্তুষ্ট করার উদ্দেশ্যে করা হয়েছে এবং তাঁর প্রতি ঈমান থেকে উৎসারিত।
৩. মানুষ যখন কুফরে আক্রান্ত হয় তখন সে কিয়ামত ও আল্লাহর বাণীকে অস্বীকার করে।
৪. এই পৃথিবীতে মানুষের বিশ্বাস ও কর্মের ওপর কিয়ামতের দিন তার পরিণতি নির্ভর করবে।
সূরা রুমের ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
فَسُبْحَانَ اللَّهِ حِينَ تُمْسُونَ وَحِينَ تُصْبِحُونَ (17) وَلَهُ الْحَمْدُ فِي السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَعَشِيًّا وَحِينَ تُظْهِرُونَ (18)
"সুতরাং তোমরা সন্ধ্যায় ও প্রভাতে আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো।" (৩০:১৭)
"এবং আসমান ও জমিনে সকল প্রশংসা তাঁরই। এবং অপরাহ্নে ও মধ্যাহ্নে।" (৩০:১৮)
অনেক মুফাসসিরের মতে, এই দুই আয়াতে প্রতিদিনের ফরজ নামাজগুলোর সময় ঘোষণা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে, সকাল, রাত, দুপুর ও বিকেলে আল্লাহকে স্মরণ করো এবং তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করো। কারণ গোটা সৃষ্টিজগত মহান আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে এবং এই বিশ্বজগত মহান আল্লাহর অসীম ক্ষমতা ও প্রজ্ঞার বহিঃপ্রকাশ। কাজেই আমাদেরকে শিরকমুক্ত থাকতে হলে সব সময় মহান আল্লাহর প্রশংসা করতে হবে। মনেপ্রাণে তাঁকে সব ধরনের ত্রুটিবিচ্যুতির ঊর্ধ্বে ভাবতে হবে এবং তাঁর সঙ্গে কাউকে শরীক করা যাবে না।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. সব জায়গায় সব সময় আল্লাহর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করার গুরুত্ব অপরিসীম। তবে নির্দিষ্ট কিছু সময়ে আল্লাহর প্রশংসা বেশি উপযোগী।
২. আল্লাহর জিকির করা এবং তাঁকে সব ধরনের ত্রুটিবিচ্যুতি ও অপবিত্রতার ঊর্ধ্বে মনে করতে পারলে তাঁর প্রশংসা করার ক্ষেত্র তৈরি হয়।
এই সূরার ১৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يُخْرِجُ الْحَيَّ مِنَ الْمَيِّتِ وَيُخْرِجُ الْمَيِّتَ مِنَ الْحَيِّ وَيُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا وَكَذَلِكَ تُخْرَجُونَ (19)
"তিনিই মৃত হতে জীবন্তের আবির্ভাব ঘটান এবং জীবন্ত হতে মৃতের আবির্ভাব ঘটান। এবং ভূমির মৃত্যুর পর ওকে পুনর্জীবিত করেন। এইভাবেই তোমরা (কবর থেকে) উত্থিত হবে।" (৩০:১৯)
যারা কিয়ামতের দিন মানুষের পুনরুজ্জীবনে অবিশ্বাস করে তাদের জন্য এই আয়াতে পৃথিবীতেই মৃতকে আবার জীবিত করার উদাহরণ তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে, যখন মহান আল্লাহ প্রতি মুহূর্তে তোমাদের সামনে মৃতকে জীবিত এবং জীবিতকে মৃতে পরিণত করছেন তখন তোমরা কীভাবে কিয়ামতের পুনরুত্থান দিবসকে অসম্ভব মনে করছো? প্রতি বছর শীতকাল আসলে অনেক গাছের পাতা ঝরে যায় এবং মাটি শুকিয়ে যায়। এরপর বসন্তে আবার গাছের পাতা গজায় এবং আরো পরে বর্ষাকালে বৃষ্টি হওয়ার পর মৃত মাটি সতেজ হয়ে ওঠে এবং মাটির নীচে মৃত অবস্থায় পড়ে থাকা বীজগুলো থেকে অঙ্কুর বের হয়ে তা জীবন্ত গাছে পরিণত হয়। উল্টোদিকে বহু প্রাণী ও উদ্ভিদ মারা যাওয়ার পর সেগুলো মাটির সঙ্গে মিশে গিয়ে এক সময় নিজেরাই মাটিতে পরিণত হয়। মানুষ প্রতি বছর মৃত থেকে জীবিত ও জীবিত থেকে মৃত্যুর এই ঘটনা প্রত্যক্ষ করে। দৃশ্যত অসম্ভব এই কাজ যে আল্লাহ সম্ভব করেছেন তার পক্ষে কি মৃত মানুষকে আবার জীবিত করা সম্ভব নয়?
এদিকে আমরা যেসব খাদ্য ও পানীয় গ্রহণ করি তা জীবিত কোনো বস্তু নয়। কিন্তু এই খাদ্য শরীরের মধ্যে প্রবেশের পর জীবন্ত সেলে পরিণত হয়। এখান থেকেও আল্লাহর অসীম ক্ষমতার প্রমাণ মেলে এবং দিবালোকের মতো স্পষ্ট হয়ে যায় যে, মৃতকে জীবিত করা আল্লাহর জন্য অতি সহজ একটি কাজ।
এ ছাড়া, এ বিষয়টিকে আধ্যাত্মিক দিক দিয়েও ব্যাখ্যা করা যায়। হাদিসে মুমিন ব্যক্তির কাফের হয়ে যাওয়াকে তার মৃত্যু এবং কাফের ব্যক্তির মুমিনে পরিণত হওয়াকে তার পুনরুজ্জীবন বলে উল্লেখ করা হয়েছে। আলেম ব্যক্তির জাহেল হওয়া এবং জাহেল ব্যক্তির আলেমে পরিণত হওয়ার ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য। এই আয়াতের একটি শিক্ষণীয় দিক হলো:
১. মানুষ যদি জ্ঞানী ও ন্যায়পরায়ণ হয় তাহলে কিয়ামতের পুনরুজ্জীবনে বিশ্বাস করতে তার মোটেও কষ্ট হয় না। কারণ, এই পৃথিবীতে মানুষের চোখের সামনে জীবিতকে মৃত ও মৃতকে জীবিত করার অসংখ্য উদাহরণ তুলে ধরেছেন আল্লাহ।#