জুন ১৫, ২০১৭ ১১:১৭ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আর- রুমের ৫০ থেকে ৫৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৫০ ও ৫১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَانْظُرْ إِلَى آَثَارِ رَحْمَةِ اللَّهِ كَيْفَ يُحْيِي الْأَرْضَ بَعْدَ مَوْتِهَا إِنَّ ذَلِكَ لَمُحْيِي الْمَوْتَى وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (50) وَلَئِنْ أَرْسَلْنَا رِيحًا فَرَأَوْهُ مُصْفَرًّا لَظَلُّوا مِنْ بَعْدِهِ يَكْفُرُونَ (51)

“অতএব, আল্লাহর রহমতের (অর্থাৎ বৃষ্টির) ফল দেখে নাও, কিভাবে তিনি মৃত্তিকার মৃত্যুর পর তাকে জীবিত করেন। নিশ্চয় তিনি মৃতদেরকে জীবিত করবেন এবং তিনি সব কিছুর উপর সর্বশক্তিমান।” (৩০:৫০)

“এবং আমি যদি এমন বায়ু প্রেরণ করি যার ফলে তারা শস্যকে হলদে হয়ে যেতে দেখে, তখন তো তারা অকৃতজ্ঞ (ও কাফের) হয়ে যায়।” (৩০:৫১)

আগের পর্বে ভূমি এবং এর উপরে বসবাসরত প্রাণী ও উদ্ভিদের প্রাণ সঞ্চারণে বাতাস ও বৃষ্টির ভূমিকা নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর আজকের এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে, বাতাস ও বৃষ্টি মহান আল্লাহর নির্দেশে কাজ করে। তিনি চাইলে এই বৃষ্টি মানুষের জন্য রহমত হিসেবে আবির্ভূত হয় এবং শুষ্ক ভূমিতে প্রাণ ফিরে আসে। ফলে কৃষক জমিতে সুন্দরভাবে ফসল ফলাতে পারে এবং প্রাণী ও উদ্ভিদের মধ্যে ফিরে আসে প্রাণচাঞ্চল্য। আবার আল্লাহ চাইলে অতিবৃষ্টি বা অনাবৃষ্টি দিয়ে পৃথিবীর বুকে বন্যা কিংবা খরা সৃষ্টি করতে পারেন। তিনি ইচ্ছা করলে স্বাভাবিক বায়ুপ্রবাহের পরিবর্তে প্রচণ্ড ঘুর্ণিঝড় পাঠাতে পারেন যার ফলে প্রাণ ও জনপদের অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যেতে পারে।

তবে সাধারণভাবে আল্লাহ তায়ালা বৃষ্টিকে মানুষের জন্য রহমত হিসেবে প্রেরণ করেন। পানির অপর নাম জীবন। এই পানির যতগুলো উৎস আছে তার প্রধান উৎসের নাম বৃষ্টি। বৃষ্টি না হলে মাটি ফেটে চৌচির হয়ে যেত, নদী-নালা খাল-বিল শুকিয়ে যেত, গাছের পাতা ঝরে পড়ত এবং সর্বোপরি পৃথিবীতে প্রাণের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখা মুশকিল হয়ে যেত। এই বৃষ্টির পানি দিয়ে মহান আল্লাহ যেমন পৃথিবীতে মৃত ভূমিকে জীবিত করেন তেমনি তিনি কিয়ামতের দিনও মৃত মানুষকে আবার জীবিত করার ক্ষমতা রাখেন। এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পবিত্র কুরআন বৃষ্টিকে আল্লাহর রহমত হিসেবে উল্লেখ করেছে যা ভূপৃষ্ঠ এবং এর উপরের সব প্রাণ রক্ষার উৎস হিসেবে বিবেচিত হয়।

২. বৃষ্টির পানির মাধ্যমে মৃত ভূমির জীবিত হয়ে ওঠা এমন একটি নিদর্শন যা দিয়ে কেয়ামতের দিন মৃত মানুষের আবার জীবিত হয়ে ওঠার বিষয়টি অনুধাবন করা যায়।

৩. নির্বোধ লোক পৃথিবীতে সামান্য সমস্যায় পড়লে বা খারাপ পরিস্থিতির শিকার হলে নিজের ধর্ম ও ঈমান ত্যাগ করে এবং কুফরি করে বসে।

সূরা রুমের ৫২ ও ৫৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَإِنَّكَ لَا تُسْمِعُ الْمَوْتَى وَلَا تُسْمِعُ الصُّمَّ الدُّعَاءَ إِذَا وَلَّوْا مُدْبِرِينَ (52) وَمَا أَنْتَ بِهَادِي الْعُمْيِ عَنْ ضَلَالَتِهِمْ إِنْ تُسْمِعُ إِلَّا مَنْ يُؤْمِنُ بِآَيَاتِنَا فَهُمْ مُسْلِمُونَ (53)

“(তাদের অন্তর মনের গেছে) অতএব, আপনি মৃতদেরকে (দাওয়াতের বাণী) শোনাতে পারবেন না এবং বধিরদেরও আহ্বান শোনাতে পারবেন না, যখন তারা পৃষ্ঠ প্রদর্শন করে।” (৩০:৫২)

“আপনি অন্ধদেরও তাদের পথভ্রষ্টতা থেকে পথ দেখাতে পারবেন না। আপনি কেবল তাদেরই (দাওয়াতের বাণী) শোনাতে পারবেন, যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস করে। কারণ তারা মুসলমান।” (৩০:৫৩)

এই দুই আয়াতে মানবজাতিকে চার দলে বিভক্ত করা হয়েছে। প্রথম দলে রয়েছে সেসব মানুষ যারা দৃশ্যত জীবিত। কিন্তু তাদের অন্তর মরে গেছে বলে তারা সত্য উপলব্ধি করে না এবং আল্লাহর প্রতি ঈমান আনে না। দ্বিতীয় দলের মানুষ আল্লাহর রাসূলের বাণী শুনতে রাজি নয়। তারা সত্যের বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং সত্য থেকে দূরে সরে যায়। তৃতীয় দলে রয়েছে সেসব মানুষ যাদের সত্য দেখার মতো চোখ না থাকার কারণে পথভ্রষ্টতায় নিমজ্জিত হয়। আর চতুর্থ দলে রয়েছেন ঈমানদার মানুষ যারা তাদের চোখ ও কান দিয়ে সত্য অনুসন্ধান করে এবং তা পাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তার কাছে আত্মসমর্পন করে ঈমানদার হয়ে যায়।

এই দুই আয়াত থেকে বোঝা যায়, শারিরীকভাবে জীবিত থেকেও আত্মিকভাবে মানুষের মৃত্যু হতে পারে। এ ধরনের মানুষ জীবিত অবস্থায় সত্যের বাণী উপলব্ধি না করার কারণে আকণ্ঠ পথভ্রষ্টতায়  নিমজ্জিত। তারা কখনো হেদায়েত প্রাপ্ত হবে না। আবার কখনো শারিরীকভাবে মৃত্যুবরণ করার পরও মানুষের পক্ষে জীবিত থাকা সম্ভব। যেমন পবিত্র কুরআনে শহীদদেরকে জীবিত বলা হয়েছে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মানুষ যদি সত্য দাওয়াতের বাণী শুনতে ইচ্ছুক না হয় তাহলে রাসূলের নিজের মুখ থেকে উৎসারিত বাণীও সে গ্রহণ করে না।

২. শুধুমাত্র চোখ, কান ও প্রজ্ঞা থাকাই যথেষ্ট নয়। গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো সত্য গ্রহণের মানসিকতা। এটি না থাকলে চোখ, কান ও প্রজ্ঞাসম্পন্ন যেকোনো মানুষ বিভ্রান্ত হয়ে যেতে পারে।

৩. সত্যের বাণী থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়াকে অভ্যাসে পরিণত করলে মানুষ কঠিন ও বিপজ্জনক মাত্রার পথভ্রষ্টতায় ডুবে যায়। এ অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়া সত্যিই কঠিন।

৪. আল্লাহর নবী-রাসূলদের দায়িত্ব ছিল তাদের উম্মতের কাছে সত্যের বাণী পৌঁছে দেয়া। তাদেরকে সত্য গ্রহণে বাধ্য করা নয়।

৫. শুধুমাত্র মুখ ও অন্তর দিয়ে ঈমান আনাই যথেষ্ট নয়। সেইসঙ্গে আল্লাহর কাছে পরিপূর্ণ আত্মসমর্পনের মাধ্যমে জীবনের সকল ক্ষেত্র তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী চলতে হবে।

সূরা রুমের ৫৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  اللَّهُ الَّذِي خَلَقَكُمْ مِنْ ضَعْفٍ ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ ضَعْفٍ قُوَّةً ثُمَّ جَعَلَ مِنْ بَعْدِ قُوَّةٍ ضَعْفًا وَشَيْبَةً يَخْلُقُ مَا يَشَاءُ وَهُوَ الْعَلِيمُ الْقَدِيرُ (54)

“তিনি আল্লাহ যিনি দুর্বল অবস্থায় তোমাদের সৃষ্টি করেন অতঃপর দুর্বলতার পর শক্তিদান করেন, অতঃপর শক্তির পর দেন দুর্বলতা ও বার্ধক্য। তিনি যা ইচ্ছা সৃষ্টি করেন এবং তিনি সর্বজ্ঞ, সর্বশক্তিমান।” (৩০:৫৪)

মানবজাতির প্রতি আল্লাহর নেয়ামত বর্ণনা এবং তৌহিদ বা একত্ববাদের নিদর্শন তুলে ধরা হচ্ছে সূরা রুমের অন্যতম প্রধান লক্ষ্য। এই আয়াতে জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত বিভিন্ন পর্যায়ে মানুষের শারিরীক গঠন ও বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে আলোকপাত করে বলা হচ্ছে: মায়ের কোলে ভূমিষ্ট হওয়ার পর থেকে কয়েক বছর পর্যন্ত তোমরা থাকো অত্যন্ত দুর্বল। কিন্তু কিশোর ও যুবক বয়সে তোমাদের শারিরীক শক্তি থাকে প্রবল। এই শক্তিধর ব্যক্তি বার্ধক্যে আবার দুর্বল হয়ে যায়। মানুষের জীবনের বিভিন্ন পর্যায়ের এই পরিবর্তন ঘটে এক আল্লাহর নির্দেশে এবং এসব ঘটনায় মানুষর কোনো হাত নেই।

বিশ্বজগত সৃষ্টিতে যদি মানুষের হাত থাকত তাহলে কেউই বয়স্ক বা বৃদ্ধ হতে চাইত না কারণ বয়স হয়ে গেলে মানুষের জীবনী শক্তি কমে আসে এবং সে দুর্বল হয়ে যায়। সবাই যৌবন ধরে রাখার চেষ্টা করত। কিন্তু এর কোনো কিছুতেই মানুষের হাত নেই বলে তাকে বিধাতার নিয়ম মেনে চলতে হয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:

১. মানুষের জন্ম হয় দুর্বল প্রাণী হিসেবে এবং মৃত্যুর আগে আবার সে দুর্বল হয়ে যায়। কাজেই যে মানুষ দু’টি দুর্বল সময়ের মধ্যে অবস্থান করছে, যৌবনে শারিরীক শক্তি থাকার সময় তার অহংকারী হওয়া উচিত নয়। বরং এই শক্তিমত্তা পাওয়ার জন্য আল্লাহর দরবারে শুকরিয়া আদায় করতে হবে এবং এ শক্তিকে সঠিক পন্থায় ব্যবহার করতে হবে।

২. মানুষের শারিরীক এই দুর্বলতা ও শক্তিমত্তা মহান আল্লাহর প্রজ্ঞাপূর্ণ ও বিজ্ঞচিত পরিকল্পনা থেকে উৎসারিত এবং এতেই মানুষের কল্যাণ রয়েছে।#