রংধনু আসর: আসহাবে কাহাফ
রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই পড়াশোনার ফাঁকে ফাঁকে টেলিভিশনে বিভিন্ন অনুষ্ঠান দেখো এবং রেডিওতে অনুষ্ঠান শোনো। আমরা জানি- রেডিও-টিভিতে তোমরা গল্পের অনুষ্ঠান দেখতে ও শুনতে ভালোবাসো।
কারণ গল্পের মাধ্যমে দেশ ও জাতির শ্রেষ্ঠ সন্তান, মহান ব্যক্তিত্ব, ধর্মীয় মনীষীদের কথা এবং বিভিন্ন ঘটনা চমৎকারভাবে ফুটে ওঠে।
পবিত্র কুরআনেও শিক্ষণীয় বহু গল্পের অবতারণা করা হয়েছে, সুন্দর এবং মার্জিতভাবে। এইসব গল্পের মধ্যে আল্লাহর অস্তিত্বের প্রমাণ, নবী-রাসূলদের নবুয়্যতির প্রমাণ, আখেরাতের প্রমাণ- চমৎকারভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। কুরআনে অন্তত ২৫ জন নবীর নাম এসেছে যাঁদের ব্যাপারে বহু গল্প রয়েছে। এঁদের মধ্যে রয়েছেন- হযরত আদম, নূহ, ইদ্রিস, হুদ, সালেহ, ইব্রাহীম, ইসমাঈল, ইউসূফ, সোলায়মান, মূসা, ঈসা এবং মুহাম্মাদ। কুরআনে বর্ণিত গল্পের সংখ্যা নিয়ে মতভেদ রয়েছে। আবু ইসহাক নিশাবুরির মতো অনেকেই বলেছেন কুরআনে বর্ণিত গল্পের সংখ্যা হলো ১১৬।
কুরআনের গল্পগুলো দিয়ে ইরানে বহু নাটক, ধারাবাহিক, ডকুমেন্টারি, কার্টুন এমনকি সিনেমাও তৈরি করা হয়েছে। এগুলো বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ব্যাপক সুনাম অর্জন করেছে। কিছুদিন আগে বাংলাদেশের এসএ টেলিভিশনে শেষ হয়েমভ হযরত ইউসুফ (আ.)-এর ঘটনা নিয়ে তৈরি ইরানি সিরিয়াল ইউসুফ-জুলেখা। একই টিভিতে এখন চলছে আসহাবে কাহাফ নামের ইরানি সিরিয়াল। পবিত্র কুরআনের সূরা আল কাহ্ফ-এ বর্ণিত আসহাবে কাহ্ফ অর্থাৎ গুহাবাসীর আশ্চর্যজনক ঘটনাবলী নিয়ে নির্মিত হয়েছে এটি।
বন্ধুরা, আজকের আসরে আমরা আসহাবে কাহাফ বা গুহাবাসী যুবকদের বিষয়ে পবিত্র কুরআনে যে কাহিনী উল্লেখ করা হয়েছে- তা তোমাদেরকে শোনাব। আর সবশেষে থাকবে একটি ইসলামী গান। এ অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন সহকর্মী আশরাফুর রহমান। তাহলে আর কথা না বাড়িয়ে প্রথমেই শোনা যাক আসহাবে কাহাফের কাহিনী।
একবার একদল কাফির কুরাইশ নেতা বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)’র দাওয়াতি কাজ সম্পর্কে যাচাই-বাছাই করতে তাদের দুই সঙ্গীকে মদীনার দুই ইহুদি পণ্ডিতের কাছে পাঠাল। অতীতের আসমানী গ্রন্থগুলোতে মুহাম্মাদ (সা.)’র আহ্বান বা ইসলাম সম্পর্কে কোনো বক্তব্য পাওয়া যায় কিনা তা জানা ছিল এই কাফির নেতাদের উদ্দেশ্য। ইহুদি পণ্ডিতরা বললেন, তোমরা মুহাম্মাদের কাছে তিনটি প্রশ্ন করো। যদি এই তিনটি প্রশ্নের যথাযোগ্য জবাব তিনি দিতে পারেন তাহলে বুঝবে যে, তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে মনোনীত একজন বড় নবী। আর যদি এই তিন প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারেন তাহলে বুঝবে যে এই ব্যক্তি মিথ্যাবাদী ও তোমরা তার ব্যাপারে তখন যে কোনো সিদ্ধান্ত নিতে পারো।
ইহুদি পণ্ডিত এরপর বললেন, প্রথমে মুহাম্মদের কাছে প্রশ্ন করো- সুদূর অতীতের সেই গুহাবাসী যুবকদের বিস্ময়কর কাহিনী সম্পর্কে যারা তাদের জাতি থেকে আলাদা হয়ে গিয়েছিল। এরপর প্রশ্ন করবে সেই ব্যক্তি সম্পর্কে যে পুরো পৃথিবীর চার দিকে ঘুরেছিল এবং তাঁর রাজ্য পৃথিবীর পূর্ব ও পশ্চিমে বিস্তৃত হয়েছিল। তৃতীয়ত তাঁকে রুহের বাস্তবতা বা স্বরূপ সম্পর্কে প্রশ্ন করবে।
এরপর কুরাইশদের ওই দুই প্রতিনিধি মহানবীর (সা.) কাছে উপস্থিত হয়ে ওই প্রশ্নগুলো তোলে। জবাবে মহানবী (সা.) জানান যে, তিনি পরের দিন তাদের প্রশ্নের উত্তর দেবেন। কিন্তু ১৫ দিন পর ওহি তথা সুরা কাহাফ নাজিল হয়। আর তাতে তাদের ওইসব প্রশ্নের উত্তর ছিল।
বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা সুরা কাহাফে বর্ণিত গুহাবাসী যুবকদের কাহিনী শোনাব। তারা ছিলেন এফসুস শহরের ছয় সভ্রান্ত যুবক। তাদের বাদশা ছিল ওয়াকীয়ানুস বা দাকিয়ানুস। সে জনগণকে মূর্তি পূজায় বাধ্য করত। সে শহরের দ্বারে প্রহরী নিযুক্ত করে রেখেছিল যাতে যারা শহরের বাইরে যাবে তারা যেন প্রথমে মূর্তিকে সিজদা করে।
ওই ছয় যুবক এক আল্লাহয় বিশ্বাসী ছিলেন। তারা মূর্তি পূজা করতে অস্বীকৃতি জানায়। ফলে তাদের ওপর নির্যাতন নেমে আসে।

একদিন তারা শিকার করার ছলে শহরের বাইরে চলে আসেন এবং এক মেষপালক ও তার কুকুরসহ এক পাহাড়ের গুহায় আশ্রয় নেন। স্বতঃস্ফূর্তভাবে তাদের মুখ থেকে বের হল- ‘আল্লাহ আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনি উত্তম কর্মসম্পাদক।’
গুহায় আশ্রয় নিতেই আল্লাহ তাদের ওপর ঘুম চাপিয়ে দেন। কুকুরটি গুহার মুখে সামনের পা দু’টি ছড়িয়ে বসে থাকল। গুহায় আশ্রয় নেয়ার জন্য তাদের ‘আসহাবে কাহাফ' বলা হয়।
এদিকে বাদশাহ তার সৈন্যদের নিয়ে গুহা প্রান্তে পৌঁছে গেল এবং তার মন্ত্রী ওয়ারিয়ুম যে অন্তরে ঈমান রাখত তাকে গুহার ভিতরে তাদের সন্ধান করতে পাঠাল। সে ভিতরে গিয়ে ডাকাডাকি করে সাড়া পেল না, তাছাড়া সেও তাদের মুক্তি কামনা করত, তাই বাইরে এসে বাদশাহকে বলল, ‘তোমার ভয়ে তারা সবাই মারা গেছে।’এ কথা শুনে বাদশাহ আনন্দিত হল এবং গুহার মুখ বন্ধ করার আদেশ দিল। তখন মন্ত্রী ওয়ারিয়ুম একটি ফলকে তাদের নাম, বংশ ও পলায়নের ইতিহাস লিপিবদ্ধ করে গুহার মুখে আটকে দিল। এজন্য তাদের ‘আসহাবে রাকীম’বা ফলকওয়ালা বলা হয়।
ওই যুবকরা গুহার ভিতর একটানা ৩০৯ বছর ঘুমালেন। ইতোমধ্যে সম্রাট ওয়াকীয়ানুসের যুগসহ বহু সম্রাট গত হয়েছে। যুবকরা জেগে দেখলেন যে, গুহার মুখ বন্ধ। ফলে তারা উদ্বিগ্ন হন। তাদের একজন আল্লাহর কাছে দোয়া করলেন, ‘একদিন আমি আমার এক কাজে এক শ্রমিককে নিয়োগ করি, সে অর্ধেক দিন কাজ করলেও আমি পুরোদিনের মজুরি দিতে চাই। কিন্তু সে তা প্রত্যাখ্যান করে চলে যায়। আমি তার মজুরি দিয়ে একটি বাছুর কিনি এবং গরুর পালে ছেড়ে দেই। এর বংশ বৃদ্ধি পেল। দীর্ঘ দিন পর শ্রমিকটি অভাবগ্রস্ত হয়ে তার মজুরি চাইতে আমার কাছে এল। আমি তাকে নিয়ে জঙ্গলে গেলাম এবং এক পাল গরু দেখিয়ে বললাম, ‘এসবই তোমার মজুরি।’ সে বলল, ‘আমাকে ঠাট্টা করলেন?’ আমি শপথ করে বললে সে বিশ্বাস করল এবং তা বুঝে নিল। হে আল্লাহ! আমার এ কাজ যদি কেবল তোমার সন্তুষ্টি লাভের জন্য হয়ে থাকে তবে এর দরজা উন্মুক্ত করে দাও।’ এরপরই দরজার এক-তৃতীয়াংশ খুলে গেল।
গুহার দরজার এক-তৃতীয়াংশ খুলে গেলে অন্য একজন বললেন, ‘খরার সময় এক সুন্দরী নারী আমার কাছে গম চাইতে আসলে আমি তাকে অবৈধ কাজের প্রস্তাব করি, কিন্তু সে নাকচ করে চলে গেল। কয়েক দফা প্রস্তাব ও নাকচের পর একান্তই অসহায় ও বাধ্য হয়ে সে সম্মত হয়। যখন আমি ইচ্ছা করলাম তখন সে কাঁপতে থাকে। আমি কারণ জিজ্ঞেস করলে সে বলল, ‘আমি আল্লাহকে ভয় করছি।’এ কথা শুনতেই আমি তওবা করলাম এবং তাকে গম দিয়ে বিদায় দিলাম। হে আল্লাহ! আমার এ কাজ যদি শুধু তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি তবে দরজা খুলে দাও।’ এ কথা বলার পরই দরজার দুই-তৃতীয়াংশ খুলে গেল।
এরপর তৃতীয়জন বললেন, ‘আমার বাবা-মা বৃদ্ধ ছিলেন। এক রাতে আমি তাদের জন্য দুধ নিয়ে যাই, কিন্তু তারা ঘুমিয়ে ছিলেন। তাদের কষ্ট হবে মনে করে জাগালাম না এবং সকাল পর্যন্ত অপেক্ষা করলাম। নিজের ছাগল ও মেষগুলোর ক্ষয়ক্ষতির পরোয়া করলাম না। হে আল্লাহ! আমার এ কাজ যদি কেবল তোমার সন্তুষ্টির জন্য করে থাকি তবে দরজা খুলে দাও।' সাথে সাথে পুরো দরজা খুলে গেল, গুহার ভিতর আলো পৌঁছে গেল।
এরপর ওই মু'মিন যুবকরা পরামর্শ করলেন যে, একজন শহরে গিয়ে কিছু খাবার নিয়ে আসবে। তবে এমনভাবে যেন কেউ জানতে-বুঝতে না পারে। তারা মনে করেছিলেন যে, তারা একদিন বা আরও কম সময় ঘুমিয়েছিলেন। তাদের একজন দশ দিরহাম নিয়ে বাজারে গেলেন এবং শহর দেখে বিস্ময়ে বলে উঠলেন, ‘হে আল্লাহ! একদিনে এত পরিবর্তন হয়ে গেছে!’
ওই যুবক যখন বাজারে এলেন তখন তিনি কাউকে চিনলেন না, তাকেও কেউ চিনল না। রুটির দোকানে পৌঁছে ওয়াকীয়ানুসের যুগের মুদ্রা দিলে দোকানদার জিজ্ঞেস করল, ‘তুমি গুপ্তধন কোথায় পেলে?’ যুবক অস্বীকার করেন। বিষয়টি জানাজানি হয়ে গেলে তাকে কাজী ও পরে সম্রাটের কাছে নেয়া হয়। এ সময় ওই যুবক কাঁদতে কাঁদতে নিবেদন করলেন, ‘আমাকে ওয়াকীয়ানুসের কাছে নিয়ে যেও না, সে আমাকে হত্যা করবে। তারা জিজ্ঞেস করল, ‘ওয়াকীয়ানুস আবার কে?’ তিনি বললেন, ‘এই দেশের সম্রাট।’ তারা বলল, ‘তুমি পাগল হয়ে গেছ, সে তো কত কাল আগে মরে জাহান্নামে গেছে। এখনকার সম্রাট তো ঈসা (আ.)-এর ধর্মের অনুসারী।’তাকে সম্রাটের কাছে নিয়ে গেলে তিনি সমস্ত ঘটনা খুলে বলেন। সম্রাট বিজ্ঞ ব্যক্তিদের তলব করলেন এবং ওই যুবকের সঙ্গে গুহার কাছে এলেন। সেখানে ফলকে তাদের নাম ও ইতিহাস দেখা গেল।
এদিকে ওই যুবক গুহার ভিতরে ঢুকে তার সাথীদের সব ঘটনা জানান। ঘটনা শুনে তারা সিজদাবনত হয়ে দোয়া করলেন, ‘আল্লাহ! আমাদের আবার ঘুমন্ত করুন।’ফলে তারা আবার ঘুমিয়ে পড়েন। কিছুক্ষণ পর সম্রাট ভিতরে গিয়ে তাদের ঘুমন্ত অবস্থায় দেখলেন। এই যুবকরা রাসূল (সা.)-এর যুগে একবার নড়ে উঠেছিলেন, এরপর আবার ঘুমিয়ে পড়েন। ইমাম মাহদী (আ.)'র আবির্ভাবের সময় হবেন তারা জাগবেন এবং ইমামের সঙ্গী হবেন।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/ মো: আবু সাঈদ/২