অক্টোবর ১৮, ২০১৭ ১৪:১০ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর! আজকের আসরে থাকবে আমরা ইসলামের ইতিহাস থেকে কয়েকটি সত্য কাহিনী, একটি ইসলামী গান ও ভারতের এক নতুন বন্ধুর সাক্ষাৎকার।

জাহান্নামী কে? 

আজকের আসরের শুরুতেই আমরা ইরাকের বিখ্যাত সুফি সাধক হযরত জা’ফর ইবনে ইউনুস (রহ.)-এর জীবন থেকে নেয়া একটি ঘটনা শোনাব। হযরত জা'ফর ইবনে ইউনুসের ডাকনাম ছিল শিবলী। তিনি ২৪৭ হিজরীতে ইরাকের সামারায় জন্মগ্রহণ আর ৩৫৫ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ছিলেন আধ্যাত্মিক জগতের আরেক সাধক হযরত জুনাইদ বাগদাদী (রহ.)-এর শিষ্য।  

হযরত শিবলী যে শহরে বাস করতেন সেখানে তাঁর বহু সমর্থক এবং অনেক বিরোধী লোকও ছিল। অনেকে তাকে প্রচণ্ড ভালোবাসত আবার কেউ কেউ তাকে শহর থেকে বের করে দেওয়ার চেষ্টাও করত। সে শহরে তাঁর অসংখ্য ভক্তদের মধ্যে একজন ছিল রুটির দোকানি। ওই ভক্ত হযরত শিবলীকে কখনো দেখেনি তবে তার নাম শুনেছে। 

একদিনের ঘটনা। হযরত শিবলী ওই রুটির দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তিনি ছিলেন খুব ক্ষুধার্ত। ক্ষুধার জ্বালায় একরকম বাধ্য হয়েই সেই রুটি বিক্রেতার কাছে এক টুকরো রুটি চাইলেন হযরত শিবলী। রুটি বিক্রেতা একথা শুনে রেগে আগুন হয়ে গেল। সে এ অচেনা ব্যক্তিকে যা-তা বলে অপমান করে বিদায় দিল। ক্ষুধার্ত সাধক সেখান থেকে চলে গেলেন। 

ওই রুটির দোকানে অন্য একজন লোক বসে তামাশা দেখছিল। সে হযরত শিবলীকে চিনত। লোকটি রুটি বিক্রেতার সামনে এসে বলল : “যদি তুমি হযরত শিবলীর সাক্ষাৎ পেতে তাহলে কি করতে?” 

রুটি বিক্রেতা বলল : “আমি তাকে অনেক সম্মান করতাম, তিনি যা চাইতেন তাই দু’হাতে তার পায়ে ঢেলে দিতাম।” 

লোকটি তাকে বলল : “যে লোকটিকে তুমি কিছুক্ষণ আগে তোমার কাছ থেকে তাড়িয়ে দিলে এবং তাকে এক টুকরো রুটি থেকে বঞ্চিত করলে, তিনি ছিলেন হযরত শিবলী! 

এ কথা শুনে রুটির দোকানির মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়ল! সে হায় আফসোস! হায় আফসোস! করতে লাগল। মনে হলো কে যেন তার অন্তরে আগুন জ্বালিয়ে দিয়েছে। পেরেশান ও বিচলিতভাবে সে ছুটে গেল হযরত শিবলীর সন্ধানে। 

অবশেষে অনেক খোঁজাখুঁজির পর তাকে পাওয়া গেল এক মরুভূমিতে। রুটির দোকানদার আর কোনো কথা না করে হযরত শিবলীর পা জড়িয়ে ধরল। এরপর বিনীত স্বরে বলতে লাগল, ‘হুজুর! দয়া করে আপনি ফিরে আসুন। আমি আপনার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব। হুজুর! দয়া করে আপনি ফিরে আসুন। আমি আপনার জন্য খাবারের ব্যবস্থা করব।’ 

হযরত শিবলী কোনো কথা বললেন না। কিন্তু রুটি বিক্রেতা তাঁকে আবারো অনুরোধ করতে লাগল, ‘হযরত! আপনি অধমের প্রতি দয়া করুন। একরাত আপনি আমার গরীবখানায় থাকুন। আমি কথা দিচ্ছি, আপনার কারণে অনেক মানুষকে খাবারের দাওয়াত করব। অনুগ্রহ করে আপনি আমার এই আকুতি প্রত্যাখ্যান করবেন না।’ 

এরকম আকুতি মিনতি দেখে এবং তাঁর কারণে অনেক মানুষ খেতে পারবে ভেবে অবশেষে রুটিওয়ালার দাওয়াত গ্রহণ করলেন হযরত শিবলী। 
দিন শেষে রাত্রি ঘনিয়ে এল। রুটিওয়ালার বাড়িতে খাবারের বিশাল আয়োজন। শতশত মানুষ তার দস্তরখানার চার পাশে জড়ো হয়ছে। রুটি বিক্রেতা এই মেহমানদারিতে পুরো একশত দিনার খরচ করল। সে তার ঘরে হযরত শিবলীর অবস্থানের সংবাদ উপস্থিত জনতাকে জানাতে ভুলল না। 

হযরত শিবলী নৈশভোজে শরিক হলেন। সকলে আহারে ব্যস্ত। শিবলী ছাড়াও অতিথিদের মধ্যে উপস্থিত ছিলেন একজন আধ্যাত্মিক সাধক। তিনি হযরত শিবলীকে প্রশ্ন করেন : "হে শেখ! আপনি কি বললে পারবেন দোযখবাসী ও বেহেশতবাসীর আলামত কী?" 

জবাবে হযরত শিবলী বলেন : "জাহান্নামী ওই ব্যক্তি, যে এক টুকরো রুটি আল্লাহর পথে দান করে না অথচ শিবলীর মতো আল্লাহর এক অপারগ ও অসহায় বান্দার জন্যে একশ দিনার খরচ করতেও দ্বিধাবোধ করে না। জান্নাতীরা কিন্তু এরকম নয়।"

(সূত্র: ফারিদুদ্দীন আত্তার নিশাপুরী; ইলাহী নামা (মাসনাভী), সংশোধনে: ফুয়াদ রুহানী,পৃঃ নং ৭১-৭২)

খ) বন্ধুরা, দেখলেতো ওই রুটিওয়ালা একশ দিরহাম খরচ করলেও তা আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ছিল না। তিনি এর মাধ্যমে হযরত শিবলীকে সন্তুষ্ট করতে চেয়েছিলেন। কিন্তু হযরত শিবলী এতে খুশি হন নি। তাই আমরা যেকোনো কাজ করি না কেন, তা যেন সুন্দর হয় এবং আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য হয়।

তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, মহান আল্লাহই উত্তম রিজিকদাতা। কেউ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনুক কিংবা না আনুক, আল্লাহ সবার রিজিকের ব্যবস্থা করে থাকেন। এ সম্পর্কে ইরানি কবি শেখ সা'দীর বুস্তানে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা প্রচলিত আছে।

আল্লাহর আতিথেয়তা 

কথিত আছে যে, একবার এক কাফের ব্যক্তি হযরত ইব্রাহিম (আ.)- এর কাছে কিছু খাবার চাইল। হযরত ইব্রাহিম বললেন: “যদি তুমি মুসলমান হও তাহলে আমি তোমাকে আমার মেহমান হিসেবে গ্রহণ করতে পারি এবং পেট পুরে খেতে দিতে পারি।” 

এ কথা শুনে কাফের লোকটি কিছু না বলে চলে গেল। কিছুক্ষণ পর আল্লাহর পক্ষ থেকে হযরত ইব্রাহিম (আ.)- এর কাছে অহি এল:  

“হে ইব্রাহিম! আমি ৭০ বছর যাবত এ কাফেরকে রুজি দিচ্ছি আর তুমি যদি এক রাতে ওকে খাবার দিতে এবং তার দ্বীন সম্পর্কে প্রশ্ন না করতে- তোমার কি ক্ষতি হতো?” 

ইব্রাহিম (আ.) অহির মাধ্যমে আল্লাহর বক্তব্য শুনে অত্যন্ত লজ্জিত হলেন। তিনি সে কাফের ব্যক্তির সন্ধানে ছুটে পড়লেন। অবশেষে অনেক কষ্টের পর তাকে খুঁজে পেলেন। এরপর হযরত ইব্রাহিম ওই কাফেরকে বাড়িতে এনে পেট ভরে খাওয়ালেন। খাবার শেষে সেই কাফের লোকটি অবাক হয়ে ইব্রাহিমকে জিজ্ঞেস করল: “হে ইব্রাহিম! এমন কি হলো যে, আপনি আগের অবস্থান থেকে থেকে ফিরে এসেছো? আর আমার জন্যে খুব সুস্বাদু খাবারের ব্যবস্থা করেছেন?” 

ইব্রাহিম (আ.) কাফের লোকটিকে ওহি আসার ঘটনা খুলে বললেন। কাফের লোকটি ঘটনাটি শুনে হযরত ইব্রাহিমকে (আ.) বলল : “যদি আপনার প্রভু এ পরিমাণ দয়ালু হয়ে থাকেন তাহলে আপনার দ্বীন সম্পর্কে আমাকে জানান যেন আমিও এরকম ধর্ম গ্রহণ করে ধন্য হতে পারি।”  

 (সূত্র: শেখ সা’দি; বুস্তান, পৃঃ নং ৫৯। আত্তার নিশাপুরী; মুসিবাত নামা, পৃঃ নং ৩০৭) 

বন্ধুরা, মহান আল্লাহর আমাদের ওপর অনেক দয়া করেছেন। কিন্তু কিছু মানুষ অকৃতজ্ঞ যে, তাঁকে ভুলে গিয়ে ভোগ-বিলাসে গা ভাসিয়ে দেয়। অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা এমন এক ব্যক্তির কথা বলব যিনি যুবক বয়সেই একটি রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন। কিন্তু হঠাৎ করে তিনি বাদশাহী ছেড়ে দিয়ে দরবেশি পথ ধরেন।

উট বাড়ীর ছাদে 

আমরা যার কথা বলছি তিনি ছিলেন, হিজরী দ্বিতীয় শতাব্দির একজন নামকরা সাধক ও আল্লাহর অলী হযরত ইব্রাহিম আদহাম। তিনি যৌবনকালে পূর্ব খোরাসানের ‘বলখ' রাজ্যের শাসনকর্তা ছিলেন। সেসময় তার শান-শওকত ও মর্যাদার কোনো কমতি ছিল না। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যেই তিনি এ জগতের সকল কিছু ছেড়ে দরবেশের পথ ধরেন। 

তার এই পরিবর্তনের কারণ সম্পর্কে শেখ ফরিদউদ্দিন আত্তার নিশাবুরী একজন  তার ‘তাজিরাতুল আউলিয়া' নামক গ্রন্থে দু’টি ঘটনা বর্ণনা করেছেন। এখান থেকে একটি ঘটনা তোমাদের শোনাচ্ছি:

বাদশাহীর আমলে এক রাতে ইব্রাহিম বিন আদহাম পালংঙ্কে বিশ্রাম নিচ্ছেন। হঠাৎ তার প্রাসাদের ছাদের উপর থেকে একটি শব্দ শুনতে পেলেন। দ্রুত বিছানা ছেড়ে প্রাসাদের ছাদে চলে গেলেন। ছাদে গিয়ে তিনি অবাক হয়ে গেলেন। তিনি দেখলেন একজন সাধা-সিধে মধ্যবয়সী লোক তার ছাদে পায়চারী করছে। 
ইব্রাহীম আদহাম জিজ্ঞেস করেন : “তুমি কে?” 
লোকটি উত্তর দিল : “জাহাঁপনা! আমার উটটি হারিয়ে গেছে, এখানে খুঁজতে এসেছি।” 
ইব্রাহীম বললেন : “ওহে নির্বোধ! কেউ কখনো ছাদের উপরে উট খোঁজে নাকি? উটের কি পাখা আছে যে, তা উড়ে এসে আমার ছাদে বসে থাকবে? উট এখানে কি করে আসবে?” 
লোকটি উত্তরে বলল : “হ্যাঁ, জাহাঁপনা! ছাদের উপর উটের খোঁজ নেয়া একটি আশ্চর্য ও বোকামিপূর্ণ ব্যাপারই বটে। তবে, আর তাঁর চেয়ে অনেক বেশী বিস্ময়কর হচ্ছে আপনার কাজ। আপনি কি করে সোনালী সিংহাসনে বসে ও চকচকে রেশমী পোশাক পরে আল্লাহর সন্ধান করছেন?”  

ছাদ থেকে ভেসে আসা এ কথাগুলো শুনে হযরত ইবরাহীম বিন আদহাম বুঝে ফেললেন, মূলত লোকটি কোনো উটের মালিক নয় বরং উটের মালিকের বেশ ধরে আল্লাহর পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতা। তাঁকে মহান আল্লাহ আরো বেশী আপন করার জন্য পথপ্রদর্শনের জন্য পাঠিয়েছেন।

বাদশাহ ইবরাহিম আদহাম ভাবলেন, আজ আমাকে যে কথা শোনানো হলো তাতো ঠিকই। কারণ মহান আল্লাহকে পেতে হলে কঠোর সাধনা ও আত্মত্যাগের প্রয়োজন। কিন্তু আমি তো এখনো বাদশাহী আয়েশী জীবন পরিত্যাগ করতে পারিনি। রাজকীয় সুখ-সম্ভোগে লিপ্ত থেকে কি আর আল্লাহপাকের প্রিয়ভাজন হওয়া যায়?

এসব চিন্তা-ভাবনা করার পর তিনি বিছানা ছেড়ে উঠে বসলেন। তাঁর সমস্ত শরীরে এক নব বিপ্লবের স্পন্দন অনুভব করলেন। নিমিষেই সমস্ত শরীর ঘেমে গেল। তিনি আর বসে থাকতে পারলেন না। সাথে সাথে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর চিরদিনের জন্য তিনি রাজসিংহাসনের মায়া ত্যাগ করে বেরিয়ে পড়লেন পরম করুণাময় আল্লাহপাকের সন্ধানে। কিছুদূর যাওয়ার পর তিনি তার একজন দাসের সাক্ষাৎ পেলেন। তখন তার দাস তারই ভেড়ার পাল দেখাশোনা করছিল। তিনি সেখানেই তার অতি সুন্দর ও মহামূল্যবান পোশাক দাসকে দিয়ে নিজে দাসের গায়ের রাখালি পোশাক পড়ে নিরুদ্দেশ হয়ে যান।  

বিখ্যাত এ মনীষী পরবর্তীতে আহলে বাইতের ষষ্ঠ ইমাম জাফর সাদিক (আ.)-এর বিচারবুদ্ধি ও যুক্তি ও চিন্তাধারা দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৮