রংধনু আসর: কাক, কবুতর ও হুদহুদের গল্প
শিশু-কিশোর বন্ধুরা, কেমন আছো তোমরা? আশা করি, বন্ধু-বান্ধব, আত্মীয়-স্বজন ও পরিবারের সবাইকে নিয়ে ভালো ও সুস্থ আছো। সেইসঙ্গে ভালোভাবে খেয়ে-পড়ে আর হেসে-খেলে আনন্দেই চলে যাচ্ছে তোমাদের সময়।
আচ্ছা, সারাদিন হৈ-হুল্লোড় করে রাত্রিতে যখন ঘুমিয়ে পড়ো তখন নিশ্চয়ই স্বপ্ন দেখো এক সুন্দর বাগানের। সবুজ প্রকৃতির মাঝে নানা রঙের পাখির কিচিরমিচির শব্দে নিস্পাপ শিশুদের সঙ্গে খেলা করো সেই বাগানে। কিন্তু এমন সুন্দর স্বপ্নের মাঝে কেউ যদি তোমাদের পিঠে দুম করে একটা কিল বসিয়ে দেয় তাহলে কেমন লাগবে- বলো তো? নিশ্চয়ই স্বপ্নভঙ্গের কষ্টে খুব খারাপ লাগবে- তাই না?
বন্ধুরা, তোমরা মনে হয় জানো না যে, পৃথিবী নামক স্বপ্নের খেলাঘরে তেমনি চলছে ভাঙা আর ধ্বংসের নিষ্ঠুর খেলা। আর এ খেলাঘরের খেলোয়াড়রূপ দানবরা হচ্ছে কিছু শক্তিশালী দেশ ও তাদের সহযোগীরা। তাদের অসৎ লক্ষ্যের শিকারে পরিণত হয়ে আজ ইরাক, সিরিয়া, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন ও মিয়ানমারের আরাকানে অশান্তির আগুন জ্বলছে। এসব দেশের শিশুরা মায়ের কোলে বসে ঘুম পাড়ানি ছড়া শোনার পরিবর্তে হায়েনাদের গুলির আওয়াজ শোনে; তারা ভালোভাবে বেঁচে থাকার জন্য কোন সুন্দর স্বপ্নও দেখে না। শৈশবেই বাবা-মা এমনকি পরিবারের সবাইকে হারিয়ে তারা অনিশ্চয়তা, ভয় কিংবা আতঙ্কের মধ্য দিয়ে বেড়ে ওঠে। কিন্তু তাদের মনেও তো ভালোভাবে বাঁচার ইচ্ছে জাগে; তাদেরও তো ইচ্ছে হয় নির্ভয়ে প্রতিদিন স্কুলে যেতে কিংবা বন্ধুদের সাথে খেলা করতে। কিন্তু হায়েনাদের বন্দুকের গুলি তাদের স্বপ্নকে প্রতিনিয়ত ধুলিস্যাৎ করে দিচ্ছে।
তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, মিয়ানমার সেনাবাহিনী ও উগ্র বৌদ্ধদের জুলুম-নির্যাতনের কারণে রোহিঙ্গা মুসলমানদের আবাসভূমি রাখাইন এখন বিভীষিকায় পরিপূর্ণ। মুসলমান অধ্যুষিত রাজ্যটিকে নরক বানিয়ে ফেলেছে বার্মিজ সেনাবাহিনী ও তাদের দোসর বৌদ্ধ উগ্রবাদীরা। তারা রোহিঙ্গা মুসলমানদের গুলি করে, কুপিয়ে, পুড়িয়ে কিংবা পানিতে ডুবিয়ে মারছে। ঘরবাড়ি জ্বালিয়ে দিচ্ছে। শিশুদের হত্যা করছে আগুনে পুড়িয়ে। প্রাণ বাঁচাতে বাংলাদেশে আসার সময় সাগর ও নদীতে নৌকাডুবে অনেকেই মারা যাচ্ছে।
প্রাণ বাঁচাতে যে ছয় লাখ রোহিঙ্গা বাংলাদেশে কক্সবাজার জেলায় আশ্রয় নিয়ে তাদের অর্ধেকই শিশু। এসব শিশুর মধ্যে ২৫ হাজার শিশু তাদের মা-বাবাকে হারিয়েছে। মা-বাবা হারানো এসব শিশু আত্মীয়-স্বজন আর পরিচিতজনদের সাথে দিন কাটাচ্ছে। এতিম রোহিঙ্গা শিশুদের মনের কষ্ট ফুটে উঠেছে চট্টগ্রামের একটি আঞ্চলিক গানে। গানটি গেয়েছে শিশুশিল্পী নীলা।
এ গানে মা-বাবার প্রতি সন্তানের ভালোবাসা এবং তাদের অবর্তমানে সন্তানের মনের অবস্থা কেমন হয়- তা ফুটে উঠেছে। মা-বাবা সন্তানের খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান, চিকিৎসাসহ সব ধরনের প্রয়োজন মেটানোর চেষ্টা করেন। নিজেরা না খেয়ে সন্তানের মুখে খাবার তুলে দেন। নিজেদের জীবনের ঝুঁকি নিয়ে হলেও শত্রুর হাত থেকে সন্তানকে রক্ষা করেন। পশু-পাখির ক্ষেত্রেও এমনটি দেখা যায়। রংধনুর আজকের আসরে এখন রয়েছে এ সম্পর্কেই একটি গল্প।
কাক, কবুতর ও হুদহুদ
একদিন এক কবুতর তার বাচ্চাকে উড়ান শেখাতে শেখাতে ক্লান্ত হয়ে পড়ায় একটি উঁচু গাছের ডালে বসল। সামান্য বিশ্রাম নেয়ার পরই দেখতে পেল পাশের ডালে একটি খালি বাসা। তৎক্ষণাৎ উড়ে গিয়ে ওই বাসায় বসল। বাসাটি ছিল এক কাকের। বছরখানেক আগে কাক ওই বাসা ছেড়ে অন্যখানে চলে যায়। ঘটনাচক্রে সেদিনই এ পথ দিয়ে উড়ার সময় আগের বাসার কথা মনে পড়ল কাকের। নিচে নেমে এসেই দেখতে পেল একটি কবুতর তার বাচ্চা নিয়ে বসে আছে ওই বাসায়। অমনি কাক কা কা করে চিৎকার করে বলে উঠল। এই বজ্জাত কবুতর! তুই আমার বাসায় বসে আছিস কেন? তোকে কে অনুমতি দিয়েছে?
কবুতর বলল : না, কারো অনুমতি নেইনি। তাছাড়া এখানে আমরা থাকার জন্যও আসিনি। আমার বাচ্চা ক্লান্ত হয়ে পড়ায় এখানে কয়েক মিনিট জিরিয়ে নিচ্ছিলাম মাত্র। তুমি অযথায় রাগারাগি করো না, আমরা এক্ষুণি চলে যাচ্ছি।
কাক আবারো চিৎকার করে বলল : তুই অন্যায়ভাবে আমার বাসা দখল করেছিস। আবার বড় বড় কথা বলছিস! তোকে এত সহজে ছাড়ব না। এক্ষুণি সব পাখিদের ডাকব। তারা এলে তোকে ঘাড় ধরে বাসা থেকে বের করে দেবো।
এই বলেই কাক কা কা করে সব পাখিদের ডাকল। আর এই ফাঁকে কবুতরের বাচ্চাটিকে ধাক্কা দিয়ে বাসা থেকে মাটিতে ফেলে দিল। কাকের শোরগোল শুনে চারদিক থেকে পাখিরা এসে জড়ো হলো। তারা জানতে চাইল, ব্যাপার কী?
কাক বলল : এই কবুতর অন্যায়ভাবে আমার বাসা দখল করে বসে আছে। আমি এখন ওকে চরম শিক্ষা দেবো।
কবুতর বলল: তোমরা কাকের কথা বিশ্বাস করো না। কাক মিথ্যা বলছে। এ বাসা আমারই। এই কাক এসে অন্যায়ভাবে আমার শিশু বাচ্চাকে বাসা থেকে বের করে নিচে ফেলে দিয়েছে। তোমাদের কাছে আমি এর বিচার চাই।
দু'পক্ষের কথা শুনে পাখিরা কাককে জিজ্ঞেস করল: এ বাসাটি যে তোমার এ বিষয়ে তোমার হাতে কোনো দলিল প্রমাণ আছে কি?
কাক বলল: কি সব আজেবাজে কথা বলছো! দলিল-প্রমাণ, সাক্ষী-সাবুদ এসব আবার কী?
পাখিরা এবার কবুতরকে জিজ্ঞেস করল : এ বাসাটি যে তোমার তার কী কোনো প্রমাণ আছে?
কবুতর বলল: অন্য কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ নেই। আমার সাক্ষী আমার বাচ্চা। কাক ঘাড় ধাক্কা দিয়ে আমার বাচ্চাকে বাসা থেকে বের করে দিয়েছে এবং একই কায়দায় আমাকেও বাসা থেকে বের করে দিতে চাচ্ছে। আমাকে দুর্বল পেয়ে কাক কী অত্যাচারইনা শুরু করে দিয়েছে।
পাখিরা বলল : ঠিক কথাই তো! কাকের অধিকার নেই এভাবে কবুতরের ওপর জুলুম করা। কাকের যদি কোনো অভিযোগ থাকে তাহলে সে গিয়ে কাজীর কাছে বিচার চাইতে পারে।
এরপর পাখিদের এক প্রতিনিধি গেল হুদহুদ পাখির কাছে। হুদহুদ সোলায়মান পয়গম্বরের বন্ধু। ন্যায় বিচারক হিসেবে তার বেশ সুনাম আছে। কাক ও কবুতরের মধ্যে ঝগড়া বেধেছে শোনার পরই হুদহুদ চলে এল। সে কাককে জিজ্ঞেস করল, কী হয়েছে বলো শুনি?
কাক বলল: আমি বছরখানেক হলো এ বাসা বানিয়েছি। অথচ কবুতর এসে বিনা অনুমতিতে এখানে জেঁকে বসেছে।
কবুতর বলল : আমি বেশ কিছু সময় ধরে এখানে আছি এবং এখানে কোনো কাক দেখিনি। আজ হঠাৎ করে কাক এসে আমাকে এখান থেকে তাড়িয়ে দিতে চাচ্ছে এবং আমার বাচ্চাকে বাসা থেকে জোর করে মাটিতে ফেলে দিয়েছে।
কাক ও কবুতরের কথা শোনার পর হুদহুদ বলল: এখন যদি আমি বিচার করি তাহলে সবাই কী মেনে নেবে?
সমবেত পাখিরা বলল : অবশ্যই মেনে নেব।
হুদহুদ কিছুক্ষণ ভেবে বলল : কাক যেহেতু এতদিন বাসাটিতে ছিল না এবং সে অন্যায়ভাবে কবুতরের বাচ্চাকে মাটিতে ফেলে দিয়েছে সে জন্য আমার মতে, বাসাটি কবুতরের হাতেই ছেড়ে দেয়া উচিত।
হুদহুদের বিচারের রায় শোনামাত্রই কাক ক্ষেপে আগুন হয়ে গেল। কিন্তু পাখিদের বাধার কারণে সে বেশিক্ষণ সেখানে টিকতে পারল না। কাক একটু দূরে যাবার পর কবুতর হুদহুদের কাছে এসে বসল এবং আস্তে আস্তে বলল : কাজী সাহেব! আপনার মহানুভবতায় আমি মুগ্ধ। কিন্তু আমি একটি বিষয়ে জানতে চাই আর তাহলো, আমার কাছে যেমন কোনো সাক্ষ্য ছিল না তেমনি কাকের কাছেও কোনো সাক্ষ্য-প্রমাণ ছিল না। তাহলে আপনি কী করে আমার পক্ষে রায় দিলেন?
হুদহুদ বলল: তুমি ও কাক ছাড়া প্রকৃত সত্য যেমন আর কেউ জানে না, তেমনি আমিও জানি না। কিন্তু যখন কোন সাক্ষ্য-প্রমাণ না থাকে তখন যার চরিত্র ভালো, সুনাম-সুখ্যাতি বেশি, মিথ্যা বলে না, তার পক্ষেই আমি রায় দিয়ে থাকি। সত্যবাদী হিসেবে তোমার খ্যাতি আছে আর মিথ্যাবাদি ও বদমেজাজী হিসেবে কাকের অনেক বদনাম আছে। তাই তোমার পক্ষে রায় দিয়েছি।
কবুতর বলল : আমি অত্যন্ত আনন্দিত যে, আপনি সুন্দর কথা বলেছেন। তবে আপনাকে এখন বলছি যে, এ বাসাটি আমার নয়। এটি কাকেরই। আমি চাইনে যে, সত্যবাদী হিসেবেও পরিচিত হবো আবার এর উল্টো কাজও করবো।
হুদহুদ বলল : সত্য কথা বলার জন্য তোমাকে অনেক অনেক ধন্যবাদ। কিন্তু বিচারের সময় তুমি মিথ্যা বললে কেন?
কবুতর বলল : আমি আসলে মিথ্যা বলিনি। আমি কখনই বলিনি যে, বাসাটি আমি তৈরি করেছি বরং আমি বলেছি, আমি এখানে ছিলাম। আর এ কথায় কোনো মিথ্যা নেই। তবে আপনার আসার আগে কাক এসে আমার সাথে বাজে ব্যবহার করায় আমিও একই ধরনের আচরণ করতে বাধ্য হই। সে যখন গায়ে পড়ে ঝগড়া বাধাতে চাইল তখন আমিও তাকে একটা শিক্ষা দিতে চাইলাম। এখন যেহেতু আমার সত্যবাদিতা ও সুখ্যাতির কথা উঠেছে সেহেতু আমি আমার এ সুখ্যাতিকে এ ধরনের শত বাসার সাথেও বিনিময় করতে চাই না।
হুদহুদ বলল : মাশাআল্লাহ! খুব ভালো লাগলো তোমার কথাগুলো। কিন্তু এখন যেহেতু প্রকৃত ঘটনা বলেছো সেহেতু আমিও তোমার কোন বদনাম কারো সামনে প্রকাশ করতে চাই না।
এরপর হুদহুদ সব পাখিকে ডেকে বলল : তোমরা সবাই সাক্ষী থাকো। কাক যদি কবুতরের কাছে তার অন্যায় আচরণের জন্য ক্ষমা চায় তাহলে কবুতর কাককে এ বাসাটি দিয়ে দিতে রাজি আছে।
কাক নিরুপায় হয়ে বলল : কাজী সাহেব! আমার আসলে কোনো দোষ নেই। আমার নিয়ত খারাপ ছিল না। তবে আমাদের কাকদের স্বভাবই হলে কর্কশ কণ্ঠে কা কা করা। আমার ব্যবহারের কারণে আমি লজ্জিত এবং আমি সবার সামনে কাকের কাছে ক্ষমা চাচ্ছি।
হুদহুদ বলল : বেশ ভালো কথা। তাহলে কবুতর কাককে বাসা ফেরত দিচ্ছে।
হুদহুদের ঘোষণা শুনে উপস্থিত পাখিরা কলরব করে বলল : ধন্য কবুতর! জয় কবুতর! সত্যিই সে অনেক দয়ালু ও মহৎ।
বন্ধুরা, দেখলে তো, পাখিরা কিভাবে নিজেদের মধ্যে ঝগড়া-বিবাদ মিটিয়ে ফেলল। অথচ দেখো- আরাকানের মুসলমানদের ওপর মিয়ানমার ও ফিলিস্তিনিদের ওপর ইহুদিবাদি ইসরাইল কিভাবে জুলুম-নির্যাতন চালাচ্ছে! ইরাক, সিরিয়া, ইয়েমেন ও আফগানিস্তানের মুসলমানদের ওপরও অন্যায় যুদ্ধ চাপিয়ে দিয়েছে ইসলামের শত্রুরা। আমরা চাই- যুদ্ধ ও সহিংসতা মুক্ত একটি পৃথিবী। যেখানে শিশুরা বেড়ে উঠবে হাসি ও আনন্দে। #
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৩