ডিসেম্বর ১২, ২০১৭ ১৪:০৯ Asia/Dhaka

ঙরংধনু আসরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, আরবী রবিউল আউয়াল অর্থাৎ এ মাসে পৃথিবীতে এসেছিলেন সর্বকালের সেরা মানুষ, বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)। মানবজাতির জন্য তিনি ছিলেন অনুপম আদর্শ। মহান রাব্বুল আলামীন পবিত্র কুরআনে বলেছেন: ‘রাসূলের জীবনে তোমাদের জন্য রয়েছে উত্তম আদর্শ।’ তাঁর তাকওয়া, অনুপম ব্যক্তিত্ব ও চরিত্র মাধুর্য আমাদের সকলের জন্য অনুসরণযোগ্য। শিশু-কিশোররাও মহানবী (সা.) এর প্রোজ্বল আলোয় উদ্ভাসিত হয়েছিল।

শিশুদের সঙ্গে রাসূলেখোদার ব্যবহার ছিল স্নেহপূর্ণ, কোমল এবং বন্ধুসূলভ। তিনি তাদের হাসি আনন্দে যোগ দিতেন। ছোটদের চপলতায় তিনি কখনও অসন্তষ্ট কিংবা বিরক্ত হতেন না। তাদের সঙ্গে সবসময় হাসিমুখে কথা বলতেন তিনি। শিশুরা তাঁর কাছে এলে নিজেদের সব দুঃখ-কষ্ট ভুলে যেতো।

বন্ধুরা, তোমাদের মতো শিশু-কিশোরদের প্রতি বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মদ (সা.)-এর ভালোবাসা সম্পর্কে আজ আমরা একটি বিশেষ অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছি। এতে থাকবে শিশু-কিশোরদের কণ্ঠে বাংলা ও ফার্সিতে দুটি নাতে রাসূল। আর অনুষ্ঠানের শেষে থাকবে বাংলাদেশের জামালপুর জেলার দুই সহোদর ভাইয়ের সাক্ষাৎকার। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই জানো যে, মহানবীর জন্ম আইয়ামে জাহেলিয়াত বা অন্ধকার যুগে। সে যুগে বেশিরভাগ মানুষ পশুর মতো জীবনযাপন করত। অন্যায়, অত্যাচার, অবিচারে অতিষ্ট হয়ে উঠেছিল সাধারণ মানুষ। নির্যাতিত মানুষদের মুক্তির দিতে, আঁধার দূর করে আলোর পথ দেখাতে মা আমিনার কোলজুড়ে আসেন শিশু 'মুহাম্মদ'।

মা আমিনার কোল জুড়ে আসা চাঁদের মতো শিশুটিই পরবর্তীতে বিশেষ সবচেয়ে প্রভাবশালী মানুষ হতে পেরেছিলেন। শিশুদের মধ্যেও তাঁর প্রভাব ছিল অন্যরকম।

এর কারণ হচ্ছে রাসূল (সা.) কখনো শিশুদের ওপর রাগ করতেন না। চোখ রাঙাতেন না। কর্কশ ভাষায় তাদের সঙ্গে কথা বলতেন না। তিনি ছোটদের আদর করে কাছে বসাতেন। তাদের সাথে মজার মজার কথা বলতেন। ছোটদেরকে দেখলে আনন্দে নবীজীর বুক ভরে যেত। তিনি তাদেরকে বুকে জড়িয়ে ধরতেন। একদিন একটি সুন্দর শিশুকে দেখে তিনি জড়িয়ে ধরলেন। বললেন, ‘এই শিশুরাইতো আল্লাহর বাগানের ফুল।’

বিশ্বনবী (সা.)-এর প্রতি ইরানি শিশুদের ভালোবাসা

বন্ধুরা, অনুষ্ঠানের এ পর্যায়ে আমরা শিশুদের প্রতি বিশ্বনবীর ভালোবাসা কেমন ছিল সে সম্পর্কে কয়েকটি ঘটনা তুলে ধরব। প্রথমেই আমরা বিশ্বনবীর সাহাবী আবু নায়ীমের শৈশবের মধুমাখা স্মৃতির কিছু কথা শুনবো- যে স্মৃতিতে অম্লান হয়ে জড়িয়ে আছেন স্ময়ং হযরত মুহাম্মদ (সা)! মক্কা থেকে মদীনায় বিশ্বনবীর হিজরতের প্রাথমিক বছরগুলোতে প্রিয় নবীজির সান্নিধ্যের সেই মিষ্টি দিনগুলোর কথা প্রায়ই ভেসে ওঠে তাঁর মনে। আবু নায়ীম মাঝে মধ্যে তাঁর ছেলের কাছে সে দিনগুলোর কথা বলতে গিয়ে আবার যেন ফিরে পেতে চান সোনালী সেই দিনগুলো।

বিশেষ করে, যেদিন প্রিয়নবী আদর করে তাঁর পিঠ চাপড়িয়ে দিয়েছিলেন সেই সুন্দর দিনটি তিনি কখনোই ভুলতে পারেন না। সে দিনটি মদীনার অলি গলি শিশুদের প্রাণচাঞ্চল্য ও কোলাহলে মুখরিত ছিল। রাস্তার এক পাশ থেকে অন্য পাশে তারা ছুটোছুটি করছিল।

কচি কাঁচা শিশুদের হাসির কলোরোল যেন গোটা মদীনা শহরেই ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হচ্ছিল। শিশু কিশোরদের কোলাহলের মধ্যেই শোনা গেলো উটের ঘণ্টার শব্দ। এ ঘণ্টার শব্দে বোঝা যাচ্ছিল, দূর থেকে শহরের দিকে এগিয়ে আসছে একটি কাফেলা। হ্যাঁ, কোনো এক সফর থেকে মদীনায় ফিরছিলেন বিশ্বনবী ও তাঁর সাহাবীদের একটি দল। আবু নায়ীম বললেন, মহানবীর কাফেলা শহরের দিকে আসছে এটা দেখতে পেয়ে আমরা আমাদের খেলাধুলা বন্ধ করে দিলাম এবং প্রিয় নবীর আগমনের জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতে লাগলাম। বিস্ময়ের ব্যাপার হলো, কোনো কিছুই আমাদেরকে খেলাধুলা থেকে বিরত রাখতে পারতো না। কিন্তু সব সময় মুখে হাসি লেগে থাকা প্রিয় নবীজীকে দেখলেই আমরা খেলা ভুলে যেতাম। রাসূলের কাফেলা যখন শহরে ঢুকে পড়লো তখন আমরা শিশুরা আনন্দে উচ্ছ্বসিত অবস্থায় তাঁর দিকে ছুটে গেলাম।

ভ্রমণের কারণে শ্রান্ত ও ক্লান্ত হওয়া সত্ত্বেও তিনি আমাদের জন্যে থামলেন এবং আমাদেরকে তাঁর দিকে আসার জন্যে সাহাবীদেরকে পথ ছেড়ে দিতে বললেন। আবু নায়ীম বললেন, আমার ছোট্র বন্ধুদের অনেকেই রাসূল (সা.)কে জড়িয়ে ধরল এবং কেউ কেউ খুশীতে মত্ত হয়ে তাঁর চারদিকে পাখীর মতো ঘুরতে লাগল। রাসূলের সাহাবীরা আমাদের বাধা দিতে চাইলেন কিন্তু রাসূল তাঁদেরকে তা করতে দিলেন না, বরং তিনি অত্যন্ত দয়াদ্রভাবে আমার বন্ধুদের সাথে আলিঙ্গন করলেন। আমিও প্রিয়নবীর কাছে আসার জন্য অপেক্ষার প্রহর গুণছিলাম। কিন্তু লাজুক হওয়ায় আমি এক কোণে সরে দাঁড়িয়েছিলাম এবং আনন্দের এ দৃশ্যগুলো দেখছিলাম। এমন সময় রাসূলুল্লাহ মিষ্টি হাসি হেসে আমার দিকে তাকালেন। তিনি আমার দিকে এগিয়ে এলেন এবং এগিয়ে আসতে আসতে তিনি আমার দিকে তাঁর দু'হাত বাড়িয়ে দিলেন। আর আমিও অপ্রতিরোধ্য ইচ্ছা নিয়ে রাসূল (সা.)কে আলিঙ্গন করতে এগিয়ে গেলাম। নবীজি আমার সাথে আলিঙ্গন করলেন, আমার কপালে চুমু দিলেন এবং আমার পিঠ চাপড়িয়ে দিলেন। এটা ছিল আমার জন্যে অবর্ণনীয় মুহূর্ত যা আমি কখনো ভুলব না। মহানবীর সান্নিধ্যের সেই স্মৃতি কতো মধুর! ইস! সেই দিনগুলো যদি আর একবার ফিরে আসত!     

হযরত মুহাম্মদ (সা.)-কে ভালোবাসে ইরানি শিশুরা 

একদিন প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ (সা.) খেতে বসেছিলেন। কিন্তু খানা তখনও শুরু করেননি। উম্মে কায়েস বিনতে মুহসিন (রা.) তার শিশুপুত্রটিকে কোলে করে রাসূলের সাথে দেখা করতে আসলেন। শিশুটিকে দেখে রাসূল (সা.) তার দিকে এগিয়ে এলেন। পরম আদরে কোলে তুলে নিয়ে খাবারের জায়গায় গিয়ে বসলেন। শিশুটি নবীজীর আদর পেয়ে তাঁর কোলেই পেশাব করে ভিজিয়ে দিল।

এ ঘটনায় নবীজি মুচকি হাসলেন। তাঁর চেহারায় বিরক্তি প্রকাশ পেল না। তিনি পানি আনার জন্য একজনকে বললেন। পানি আনা হলে যে যে জায়গায় পেশাব পড়েছিল সেখানে পানি ঢেলে দিলেন। রাসূলেখোদা মনে করতেন, ‘বাগানের ফুল যেমন পবিত্র, মায়েব কোল থেকে নেয়া শিশুও তেমনি পবিত্র।' তিনি আরো বলেছেন, 'তোমরা শিশুদেরকে স্নেহ কর এবং তাদের প্রতি দয়ালু হও।'

শিশুদের প্রতি মহানবী (সা.)'র স্নেহ ও পিতৃসূলভ আচরণের কথা ইতিহাসে স্বর্ণাক্ষরে লেখা আছে। তিনি মুসলমানদের বাস্তবে শিখিয়ে গেছেন যে, কিভাবে শিশুদের সঙ্গে ব্যবহার করতে হয়। কিন্তু অনেক অভিভাবক আছেন যারা শিশুদের সাথে কোমল আচরণ করেন না, তাদের কথাও মনোযোগ দিয়ে শোনেন না। কেবল হু, হ্যাঁ করে যান। এমন আচরণ করলে শিশুরা কষ্ট পায়। আর এটা ইসলামী আদর্শেরও পরিপন্থি। আমাদের মনে রাখা উচিত, ঘর সাজাতে হলে শিশু প্রয়োজন। যত মূল্যবান আসবাবপত্র দ্বারাই গৃহ পূর্ণ করা হোক না কেন, একটি শিশু ঘরটিতে যত জীবন্ত, আনন্দময় এবং সুন্দর করে তোলে, অতি মূল্যবান আসবাবপত্রও তার তুলনায় মূল্যহীন। তাই আমাদের সবাইকে শিশুদের প্রতি আন্তরিক ও স্নেহশীল হতে হবে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১২