রংধনু আসর: শিকারি ও পাখির গল্প
রংধনু আসরের শিশুকিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই এমন কিছু লোককে দেখেছো যারা প্রতারণা ও ধোঁকাবাজির মাধ্যমে অন্যকে ঠকিয়ে নিজের স্বার্থ হাসিল করে। প্রতারণা মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর, তাই এটা ক্ষমার অযোগ্য গুরুতর অপরাধ। প্রতারণা মানে ঠকানো, শঠতা, ছলনা, ফাঁকিবাজি, বিশ্বাস ভঙ্গ করা, মাপে বা ওজনে কম দেওয়া, বেশি দামের জিনিসের সঙ্গে কম দামের বস্তু বা ভেজাল মিশিয়ে দেওয়া, মিথ্যা শপথ করে অন্যের ন্যায্যপ্রাপ্য বা হক বিনষ্ট করা ইত্যাদি।
ইসলামের পরিভাষায় আল্লাহ ও তাঁর রাসুলের নির্দেশ অনুযায়ী কাউকে ন্যায্যপ্রাপ্য ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করাই প্রতারণা। পবিত্র কুরআনে প্রতারক বা ধোঁকাবাজদের ব্যাপারে বলা হয়েছে, "তারা আল্লাহ ও ঈমানদারদেরকে ধোঁকা দিতে অথচ তারা বুঝতে পারে না যে, তারা নিজেদের ছাড়া অন্য কাউকে ধোঁকা দেয় না।"
ইসলামের দৃষ্টিতে মানবজীবনে যা কিছু করণীয়, তার মধ্যে ফাঁকিবাজি ও প্রতারণার কোনো স্থান নেই। এটি সমাজদ্রোহী মহাপাপ। যে ব্যক্তি ধোঁকাবাজি ও প্রতারণার আশ্রয় নেয়, সে প্রকৃতপক্ষে মুমিন বান্দা নয়। পবিত্র কোরআনে আল্লাহ তাআলা নিষেধাজ্ঞা জারি করে ইরশাদ করেছেন, ‘আর তোমরা সত্যকে মিথ্যার সঙ্গে মিশ্রিত করবে না এবং তোমরা জেনেশুনে সত্য গোপন করবে না।’ (সূরা: আল-বাকারা, আয়াত-৪২)
আমিরুল মোমেনীন হযরত আলী (আ.) কপটতাকে একটি আত্মিক রোগ হিসেবে আখ্যায়িত করে বলেছেন, "কপটতাপূর্ণ লোকদের ব্যাপারে সতর্ক হও। কেননা তারা ভুলপথে পরিচালিত। তারা বিভ্রান্ত, তাদের অন্তর রুগ্ন এবং তাদের চেহারা অপবিত্র।"
তিনি আরো বলেছেন, "কপট লোক নিজের তোষামোদকারী এবং অন্যের বদনামকারী।"
তবে, কেবল মানুষই নয়, পশু-পাখির মধ্যেও প্রতারণা, কপটতা ও জুলুম নির্যাতনের ঘটনা ঘটে। রংধনুর আজকের আসরে আমরা এ সম্পর্কেই একটি গল্প শোনাবো। গল্পটি নেয়া হয়েছে মাওলানা জালালউদ্দিন রুমীর মসনবী গ্রন্থ থেকে।
অনেক দিন আগের কথা। একদিন এক শিকারি পাখি শিকারের জন্য এক বনে গেল। এদিক সেদিক ঘোরাফেরা করে শেষে এক জঙ্গলে শিকারের জন্য তার জাল পাতল। জালের নিচে কিছু গম ও শস্যদানা ছড়িয়ে এবং নিজের গায়ে লতাপাতা জড়িয়ে সে একটি ঝোপের আড়ালে চুপটি করে বসে রইল। কিছুক্ষণ পর একটি পাখি দূর থেকে উড়ে এসে- শিকারি যেখানে বসে ছিল- সেখানে এসে নামল। এরপর শস্যের দানা খোঁজা শুরু করল। পাখিটি যখন শিকারির একেবারে কাছে পৌঁছে গেল তখন শিকারির ভীষণ হাঁচি পেল। হাঁচি থামানোর জন্য অনেক চেষ্টা করেও সে ব্যর্থ হলো এবং বিকট শব্দে তা বেরিয়ে গেল। হাঁচির শব্দ শুনে পাখিটি ভালোভাবে তাকিয়ে দেখতে পেল যে, একটা লোক সারা গায়ে লতাপাতা জড়িয়ে ঝোপের আড়ালে বসে আছে। লোকটিকে দেখে পাখিটি বলল :
পাখি: এই যে ভাই, তুমি কে? সারা শরীরে লতাপাতা জড়িয়ে এখানে বসে কি করছ?
শিকারি : আমি একজন সুফী দরবেশ। ইবাদাত-বন্দেগী করেই আমার দিন কাটে। দুনিয়াদারী ছেড়ে বনবাসী হয়েছি। এখানে বসেছি একটু নিরিবিল ধ্যান করব বলে। কিন্তু তোমার কারণে মনে হয় তাও সম্ভব হবে না।
পাখি: আমি যদি তোমাকে কষ্ট দিয়ে থাকি তাহলে মাফ চাইছি। কিন্তু তুমি আমাকে বলো যে, বনবাদাড়ে ঝোপঝাড়ের আড়ালে লুকিয়ে থেকে ইবাদত-বন্দেগী করার নির্দেশ তুমি কোথায় পেয়েছে? তুমি কি জানো না সংসারধর্ম ত্যাগ করে বৈরাগী হওয়া ভালো না ! তুমি কি শুননি-
“মানুষের খেদমত ছাড়া নেই কোনো ইবাদত
তসবিহ, জায়নামাজ ও জোব্বায় নেই পথ।”
শিকারি : তোমার কথা শুনে বুঝা যাচ্ছে, তুমি একটি সহজ সরল সাদাসিধে পাখি, মানুষ জাতিকে এখনো চিনতে পারো নি। তবে শুনে রাখো, দুনিয়ার মানুষ খুবই খারাপ, তারা কাউকেই শান্তিতে থাকতে দেয় না। তারা মিথ্যা বলে, ফাঁকি দেয়, অন্যকে ঠকায়। এছাড়া একজন আরেকজনের ওপর জুলুম করে। কিন্তু আমার অন্তরটা খুবই নরম। তাই এসব অনাচার সহ্য করতে না পেরে এই বনে আশ্রয় নিয়েছি।
পাখি : দুনিয়ার বেশীরভাগ মানুষই যে খারাপ, একথা তুমি ঠিকই বলেছো। কিন্তু তোমার দেখাদেখি সবাই যদি বনবাসী হয় তাহলে তো দুনিয়ার কাজকর্ম বন্ধ হয়ে যাবে! তাছাড়া দুনিয়ার সকল নবী-রাসূল, অলি-আউলিয়া, জ্ঞানী-গুনি ও ভালো লোকেরা সবাই এই খারাপ মানুষদের সাথেই জীবন-যাপন করেছেন: তাদের সুখে সুখী এবং তাদের দুঃখে দুঃখী হয়েছেন। আমার তো মনে হয় দুনিয়া ছেড়ে একা একা নিজের চিন্তায় মশগুল হওয়া স্বার্থপরতা ছাড়া আর কিছুই নয়।
শিকারি : আমাকে তুমি স্বার্থপর বল আর যা-ই বলো তোমার কোন উপদেশ আমি মেনে নিতে পারছি না। আর আমি ঐ সংসারে আর ফিরে যেতেও চাই না। তুমি দয়া করে আমাকে একা থাকতে দাও।
পাখি : ঠিকাছে তুমি যখন কোনো যুক্তি মানবে না তাহলে থাকো তোমার ইবাদত-বন্দেগী নিয়ে। তবে মনে রেখ, বৈরাগ্যবাদকে ইসলাম সমর্থন করে না।
এ কথা বলেই পাখিটি নিজের পথ ধরল। কিন্তু কয়েক কদম যেতে না যেতেই দেখতে পেল বেশ কিছু গম ও শস্যদানা ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। এগুলোর উপর একটি জাল। পাখিটি মনে মনে ভাবল, বনের ভেতর তো কোনোসময় একটি গমও পাওয়া যায় না। কিন্তু এখানে এতো দানা এলো কোত্থেকে! এসব ভাবার পরও পাখিটি গম খাবার জন্য পা বাড়ালো না। তার মনে পড়লে দরবেশরূপী শিকারির কথা। গম খেতে গেলে লোকটি যদি বাধা দেয়! তাই সে ফিরে এসে শিকারিকে জিজ্ঞেস করলো :
পাখি: আচ্ছা দরবেশ সাব, এই গমগুলো কি তোমার?
শিকারি: না, না, ওসব আমার হবে কেন? আমার কোন সহায় সম্বল নেই। তবে আমি যতদুর জানি ওগুলো দু’টি এতিম শিশুর সম্পদ। তুমি ওসবে মোটেও মুখ দিও না। তবে কেউ যদি খুবই অভাবী হয় কিংবা ক্ষুধায় জ্বালায় মরে যাবার মত হয় তাহলে এগুলো খেতে পারে। যাকগে বাপু এসব নিয়ে আমার কোন মাথাব্যথা নেই।
পাখি : ভাগ্যের নির্মম পরিহাস, আমি আসলেই খুব অভাবী। ক্ষুধার জ্বালায় একেবারে মরে যাচ্ছি। আমার মত ক্ষুধার্তের জন্য মরা লাশ খাওয়াও বৈধ বলে আমি মনে করি।
শিকারি : আমি বাপু এসব কিছু বুঝি না। তুমি তোমার অবস্থা ভালো জানো। তবে কথা হলো, প্রকৃত অভাবী না হলে এসব খাওয়া তোমার জন্য গুণাহ হবে। আর অভাবী হলে তুমি নিশ্চিন্তে এগুলো খেতে পারে। তোমাকে তো আর কেউ বাধা দিচ্ছে না।
শিকারির কথা শুনে পাখিটি কিছুক্ষণ চিন্তা করল। এরপর এগিয়ে গেল সামনে এবং খাওয়া শুরু করল। কিন্তু পয়লা দানা মুখে দেবার পরই সে দেখতে পেল তার পা দু’টি জালের সাথে আটকে গেছে ; জাল থেকে বেরিয়ে আসার কোনো পথই নেই। পাখিটি এবার বুঝতে পারল যে, শিকারি তাকে ফাঁকি দেয়ার জন্যই দরবেশ সাজার ভান করেছে। শিকারি যখন দেখল যে, পাখিটি জালে আটকা পড়েছে তখন সে লতাপাতার আড়াল থেকে বেরিয়ে এল এবং পাখিটিকে ধরার জন্য হাত বাড়াল। এ সময় পাখিটি বলল :
পাখি : কী যে ভুল করেছি তা এতোক্ষণে বুঝতে পারছি। একজন ভণ্ড দরবেশ, লোকদেখানো সুফি ও প্রতারকের কথায় বিশ্বাস করার মাশুল এখন আমাকে দিতে হচ্ছে।
শিকারি : আমাকে ভণ্ড বলো কিংবা যাই বলো তাতে আমার কোনো আপত্তি নেই। তবে আমি আমার সাধনার পুরস্কার পেয়ে গেছি। এখন তুমি গম খাও আর আমি খাবো তোমাকে। তবে একটা কথা মনে রেখ, তোমার লোভই তোমাকে প্রতারণা করেছে।
পাখি : আমাকে লোভি বলছো তুমি? আরে আমি তো অভাবে পড়ে গম খেতে গেছি। আমি দোষ করেছি এ কথা তোমার মত ভণ্ড ছাড়া আর কেউ বলবে?
শিকারি : তোমার চিন্তা করা উচিত ছিল যেখানে গম আছে সেখানে যমও আছে। তুমি নিজের পায়ে নিজেই কুড়াল মেরেছো-এখন আর কিছুই করার নেই।
বন্ধুরা, গল্পটি শুনলে। প্রতারক শিকারি যতই যুক্তি দেখাক না কেন, তার কাজটি অবশ্যই অন্যায় হয়েছে। যারা প্রতারণা করে, তারা প্রকৃত মুসলমান হতে পারে না। আমরা সবাই প্রকৃত মুসলমান হওয়ার চেষ্টা করব এবং প্রতারণা ও ধোঁকাবাজি থেকে দূরে থাকব মহান আল্লাহর কাছে এটা আমাদের প্রার্থনা।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৩