ডিসেম্বর ২৯, ২০১৭ ১২:৩৮ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই হিজরী সপ্তম শতাব্দীর বিখ্যাত ইরানি কবি ও আধ্যাত্মিক ব্যক্তিত্ব মাওলানা জালালুদ্দিন রুমীর নাম শুনেছো। তাঁর একটি বিখ্যাত কাব্যগ্রন্থ হচ্ছে  মসনবী।

মাওলানা দীর্ঘ ১৪ বছর ধরে মসনবী রচনা করেন। জীবনের অবসান পর্যন্ত তিনি এই লেখা অব্যাহত রাখেন। মসনবী হলো সমুদ্রের মতো সীমাহীন বিস্তৃত একটি গ্রন্থ। সমুদ্রের সম্পদের যেমন শেষ নেই তেমনি মসনবীর  রয়েছে নতুন নতুন মুক্তা। 

মাওলানা রুমীর মসনবীতে পবিত্র কুরআনের প্রভাব ব্যাপকভাবে লক্ষ্য করা যায়। কুরআনে যেমন প্রসঙ্গক্রমে বিভিন্ন গল্প-কাহিনীর উল্লেখ করা হয়েছে, মসনবীতেও তেমনি মাওলানা রুমী তাঁর চিন্তাদর্শন বর্ণনা করতে গিয়ে গল্প-কথার আশ্রয় নিয়েছেন। গবেষণায় দেখা গেছে- মাওলানা রুমী তাঁর মসনবী গ্রন্থে পবিত্র কুরআনের অন্তত দুই হাজার ২০০টি আয়াতের প্রতি সরাসরি ইঙ্গিত করেছেন কিংবা কবিতার আঙ্গিকে তিনি আসলে কুরআনের আয়াতেরই ব্যাখ্যা করেছেন। এ কারণেই হিজরী ত্রয়োদশ শতকের বিখ্যাত মরমী কবি মরহুম হাজ্জ্ব মোল্লা হাদী সাবজেভরি মসনবীকে কুরআনের তাফসীর এবং মাওলানা রুমীকে কুরআনের একজন মুফাসসির বলে উল্লেখ করেছিলেন।

মসনবী এমন এক অনন্য সাধারণ গ্রন্থ যা আজও তার নিজস্ব স্বাতন্ত্র্য এবং আধুনিকতায় উজ্জ্বল হয়ে আছে। আটশ বছর আগের এই গ্রন্থে কল্পনাভিত্তিক গল্প, রূপকধর্মী গল্প, রহস্যময় গল্প, আধ্যাত্মিক গল্প, শিক্ষণীয় গল্প, নৈতিক বা চারিত্রিক গল্প রয়েছে। আজকের আসরে মাওলানা রুমীর মসনবী থেকে তিনটি গল্প শোনাব। আর গল্প শেষে থাকবে বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকার এক ছোট্ট বন্ধুর সাক্ষাৎকার। অনুষ্ঠানটি তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।

মাওলানা রুমীর মসনবীতে পাখিদের বিচিত্র এবং বিস্ময়কর ভূমিকা লক্ষ্য করা যায়। পাখির স্বাভাবিক যে বৈশিষ্ট্য মাওলানা সেগুলোকেই ব্যবহার করেছেন। যেমন পাখিদের পাখা-পালক, পাখিদের গান গাওয়া, পাখিদের সৌন্দর্য, তাদের উড়াল, পাখির বাসা, খাঁচায় বন্দী থাকা এবং দলবদ্ধভাবে পাখিদের ভ্রমণ করা ইত্যাদি অনুষঙ্গই মাওলানা তাঁর রচনায় ব্যবহার করেছেন। মাওলানা তাঁর জটিল চিন্তা ও তাঁর আদর্শগুলো বর্ণনার ক্ষেত্রে বিচিত্র পাখির ব্যবহার করেছেন। মাওলানা পাখির উড়াল থেকে আকাশ এবং জমিন, ফেরেশতা এবং উর্ধ্বজগত ইত্যাদিকে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন। প্রথমেই তোতা পাখিকে নিয়ে একটি গল্প শোনা যাক

দোকানদার ও তোতা পাখি

এক মুদি দোকানদারের একটি সুরেলা তোতা পাখি ছিল। সেই তোতা পাখিটি মানুষের ভাষা খুব ভালোভাবেই জানত। দোকানের প্রহরী এবং ক্রেতাদের সাথে সে কথা বলতো। একদিন দোকানদার বিশ্রামের উদ্দেশ্যে বাসায় গেল এবং যথারীতি তোতা পাখিটি একাকী দোকানে ছিল। হঠাৎ একটা বিড়াল ইঁদুর ধরার জন্যে দোকানের ভেতরে ঢুকল। তোতা পাখিটি বিড়ালকে দেখে ভীষণ ভয় পেয়ে গিয়েছিল। সে একেবারে কোণায় গিয়ে পালাতে চেয়েছিল আর অমনি বাদাম তেলের বোতলগুলোতে বাধাগ্রস্ত হয় আর বোতলগুলো নীচে পড়ে যায়। দোকানদার যখন ফিরে এসে দেখল যে, সারা দোকানে তেল আর তেল, ভীষণ রেগে গেল এবং তোতার মাথায় আঘাত করে। আঘাত পেয়ে তোতার মাথাটা ন্যাড়া হয়ে যায়। ফলে তোতা পাখিটি চুপচাপ দোকানের এক কোণে গিয়ে বসে থাকে।

 তোতা পাখির এই নীরবতায় দোকানদার ভীষণ কষ্ট পেল। সে তোতার কথা খুবই উপভোগ করত। এখন পাখির কণ্ঠ রোধ হয়ে আসায় নিজের কাজের জন্যে অনুতপ্ত হল। দোকানদার আগের অবস্থায় ফিরে যাবার চেষ্টা করল। কিন্তু কিছুতেই কাজ হলো না। অগত্যা চুপ মেরে গেল। এমন সময় ন্যাড়া মাথার এক তাঁতের কারিগর দোকানের পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তাকে দেখেই তোতা পাখিটি বলে উঠল-

তুই কেন ন্যাড়া? তুইও কি তেলের বোতল ভেঙেছিস?

মানুষ তোতার এ রকম মজার কথা শুনে হাসল।

বাজ পাখি

বাজ পাখি ও পেঁচার গল্প

একটা শিকারি বাজপাখি সবসময় রাজকীয় অতিথি ছিল। একদিন সে তার পথ হারিয়ে গিয়ে হাজির হয় এক বিরান ভূমিতে। সেখানে বাস করতো পেঁচার দল। পেঁচার দল শিকারি বাজপাখিকে দেখে স্বাভাবিকভাবেই ভয়ে একটু চমকে গিয়েছিল। পরে ঈর্ষাপরায়ন হয়ে বলল, এই বাজপাখি অবিবেচকের মতো এখানে এসেছে আমাদের স্থান দখল করতে, আমাদেরকে আমাদের বাসা থেকে উচ্ছেদ করতে। পেঁচারা তাই বাজপাখির ওপর হামলা করল এবং নোংরা কথাবার্তা বলল।

বাজপাখি পেঁচাদের মাঝে পড়ে ভীষণভাবে অস্বস্তি বোধ করছিল। তাই সে চিৎকার করে বলল- ‘এই বিরান প্রান্তরে পেঁচাদের সাথে কেন আমি? আমি তো রাজপ্রাসাদে বাস করি।’  এরপর পাখিটি বলল- 'হে পেঁচার দল, তোমরা দুঃখিত হয়ো না। আমি এই অপরিচিত প্রান্তরে থাকতে আসি নি। আমি আমার গন্তব্য রাজপ্রাসাদের দিকে যাব। এই ফালতু প্রান্তর যা তোমাদের দৃষ্টিতে মহামূল্যবান, আমার কাছে এর মূল্য অতি সামান্য। আমার যেহেতু রাজপ্রাসাদে সবসময়ই স্থান রয়েছে, সেহেতু আমি এই গুহার মধ্যে বসবাস করতে স্বস্তি বোধ করবো না। ফলে তোমরা দুশ্চিন্তা কর না, আমি এই নোংরা জায়গা থেকে অবশ্যই চলে যাব।'

কিন্তু পেঁচার দল বাজপাখির কথা বিশ্বাস করতে পারল না। তারা ভাবল- এটা নতুন আরেকটা ফন্দি। রাজপ্রাসাদে বসবাস করা, রাজকীয় লোকজনের সাথে চলাফেরা করা ইত্যাদি বক্তব্য আমাদেরকে ভয় দেখানো এবং আমাদের বাসা দখল করার পাঁয়তারা মাত্র। আমাদেরকে ভড়কে দেওয়ার জন্যেই এসব বলা হচ্ছে। তা না হলে একটা বাজপাখিকে পৃষ্ঠপোষকতা দেয়ার মতো এমন কী ঠেকা পড়েছে বাদশাহদের।

পেঁচা

এ রকম একটা বাজপাখির এ ধরনের কথাবার্তা কেউই বিশ্বাস করবে না। সে যে বলছে বাদশাহ এখন তার সৈন্য সামন্তকে তার খোঁজে পাঠিয়েছে, এগুলো মিথ্যা, চালবাজি ছাড়া আর কিছু না। যে এই বাজপাখির কথা বিশ্বাস করবে সে বোকার হদ্দ। বাজপাখির মতো সাধারণ একটা পাখির এমন কী কদর থাকতে পারে বাদশাহী মহলে!

বাজ পাখি চাচ্ছিল পেঁচাদেরকে তাদের অজ্ঞতা ও মূর্খতা থেকে মুক্তি দিতে। এই লক্ষ্যে সে পেঁচাদেরকে বলল-  'অহঙ্কার কর না। আমার একটি পালক যদি ভাঙে, তাহলে আমার মালিক তোমাদের এই বাসভূমিকে নিশ্চিহ্ন করে দেবেন। আমার স্বগোত্রীয় কেউ যদি আমাকে বিরক্ত করতে চাইতো, তাহলেও বাদশাহ তার প্রতিশোধ নিতে গিয়ে হাজার হাজার বাজপাখিকে মেরে ফেলত। কেননা তাঁর অন্তরে আমার একটা বিশেষ স্থান রয়েছে। আমি যেখানেই যাই না কেন তিনি আমার সাথে সাথে রয়েছেন। তিনি আমাকে আকাশে ওড়ালে আমি দিগন্তের পর্দা ভেদ করে আকাশে উড়ি। কারণ আমি হলাম বাজপাখি। আমার আকাশে ওড়া দেখে বিশাল পাখি হোমাও আশ্চর্য হয়ে যায়। আর সামান্য পেঁচা তো ছাই। তারা কী করে আমার মর্যাদা বা আমার গুরুত্ব উপলব্ধি করবে?'

পেঁচাদের দিকে তাকিয়ে বাজপাখি আরও বলল, 'সেই পেঁচাটিই সৌভাগ্যবান যে আমার আকাশের ওড়ার রহস্য নিয়ে ভাবে এবং আমার মর্যাদা উপলব্ধি করতে পারে। যদি এ বিষয়টি বুঝতে পারতে যে বাদশাহর সাথে যার সম্পর্ক রয়েছে সে যেখানেই থাকুক না কেন, অবাঞ্ছিত নয়, কিংবা অপরিচিত নয়। যে-ই তার ব্যথা নিরাময়ের জন্যে তাঁর অনুগ্রহ বা দয়া লাভ করে, সে বাঁশির মতো কৃশদেহ হলেও অক্ষম নয়। এ কথা সত্য যে আমি বাদশার গোত্রের কেউ নই, আমি কেবল তাঁর এক প্রিয় শিকারি পাখি। তিনি মহামান্য। আমি কিচ্ছু না। কিন্তু বাদশাহর ভালোবাসার কারণে এবং আমি তাঁর খেদমত করার কারণে তিনি তাঁর মহান মর্যাদাবান কৃপা দৃষ্টি দিয়ে আমার দিকে তাকালেন, আর আমি তাঁর সেই অনুগ্রহে এই মর্যাদা বা সম্মানে ভূষিত হয়েছি।'

বাজপাখি এই গল্পে ইনসানে কামেল এবং আল্লাহর নবীর রূপক। আর পেঁচা হলো দুনিয়া পূজারী অর্থাৎ যারা আল্লাহর সাথে বা আল্লাহর অলিদের সাথে শত্রুতা করে সেইসব মানুষের রূপক। বাদশাহ হলো আল্লাহ বা সত্যের প্রতীক। মাওলানা রুমী এই গল্পের মাধ্যমে বোঝানোর চেষ্টা করেছেন যে পেঁচারাও যদি বাজপাখির মতো আল্লাহর ভালোবাসা পাবার জন্যে তাঁরি খেদমতে বিনীত থাকত তাহলে পেঁচারাও বাজপাখির মতো মর্যাদাবান হতে পারত।

পাখি ও শিকারি

শিকারির প্রতি পাখির ৩ উপদেশ

এবারে এক শিকারি ও পাখির গল্প গল্প শোনা যাক। এক শিকারী ফাঁদে ফেলে একটি পাখিকে ধরল। পাখিও একটা ফাঁদের কথা ভেবে বলল: তোমার মতো একজন বিচক্ষণ শিকারী আমার মতো দুর্বল একটি পাখিকে শিকার করে এমন কী লাভ হবে? তারচে বরং আমাকে অতি সামান্য বা ক্ষুদ্র ভেবে যদি না মারো, তাহলে বিনিময়ে আমি তোমাকে তিনটি উপদেশ দেবো। এই উপদেশ তিনটি তোমার সারাজীবনের জন্যে কাজে লাগবে।

প্রথম উপদেশটি তোমার হাতে বন্দী থাকা অবস্থায় বলব। দ্বিতীয় উপদেশটি তোমার হাত থেকে ছাড়া পেয়ে ছাদে বা দেয়ালের ওপর বসে বলব। আর তৃতীয় উপদেশটি বলবো গাছ থেকে উড়াল দেয়ার সময়।

শিকারী পাখিটির প্রস্তাব মেনে নিল এবং পাখির প্রথম উপদেশ শোনার অপেক্ষা করতে লাগলো। পাখি খুব মজা পাচ্ছিল। সে বলল, প্রথম উপদেশটি হলো 'কারো কোনো অসম্ভব নির্দেশ বা হুকুম মানবে না।' শিকারী পাখিটিকে ছেড়ে দিল। পাখিটি সামনের দেওয়ালে গিয়ে দ্বিতীয় উপদেশটি দিল। উপদেশটি হলো, যা কিছু ঘটে গেছে তা নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না।'

এই দুটি উপদেশ দেয়ার পর পাখি বলল তোমাকে একটা মজার কথা বলি। কথাটি হলো আমার পেটের ভেতর অসম্ভব মূল্যবান একটি রত্ন আছে, যার ওজন দশ দেরহামের পয়সার সমান। এই রত্ন দিয়ে তুমি এবং তোমার সন্তানেরা সম্পদশালী হতে পারতে। শিকারি এ কথা শুনে বোকা বনে গেল।

পাখিটা এবার শিকারীকে বলল, তুমি আমার দুটি উপদেশ মান্য করো নি। তোমাকে উপদেশ দিয়েছি যে, গত হয়ে যাওয়া কোনো বিষয় নিয়ে দুশ্চিন্তা করো না। যাই হোক, অন্য উপদেশটি হলো 'কারো কোনো অযৌক্তিক কথা বিশ্বাস করো না। যে পাখির নিজের ওজনই তিন দেরহামের পয়সার সমান নয়, তার পেটের ভেতর কী করে দশ দেরহাম পয়সারর সমান ওজনের রত্ন থাকে?' পাখির কথা শুনে শিকারী লজ্জা পেয়ে গেল। বলল 'হে পাখি! তৃতীয় উপদেশটা আবার একটু বলো তো!'

মাওলানা এই গল্পের মাধ্যমে স্মরণ করিয়ে দিতে চেয়েছেন যে, উপদেশ দেওয়া উচিত এমন লোকদেরকে যারা মূর্খ নয়। কাফেররা যখন সত্য দ্বীনের দাওয়াত গ্রহণ করল না বা বুঝল না, তখন নবী রাসূলগণ পাথর এবং লাঠির সাহায্যে তাদের মোজেযা বা অলৌকিক ঘটনা দেখিয়েছেন।

বন্ধুরা, আল্লাহ রাব্বুল আলামীন হলেন মহাজ্ঞানী। তিনি তাই তাঁর বান্দাদেরকে জ্ঞান অর্জন করতে বলেছেন। কারণ জ্ঞান অর্জন না করলে জ্ঞানীকে বোঝা যায় না। জ্ঞান না থাকলে উপদেশও বোঝা যায় না। পুরো কুরআনটাই হচ্ছে মানুষের জন্যে আল্লাহর উপদেশের সংকলন। মানুষ জ্ঞানী হলেই তা বুঝতে পারবে।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/২৯