সূরা সিজদাহ; আয়াত ১-৬ (পর্ব-১)
সূরা সিজদাহ পবিত্র কুরআনের ৩২ নম্বর সূরা। এটি মক্কায় নাজিল হয়েছে। কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা সিজদাহর ১ থেকে ৬ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১ থেকে ৩ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
الم (1) تَنْزِيلُ الْكِتَابِ لَا رَيْبَ فِيهِ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ (2) أَمْ يَقُولُونَ افْتَرَاهُ بَلْ هُوَ الْحَقُّ مِنْ رَبِّكَ لِتُنْذِرَ قَوْمًا مَا أَتَاهُمْ مِنْ نَذِيرٍ مِنْ قَبْلِكَ لَعَلَّهُمْ يَهْتَدُونَ (3)
“আলিফ-লাম-মীম। ” (৩২:১)
“এই কিতাবের অবতরণ বিশ্ব পালনকর্তার নিকট থেকে এতে কোন সন্দেহ নেই।” (৩২:২)
“তারা কি বলে, এটা সে (অর্থাৎ আল্লাহর রাসূল) মিথ্যা রচনা করেছে? (এরকমটি নয়) বরং এটা আপনার পালনকর্তার তরফ থেকে সত্য, যাতে আপনি এমন এক সম্প্রদায়কে সতর্ক করেন, যাদের কাছে আপনার পূর্বে কোন সতর্ককারী আসেনি। হয়ত এরা সুপথ প্রাপ্ত হবে।” (৩২"৩)
পবিত্র কুরআনের যে ২৯টি সূরা হুরুফে মুকাত্তায়া দিয়ে শুরু হয়েছে সূরা সিজদাহ সেগুলোর একটি। সূরা বাকারা যেমন আলিফ লাম মিম দিয়ে শুরু হয়েছে, সূরা সিজদাহও তেমনি ওই তিনটি হরফ দিয়েই শুরু করেছেন আল্লাহ তায়ালা। পরের আয়াত থেকে বোঝা যায়, পবিত্র কুরআন নাজিলের সঙ্গে এসব হরফের সম্পর্ক রয়েছে। সেইসঙ্গে এখানে এই আসমানি কিতাবের মহত্ত্ব ফুটে উঠেছে যা লিখিত হয়েছে এই আরবি হরফগুলো দিয়েই। অথচ পবিত্র কুরআনে এই হরফ এবং এগুলোর মাধ্যমে তৈরি বাক্যগুলো এমনভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে যে, কোনো মানুষের পক্ষে এর একটি আয়াত বা এর ক্ষুদ্রতম অংশ তৈরি করা সম্ভব হবে না।
মহাসত্যের পক্ষ থেকে নাজিল হওয়া এই গ্রন্থের প্রতিটি কথা সত্য ও বাস্তব। তবে অবিশ্বাসী কাফেররা এই কিতাবের বাণী গ্রহণ করতে প্রস্তুত ছিল না বলে তারা মহানবী (সা.)’র বিরুদ্ধে এই অপবাদ আরোপ করেছিল যে, তিনি নিজের কথা আল্লাহর নামে চালিয়ে দিচ্ছেন। অথচ মানুষকে ভয় দেখানো ও সতর্ক করা ছাড়া বিশ্বনবীর অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না। তিনি চাইতেন মানুষ তাদের কুৎসিত ও অপছন্দনীয় কাজের পরিণতি সম্পর্কে জেনে এ কাজ থেকে বিরত থাকুক; এর মাধ্যমে তারা সুপথ পেয়েও যেতে পারে।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হচ্ছে:
১. কাফেররা পবিত্র কুরআনের সত্যতার ব্যাপারে মানুষের মনে সন্দেহ ও দ্বিধা সৃষ্টির চেষ্টা করলেও এটি মহান প্রতিপালকের পক্ষ থেকে নাজিল হয়েছে বলে এতে বিন্দুমাত্র সন্দেহের অবকাশ নেই।
২. কুরআন একটি পবিত্র গ্রন্থ। আসমান-জমিনের মালিক হচ্ছেন এই গ্রন্থের স্রষ্টা।
৩. মানুষকে বিভ্রান্ত ও বক্রপথ থেকে সরিয়ে সরল-সঠিক পথে পরিচালিত করা ছিল নবী-রাসূলদের প্রধান উদ্দেশ্য।
সূরা সিজদাহর ৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ وَمَا بَيْنَهُمَا فِي سِتَّةِ أَيَّامٍ ثُمَّ اسْتَوَى عَلَى الْعَرْشِ مَا لَكُمْ مِنْ دُونِهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا شَفِيعٍ أَفَلَا تَتَذَكَّرُونَ (4)
“তিনিই আল্লাহ যিনি নভোমণ্ডল, ভূমণ্ডল ও এ দুইয়ের মধ্যবর্তী সবকিছু ছয় দিনে সৃষ্টি করেছেন, অতঃপর তিনি আরশে বিরাজমান হয়েছেন। তিনি ব্যতীত তোমাদের কোন অভিভাবক ও সুপারিশকারী নেই। এরপরও কি তোমরা বুঝবে না?” (৩২:৪)
আগের আয়াতগুলোতে আল্লাহর পক্ষ থেকে কুরআন নাজিল সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। এরপর এই আয়াতে তাঁর মাধ্যমে বিশ্বজগত সৃষ্টির প্রতি ইঙ্গিত করা হয়েছে। পবিত্র কুরআন নাজিল করার ক্ষেত্রে যেমন আল্লাহর কোনো শরীক ছিল না তেমনি বিশ্বজগত সৃষ্টিতেও তিনি কারো সাহায্য নেননি। আসমান ও জমিন এবং এর মধ্যবর্তী দৃশ্যমান ও অদৃশ্য সব কিছু তাঁর ইচ্ছা ও নির্দেশে সৃষ্টি হয়েছে।
রাসূলুল্লাহ (সা.)’র নবুওয়াতপ্রাপ্তির পর থেকে যেমন দীর্ঘ ২৩ বছরে ধীরে ধীরে কুরআনের আয়াতগুলো নাজিল হয়েছে। ঠিক তেমনি বিশ্বজগতও আস্তে আস্তে ছয়টি পর্যায়ে অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে অস্তিত্বে এসেছে। এই ছয়টি পর্যায়ের প্রতিটিতে বহুকাল সময় লেগে থাকতে পারে যার জ্ঞান কেবল এক আল্লাহর কাছেই রয়েছে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বহু মানুষ এই জগত সৃষ্টিতে আল্লাহ তায়ালার একক ক্ষমতার বিষয়টি উপলব্ধি না করে তাঁরই সৃষ্টি বিভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুর পূজায় লিপ্ত হয় এবং তাদেরকে নিজের উপাস্য ও সুপারিশকারী নির্ধারণ করে। অথচ আল্লাহর ইচ্ছায় তাঁর আওলিয়া ছাড়া অন্য কেউ কোনো মানুষের সুপারিশকারী হতে পারবে না। আর কারো পক্ষে মধ্যস্থতাকারী হয়ে মানুষের গোনাহ মাফ করা কিংবা তাদের জন্য আল্লাহর কাছ থেকে নেয়ামত গ্রহণ করা সম্ভব নয়।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. এই বিশ্বজগতের নিয়ন্ত্রণ করছেন একমাত্র তিনি, যিনি এটি সৃষ্টি করেছেন। বিশ্বজগত সৃষ্টি করে তিনি এটিকে ফেলে রাখেননি কিংবা এর পরিচালনার দায়িত্ব অন্য কারো হাতেও ন্যস্ত করেননি।
২. মানুষকে আল্লাহর নেয়ামতের শোকর আদায় বা তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানাতে হবে। তা না হলে সে আল্লাহ তায়ালার প্রতি উদাসিন হতে হতে এক সময় পথভ্রষ্ট হয়ে যেতে পারে।
সূরা সিজদাহহ’র ৫ ও ৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مِنَ السَّمَاءِ إِلَى الْأَرْضِ ثُمَّ يَعْرُجُ إِلَيْهِ فِي يَوْمٍ كَانَ مِقْدَارُهُ أَلْفَ سَنَةٍ مِمَّا تَعُدُّونَ (5) ذَلِكَ عَالِمُ الْغَيْبِ وَالشَّهَادَةِ الْعَزِيزُ الرَّحِيمُ (6)
“তিনি আকাশ থেকে পৃথিবী পর্যন্ত সমস্ত কর্ম পরিচালনা করেন, অতঃপর তা তাঁর কাছে পৌছাবে এমন এক দিনে, যে দিনের পরিমাণ তোমাদের গণনায় হাজার বছরের সমান।” (৩২:৫)
“তিনিই দৃশ্য ও অদৃশ্যের জ্ঞানী, পরাক্রমশালী ও পরম দয়ালু।” (৩২:৬)
আগের আয়াতগুলোতে আল্লাহর পক্ষ থেকে বিশ্বজগত পরিচালনার কথা উল্লেখ করার পর এই আয়াতে বিষয়টিকে আরো স্পষ্ট করে বলা হয়েছে: নভোমণ্ডল থেকে ভূমণ্ডল পর্যন্ত যা কিছু তার সবকিছু তিনিই পরিচালনা করেন এবং এ কাজে তার কোনো অংশীদার নেই। সেইসঙ্গে মানুষের প্রতিটি কথা, কাজ ও আচরণ কিয়ামতের দিন আল্লাহর কাছে ফিরে যাবে। তাঁর জ্ঞান ও ক্ষমতার বাইরে কিছু নেই।
মানুষের গণনায় এক হাজার বছরের সমান যে দিনের কথা আল্লাহ তায়ালা এখানে বলেছেন সেটি কিয়ামতের দিন। বিশ্বের শেষ দিন পর্যন্ত এখানে যা কিছু ঘটবে কিয়ামতের দিন তার সবকিছু আল্লাহর সামনে উপস্থাপন করা হবে। সেদিন মহান আল্লাহ তাঁর অসীম জ্ঞান, মহিমা ও দয়ার ভিত্তিতে প্রতিটি বান্দার হিসাব নেবেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হলো:
১. সৃষ্টিকর্তা, মালিক ও পালনকর্তা একমাত্র আল্লাহ এবং তাঁর হাতে সবকিছু সমর্পন করার নাম তৌহিদ। তাঁর ইচ্ছা ছাড়া অন্য কারো পক্ষে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়। কাজেই আমরা যেন অন্য কাউকে কোনো অবস্থাতেই নিজেদের অভিভাবক না ভাবি।
২. বিশ্বজগত সৃষ্টি এবং এটি পরিচালনার নিয়ম-কানুন মহান আল্লাহর অসীম জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে তৈরি হয়েছে।
৩. দৃশ্যমান ও অদৃশ্য প্রতিটি বস্তুর ওপর আল্লাহর জ্ঞান সমানভাবে প্রযোজ্য।#