ফেব্রুয়ারি ১৭, ২০১৮ ১৫:২৭ Asia/Dhaka

রংধনু আসরের কাছের ও দূরের শিশু-কিশোর বন্ধুরা, আজকের অনুষ্ঠানের শুরুতেই থাকবে মাওলানা জালাল উদ্দিন রুমির “মসনবী” কাব্যগ্রন্থ অবলম্বনে রচিত একটি গল্প। এরপর রয়েছে একটি ইসলামী গান। প্রথমেই গল্পটি শোনা যাক।

এক দেশে ছিল এক শহর। সে শহরে বাস করতেন শেখ আহমদ খাজারী নামক এক আলেম। শহরে তার খুব নাম যশ। মানুষের উপকার সাধন ও কল্যাণ কামনাই তার জীবনের ব্রত। এ কারণেই তার খুব সুনাম। তিনি এক সময় বেশ ধনী লোক ছিলেন। কিন্তু দান খয়রাত করে করে তার ধনসম্পদ সব শেষ করে দিয়েছেন। তিনি এখন দরিদ্র ও বিত্তহীন। তার ধনসম্পদ শেষ হয়ে গেলেও শহরের লোকজন তাকে ছাড়ছে না। যেকোনো অভাব-অনটনে ও সংকটে তারা হাজির হতো শেখ আহমদ খাজারীর কাছে।

শহরে যদি কোনো আগন্তুক আসত এবং তার যদি থাকার কোনো জায়গা না থাকত তাহলে শহরের লোকেরা তাকে দেখিয়ে দিত শেখ আহমদের বাড়ি। কেউ অভাবে পড়লে এবং ঋণগ্রস্ত হলেই ছুটতো শেখের কাছে। শেখের গরীব দুঃখী মুরিদের অভাব ছিল না।

শেখ আহমদের মনটা ছিল খুবই নরম ও দয়ালু। কারো সমস্যা দেখলে তিনি অস্থির হয়ে পড়তেন। তার অবস্থা দেখে ঘরের লোকেরা বলত, “এভাবে চলতে থাকলে আপনি কখনো মানুষের ঋণ পরিশোধ করতে পারবেন না।”

জবাবে শেখ আহমদ খাজারী বলতেন,  “আরে বাবা, আমি কি আর আমার জন্যে ঋণ করি! আল্লাহর রাস্তায় খরচ করি আল্লাহ নিজেই এর ব্যবস্থা করবেন। এ যাবত তো ঠেকিনি, এরপরও ঠেকবো না। আল্লাহ নিশ্চয়ই আছেন।

দেখতে দেখতে শেখ আহমদের ঋণের পরিমাণ সাত’শ দিনারে গিয়ে ঠেকল। সাতশ’ দিনার তখনকার দিনে বিরাট অঙ্কের টাকা। তবে যারা শেখ আহমদকে টাকা কর্জ দিত তারা যখন দেখতে পেত যে শেখ অসহায় নিঃস্ব মানুষের জন্যই ওই অর্থ খরচ করছেন তখন বাধা দিত না। তারা বলত, শেখ আহমদ ভালো মানুষ। কর্জ পরিশোধ করতে না পারলে কি আর তিনি কর্জ নিচ্ছেন। নিশ্চয়ই তার কোনো ভরসা আছে। ওই ভরসা আছে বলেই কর্জ করে বিলাচ্ছেন।

অনেক সময় লোকজন কোনো কিছু মানত করলে বা সদকা দিতে চাইলে তা শেখ আহমদের হাতেই তুলে দিত। শেখ আহমদও ওই অর্থ কড়ি দিয়ে ছোট খাট ঋণগুলো পরিশোধ করে ফেলতেন। কিন্তু পুনরায় প্রয়োজন দেখা দিলে কিংবা কেউ এসে সাহায্য চাইলে তিনি ফিরিয়ে দিতে পারতেন না। তাই আবারো কর্জ করতেন। এ কারণে তার নাম হয়ে যায় 'কর্জ পীর'। তিনি শুধু কর্জই করেন।

একবার শেখ আহমদ খাজারীর অসুখ হল। ক্রমে ক্রমে তার অবস্থা শোচনীয় আকার ধারণ করল। মুখে মুখে রটে গেল যে, শেখ আহমদ তার শেষ দিনগুলো কাটিয়ে যাচ্ছেন। আরোগ্যের কোনো আশা নেই। এ খবরে পাওনাদাররা শঙ্কিত হয়ে পড়ল। তারা ভাবল যে, এ ব্যক্তি তো সারা জীবন কর্জের উপর বেঁচে ছিলেন। এখন যদি মারা যান তাহলে তাদের পাওনা পরিশোধ করার কেউ থাকবে না। সুতরাং যিন্দা থাকতেই তার কাছে যাওয়া উচিত। তখন একটা উপায় বের করতে তিনি বাধ্য হবেন।

পাওনাদাররা একে অপরকে খবর দিল এবং একদিন সবাই দল বেধে উপস্থিত হল শেখ আহমদের বাড়িতে। তাদের একজন শেখকে বলল:

পাওনাদার: হে শেখ! বহু বছর যাবত আপনি আমাদের কাছে যা চেয়েছেন তা কর্জ দিয়ে এসেছি। কিন্তু আপনি কখনো তা পরিশোধের চিন্তাও করেননি। আমাদের আর ধৈর্য নেই। টাকা পয়সা নেই বলে আমাদের বিদায় করতে পারবেন না। টাকা এনেছেন টাকা ফেরত দিতেই হবে। পরের অর্থে নাম করা ঠিক নয়। দিন, আজই আমাদের পাওনা দিয়ে দিন।

শেখ:, কথা ঠিকই বলেছেন। আমি টাকার অপেক্ষায় আছি। আপনারা এতোকাল ধৈর্য ধরেছেন, আরেকটু ধৈর্য ধরুন। আমি কারো টাকা মেরে দেবো না।

পাওনাদার: কেউই কারো টাকা মারতে চায় না। কিন্তু কারো ঋণ যখন আসমান ছাড়িয়ে যায় আর তার পরিশোধের ক্ষমতা না থাকে তখন তার পক্ষে ওই কর্জ শোধ করা অসম্ভব হয়ে দাঁড়ায়। আমাদেরও সমস্যা সংকট আছে। আমরাতো খাল-বিল থেকে টাকা পয়সা কুড়িয়ে পাইনি। ছাইয়ের নীচ থেকেও অর্থের ভাণ্ডার হাতে আসেনি। আমরাও যদি আপনার মতো বেহুদা দান-খয়রাত করে টাকা পয়সা উড়িয়ে দিতাম তাহলে আপনাকে কর্জ দেয়ার অর্থ কোথায় পেতাম? আপনি একজন বেহিসেবী মানুষ। একহাতে কর্জ করেন আর অন্য হাতে বিলিয়ে দিন। ভালো কাজ যে করছেন, তা ঠিক বটে। তবে ভালো কাজ তারই শোভা পায় যার ধন-সম্পদ আছে। যা হোক আমরা আপনার সম্মান রক্ষা করব। আপনি যেহেতু সম্মানী ও নামী দামী লোক আপনার ইজ্জত-সম্মান নষ্ট করব না। কিন্তু কথা হলো এর শেষ কোথায়?

শেখ: ভালো কথা, এখন আপনারাই বলুন আমি কি করব?

পাওনাদার: জানেন না কি করবেন? আমাদের পাওনা পরিশোধ করে দিন কিংবা দিন তারিখ নির্ধারণ করুন যে কবে পরিশোধ করবেন।

শেখ: আমি তারিখ-টারিখ কিছু বুঝিনে, দিন তারিখ আল্লাহর হাতে। আমি তো আপনাদের কথাই চিন্তা করছি। আপনাদের ধৈর্য ধরতে হবে। আমি সারা জীবন খেটে ইজ্জত-সম্মান কুড়িয়েছি। আপনাদের কোনো অধিকার নেই হৈ চৈ করে আমাকে বেইজ্জতি করার। আমি চেষ্টা করছি যত তাড়াতাড়ি আপনাদের পাওনা বুঝিয়ে দিতে। আল্লাহর কাছে এই সাতশ’ দিনার কিছুই না। তিনিই ব্যবস্থা করবেন।

পাওনাদার: আমরা জানিনে কে দেবে, খোদা দেবেন না খোদার বান্দা দেবেন তাতে আমাদের কাছে কোনো তফাৎ নেই। ভালো কথা, যদি কোথাও কোন ভরসা থেকে থাকে তাহলে আমাদের দিন তারিখ বলে দিন। “যত তাড়াতাড়ি” কথার কি অর্থ আছে? আমরা আজ এখানে বসে থাকব। আপনি আপনার চিন্তা ভাবনা করুন, কথা দিন। আপনার তো প্রতিদিনই মেহমান থাকে, আজ না হয় আমরাই আপনার মেহমান।

শেখ: এ ঘর আপনাদেরই। আপনাদের স্থান আমার মাথার উপর। থাকতে চানতো থাকুন, আমিও আমার চিন্তা করব। তবে আমার যে আশা ভরসা এর কোনো দিন-তারিখ নেই। হয়তো খুব নিকটে, তবে তা আমার জানা নেই।

এমন সময় রাস্তার পাশ থেকে একটি হকার ছেলের ডাক শুনা গেল। সে জোর গলায় বলছে: "হালুয়া চাই হালুয়া, অনেক মজার হালুয়া, গরম গরম হালুয়া, জব্বর মজার হালুয়া। গেল শেষ হয়ে গেল হালুয়া।"

শেখ আহমদ খাজারী হালুয়া বিক্রেতা ছেলেটির হাঁক-ডাক শুনে ভাবলেন, যা হবার হবে। আমার তো দেনা সাতশ’ দিনার হয়েই আছে। এক ডালা হালুয়াতে আর তেমন কি আসবে যাবে। না হয় সাতশ’র সাথে সামান্য কিছু যোগই হলো। তাতে আর কি আসে যায়। ঘরে এখন মেহমান। শেখ আহমদ ঘরে মেহমানদের উপোস রাখার মতো লোক নয়। যেমন ভাবা তেমন কাজ। শেখ খাদেমকে ডেকে বললেন, যাও ঐ বালকের কাছ থেকে হালুয়ার ডালাটি কিনে নিয়ে এসো আর মেহমানদের খেতে দাও।

খাদেম জানত যে, শেখের হাতে টাকা পয়সা নেই। হালুয়া বাকিতেই আনতে হবে। অথচ ঘরের মেহমানরা সবাই পাওনা আদায়ের জন্য বসে আছে। কিন্তু শেখের মন মানসিকতা তার ভালো করেই জানা ছিল। তাই আর কোনো কথা না বলে বের হয়ে গেল রাস্তায়। খাদেম বালকটিকে ডেকে বলল, এই ছেলে! তোর সবটুকু হালুয়ার দাম কতো রে?

বালক: এক দিনার তিন দেরহাম।

খাদেম: আরে বাপু! এতো দাম চাস কেনো? আমরা ফকির দরবেশ মানুষ। এতো টাকা পয়সা নেই। ঘরে এখন অনেক মেহমান। দে, এক দিনার পাবি।

বালক: এতে আমার কোনো লাভ হবে না। ওস্তাদকেই দিতে হবে এক দিনার। আমার কিছু থাকবে না।

খাদেম: আজ না হয় লাভ করলিনে। তোর ওস্তাদের দামেই দিয়ে দে। মেহমানরা খেয়ে দোয়া করবে।

বালক:, ঠিক আছে, এই নিন হালুয়া। বলুন কোথায় পৌঁছে দিতে হবে।

খাদেম: এখানেই, হুজুরের ঘরে নেব।

বালকটি খুশি হয়ে হালুয়ার ডালা মাথায় তুলে নিল এবং শেখ আহমদের ঘরে এসে মেহমানদের কাছে রাখল। শেখ মেহমানদের বললেন, বিসমিল্লাহ বলে শুরু করুন, সামান্য মিষ্টি মুখ করুন। আমিও ভেবে দেখি-কি করা যায়।

মেহমানরা শুরু করল হালুয়া খাওয়া। শেখ ঘরের এক কোণে তার জায়নামাজ বিছিয়ে কয়েক রাকাত নামাজ পড়ে আল্লাহর দরবারে হাত উঠালেন এবং বলতে লাগলেন: হে খোদা! দেখতেই পাচ্ছো অবস্থা। আমি এই সাতশ’ দিনার তোমার জন্যে কর্জ করেছি এবং তোমার অভাবী বান্দাদের জন্যে খরচ করেছি। এবার সর্বশেষ কর্জটাও করলাম। হে খোদা! এই হালুয়া বিক্রেতা ছেলেটির সামনে আমাকে লজ্জিত করো না। এখন জানিনে এই এক ডালা হালুয়ার কি জবাব দেবো। এরা সবাই শেখ আহমদের মেহমান আর শেখ আহমদতো তোমারই মেহমান।

এদিকে হালুয়ার মালিক বালকটি সবাইকে হালুয়া খাইয়ে শেখের সামনে এসে উপস্থিত হলো এবং বলল:  হুযুর শেষ হয়েছে। এবার আমার টাকা দিন ঘরে ফিরব।

শেখ: অ্যাই ভালো ছেলে, শুন্। আমার কাছে তো এখন কোনো টাকা পয়সা নেই। এই যে দেখছিস লোকজন হালুয়া খেলো তারা সবাই আমার পাওনাদার। সবাই বসে আছে তাদের পাওনা বুঝে নিতে। তুইও ধৈর্য ধরে বস্। হয়তো একটা ব্যবস্থা হয়ে যাবে।

বালক: আমি বাবা ওসব বুঝিনে। আমার বসার সময় নেই। হালুয়া খেয়েছেন দাম দিন। আমার দেরী হলে আমার ওস্তাদ আমাকে বকবে, হালুয়ার দাম না নিয়ে গেলেও বকাঝকা ও মারধোর করবে। এসব লোকের সাথে আমার কোনো সম্পর্ক নেই। আমার টাকা দিয়ে দিন আমি চলে যাই।

শেখ: হাঁ, তোর হিসাব এদের থেকে আলাদা। কিন্তু আমার হিসাব থেকে তো আলাদা নয়রে। আমার এখন সাতশ’ দিনার ঋণ। এক কানাকড়িও নেই। আল্লাহ সাক্ষী আছেন যে, আমার হাত শূন্য। ধৈর্য ধরা ছাড়া কোনো গতি নেই।

বালক: অ্যাঁ, বাবা! আজব ফাঁদে এসে পড়লাম। ধৈর্য ধরো মানে কি? আমার টাকা আমাকে দিয়ে দিন। জলদি করুন, নইলে পুলিশ ডেকে আনব। টাকা না থাকলে হালুয়া কিনলেন কেন? সে-ই হালুয়া কিনে যার টাকা আছে অথবা তার বড় কেউ আছে যিনি দাম দিতে পারেন।

শেখ আহমদ বালকের শেষ কথাটি শুনে বিচলিত হয়ে পড়লেন। তার মাঝে বিরাট ভাবান্তর দেখা দিল। তার চোখ বেয়ে অশ্রু ধারা প্রবাহিত হলো। শেখ বললেন, ঠিক কথাই বলেছিস হে প্রিয় বালক। হালুয়া সে-ই কেনে যার অর্থ আছে কিংবা তার মাথার ওপর বড় কেউ থাকে যিনি ঐ মূল্য দিয়ে দিতে পারেন। আমারও একজন বড় ব্যক্তি আছেন। অপেক্ষা করছি সেই বড় ব্যক্তি এসে আমার কর্জ আদায় করে দেবেন।

শেখ আহমদের গাল বেয়ে চোখের পানি ঝরছে। হাতে তসবিহ। কান্নায় তার সারাটা শরীর দুলে দুলে কাঁপছে। বালক শেখের কান্না দেখে বলল, এতে কান্নার কি আছে। যার কথা বলছেন সেই বড় লোক কোথায়? মারা গেছে? নাকি কোথাও চলে গেছেন? জলদি করুন। বলুন তাকে আমার দিনার দিয়ে দিতে।

শেখ: তিনি জীবিত, তিনি এখানেই আছেন। তিনি ইচ্ছে করলে সবার পাওনাই দিয়ে দিতে পারেন।

একথা বলার সাথে সাথেই শেখের বুক ফেটে কান্না বেরিয়ে এলো। হাউমাউ করে তিনি কান্না জুড়ে দিলেন। তার কান্নার শব্দ ছড়িয়ে গেলো দিকে দিকে। বালকটি শেখের অবস্থা দেখে একেবারে গলে গেলো। তার কলজেটাও যেনো শেখের দুঃখে কাবাব হয়ে গেল। শেখের কথার কোন অর্থ সে না বুঝলেও তার ওস্তাদের ভয়ে আর হালুয়ার টাকার জন্য তারও কান্না এসে গেল। সে জোর গলায় ডুকরে ডুকরে কেঁদে বিলাপ করে বলতে লাগল, আমি ওসব বুঝিনে, আমি হালুয়ার টাকা চাই, আমি আর কিছু চাইনে। টাকা না নিয়ে গেলে ওস্তাদ আমাকে মারবে!

বালকের চিৎকার ও কান্নাকাটিতে শেখের বাড়িতে পাড়া পড়শীরা এসে জমা হলো। শেখকে তারা যা কিছুই জিজ্ঞেস করুক না কেন শেখ শুধু কাঁদছেন। শেখ কাঁদছেন নিরবে সারা শরীর দিয়ে। আর বালকটি কাঁদছে হাউ মাউ করে। লোকজন বলাবলি করতে লাগল, বালকের কি দোষ। তার পাওনা তাকে দিয়ে দিলেই হয়। শেখের কর্জ বেশী না কম তার সাথে এ বালকের কি সম্পর্ক? বাবা, টাকা নেই তো হালুয়া খেলেন কেন?

শেখের বাড়িতে বেশ শোরগোল শুরু হয়ে গেল। আশেপাশের ও রাস্তার লোকজনও ছুটে এলো। এমন সময় এক বৃদ্ধ ভীড় ঠেলে প্রবেশ করলেন শেখের ঘরে। তার হাতে একটি চিঠি ও থলে। বৃদ্ধ শেখ আহমদের জায়নামাজের পাশে গিয়ে শেখের হাতে চিঠি ও থলে গুঁজে দিলেন এবং ভীড় ঠেলে পুনরায় বের হয়ে গেলেন। শেখ আহমদ চোখ মুছে প্রথমেই চিঠিটা খুললেন। ওতে লেখা ছিল

জনাব শেখ আহমদ খাজারী!

আসসালামু আলাইকুম। আমি এই মহল্লার একজন বাসিন্দা। কয়েক বছর আগে আপনার এক মুরীদ মুখ বাধা এই থলেটি আমার কাছে রেখে যান এবং বলে যান, যেদিন দেখবেন যে শেখ আহমদ খুবই অভাবী হয়ে পড়েছেন এবং তার কোন উপায়ান্তর নেই তখন টাকার এই থলেটি তার হাতে পৌঁছে দেবেনআজ আমি আপনার ঘরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম। দেখতে পেলাম হালুয়া বিক্রেতা ছেলেটি তার একটি মাত্র দিনারের জন্য বাড়ি ভর্তি মানুষের সামনে চিৎকার করে বুক ফাটাচ্ছে। ভেবে দেখলাম আজই আপনার সেই জরুরী দিন। আজ এক দিনারের জন্যেও আপনি দারুন অভাবী। তাই আমার সেই বন্ধুর অসিয়ত অনুসারে তার অনুরোধ রক্ষা করলাম। এ টাকা কড়ি দিয়ে যা ইচ্ছা তাই করুন। আমিও চাইনে কেউ আমাকে চিনুক। খোদা হাফেজ

চিঠি পড়া শেষ হলে শেখ আহমদ মনে মনে বললেন, আজই তাহলে হিসাব-নিকাশের দিন ধার্য হয়েছে। এরপর তিনি থলের মুখ খুললেন এবং বালকটিকে ডেকে বললেন,

শেখ: কাছে আয় বাবা! টাকার জন্যে অধৈর্য হয়ে পড়েছিলি। কিন্তু তুই সবার চেয়ে বেগুণাহ। ভালোই করেছিস চিৎকার করে। তোর কান্না দিয়ে আমার ফরিয়াদ সেই বড় ব্যক্তির কানে পৌঁছে দিলি। বলেছিলাম না আমার মাথার ওপরও একজন বড় আছেন? এই নে তোর ওস্তাদের হালুয়ার এক দিনার। আর এই নে আরেক দিনার। এটি তোর। তুই আমাকে আজ বিরাট দুঃখ-কষ্ট ও বেইজ্জতি থেকে নাজাত দিলি। তোর চিৎকার না হলে আজ এতো তাড়াতাড়ি সমস্যার সমাধান হতো না।

বালকটি তার অর্থ নিয়ে চলে যেতেই শেখ আহমদ থলের বাকী অর্থ গুনতে শুরু করলেন। গুনে দেখলেন সাতশ দিনার। শেখ আহমদ পাওনাদারদের সব কর্জ পরিশোধ করে দিলেন। এবার পাওনাদাররা বলতে লাগলেন, জনাব শেখ! এখন আর তেমন তাড়াহুড়া নেই। আপনার প্রয়োজন হলে এ অর্থ অন্য কোনো ফরজ কাজে খরচ করুন। আমরা ধৈর্য ধরব। আগে অভাবীদের প্রয়োজন মিটান।

শেখ: জ্বী না! ঋণ পরিশোধের চেয়ে বড় ফরজ কাজ নেই। আর অনুরোধ করবেন না। আপনাদের পাওনা নিয়ে যান আর ওই হালুয়া বিক্রেতা ছেলেটির জন্য দোয়া করুন। সে না থাকলে টাকা পয়সার কোনো খবরই ছিল না। আমিও আল্লাহর কাছে এই একটা বিষয়ই চেয়েছিলাম। আমার একটা আরজুই ছিল যে মরণের আগে মানুষের ঋণ শোধ করে যাব।#

পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/১৭