রংধনু আসর: সুলতান মাহমুদ ও আয়াজ
বন্ধুরা, তোমরা নিশ্চয়ই সুলতান মাহমুদ গজনভীর নাম শুনেছো। তিনি ছিলেন একাদশ শতাব্দিতে পারস্য, আফগানিস্তান, পাকিস্তান এবং ভারতের উত্তরাঞ্চলের শাসক।
সুলতান মাহমুদের এক গোলামের নাম ছিল আয়াজ। সে ছিল একজন কৃষ্ণাঙ্গ ক্রীতদাস। আয়াজ ছিল খুব বুদ্ধিমান, কর্মঠ ও চরিত্রবান। বহুমূখি প্রতিভার অধিকারী আয়াজ এক সময় সুলতানের একান্ত ব্যক্তিগত গোলামে পরিণত হয়।
আয়াজের প্রতি সুলতানের গভীর ভালোবাসা ও স্নেহ দেখে অনেকেই তার প্রতি ঈর্ষা ও বিদ্বেষপরায়ণ হয়ে ওঠে। কিন্তু সুলতান প্রমাণ একদিন করে দেন যে, বুদ্ধিমত্তা, সততা, চিন্তা-চেতনা ও কাজ-কর্মের কারণেই আয়াজ অন্যদের চেয়ে শ্রেষ্ঠ। ফলে আয়াজের ব্যাপারে সবার ভুল ভাঙে।
আজকের আসরে আমরা সেই ঐতিহাসিক ঘটনাটিই তোমাদেরকে শোনাব। এছাড়া থাকবে ইরানি শিশু ক্বারীদের কণ্ঠে পবিত্র কুরআন থেকে তেলাওয়াত এবং বাংলাদেশি দুই বন্ধুর কণ্ঠে একটি কবিতা ও গান। আমাদের আজকের অনুষ্ঠানটিও তৈরি করেছেন আশরাফুর রহমান।
একবার সুলতান মাহমুদ শিকারে বের হবার সিদ্ধান্ত নিলেন। তিনি তার আমীর ওমরাহ ও সভাসদদের বিশজনকে দাওয়াত করলেন এবং সবাইকে তৈরি থাকার জন্য বললেন। পরের দিন শিকারের উদ্দেশ্যে সুলতান রওনা হলেন। শহর থেকে বের হয়ে সামনের দিকে এগিয়ে তারা দেখতে পেলেন যে, তাদের আগে আগে সুলতানের কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ঘোড়া চালাচ্ছে আয়াজ। একজন কৃষ্ণাঙ্গ গোলাম তাদের আগে আগে ও সুলতানের পাশাপাশি চলায় তারা বিরক্ত হলেন। পরস্পর বলতে লাগলেন, আমাদের মত জ্ঞানী-গুনী ও বুদ্ধিমান লোক থাকতে সুলতান কেন যে একজন কৃষ্ণাঙ্গ গোলামকে শিকারের ময়দানে নিয়ে এসেছে বুঝতে পারছি না। এর একটা বিহিত করতেই হবে।"
এরপর তারা নিজেদের মধ্যে পরামর্শ করে এক আমীরকে সুলতানের কাছে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। সুলতানকে কী বলতে হবে তাকে তাও বুঝিয়ে দেয়া হলো। নির্বাচিত লোকটি ঘোড়া হাঁকিয়ে সামনে গেলেন এবং সুলতানের অনুমতি নিয়ে তার পাশাপাশি চলতে লাগলেন। এক পর্যায়ে তিনি সুলতানকে বললেন, আমরা যদি জানতে পারতাম যে, আয়াজের প্রতি সুলতানের স্নেহের কারণ কী- তাহলে হয়তো বিরক্ত হতাম না। কিন্তু এই যে অকারণে তাকে মান সম্মান দেয়া হচ্ছে এর ফলে সুলতানের প্রতি আমাদের ভক্তি-শ্রদ্ধা ও আকর্ষণ কমে যেতে পারে।
এ কথা শুনে সুলতান মাহমুদ বললেন: আপনারা যেহেতু আয়াজকে মেনে নিতে পারছেন না তাহলে একটা পরীক্ষা হয়ে যাক। যদি আমার ভুল হয়ে থাকে তবে আমি তা জেনে যাব। আর যদি আমি সঠিক কাজ করে থাকি তাহলে আপনারা নিজেদের ভুল বুঝতে পারবেন।"
এই বলে সুলতান হুকুম দিলেন সবাইকে দাঁড়িয়ে যেতে। এরপর তিনি মাঠের ডান দিকে বেশ কিছূ দূরের একটি গাছ দেখিয়ে আয়াজকে বললেন, আয়াজ শোন্, ওই গাছটি দেখছিস তো? দৌড়ে ওই গাছের তলায় গিয়ে গাছের দিকে মুখ করে দাঁড়াবি। যখন তরবারি ও বর্শার শব্দ পাবি- কেবল তখনি তোর তরবারি গাছের তলায় রেখে ছুটে আসবি আমার কাছে।"
আয়াজ 'জো হুকুম' বলেই তার ঘোড়া ছুটালো গাছের দিকে। সুলতান মাহমুদ এ সময় আমীর ও সেনাপতিদের উদ্দেশ্যে বললেন, শুনুন, আপনারা সবাই আমার কাছে প্রিয় ও সম্মানিত। আজ আমরা সবাই মিলে একটি সমস্যার সমাধান করতে চাই। আপনারা এক কাজ করুন,আপনাদের মধ্য থেকে এমন একজনকে আমীর নির্বাচিত করুন যার ওপর আপনাদের বিশ্বাস আছে। এ কাজটি দ্রুত শেষ করুন।
এরপর সবাই মিলে সেই ব্যক্তিকেই আমীর নির্বাচিত করলেন যিনি এর আগে সবার পক্ষ থেকে আয়াজের ব্যাপারে সুলতানের কাছে অভিযোগ করেছিলেন। সুলতান নবনির্বাচিত আমীরকে নিয়ে পঞ্চাশ কদম দূরে সরে গেলেন। এরপর বললেন, ওই যে দূরের রাস্তা ধরে একটি কাফেলা পথ চলছে। আমি জানতে চাই কাফেলাটি কোথা থেকে এসেছে। দ্রুত সেখানে গিয়ে খবর নিয়ে আসুন।
সুলতানের নির্দেশ শুনে আমীর দ্রুত ঘোড়া ছুটালেন কাফেলার উদ্দেশ্যে। কাফেলার কাছে গিয়ে কাফেলার প্রধানের কাছ থেকে প্রশ্নের জবাব নিয়ে ফিরে এসে সুলতানকে জানালেন: মহামান্য সুলতান,কাফেলাটি খোরাসান থেকে এসেছে।
সুলতান: বুঝতে পেরেছেন কি তারা কোথায় যাচ্ছে?
আমীর : জিজ্ঞেস করিনি সুলতান।
সুলতান : বেশ ভালো কথা। আপনি আমার কাছেই দাঁড়িয়ে থাকুন।
সুলতান মাহমুদ এবার আরেকজন আমীরকে ডেকে বললেন,
সুলতান : ওই যে কাফেলাটি দেখছেন, দ্রুত সেখানে গিয়ে খোঁজ নিয়ে আসুন তারা কোথায় যাচ্ছে।
আমীর দ্রুত ছুটে গিয়ে খোঁজ নিয়ে এসে সুলতানকে জানালেন, কাফেলাটি মদীনা যাচ্ছে। সুলতান জানতে চাইলেন,
সুলতান : কাফেলায় কতজন লোক রয়েছে?
আমীর : জিজ্ঞেস করিনি সুলতান।
সুলতান : ঠিক আছে। আপনি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন।
এরপর সুলতান তৃতীয় আমীরকে ডেকে আনলেন এবং বললেন,
সুলতান : ওই যে কাফেলাটি দেখছেন, সেখানে গিয়ে দেখে আসুন তো কতজন লোক আছে ওই কাফেলায়?
আমীর দ্রুত সেখানে গেল এবং ফিরে এসে সুলতানকে জানালো, কাফেলায় ১৮০ জন লোক রয়েছে। সুলতান এবার জিজ্ঞেস করলেন,
সুলতান : তারা কি ব্যবসায়ী না মুসাফির? মদীনায় কি নিয়ে যাচ্ছে?
আমীর : তা তো জিজ্ঞেস করিনি।
সুলতান : ঠিকাছে আপনি এখানেই দাঁড়িয়ে থাকুন।
এভাবে সুলতান একে একে প্রত্যেক আমীরকে ডেকে একটি করে প্রশ্নসহ কাফেলার কাছে পাঠালেন এবং আমীরগণ যার যার প্রশ্নের জবাব এনে সুলতান মাহমুদকে জানালেন। সুলতান এরপর সবাইকে উদ্দেশ্য করে বললেন,
সুলতান : এখন আমরা আসল বিষয়ে আসব। আপনারা সবাই মিলে পরস্পরের তরবারী ও বর্শাগুলোতে আঘাত হানুন যাতে শব্দ শুনে আয়াজ ফিরে আসে।
সুলতানের হুকুমে সবাই তাই শুরু করলেন। ওদিকে আয়াজ শব্দ শোনামাত্র দ্রুত গাছের তলা থেকে ছুটে এলো দলের কাছে। সুলতান সবার সামনেই বললেন,
সুলতান : আয়াজ, ওই যে একটি কাফেলা পথ চলছে। আমি জানতে চাই কাফেলাটি কোত্থেকে এসেছে এবং কোথায় যাবে? দ্রুত খবর নিয়ে আয়।
আয়াজ ঘোড়া হাঁকিয়ে ছুটে গেল কিন্তু অন্যদের চেয়ে কিছু সময় দেরিতে ফিরে এলো। এরপর সুলতানকে লক্ষ্য করে বলল :
আয়াজ : সুলতানের মঙ্গল হোক, কাফেলাটি খোরাসান থেকে মদীনার দিকে যাচ্ছে।
সুলতান : বুঝতে পারছিস কতজন লোক?
আয়াজ : জিজ্ঞেস করেছি, একশো সত্তরজন পুরুষ ও দশজন মহিলা।
সুলতান : তারা ব্যবসায়ী না মুসাফির?
আয়াজ : কিছু সংখ্যক মুসাফির হজ করতে যাচ্ছে। আর বেশীর ভাগই ব্যবসায়ী।
সুলতান : খুবই ভালো হতো যদি জিজ্ঞেস করতি, তারা মদীনায় কি নিয়ে যাচ্ছে?
আয়াজ : জিজ্ঞেস করেছি। তাদের কাচে রেশমী কাপড়, খোরাসানি ফরাশ-গালিচা, পাথরের থালাবাসন, পেস্তাবাদাম ও বিভিন্ন শুকনো ফলমূল রয়েছে।
সুলতান : তারা কবে রওনা হয়েছে বুঝতে পেরেছিস?
আয়াজ : নিশ্চয়ই! তারা রজব মাসের সাত তারিখে রওনা হয়েছে, দু'মাস যাবত পথ চলছে এবং এক সপ্তা রেই শহরে কেনাকাটার জন্য অবস্থান করছে।
সুলতান : ঠিকাছে, বেশ ভালো কথা- তোর তরবারি কই?
আয়াজ : ওই গাছের ডালে ঝুলিয়ে রেখেছি।
সুলতান : শিগগিরই তরবারী নিয়ে আয়। রওনা হতে হবে।
আয়াজ দূরে চলে যেতেই সুলতান মাহমুদ গজনভী আমীরদের বললেন :
সুলতান : আপনাদেরকে একটা কথা অবশ্যই বলা প্রয়োজন। আয়াজকে কেন ভালোবাসি আপনারা তার কারণ জানতে চেয়েছেন আর পরীক্ষার ফলাফলও দেখেছেন। আপনারা বিশজন আমীর ওমরাহ ও সেনাপতি ছিলেন। অন্যদিকে আয়াজ এক কাফ্রী গোলাম। আমি আপনাদের প্রত্যেককে একেকটি প্রশ্ন দিয়ে পাঠিয়েছিলাম যা আয়াজ জানতো না। কিন্তু আয়াজ যেভাবে অনুসন্ধান করে তথ্য নিয়ে এসেছে আপনারাও তা করতে পারতেন। কিন্তু তা করেননি। শুধু যার যার প্রশ্নের জবাবই এনেছেন। আমি চাই না আপনাদের কাউকে অপমান করতে। আপনারা প্রত্যেকেই বিভিন্ন কাজের দক্ষতা ও ক্ষমতা রাখেন যা আয়াজের নেই। তবে সে যে কাজ জানে ও যা তার পক্ষে সম্ভব তা সঠিক ও পূর্ণাঙ্গভাবেই করে থাকে। এরপরও কি ব্যাখ্যার প্রয়োজন আছে?
সুলতানের কথা শুনে আমীরদের দলনেতা বললেন-
আমীর : না সুলতান, আর ব্যাখ্যা দেয়ার প্রয়োজন নেই। আমরা স্বীকার করছি, সুলতান সঠিক পথেই আছেন। যেকোনো লোক তার কাজ যত ছোট ও গুরুত্বহীনই হোক না কেনো যদি তা সঠিক ও পূর্ণাঙ্গভাবে আঞ্জাম দেয়, তাহলে স্থান-কাল ভেদাভেদে সে প্রিয় ও সম্মানিত হবেই এবং তাই হওয়া উচিত।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/ মো:আবু সাঈদ/১২