সূরা আল আহযাব: আয়াত ১৩-১৭ (পর্ব-৪)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের আজকের পর্বে সূরা আল আহযাবের ১৩ থেকে ১৭ নম্বর আয়াতের ব্যাখ্যা তুলে ধরা হবে। এই সূরার ১৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَإِذْ قَالَتْ طَائِفَةٌ مِنْهُمْ يَا أَهْلَ يَثْرِبَ لَا مُقَامَ لَكُمْ فَارْجِعُوا وَيَسْتَأْذِنُ فَرِيقٌ مِنْهُمُ النَّبِيَّ يَقُولُونَ إِنَّ بُيُوتَنَا عَوْرَةٌ وَمَا هِيَ بِعَوْرَةٍ إِنْ يُرِيدُونَ إِلَّا فِرَارًا (13)
“এবং যখন তাদের একদল (অর্থাৎ মুনাফিকরা) বলেছিল, হে ইয়াসরেববাসী, এটা টিকবার মত জায়গা নয়, তোমরা ফিরে চল। তাদেরই একদল নবীর কাছে (ফিরে যাওয়ার) অনুমতি প্রার্থনা করে বলেছিল, আমাদের বাড়ী-ঘর খালি, অথচ সেগুলো খালি ছিল না, (যুদ্ধ থেকে) পলায়ন করা ছাড়া তাদের অন্য কোনো উদ্দেশ্য ছিল না।” (৩৩:১৩)
আগের পর্বে আহযাব যুদ্ধ শুরু হওয়ার ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছিল। বলা হয়েছিল, মুনাফিকদের পাশাপাশি যাদের অন্তরে ব্যধি ছিল তারা সাধারণ মানুষের মনোবল দুর্বল করে ফেলার চেষ্টা করছিল। তারা বলেছিল, রাসূল (সা.) আমাদের সঙ্গে প্রতারণা করেছেন এবং আমরা বিজয়ী হতে পারব না। এরপর আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে: মুনাফিকদের আরেকটি দল শত্রুদের প্রতিহত করার জন্য যুদ্ধক্ষেত্রে আগমনকারী ব্যক্তিদের বলেছিল, এখানে তোমরা টিকতে পারবে না এবং তোমাদের পক্ষে কিছু করাও সম্ভব নয়। কাজেই তোমরা শহরে ফিরে গিয়ে নিজেদের ঘর-বাড়ি এবং স্ত্রী-সন্তানকে পাহারা দাও। আরেকদল নানা অজুহাতে রাসূলুল্লাহ (সা.)’র কাছে গিয়ে নিজেদের ঘর-বাড়িতে ফিরে যাওয়ার অনুমতি প্রার্থণা করছিল। তারা বিভিন্ন মিথ্যা অজুহাত তুলে ধরলেও তাদের মূল উদ্দেশ্য ছিল যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়া।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. গুজব রটিয়ে মানুষের মনোবল দুর্বল করে দেয়া মুনাফিকদের কাজ। সমাজে এ ধরনের লোক এবং তাদের গতিবিধির ওপর ঈমানদার ব্যক্তিদের সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে।
২. যুদ্ধক্ষেত্রে রাসূলে খোদা (সা.) নিজে সেনা কমান্ডারের দায়িত্ব পালন করতেন। বিপদের সময় সাধারণ মানুষের পাশে ছিল তার অবস্থান এবং কখনোই সঙ্গীসাথীদের বিপদে ফেলে তিনি চলে যাননি।
এই সূরার ১৪ ও ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَوْ دُخِلَتْ عَلَيْهِمْ مِنْ أَقْطَارِهَا ثُمَّ سُئِلُوا الْفِتْنَةَ لَآَتَوْهَا وَمَا تَلَبَّثُوا بِهَا إِلَّا يَسِيرًا (14) وَلَقَدْ كَانُوا عَاهَدُوا اللَّهَ مِنْ قَبْلُ لَا يُوَلُّونَ الْأَدْبَارَ وَكَانَ عَهْدُ اللَّهِ مَسْئُولًا (15)
“যদি শত্রুপক্ষ চতুর্দিক থেকে নগরে প্রবেশ করে তাদের সঙ্গে মিলিত হত, অতঃপর বিদ্রোহ করতে (এবং শিরকে ফিরে যেতে) প্ররোচিত করত, তবে তারা অবশ্যই বিদ্রোহ করত এবং মোটেই বিলম্ব করত না।” (৩৩:১৪)
“অথচ তারা পূর্বে আল্লাহর সাথে অঙ্গীকার করেছিল যে, তারা (শত্রুদেরকে) পৃষ্ঠ প্রদর্শন করবে না। আল্লাহর অঙ্গীকার সম্পর্কে জিজ্ঞাসা করা হবে।” (৩৩:১৫)
আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আজ যারা শত্রুদের ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাচ্ছে এবং বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে প্রস্তুত নয় আল্লাহর প্রতি তাদের ঈমান অত্যন্ত দুর্বল। এ অবস্থায় শত্রুরা যদি মদীনা শহরে প্রবেশ করে তাদেরকে শিরক ও কুফরির জীবনে ফিরে যেতে বলে তাহলেও তারা কালবিলম্ব না করে সেকথা মেনে নেবে এবং ঈমান ত্যাগ করবে। অথচ রাসূলুল্লাহ (সা.)’র সঙ্গে বাইআত করার বা আনুগত্যের শপথ করার সময় তারা এ প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল যে, তারা ইসলামের নবী ও মুসলমানদেরকে শত্রুর হাত থেকে রক্ষা করবে এবং যুদ্ধক্ষেত্রে থেকে পলায়ন করবে না। কিন্তু তারা সে প্রতিশ্রুতিতে অটল না থেকে তা লঙ্ঘন করেছে। যদিও তাদের জানা ছিল যে, এ বিষয়ে আল্লাহতায়ালা জিজ্ঞাসাবাদ করবেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মুসলিম সমাজে বসবাসকারী কিছু দুর্বল ঈমানের মানুষ থাকে যারা খুব সহজেই সত্যের পথ ত্যাগ করে শত্রুর সঙ্গে একাত্মতা ঘোষণা করে। তারা মুসলিম সমাজের নেতার আদেশ মানতে অপারগতা প্রকাশ করে শত্রুর আধিপত্য মেনে নিতেও প্রস্তুত থাকে।
২. ঈমান হচ্ছে আল্লাহর সঙ্গে এক ধরনের চুক্তি বা প্রতিশ্রুতি যা শত্রুর মোকাবিলায় জীবনের শেষ রক্তবিন্দু দিয়ে হলেও রক্ষা করতে হবে। এই চুক্তি ভঙ্গ করা বেঈমানির লক্ষণ।
সূরা আহযাবের ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ لَنْ يَنْفَعَكُمُ الْفِرَارُ إِنْ فَرَرْتُمْ مِنَ الْمَوْتِ أَوِ الْقَتْلِ وَإِذًا لَا تُمَتَّعُونَ إِلَّا قَلِيلًا (16) قُلْ مَنْ ذَا الَّذِي يَعْصِمُكُمْ مِنَ اللَّهِ إِنْ أَرَادَ بِكُمْ سُوءًا أَوْ أَرَادَ بِكُمْ رَحْمَةً وَلَا يَجِدُونَ لَهُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا (17)
“(হে নবী আপনি) বলুন! তোমরা যদি মৃত্যু অথবা হত্যা থেকে পলায়ন কর, তবে এ পলায়ন তোমাদের কাজে আসবে না। (যদি কাজে আসেও) তখনও তোমরা সামান্যই ভোগ করতে পারবে।” (৩৩:১৬)
“(হে নবী আপনি) বলুন! কে তোমাদেরকে আল্লাহ থেকে রক্ষা করবে যদি তিনি তোমাদের অমঙ্গল অথবা তোমাদের প্রতি অনুকম্পার ইচ্ছা করেন? তারা আল্লাহ ব্যতীত নিজেদের কোন (অভিভাবক) ও সাহায্যদাতা পাবে না।” (৩৩:১৭)
যারা শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে পালিয়ে যেতে চায় তাদের উদ্দেশ করে আল্লাহ তায়ালা বলেন: তোমরা ভেবো না নিহত হওয়ার ভয়ে যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালয়ে গেলেই তোমরা বেঁচে থাকবে এবং লাভবান হয়ে যাবে। কারণ, তাতে হয়ত দুনিয়ার জীবনের বাকি কয়েকটা দিন বেঁচে থাকবে কিন্তু এরপরই তোমাদের জন্য অপেক্ষা করছে জাহান্নামের ভয়াবহ আজাব। সেখানে তোমরা আল্লাহ তায়ালার চরম ক্রোধের শিকার হবে।
এ ছাড়া, যুদ্ধে অবতীর্ণ হলেই যে কেবল মানুষের মৃত্যু হয় তা তো নয়। প্রকৃতিগতভাবেই প্রতিদিন কোনো না কোনো মানুষ মারা যায় এবং এই নশ্বর জীবন ত্যাগ করে চিরস্থায়ী আবাসের দিকে চলে যায়।
আল্লাহ বলেন, তোমাদেরকে কে এই নিশ্চয়তা দিল যে, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে পালিয়ে যাওয়ার পরপরই তোমাদের স্বাভাবিক মৃত্যু হবে না বা কোনো দুর্ঘটনায় তোমাদের প্রাণ চলে যাবে না? মহান আল্লাহ কি যুদ্ধ ছাড়া অন্য কোনো উপায়ে তোমাদের প্রাণ কেড়ে নিতে পারেন না? তোমাদের কি আল্লাহ ছাড়া আর কোনো অভিভাবক আছে যার কাছে আশ্রয় নিয়ে তোমরা আল্লাহর সংকল্পের গণ্ডি থেকে বেরিয়ে যেতে পারবে? এমন কেউ আছে কি যে তোমাদেরকে আল্লাহর মোকাবিলায় সাহায্য করবে?
কাজেই শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধ থেকে পালানোর পরিবর্তে জিহাদের ময়দানে উপস্থিত হও এবং বীরবিক্রমে যুদ্ধ করো। যদি এই যুদ্ধে শহীদ হয়ে যাও তাহলে মহান আল্লাহ তোমাদের জন্য মহাপুরষ্কারের ব্যবস্থা রেখেছেন।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. প্রত্যেকের জীবনে একদিন মৃত্যু আসবে এবং তা থেকে পালিয়ে বাঁচার সাধ্য কারো নেই। কাজেই মরতে যখন হবেই তখন আল্লাহর নির্দেশ পালন করে তাঁর রাস্তায় যুদ্ধ করতে করতে মৃত্যুর স্বাদ গ্রহণ করার চেয়ে উত্তম আর কিছু হতে পারে না।
২. আমাদেরকে সব সময় এ ব্যাপারে সতর্ক থাকতে হবে, আমরা যেন এই নশ্বর পৃথিবী ও তার ক্ষণস্থায়ী সম্পদ বা নাম-যশ অর্জন করতে গিয়ে চিরকালীন সুখ ও শান্তিকে বিসর্জন না দেই।
৩. এই বিশ্বজগত পরিচালিত হয় আল্লাহ তায়ালার ইচ্ছায়। দুঃখ-দুর্দশা ও সুখ, জয় ও পরাজয় ইত্যাদি সবই আল্লাহর বিজ্ঞচিত সিদ্ধান্ত অনুযায়ী হয়ে থাকে। এখানে আল্লাহর ইচ্ছার কাছে নতি স্বীকার করে তাঁর নির্দেশ অনুযায়ী চলাই বুদ্ধিমানের কাজ। এই পথে চলার মাধ্যমেই মানুষ পরকালের স্থায়ী সুখের আবাস অর্জন করতে পারে।#