ইরানের পণ্য-সামগ্রী: লোহা
ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। তো এগুলোর সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দেয়ার জন্য আমাদের সাপ্তাহিক আয়োজন " ইরানি পণ্য সামগ্রী"র আজকের পর্বে আপনাদের স্বাগত জানাচ্ছি। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ পণ্য আকরিক লোহা নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করেছি।
ইরানের উত্তর পশ্চিমাঞ্চলীয় পশ্চিম আজারবাইজানের হাসানলু এলাকায় পুরাতত্ত্ব গবেষকরা যে খননকাজ চালিয়েছিল সেখানে ব্যাপক যুদ্ধাস্ত্র উদ্ধার করতে সক্ষম হয়েছিল বলে গত আসরে আমরা উল্লেখ করেছিলাম। ওইসব যুদ্ধাস্ত্র ছিল লোহার তৈরি এবং খ্রিষ্টপূর্ব নবম শতাব্দির সরঞ্জাম। পাসারগার্ড এবং তাখতে জামশিদের মতো স্থাপনাগুলোর পিলারের গোড়ায় সেই হাখামানেশিয় আমলেই লোহা ব্যবহারের নিদর্শন লক্ষ্য করা যায়। বিশাল বিশাল পাথর কেটে পিলারে ব্যবহার করা হয়েছে এবং পিলারের গোড়ায় লোহার সঙ্গে কাঠ সংযুক্ত করা হয়েছিল ওইসব স্থাপনায়।

পুরাতাত্ত্বিক গবেষকদের আবিষ্কৃত তথ্যপঞ্জি অনুযায়ী চদোরমালু, গোল গোহার এবং সাঙ্গন খনির মতো আরও অনেক খনি আছে যেগুলোকে ইরানের বৃহৎ লোহার খনি বলে গণ্য করা হয়, সেগুলো সেই প্রাচীন কালেও ব্যবহার করা হতো। সাঙ্গন আকরিক লোহার খনিতে রয়েছে বিশাল মজুদ। পৃথিবীর বৃহত্তম আকরিক লোহার খনিগুলোর একটি হলো এই সাঙ্গন। খনিটি উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় ইরানের খোরাসানে রাজাভি প্রদেশে অবস্থিত। সাঙ্গন লোহার খনিতে ব্যাপক গর্তের সন্ধান পাওয়া গেছে। এগুলো পর্যালোচনা করে গবেষকরা বলেছেন প্রাচীনকালেও এই খনি থেকে আকরিক লোহা উত্তোলন করা হয়েছিল। গবেষকদের মতে এই খনিতে দুই শ কোটি টন লোহার মজুদ রয়েছে। সাঙ্গন আকরিক লোহার খনির অপর একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এই খনির লোহার মান বা বিশুদ্ধতা অনেক বেশি।
আকরিক লোহার মান, ওই লোহার মধ্যে বিদ্যমান পানি ও আর্দ্রতা, অপরিশোধিত লোহার গায়ে লেগে থাকা ময়লা এবং পূর্ণ বিশুদ্ধতার মান সম্পন্ন হওয়া ইত্যাদি খনিজ এই পাথরের বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্য। এসব বৈশিষ্ট্য সম্পর্কে জানা, খনি সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান থাকা খনিজ পাথরকে কাজে লাগানোর ক্ষেত্রে খুবই গুরুত্বপূর্ণ। এমনও তো হতে পারে যে খনিতে যে লোহা রয়েছে সেগুলোর বিশুদ্ধতা অনেক বেশি। কিন্তু পারিপার্শ্বিক অবস্থা বিশেষ করে খনিজ আর্সেনিকযুক্ত হবার কারণে পরিবেশের ওপর তার বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে অর্থাৎ পরিবেশ দূষণের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে-এই আশংকায় সেই বিশুদ্ধ লোহা কিংবা ইস্পাতকে র' ম্যাটেরিয়াল হিসেবে কাজে লাগানো কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। আজকাল অবশ্য প্রযুক্তির কল্যাণে অবস্থার অনেক উন্নতি হয়েছে। পাথর চেনা কিংবা সেগুলোর ভালো-মন্দ দিক বিচার বিশ্লেষণ করা এখন আর কঠিন বিষয় নয়। আকরিক লোহা কিংবা পাথর খনি থেকে উত্তোলন করার পর মিনারেল ড্রেসিং প্রসেস করা হয়। এটা করার উদ্দেশ্য হলো মূল্যবান খনিজ পাথর থেকে ময়লা-আবর্জনা পরিষ্কার করা।

খনিজ সম্পদ বিভাগের উন্নয়নের স্বার্থে ইরান অপরিশোধিত খনিজ দ্রব্য বিক্রি বন্ধের ব্যবস্থা নেয়ার পাশাপাশি আকরিক লোহা থেকে বিচিত্র পণ্য উৎপাদনের চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে যাতে এই খাতে আয় বৃদ্ধি পায়। এই লক্ষ্যে ইরান এখন নিজেরাই কারখানায় আয়রন প্যালেটাইজিং এবং ডাইরেক্ট রিডিয়ুসড আয়রনের কাজ করছে। গুল গোহার ইরানের মধ্যে বিদ্যমান বৃহত্তম আকরিক লোহাগুলোর একটি। ইরানের দক্ষিণাঞ্চলের ফার্স প্রদেশে অবস্থিত এই খনিটি। এই খনিতে কার্যক্রমের ইতিহাস বেশ প্রাচীন। অন্তত ৯০০ বছর আগে থেকে এই খনি নিয়ে কাজ চলছে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন এক শ কোটি টনেরও বেশি আকরিক লোহার মজুদ রয়েছে এই খনিটিতে। এই খনিতে প্যালেটাইজিং এবং ডাইরেক্ট রিডিয়ুসড আয়রনের কাজ করে দেশের লোহার চাহিদা পূর্ণ করার চেষ্টা করা হয়েছে।

এভাবে আকরিক লোহা থেকে উৎপাদিত আরেকটি পণ্য সামগ্রী হলো আকরিক লোহার পাউডার। ইরানের কেন্দ্রিয় মরুভূমিতে অবস্থিত চদোরমালু খনি এমন একটি খনি যেখানে পাওয়া যায় পাউডারে রূপান্তরযোগ্য আকরিক লোহা। লোহা এবং স্টিল উৎপাদনের গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক উপাদান হলো আকরিক লোহা। খনি থেকে পাওয়া লোহার আকরিক থেকে বিশুদ্ধ লোহা বের করে নেয়া যায়। কিন্তু সেই লোহা ততটা মচবুত হয় না। ক্ষয়ে যাওয়ার সমস্যা থেকে যায়। তাই লোহার বদলে ইস্পাত ব্যবহার করা হয়। ইস্পাত হচ্ছে লোহা আর কার্বনের শংকর। লোহার সঙ্গে একটা নির্দিষ্ট পরিমাণ কার্বন মেশালে তার ধর্ম পাল্টে যায় এবং সেটি বেশ মজবুত হয়ে ওঠে। এ প্রক্রিয়ায় আকরিক লোহার খাদ যেমন সিলিকা, ফসফরাস, সালফার ইত্যাদি অপদ্রব্যাদি দূর করা যায়।
বলছিলাম লোহার সঙ্গে কার্বনের মিশ্রণে তৈরি হয় ইস্পাত। বিশ্বের শতকরা নব্বুই ভাগেরও বেশি খনিজ আকরিক লোহা ইস্পাত তৈরির কাজে ভ্যবহৃত হয়।লৌহ ধাতু যেহেতু একটু নরম এবং ক্ষয়ে যাবার শঙ্কামুক্ত নয় সেহেতু আকরিক লোহা থেকে অপ্রয়োজনীয় খাদগুলো দূর করে তার সঙ্গে কার্বনের পাশাপাশি ক্রোমিয়াম, কপার, ম্যাঙ্গানিজ, সিলিকন ইত্যঅদি মেশানো হয়। এগুলোর মিশ্রণে ইস্পাত হয়ে ওঠে শক্ত, মজবুত ও টেকসই। বিশ্বের বর্তমান মেশিনারি প্রযুক্তির মৌলিক উপাদানই হলো লোহা কিংবা তার শংকর ধাতু ইস্পাত সামগ্রী। গৃহনির্মাণ,সেতু নির্মাণ, গাড়ি, জাহাজ, রেলগাড়ি কিংবা রেলগাড়ির ইঞ্জিন তৈরি ইত্যাদি সকল কাজে এই লোহা এবং ইস্পাত সামগ্রী ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হচ্ছে।
کارخانه سنگ آهن چادرملو- یزد
کارخانه سنگ آهن گل گهر- بافق
کارخانه سنگ آهن بافق- یزد
مجتمع سنگ آهن فلات مرکزی ایران
معدن سنگ آهن جلال آباد زرند- کرمان
مجتمع فولاد مبارکه
کارخانجات نورد و پروفایل ساوه
مجتمع فولاد صنعت بناب
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যাপার হলো এইসব ধাতু পরিবেশবান্ধব। এ কারণে আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলোর পক্ষ থেকে ইস্পাত উৎপাদন বৃদ্ধির ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। আগামি কয়েক দশকে এর ব্যবহার আরও বাড়বে। স্বাভাবিকভাবেই ইস্পাত ও লোহা শিল্পে বিনিয়োগের ব্যাপারে বিভিন্ন দেশ এবং কোম্পানি ব্যাপক আগ্রহী হয়ে উঠেছে। ইরানেও তাই ইস্পাত তৈরির কারখানা ব্যাপক বৃদ্ধি পেয়েছে। ইরান এখন ইস্পাতের ক্ষেত্রে নিজেদের অভ্যন্তরীণ চাহিদা মিটিয়ে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশসহ আফ্রিকা ও ইউরোপের বিভিন্ন দেশেও রপ্তানি করছে। #
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ২৫
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন