ইরানের পণ্য-সামগ্রী: ইরানের পাথরের খনিগুলোতে রয়েছে মূল্যবান রত্নপাথর
আপনারা জানেন যে, ইরানের জলে-স্থলে, ক্ষেত-খামারে, বাগ-বাগিচায়, কল-কারখানায় উৎপাদিত হয় বিচিত্র সামগ্রী। এর পাশাপাশি খনি থেকে উৎপন্ন বিভিন্ন সামগ্রী এবং ইরানি নরনারীদের মেধা ও মনন খাটিয়ে তৈরি করা হয় বিভিন্ন শিল্পপণ্য। গত আসরে আমরা ইরানের গুরুত্বপূর্ণ খনিজ ধাতু মূল্যবান সব পাথর নিয়ে কথা বলেছি।
الماس دریای نور
الماس کوه نور
کره جواهر نشان
تخت طاووس
تاج کیانی
রত্নবিদরা ইরানকে নাম দিয়েছেন 'গুপ্ত বেহেশত'। কারণ এখানকার মাটি আর সমুদ্রের নীচে লুকিয়ে আছে এমন সব মহামূল্যবান রত্ন যার জাকজমক বেহেশতের কথাই কল্পনায় নিয়ে আসে। গত আসুর আমরা তুলনামূলকভাবে মূল্যবান পাথরের সঙ্গে আপনাদের পরিচয় করিয়ে দিয়েছিলাম। মূল্যবান পাথরের শ্রেণীতে পড়েছে হীরা, লাল ইয়াকুত, নীল ইয়াকুত, পান্না ইত্যাদি পাথরগুলো। এইসব পাথর যেহেতু দুর্লভ সেজন্য এগুলোর মূল্য স্বর্ণের মতোই মূল্যবান। হীরা হলো সর্বাপেক্ষা মূল্যবান একটি রত্ন যা গহনা তৈরিতে বহুলভাবে ব্যবহার করা হয়। বর্ণহীন এই রত্নটি একটি মাত্র বিশুদ্ধ উপাদান কার্বন থেকে সৃষ্ট। অন্যভাবে বলা যেতে পারে হীরা কার্বনেরই একটি বিশেষ রূপ মাত্র। লাল ইয়াকুত বা চুনি এবং নীল ইয়াকুত বা চুনির ক্ষেত্রেও একই কথা প্রযোজ্য অর্থাৎ এগুলোও বেশ মূল্যবান পাথর। তবে প্রবাল তুলনামূলকভাবে হীরার মতো মূল্যবান নয়। আজকের আসরে আমরা হীরার তুলনায় কম মূল্যবান পাথর নিয়ে কথা বলার চেষ্টা করবো।
استفاده از سنگ فیروزه در جواهرات ایران باستان
استفاده از سنگ ها در جواهرات دوره هخامنشی
استفاده از سنگ ها در جواهرات دوره اشکانیان
استفاده از سنگ ها در جواهرات دوره ساسانی
অর্ধ-উচ্চমূল্যবান পাথরের বেশিরভাগই হলো কোয়ার্টয বা স্ফটিক শ্রেণীর। আকিক পাথর, ফিরোজা পাথর, অ্যাম্বার পাথর, নীলা পাথর, পান্না পাথর, দিলরুবা পাথর, ইয়ামনি পাথর, পীত পাথর, ইয়াশ্ম বা গ্রিন জ্যাসফার স্টোন, ব্ল্যাক অ্যাম্বার স্টোন এবং পোখরাজ পাথর ইত্যাদি তুলনামূলকভাবে কম দামী পাথরের অন্তর্ভুক্ত। অবশ্য মূল্যমান নির্ভর করে পাথরের প্রকার, তার সৌন্দর্য, স্থায়িত্ব, প্রতিরোধ শক্তি, ঔজ্জ্বল্য, সাইজ, প্রাচুর্য, কাটার সুবিধা ইত্যাদির ওপর। নভোনীল বা স্কাই ব্লু পাথর এবং গ্রিন ম্যালাকাইট পাথরের মতো অর্ধ-উচ্চমূল্যবান পাথরের সৌন্দর্যের কারণে এগুলোর মূল্য অনেক সময় বেড়ে গিয়ে উচ্চমূল্যবান পাথরের পর্যায়ে চলে যায়। এ কারণে ব্যবসার ক্ষেত্রে উচ্চ মূল্যবান ও অর্ধ-উচ্চমূল্যবান পাথরের পরিভাষাগুলো ব্যবহৃত হতে হতে মহামূল্যবান পাথরের জাঁকজমক অনেকটা ফ্যাকাশে হয়ে গেছে।

গত কয়েক দশকে অবশ্য জুয়েলারি বিদ্যার জগতে ব্যাপক উন্নয়ন ও অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। সেইসঙ্গে রত্ন ভাঙা বা কাটার প্রযুক্তিসহ রত্ন উত্তোলন ও সেগুলোকে ব্যবহারযোগ্য করে তোলার কারিগরি উন্নয়ন ঘটেছে চোখে পড়ার মতো। এসব বিচিত্র কারণে বিশ্বব্যাপী দামি পাথরের ব্যবসা ও ব্যবহারের প্রবণত অনেক বেড়ে গেছে। কোনো কোনো দেশের অর্থনীতি তো সরাসরি এই রত্ন ব্যবসার উপরই নির্ভরশীল। বছরে হাজার হাজার কোটি ডলার বিশ্ব রত্ন বাজারে নগদ আদান প্রদান বা লেনদেন হয়। মূল্যবান রত্নগুলোর বেশকিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে। এসব পাথর অলংকার নির্মাণের ক্ষেত্রে ব্যবহার করা ছাড়াও টেলিস্কোপ নির্মাণ, মেডিক্যাল ইকুইপমেন্টস তৈরি, পরমাণু প্রযুক্তি এবং ন্যানো টেকনোলজিসহ আরও বহু স্পর্শকাতর শিল্পে ব্যবহার করা হয়। জেম থেরাপিতেও এগুলোর ব্যবহার রয়েছে। জেম থেরাপি বিশ্বব্যাপী স্বীকৃত একটি প্রাচীন চিকিৎসা পদ্ধতি।
الماس صورتی
انگشتر یاقوت سرخ
یاقوت کبود
زمرد
ইরানে একটি স্বতন্ত্র প্রতিষ্ঠান রয়েছে "ভূবিদ্যা ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন সংস্থা" নামে। নাম থেকেই এই প্রতিষ্ঠানের কাজ কী-তা অনুমান করা যায়। হাঁ, খনিজ সম্পদ সংক্রান্ত তথ্য সংগ্রহ এবং সর্বপ্রকার খনিজ সম্পদ আবিষ্কার ও উত্তোলন এই সংস্থার কর্মপরিধির মধ্যে পড়ে। অন্তত পঞ্চাশ বছর ধরে এই সংস্থা তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে। সংস্থাটির অভিজ্ঞতা, প্রযুক্তিগত সামর্থ্য যোগ্যতা অনেক উন্নত ও উঁচু পর্যায়ের। সেইসঙ্গে এই সংস্থায় কর্মতৎপর রয়েছে বিশেষজ্ঞ ও নিপুণ গবেষকদল। এদিক থেকে তাই বিশ্বের আটটি বৃহৎ ও গুরুত্বপূর্ণ সংস্থার একটি এখন ইরানের এই খনিজ সম্পদ উত্তোলন সংস্থা। মধ্যপ্রাচ্য অঞ্চলের জন্য তো বটেই এই সংস্থা সমগ্র বিশ্বের জন্যই সিসমো টেকটোনিক মানচিত্র তৈরি করতে সক্ষম হয়েছে।
ইরানের ভূ-তত্ত্ববিদ্যা ও খনিজ সম্পদ উত্তোলন সংস্থা মূল্যবান খনিজ পাথরের খনি নিয়ে ব্যাপক কার্যক্রম ও তৎপরতা চালিয়েছে। তাদের গবেষণায় জানা গেছে অন্তত চল্লিশ প্রকারের মূল্যবান রত্নপাথর রয়েছে ইরানের খনিগুলোতে। সুতরাং বিশ্ব রত্ন মজুদের দিক থেকে ইরানের গুরুত্ব অপরিসীম। ইরানের বিভিন্ন প্রদেশে ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে এসব রত্নের খনিজ ভাণ্ডার। যেমন কোম প্রদেশ, খোরাসান প্রদেশ, কেরমান প্রদেশ, হামেদান প্রদেশ, ইস্ফাহান প্রদেশ, সেমনান ও কুর্দিস্তান প্রদেশে এইসব মূল্যবান রত্ন,পাথরের খনি রয়েছে। এগুলোর মধ্যে দুটি খনি জাতীয় ঐতিহ্যের তালিকাভুক্ত হওয়ায় এগুলোর মূল্য ও গুরুত্ব অনেক বেশি। এই দুটি খনি হলো কোমের আকিক পাথরের খনি আর নিশাবুরের ফিরোজা পাথরের খনি। মজার ব্যাপার হলো এই দুটি পাথরের আধ্যাত্মিক মূল্য রয়েছে ইসলামি সংস্কৃতিতে।
سنگ عقیق
سنگ فیروزه
سنگ آمتیست
سنگ کهربا
سنگ آکوامارین
سنگ دلربا
سنگ یمانی
سنگ یشم
کهربای سیاه
পাথরের আধ্যাত্মিক মূল্য নিয়ে কথা বলছিলাম আমরা। ধর্মীয় ব্যক্তিত্ববর্গ ও মনীষীদের বর্ণনা থেকে জানা যায় তাঁরা মুসলমানদেরকে ফিরোজা ও আকিক পাথর ব্যবহার করার পরামর্শ দিয়েছেন। যেমনটি পাওয়া হযরত ইমাম জাফর সাদেক (আ) এর বর্ণনা থেকে। তিনি বলেছেন: আকিক পাথরের আংটি পরো। কেননা এই পাথর পবিত্র। আকিক পাথরের আংটি যে পরবে তার জন্য সৌভাগ্য ও মঙ্গল রয়েছে বলে আশা করা যায়। কোমের আকিক পাথরের খনি মূল্যবান এই পাথরের জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এখানে ৫ হাজার টনের বেশি আকিক পাথরের মজুদ রয়েছে বলে মনে করা হয়। এ পর্যন্ত ৮০ রঙের আকিক পাথর পাওয়া গেছে এখানকার খনিতে।
فیروزه نیشابور؛ از معدن تا نگین انگشتر
অপর মূল্যবান পাথর হলো ফিরোজা। উজ্জ্বল নীল থেকে সবুজ রঙের এই পাথরের খনি ইরানের নিশাবুর, খোরাসানে রাজাভি, দক্ষিণ খোরাসান, কেরমান, ইয়াযদ এবং সেমনান প্রদেশে অবস্থিত। তবে শ্রেষ্ঠ ও বিখ্যাত ফিরোজা পাথর হলো নিশাবুরের। পার্সিয়ান কোয়ালিটি একটি পরিভাষা। এই পরিভাষাটি নিশাবুরি ফিরোজা পাথরের ক্ষেত্রেই ব্যবহার করা হয়। বিশ্বব্যাপী এই নিশাবুরি পাথরের খ্যাতি রয়েছে। খোরাসানে রাজাভি প্রদেশের একটি শহর হলো নিশাবুর। আর কেন্দ্রিয় শহরের নাম মাশহাদ। এই ফিরোজা পাথরের কারণে মাশহাদ শহরটি বিশ্ব শহরের মর্যাদা পেয়েছে। কেননা ওয়ার্ল্ড ক্রাফ্টস কাউন্সিল এই শহরকে ফিরোজা পাথরের মতো মূল্যবান পাথরের জন্য 'বিশ্ব শহর' হিসেবে নির্বাচন করেছে।#
পার্সটুডে/নাসির মাহমুদ/ মো:আবু সাঈদ/ ৩০
খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন