সূরা সাবা: আয়াত ৩১-৩৩ (পর্ব-৮)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ৩১ থেকে ৩৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ৩১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا لَنْ نُؤْمِنَ بِهَذَا الْقُرْآَنِ وَلَا بِالَّذِي بَيْنَ يَدَيْهِ وَلَوْ تَرَى إِذِ الظَّالِمُونَ مَوْقُوفُونَ عِنْدَ رَبِّهِمْ يَرْجِعُ بَعْضُهُمْ إِلَى بَعْضٍ الْقَوْلَ يَقُولُ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لَوْلَا أَنْتُمْ لَكُنَّا مُؤْمِنِينَ (31)
“যারা কাফের তারা বলে, আমরা কখনও এ কোরআনে বিশ্বাস করব না এবং এর পূর্ববর্তী কিতাবেও নয়। আপনি যদি পাপিষ্ঠদেরকে দেখতেন, যখন তাদেরকে তাদের পালনকর্তার সামনে দাঁড় করানো হবে, (আপনি অবাক হয়ে যাবেন এটা দেখে যে) তখন তারা পরস্পর কথা কাটাকাটি করবে (এবং একে অপরের ওপর দোষ চাপানোর চেষ্টা করবে)। যাদেরকে দুর্বল মনে করা হত, তারা অহংকারীদেরকে বলবে, তোমরা না থাকলে আমরা অবশ্যই মুমিন হতাম।” (৩৪:৩১)
গত আসরে আমরা কিয়ামতের দিন মুমিন ও কাফির ব্যক্তিদের অবস্থান বর্ণনা করেছি। সে আলোচনার ধারাবাহিকতায় আজকের এ আয়াতে বলা হচ্ছে: আসমানি গ্রন্থগুলোতে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদ ও পরকাল সম্পর্কে যেসব কথা বলা হয়েছে কাফেররা তার সবকিছুই প্রত্যাখ্যান করে। কোনো অবস্থাতেই তারা এসব মেনে নিতে রাজি নয়। তাদের সামনে যতই দ্বীনের কথা বলা হোক না কেন, তারা আগে থেকেই সিদ্ধান্ত নিয়ে রেখেছে যে, সত্য গ্রহণ করবে না। তাদের উদাহরণ ঘুমের ভান করে থাকা ব্যক্তির মতো যাকে যতই ডাকাডাকি করা হোক না কেন সে জেগে ওঠে না।
আয়াতের পরবর্তী অংশে বলা হচ্ছে, কিন্তু এই পাপিষ্ঠ ব্যক্তিরা- যারা দুনিয়াতে গোঁড়ামি ও হঠকারিতার কারণে সত্য গ্রহণ করেনি তারা কিয়ামতের দিন মানতে চাইবে না যে, সত্য গ্রহণ না করার জন্য তারা নিজেরাই দায়ী। তার বরং এই অপরাধ অন্যের ওপর চাপানোর চেষ্টা করবে। তখন সাধারণ মানুষ তাদের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিদেরকে বলবে, তোমরাই আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছ। তা না হলে আমরা দুনিয়াতেই ঈমান আনতাম এবং আজকের এই পরিণতি হতো না। কিন্তু সেদিনের এই বক্তব্য তাদের কোনো কাজে আসবে না। কারণ দুনিয়াতে তারা যাদেরকে অনুসরণ করেছে সেদিন তারাও জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় কয়েকটি দিক হচ্ছে:
১. সত্যের বিরুদ্ধে একগুঁয়েমি অবস্থান নিলে মানুষ কাফেরে পরিণত হয়। এ ধরনের মানুষকে আল্লাহ সৎপথ দেখান না।
২. সব ঐশী গ্রন্থে এক আল্লাহর একত্ববাদের দিকে আহ্বান করা হয়েছে। কাফেররা এসব গ্রন্থের কোনোটির প্রতিই ঈমান আনে না।
৩. কুফর, শিরক ও ধর্মহীনতা নিজের পাশাপাশি নবী-রাসূলদের প্রতি এক ধরনের জুলুম।
৪. কিয়ামতের দিন মানুষের মুক্তি ও জান্নাত লাভের মাধ্যম হবে ঈমান।
সূরা সাবা’র ৩২ ও ৩৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
قَالَ الَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا لِلَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا أَنَحْنُ صَدَدْنَاكُمْ عَنِ الْهُدَى بَعْدَ إِذْ جَاءَكُمْ بَلْ كُنْتُمْ مُجْرِمِينَ (32) وَقَالَ الَّذِينَ اسْتُضْعِفُوا لِلَّذِينَ اسْتَكْبَرُوا بَلْ مَكْرُ اللَّيْلِ وَالنَّهَارِ إِذْ تَأْمُرُونَنَا أَنْ نَكْفُرَ بِاللَّهِ وَنَجْعَلَ لَهُ أَنْدَادًا وَأَسَرُّوا النَّدَامَةَ لَمَّا رَأَوُا الْعَذَابَ وَجَعَلْنَا الْأَغْلَالَ فِي أَعْنَاقِ الَّذِينَ كَفَرُوا هَلْ يُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كَانُوا يَعْمَلُونَ (33)
“(কিন্তু সেদিন) অহংকারীরা দুর্বলদেরকে বলবে, তোমাদের কাছে হেদায়েত আসার পর আমরা কি তোমাদেরকে বাধা দিয়েছিলাম? (মোটেই নয়) বরং তোমরাই তো ছিলে অপরাধী।” (৩৪:৩২)
“(তখন) দুর্বলরা অহংকারীদেরকে বলবে, বরং তোমরাই তো দিবারাত্রি চক্রান্ত করে আমাদেরকে নির্দেশ দিতে যেন আমরা আল্লাহকে না মানি এবং তাঁর অংশীদার সাব্যস্ত করি। তারা যখন শাস্তি দেখবে, তখন মনের অনুশোচনা গোপন রাখবে। বস্তুতঃ আমি কাফেরদের গলায় ডাণ্ডাবেড়ী পরাব। তারা যা করত তা ছাড়া তাদেরকে কি অন্য কোনো প্রতিফল দেয়া যায়?” (৩৪:৩৩)
এই দুই আয়াতে কয়েকবার দুর্বল ও অহংকারী শব্দ দু’টি ব্যবহার করা হয়েছে। ধারণা করা যায়, এখানে দুর্বল বলতে তাদেরকে বোঝানো হয়েছে, যারা কোনোরকম চিন্তাভাবনা ও বিচারবুদ্ধিকে কাজে লাগানো ছাড়াই চোখ-কান বন্ধ করে অন্যদেরকে অনুসরণ করে। অন্যদিকে অহংকারী তাদেরকে বলা হচ্ছে, যারা তাদের ধন-সম্পদ ও ক্ষমতাকে অন্যদের ওপর প্রভাব বিস্তারের কাজে ব্যবহার করে তাদেরকে নিজেদের খেয়ালখুশি মতো পরিচালিত করেছে।
একথা সত্যি যে, অহংকারীরা সাধারণ মানুষকে তাদের অনুসরণ করতে বাধ্য করেনি। তারা বরং নানা ধরনের প্রচারযন্ত্র ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে ব্যবহার করে নিজেদের শিরক-মিশ্রিত চিন্তাধারা এমন আকর্ষণীয়ভাবে মানুষের সামনে তুলে ধরেছে যে, কিছু মানুষ আল্লাহ ও তার রাসূলের শিক্ষা বাদ দিয়ে সেই দৃষ্টিনন্দন প্রচারণার মোহে আকৃষ্ট হয়েছে। তারা ধর্মীয় শিক্ষাকে সেকেলে মনে করে কথিত আধুনিকতাকে বেছে নিয়েছে। এই কথিত আধুনিক জীবন অনুসরণ করলে মানুষ তাৎক্ষণিক ঋপুর চাহিদা পূরণ করতে পারে এবং ক্ষণিকের জন্য ভোগলালসায় লিপ্ত থাকা যায়। কারণ, অহংকারীদের প্রদর্শিত এই পথ অনুসরণ করলে চোখ, কান বা জিহ্বা’র কোনোটিকেই নিয়ন্ত্রণের প্রয়োজন হয় না;যা খুশি তাই করা যায়। কিন্তু এই আয়াতে কিয়ামতের দিন এই দুই দল মানুষের মধ্যকার বিবাদের যে চিত্র তুলে ধরা হয়েছে তা থেকে বোঝা যায়, পরস্পরের কাঁধে দোষ চাপিয়ে সেদিন এদের কেউ পার পাবে না। মানুষ যত স্বল্পশিক্ষিত বা মূর্খই হোক না কেন তাকে লাগামহীন ভোগবিলাস ও লালসা চরিতার্থ করার অনুমতি দেয়া হয়নি; বরং তার ভেতরেই আল্লাহ তায়ালা যে বিবেক ও বিচারবুদ্ধি দিয়ে দিয়েছেন তা কাজে লাগিয়ে তাকে পবিত্র জীবনযাপন করতে হবে। কিন্তু মানুষ যখন বারবার বিবেকের ডাককে অস্বীকার করে তখন বিবেক আর তাকে ভালো কাজের দিকে আহ্বান করে না। বিবেকের এই ঘুমন্ত অবস্থায় একজন মানুষের পক্ষে যা খুশি তাই করা সম্ভব।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. একটি নষ্ট সমাজ মানুষের জীবনে ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেললেও তাকে খারাপ কাজ ও বেপরোয়া জীবনযাপনে বাধ্য করতে পারে না। কাজেই কিয়ামতের দিন কেউ নিজের পাপের বোঝা অন্যের ওপর চাপাতে পারবে না।
২. নবী-রাসূলের শিক্ষা পৌঁছার পরও যে তা অনুসরণ করবে না কিয়ামতের দিন তাকে মারাত্মক পরিণতি ভোগ করতে হবে।
৩. অর্থ ও ক্ষমতার অধিকারী ব্যক্তিরা তাদের চাল-চলন ও চিন্তাধারা সমাজের সবার মধ্যে ছড়িয়ে দিতে দিনরাত এমনভাবে চেষ্টা চালায় যাতে মানুষ আল্লাহর কথা চিন্তা করার সুযোগ না পায়।
৪. পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের কাজ হলো অন্যদেরকেও পথভ্রষ্ট হতে উৎসাহিত করা। এ ধরনের মানুষকে অনুসরণ করলে কিয়ামতের দিন নির্ঘাত জাহান্নামই হবে একমাত্র ঠিকানা।#