সূরা সাবা: আয়াত ৪৮-৫৪ (পর্ব-১৩)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠান 'কুরআনের আলো'র আজকের পর্বে সূরা সাবার ৪৮ থেকে ৫৪ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা শুরু হবে। এই সূরার ৪৮ ও ৪৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ إِنَّ رَبِّي يَقْذِفُ بِالْحَقِّ عَلَّامُ الْغُيُوبِ (48) قُلْ جَاءَ الْحَقُّ وَمَا يُبْدِئُ الْبَاطِلُ وَمَا يُعِيدُ (49)
“বলুন, আমার পালনকর্তা সত্য দ্বীন অবতরণ করেছেন। তিনি গায়েবের খবর (এবং গোপন রহস্য) সম্পর্কে অবগত।” (৩৪:৪৮)
“বলুন, সত্য আগমন করেছে এবং অসত্য না পারে নতুন কিছু সৃজন করতে এবং না পারে পুনঃ প্রত্যাবর্তিত হতে।” (৩৪:৪৯)
আগের কয়েকটি আয়াতে রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর নবুওয়্যাতের পক্ষে প্রমাণ তুলে ধরার পর এই আয়াতে বলা হচ্ছে: যে আল্লাহ সব মানুষের অন্তরের খবর রাখেন তিনি জানেন কার অন্তর ঐশী বার্তা গ্রহণের জন্য উপযুক্ত। এ কারণে তিনি বিশ্বনবী (সা.)কে নিজের প্রেরিত পুরুষ হিসেবে মনোনিত করেছেন এবং কুরআনের আয়াতগুলো তাঁর অন্তরে নাজিল করেছেন যাতে তিনি তা মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে পারেন। মহানবীর রিসালাতের মাধ্যমে মানুষের কাছে মহাসত্য পৌঁছে যায় এবং প্রমাণিত হয়, আল্লাহ ছাড়া আর সব কিছু ভ্রান্ত শক্তি। কাফের ও মুশরিকরা যেসব ব্যক্তি বা বস্তুকে আল্লাহর স্থানে বসায় তাদের যেমন কোনো কিছু সৃষ্টি করার ক্ষমতা নেই তেমনি যা কিছু ধ্বংস হয়ে গেছে তাও তারা ফিরিয়ে আনতে পারে না। কাজেই কুফর ও শিরক হচ্ছে ভ্রান্ত বিশ্বাস এবং মহান আল্লাহর সামনে প্রতিরোধ করার বা টিকে থাকার শক্তি এগুলোর নেই। অবশ্য যতক্ষণ মানুষের সামনে সত্য উন্মোচিত না হয় ততক্ষণ ভ্রান্ত শক্তিগুলো মানুষকে প্রতারণা করতে থাকে। কিন্তু ভ্রান্ত শক্তির চাকচিক্য ক্ষণস্থায়ী এবং সত্য আসার সঙ্গে সঙ্গে তা ধ্বংস হয়ে যায়।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. মহান আল্লাহ হচ্ছেন সত্য এবং তার পক্ষ থেকে যা কিছু অবতীর্ণ হয় তার সত্যতা সুনিশ্চিত। সত্য ও মিথ্যার পার্থক্যকারী হিসেবে কুরআনের আয়াতই যথেষ্ট।
২. মিথ্যার বিরুদ্ধে সত্যের জয় অবশ্যম্ভাবী এবং সার্বিক বিচারে মিথ্যা বা বাতিলের পক্ষে কোনো কিছু করা সম্ভব নয়।
সূরা সাবার ৫০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
قُلْ إِنْ ضَلَلْتُ فَإِنَّمَا أَضِلُّ عَلَى نَفْسِي وَإِنِ اهْتَدَيْتُ فَبِمَا يُوحِي إِلَيَّ رَبِّي إِنَّهُ سَمِيعٌ قَرِيبٌ (50)
“বলুন, আমি পথভ্রষ্ট হলে নিজের ক্ষতির জন্যেই পথভ্রষ্ট হব; আর যদি আমি সৎপথ প্রাপ্ত হই, তবে তা এ জন্যে যে, আমার পালনকর্তা আমার প্রতি ওহী প্রেরণ করেন। নিশ্চয় তিনি নিকটবর্তী সর্বশ্রোতা।” (৩৪:৫০)
এই আয়াতে আল্লাহ তায়লা তাঁর নবীকে মানুষের উদ্দেশে একথা বলার নির্দেশ দেন যে, এমনকি আমি যে নবী হয়েছি তা আল্লাহর ওহীপ্রাপ্ত হওয়ার মাধ্যমেই সম্ভব হয়েছে। যদি ওহী না থাকত তাহলে আমিও তোমাদের মতোই পথভ্রষ্ট থাকতাম।
অবশ্য আকল বা বিবেকও মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি রহমত বা দয়া। কিন্তু ওহীর আলো না থাকলে বিবেক সঠিক পথ অনুসন্ধান করতে গিয়ে মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করতে পারে।
এ আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হলো:
১. মানুষের সঠিক পথে থাকা বা পথভ্রষ্ট হওয়ার উপকার বা ক্ষতি অন্যের আগে তার নিজের ওপর পড়ে।
২. আল্লাহ তায়ালা নিজে মানুষকে সৃষ্টি করেছেন বলে তিনি মানুষের সব প্রয়োজন সম্পর্কে জানেন এবং সৃষ্টির সঙ্গে তার কোনো দূরত্ব নেই।
এই সূরার ৫১ ও ৫২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন,
وَلَوْ تَرَى إِذْ فَزِعُوا فَلَا فَوْتَ وَأُخِذُوا مِنْ مَكَانٍ قَرِيبٍ (51) وَقَالُوا آَمَنَّا بِهِ وَأَنَّى لَهُمُ التَّنَاوُشُ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ (52)
“যদি আপনি দেখতেন, যখন (কাফের ও মুশরিকরা) ভীতসস্ত্রস্ত হয়ে পড়বে, অতঃপর পালিয়েও বাঁচতে পারবে না এবং নিকটবর্তী স্থান থেকে ধরা পড়বে।” (৩৪:৫১)
“এবং তারা বলবে, আমরা সত্যে বিশ্বাস স্থাপন করলাম। কিন্তু তারা এতদূর থেকে তার (অর্থাৎ ঈমানের) নাগাল পাবে কেমন করে?” (৩৪:৫২)
এই দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা মহানবী (সা.)কে জানিয়ে দিচ্ছেন, এমন একদিন আসবে যেদিন কাফের ও মুশরিকরা তাদের কৃতকর্মের জন্য অনুতপ্ত হয়ে আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে। কিন্তু জাহান্নামের আজাব চোখে দেখার পর আনা ঈমান কোনো কাজে আসবে না।
এ ছাড়া, দুনিয়া ও আখেরাতের জীবনে কোনো অপরাধীর পক্ষে আল্লাহর আয়ত্বের বাইরে যাওয়া সম্ভব নয়। আল্লাহ নিজে যেমন মানুষের অতি নিকটবর্তী তেমনি সৎকর্মশীল ও পাপাচারী ব্যক্তিদের পুরস্কার ও শাস্তিও অতি নিকটে রয়েছে।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. পার্থিব জীবনে পথভ্রষ্ট অবস্থা থেকে ঈমানের পথে ফিরে আসার সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কিয়ামতের দিন এই সুযোগ বন্ধ হয়ে যাবে।
২. আল্লাহর ক্রোধ ও আজাব মোটেই দূরে নয়। যেকোনো সময় যেকোনো স্থানে তা মানুষকে পাকড়াও করতে পারে।
সূরা সাবার শেষ দুই আয়াত অর্থাৎ ৫৩ ও ৫৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে:
وَقَدْ كَفَرُوا بِهِ مِنْ قَبْلُ وَيَقْذِفُونَ بِالْغَيْبِ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ (53) وَحِيلَ بَيْنَهُمْ وَبَيْنَ مَا يَشْتَهُونَ كَمَا فُعِلَ بِأَشْيَاعِهِمْ مِنْ قَبْلُ إِنَّهُمْ كَانُوا فِي شَكٍّ مُرِيبٍ (54)
“অথচ তারা পূর্ব থেকে সত্যকে অস্বীকার করছিল। আর তারা সত্য হতে দূরে থেকে অজ্ঞাত বিষয়ের উপর মন্তব্য করত।” (৩৪:৫৩)
“তাদের ও তাদের বাসনার মধ্যে অন্তরাল হয়ে গেছে, যেমন- অতীতে তাদের সতীর্থদের সাথেও এরূপ করা হয়েছে। তারা ভয়ঙ্কর সন্দেহে লিপ্ত ছিল।” (৩৪:৫৪)
এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: আজ যারা আল্লাহর আজাব দেখে মুখে ঈমান আনছে তারা পার্থিব জীবনে কুরআন ও মহানবীর রিসালাতকে অস্বীকার করত। তারা কোনো কারণ ছাড়াই সন্দেহবশতঃ উল্টোপাল্টা কথা বলত এবং পরকালীন জীবনকে অস্বীকার করত। পার্থিব জীবনে তারাই কিয়ামতকে অস্বীকার করে যারা ভোগবিলাস ও ঋপুর চাহিদা পূরণে ব্যস্ত। কিন্তু মৃত্যু একদিন তাদের এই ভোগবিলাসী জীবনের ইতি ঘটিয়ে দেবে। তাদের পূর্বেও বহু কাফের জাতি তাদের লালসা চরিতার্থ করতে না পেরেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে।
সূরার শেষ আয়াতে কাফেরদের সব সংকটের মূলে তাদের অমূলক সন্দেহ ও সংশয়কে দায়ী করা হয়েছে। মানুষের জীবনে নানা বিষয়ে নানা কারণে সন্দেহ আসতেই পারে। কিন্তু চিন্তা ও গবেষণা করে সে সন্দেহ দূর করাটা বুদ্ধিমানের কাজ। শুধুমাত্র একথা বলে আল্লাহর কাছে পার পাওয়া যাবে না যে, এই ব্যক্তি যে নবী ছিল এবং তার কাছে যে ওহী আসত সে ব্যাপারে আমি সন্দিহান ছিলাম।
এ দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ভোগবিলাস ও রিপুর চাহিদা পূরণ ক্ষণস্থায়ী বিষয়। এর পরিবর্তে আমাদেরকে আখেরাতের স্থায়ী সুখের চিন্তা করতে হবে।
২. আমাদেরকে চিন্তা ও গবেষণা করে একবারের জন্য নিজেদের চলার পথ বাছাই করে নিতে হবে। কারণ, সারাজীবন কুরআন ও কিয়ামতের ব্যাপারে সন্দেহে ভুগতে থাকলে তার ক্ষতিপূরণ করা সম্ভব হবে না। #