সূরা আস-সাফফাত: আয়াত ৭-১১ (পর্ব-২)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ৭ থেকে ১১ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৭ থেকে ১০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَحِفْظًا مِنْ كُلِّ شَيْطَانٍ مَارِدٍ (7) لَا يَسَّمَّعُونَ إِلَى الْمَلَإِ الْأَعْلَى وَيُقْذَفُونَ مِنْ كُلِّ جَانِبٍ (8) دُحُورًا وَلَهُمْ عَذَابٌ وَاصِبٌ (9) إِلَّا مَنْ خَطِفَ الْخَطْفَةَ فَأَتْبَعَهُ شِهَابٌ ثَاقِبٌ (10)
“এবং (তাকে) সংরক্ষিত করেছি প্রত্যেক অবাধ্য শয়তান থেকে।”(৩৭:৭)
“ওরা উর্ধ্ব জগতের (গোপন) কোন কিছু শ্রবণ করতে পারে না এবং চার দিক থেকে তাদের ওপর হামলা করা হয়।” (৩৭:৮)
“ওদেরকে বিতাড়নের উদ্দেশ্যে। ওদের জন্যে রয়েছে বিরামহীন শাস্তি।” (৩৭:৯)
“তবে কেউ ছোঁ মেরে কিছু শুনে ফেললে জ্বলন্ত উল্কাপিন্ড তার পশ্চাদ্ধাবন করে।” (৩৭:১০)
গত আসরে আমরা বলেছি, আল্লাহ তায়ালা তারকারাজি দিয়ে আকাশকে সুশোভিত করেছেন এবং ভূপৃষ্ঠের অধিবাসীরা সেই তারকারাজি দেখে চিত্তসুখ লাভ করে। আর আজকের এই আয়াতগুলোতে মহাকাশের আরেকটি কার্যকারিতার প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: শয়তানরা আসমানের ফেরেশতাদের কথাবার্তা ও ঘটনাবলী জানার চেষ্টা করে। তারা ফেরেশতাদের কথাবার্তা আগে থেকে জেনে তার বিপরীত কাজ করতে চায়। এখানে জেনে রাখা প্রয়োজন যে, ভূপৃষ্ঠের ঘটনাবলী সম্পর্কে সব খবর ও তথ্য ফেরেশতাদের কাছে পৌঁছে যায় এবং তারা আসমানে বসে সেসব ঘটনাবলী নিয়ে নিজেদের মধ্যে আলাপ-আলোচনা করে। এই গায়েব বা অজানা তথ্য জানার জন্য শয়তানদের মনে প্রচণ্ড কৌতুহল রয়েছে। তারা কান পেতে আসমানের সেসব খবর জানার চেষ্টা করে। কিন্তু তারা যখনই আসমানের প্রান্তসীমা বা শয়তানের জন্য নিষিদ্ধ সীমার কাছে পৌঁছে যায় তখনই তাদেরকে হামলা করে তাড়িয়ে দেয়া হয়।
এই আয়াতের মাধ্যমে মানব জাতিকে একপ্রকার সুসংবাদ দিয়েছেন আল্লাহ তায়ালা। জিনদের মধ্যে যারা অবাধ্য, যাদেরকে আমরা শয়তান বলি তাদেরকে মহান আল্লাহর সৃষ্টিজগত পরিচালনার কেন্দ্র অর্থাৎ ফেরেশতাদের জগতের ধারেকাছে পৌঁছানোর সুযোগ দেয়া হয়নি। শয়তানরা কখনোই ফেরেশতাদের কথা শুনতে বা তাদের কাজে হস্তক্ষেপ করতে পারবে না। পরের আয়াতে বলা হচ্ছে, এমনকি যদি কোনো শয়তান কিছু বাধা অতিক্রম করে ফেরেশতাদের জগতের কাছাকাছি পৌঁছানোর চেষ্টা করে তখন তাকে হামলা করে মেরে ফেলা হয়। সূরা হিজরের ১৭ ও ১৮ নম্বর আয়াত এবং সূরা মুলকের পাঁচ নম্বর আয়াতেও একই ধরনের বক্তব্য রয়েছে।
তবে মুফাসসিরগণ মনে করেন, এই আয়াতগুলোতে যেসব বক্তব্য রয়েছে সেগুলোকে সরাসরি অর্থে গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহ তায়ালা এসব শব্দ ও বক্তব্যকে উপমা হিসেবে ব্যবহার করেছেন। কুরআনে বর্ণিত আরশ, কুরসি, লৌহ, কালাম ইত্যাদি শব্দের মতো করে এই আয়াতগুলোর অর্থ উপলব্ধি করতে হবে। মহান আল্লাহ এ সম্পর্কে কুরআনের অন্যত্র বলেছেন: আমি যা কিছু নাজিল করেছি তার একাংশ আলেম বা জ্ঞানীরা ছাড়া উপলব্ধি করতে পারবে না।
এই চার আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- ঊর্ধ্বাকাশে ফেরেশতাদের কাছে অনেক গোপন খবর রয়েছে যা জানার জন্য শয়তানরা সারাক্ষণ ওঁৎ পেতে থাকে। কিন্তু আল্লাহ তায়ালা তাদেরকে সেসব খবর জানার অনুমতি দেননি।
২- অন্যের কথাবার্তা কান পেতে শোনা শয়তানের কাজ। পবিত্র কুরআনে এই কাজ করতে নিষেধ করার পাশাপাশি যারা এ কাজ করে তাদেরকে ভর্ৎসনা করা হয়েছে।
৩- যারা অন্যের গোপন কথা জেনে তা ফাঁস করে নিজের স্বার্থ হাসিল করতে চায় তাদের বিরুদ্ধে সমাজ বা রাষ্ট্রের দায়িত্বশীলদের ব্যবস্থা নিতে হবে।
সূরা সাফফাতের ১১ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেছেন:
فَاسْتَفْتِهِمْ أَهُمْ أَشَدُّ خَلْقًا أَمْ مَنْ خَلَقْنَا إِنَّا خَلَقْنَاهُمْ مِنْ طِينٍ لَازِبٍ (11)
“সুতরাং আপনি তাদেরকে জিজ্ঞেস করুন, তাদেরকে সৃষ্টি করা কঠিনতর, নাকি আমি (আসমান ও জমিনে) অন্য যা সৃষ্টি করেছি (তা সৃষ্টি করা কঠিনতর)? আমি তাদেরকে সৃষ্টি করেছি এঁটেল মাটি থেকে।” (৩৭:১১)
গত অনুষ্ঠানে আমরা বলেছি, সৃষ্টির শুরু এবং কিয়ামতের মতো আকিদা বা বিশ্বাসগত বিষয়গুলোর প্রতি সূরা সাফফাতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হয়েছে। এই আয়াতে বিশ্বনবী (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: যারা কিয়ামতে বিশ্বাস করে না আপনি তাদের কাছে প্রশ্ন করুন: মানুষকে মৃত্যুর পর যে আবার সৃষ্টি করা হবে সে বিষয়টি তারা কীভাবে অস্বীকার করে? তাদেরকে মৃত্যুর পর আবার সৃষ্টি করা কঠিন নাকি তারা নিজেদের চোখে যে বিশাল আসমান দেখতে পায় তা সৃষ্টি করা বেশি কঠিন। মানুষকে শুধুমাত্র মাটি ও পানি দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। প্রথম মানুষ অর্থাৎ হযরত আদম (আ.)কে যেমন সরাসরি মাটি থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে তেমনি এই মাটি থেকে উৎগত শষ্য ও ফল খেয়ে মানুষ জীবনধারণ করছে। আবার মৃত্যুর পর তাদেরকে তাদের উৎসভূমি অর্থাৎ মাটিতে ফিরিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। কিন্তু তারা ধ্বংস হয়ে যাবে না।
বর্তমানে বিজ্ঞান একথা প্রমাণ করেছে যে, মানুষের শরীরের প্রতিটি অণুতে তার জীবনীশক্তির অস্তিত্ব বিদ্যমান এবং প্রত্যেক ব্যক্তির ডিএনএ সম্পূর্ণ আলাদা আলাদা বৈশিষ্ট্য দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে। একজন মানুষের আঙুলের ছাপের সঙ্গে আরেকজনের আঙুলের ছাপের যেমন কোনো মিল নেই তেমনি কারো ডিএনএ অন্য কারো ডিএনএ’র সঙ্গেও মিলবে না। কাজেই বোঝা যাচ্ছে, মানুষের দেহ মাটির সঙ্গে মিশে গেলেও তার শরীরের অণু পরিমাণ অংশই তাকে আবার জীবিত মানুষে পরিণত করার জন্য যথেষ্ট।
এ ছাড়া, এক বিন্দু শুক্রাণু মায়ের পেটে নয় মাস পর যে একটি পূর্ণাঙ্গ মানুষে পরিণত হয় সে সত্য সৃষ্টির শুরু থেকে মানুষ দেখে ও উপলব্ধি করে এসেছে। কাজেই পৃথিবীর গর্ভে থাকা মানবদেহের অংশগুলোকে আবার মানুষে রূপান্তরিত করে কিয়ামতের দিন বাইরে বের করে আনা কোনো অসম্ভব বিষয় হবে না।
এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- আল্লাহকে অস্বীকারকারী ব্যক্তির সহজাত প্রবৃত্তিকে জাগিয়ে তোলার জন্য তাকে প্রশ্ন করা একটি উত্তম পদ্ধতি যা পবিত্র কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে। শিশুদের পাঠদানের সময় কোনো বিষয় সরাসরি না বুঝিয়ে প্রশ্নোত্তরের মাধ্যমে তুলে ধরলে তা তুলনামূলক সহজে শিশুদের বোধগম্য হয়।
২- মানুষ যদি নিজের সৃষ্টি এবং গোটা মানবজাতির সৃষ্টির কথা চিন্তা করে তাহলে কিয়ামতের কথা বুঝতে তার মোটেও অসুবিধা হয় না। #