অক্টোবর ০২, ২০১৯ ১৬:৪১ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১২ থেকে ২১ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১২ থেকে ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

بَلْ عَجِبْتَ وَيَسْخَرُونَ (12) وَإِذَا ذُكِّرُوا لَا يَذْكُرُونَ (13) وَإِذَا رَأَوْا آَيَةً يَسْتَسْخِرُونَ (14) وَقَالُوا إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُبِينٌ (15)  

“বরং আপনি (তাদের অস্বীকারে) বিস্ময়বোধ করেন আর তারা (আপনাকে) বিদ্রুপ করে।” (৩৭:১২)

“যখন তাদেরকে শিক্ষা দেয়া হয়, তখন তারা শিক্ষা গ্রহণ করে না।” (৩৭:১৩)

“তারা যখন কোন (অলৌকিক) নিদর্শন দেখে তখন উপহাস করে (এবং অন্যকেরকেও উপহাস করতে আমন্ত্রণ জানায়)। (৩৭:১৪)

“এবং বলে, নিশ্চয় এটা স্পষ্ট যাদু ছাড়া আর কিছু নয়।” (৩৭:১৫)

এই আয়াতগুলোর শুরুতেই রাসূলুল্লাহ (সা.)কে উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে: কাফেররা কিয়ামতকে অস্বীকার করেই ক্ষান্ত হয়নি বরং তারা কিয়ামতকে হাসিঠাট্টার পাত্র বানিয়ে আপনাকে নিয়ে বিদ্রূপ করে। কিন্তু আপনি কিয়ামতের ওপর পূর্ণ বিশ্বাস রাখেন বলে তাদের এই বিদ্রূপ আপনাকে বিস্মিত করে। আপনি মনে করেন, তাদের যে বিষয়ে জ্ঞান নেই সে বিষয়কে তারা কীভাবে অস্বীকার করে!হায় তারা যদি এ বিষয়ে চুপ থাকত অথবা বলত: আমরা জানি না কিয়ামত হবে কিনা!

পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: তাদের এই অস্বীকারের পেছনে অজ্ঞতা কারণ হিসেবে কাজ করছে না বরং তাদের অহংকার ও গোঁয়ার্তুমি তাদেরকে কুফরের দিকে ধাবিত করেছে।  জেদের কারণে তারা কিয়ামতের কথা উঠলে তা থেকে এমনভাবে মুখ ফিরিয়ে নেয় যেন কিছুই শোনেনি। এমনকি তাদেরকে কোনো অলৌকিক নিদর্শন দেখালেও তারা তা মেনে নিতে রাজি নয়; বরং তারা অন্যদেরকেও রাসূলের অপমানে শামিল হওয়ার আহ্বান জানায়। অন্যরা যাতে অলৌকিক নিদর্শন দেখে ইসলাম গ্রহণ না করে সেজন্য তারা বলে বেড়ায়: ‘এগুলো সব যাদুটোনা। এর মধ্যে সত্যতা নেই। ’ অথচ জাদুর সঙ্গে অলৌকিক ঘটনার সুস্পষ্ট পার্থক্য রয়েছে। যাদুকররা যাদু দেখানোর জন্য বছরের পর বছর ধরে অনুশীলন করে। কিন্তু নবী-রাসূলগণ কোনো ধরনের প্রস্তুতি ছাড়া মানুষকে সৎপথ প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে শুধুমাত্র আল্লাহর ইচ্ছায় অলৌকিক ক্ষমতা প্রদর্শন করেন।

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- যদি কেউ সত্য গ্রহণে প্রস্তুত না থাকে তাহলে বিশ্বের শ্রেষ্ঠ মানুষের কথাও তার অন্তরে বিন্দুমাত্র রেখাপাত করে না।

২- ইসলামের শত্রুদের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হচ্ছে সত্যকে উপহাস করা। কাজেই সত্যের অনুসারীদেরকে ব্যঙ্গবিদ্রূপ সহ্য করার জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

৩- পবিত্র কুরআন যে একটি মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন সে সম্পর্কে মক্কার মুশরিক ও কাফিরদের কোনো সংশয় ছিল না। কিন্তু তা সত্ত্বেও তারা অহংকারবশত কুরআনের শিক্ষাকে যাদু বলে উড়িয়ে দিত।

সূরা সাফফাতের ১৬ থেকে ১৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

أَئِذَا مِتْنَا وَكُنَّا تُرَابًا وَعِظَامًا أَئِنَّا لَمَبْعُوثُونَ (16) أَوَآَبَاؤُنَا الْأَوَّلُونَ (17) قُلْ نَعَمْ وَأَنْتُمْ دَاخِرُونَ (18)

“আমরা যখন মরে যাব, এবং (পঁচে) মাটি ও হাড়ে পরিণত হয়ে যাব, তখনও কি আমরা পুনরুত্থিত হব?” (৩৭:১৬)

“আমাদের পিতৃপুরুষগণও কি (পুনরুত্থিত হবেন)?” (৩৭:১৭)

“বলুন, হ্যাঁ (সবাই পুনরুত্থিত হবে) হীন ও লাঞ্ছিত অবস্থায়।” (৩৭:১৮)

এই তিন আয়াতে রাসূলুল্লাহর সঙ্গে কিয়ামতে অবিশ্বাসীদের সংলাপ তুলে ধরা হয়েছে। মজার ব্যাপারে হচ্ছে, এখানে তারা কিয়ামত সংঘটিত না হওয়ার ব্যাপারে কোনো যুক্তি তুলে না ধরে শুধুমাত্র নিজেদের বিস্ময় প্রকাশ করেছে। তারা রাসূলের কাছে জিজ্ঞাসা করে, যারা মারা গিয়ে পঁচে-গলে মাটি হয়ে যায় তারা কীভাবে আবার জীবিত হবে? বিশেষ করে আমাদের যেসব পূর্বপুরুষ শত শত বছর আগে পৃথিবী ছেড়ে চলে গেছেন তারা কীভাবে পুনরুজ্জীবিত হবেন? তাদের কবর খুঁড়লেও তো এখন মাটি ছাড়া আর কিছু পাওয়া যাবে না!

এই প্রশ্ন যেকোনো মানুষের মনে উত্থাপিত হওয়া স্বাভাবিক। কিন্তু মুমিন ব্যক্তিরা আল্লাহ তায়ালার ওপর এতটা বিশ্বাস রাখেন যে, তারা মানুষকে পুনরুজ্জীবিত করার ক্ষেত্রে আল্লাহর এই ক্ষমতার ওপর মনেপ্রাণে আস্থা রাখেন। কিয়ামতের পুনরুত্থান দিবস সম্পর্কে নবী-রাসূলের বক্তব্য ও ঐশী কিতাবগুলোতে যা বলা হয়েছে তা ঈমানদার ব্যক্তিরা একবাক্যে সত্য বলে মেনে নিয়েছেন। কিন্তু আল্লাহর প্রতি যারা বিশ্বাসী নয় তাদের পক্ষে এই মহাসত্য মেনে নেয়া অসম্ভব।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- কিয়ামতে অস্বীকারকারীদের কাছে শক্ত কোনো যুক্তি নেই। তারা শুধু বিস্ময় প্রকাশ ও তর্ক করে মাত্র।

২- সংশয় ও বিদ্রূপের ছলেও যদি কেউ মহাসত্য সম্পর্কে প্রশ্ন করে তাহলেও আলেম ও জ্ঞানী ব্যক্তিদের উচিত তাকে সঠিক উত্তরটি সুস্পষ্টভাবে দেয়া।

৩- যারা অহংকার ও গোয়ার্তুমির কারণে সত্য প্রত্যাখ্যান করে কিয়ামতের দিন তারা লাঞ্ছিত ও অপমানিত হবে।

সূরা সাফফাতের ১৯ থেকে ২১ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَإِنَّمَا هِيَ زَجْرَةٌ وَاحِدَةٌ فَإِذَا هُمْ يَنْظُرُونَ (19) وَقَالُوا يَا وَيْلَنَا هَذَا يَوْمُ الدِّينِ (20) هَذَا يَوْمُ الْفَصْلِ الَّذِي كُنْتُمْ بِهِ تُكَذِّبُونَ (21)   

“বস্তুতঃ সে উত্থান হবে একটি বিকট শব্দ মাত্র, তখন তারা (পুরুত্থিত হবে এবং) প্রত্যক্ষ করতে থাকবে।” (৩৭:১৯)

“এবং বলবে, দুর্ভাগ্য আমাদের! এটাই তো প্রতিফল দিবস।” (৩৭:২০)

“(বলা হবে) এটাই (হক ও বাতিলের মধ্যে) ফয়সালার দিন, যাকে তোমরা অস্বীকার করতে।” (৩৭:২১)

এই তিন আয়াতে মৃতদের জীবিত করার ক্ষেত্রে আল্লাহ তায়ালার অপার ক্ষমতা বর্ণনা করে বলা হচ্ছে: তোমরা ভেব না যে, কিয়ামতের দিন কবরবাসী একজন একজন করে ধীরে ধীরে পুনরুজ্জীবিত হয়ে কবর থেকে উঠে আসবে; বরং সেদিন একটি বিকট শব্দের জের ধরে সকল মৃত ব্যক্তি একসঙ্গে জীবিত হবে এবং তারা হতচকিত অবস্থায় আশপাশে তাকাতে থাকবে। এই অবস্থা দেখার পর কাফেররা সঙ্গে সঙ্গে উপলব্ধি করবে, পার্থিব জীবনে তারা যে দিবসকে অস্বীকার করেছে এই হচ্ছে সেই দিবস।

তারা তখন সেটা স্বীকার করে বলে উঠবে: দুর্ভোগ আমাদের! আমরা এ বিষয়টিকে অস্বীকার করতাম। আজ আমাদের কি হবে? মহান আল্লাহ আজ আমাদের সঙ্গে কী ব্যবহার করবেন? তাদের এই স্বীকারোক্তির জবাবে ফেরেশতারা বলবেন: আজ হক থেকে বাতিলের আলাদা হয়ে যাওয়ার দিন; আজ ঈমানদার ব্যক্তিদেরকে কাফেরদের কাছ থেকে আলাদা করে ফেলা হবে। আজ আল্লাহ তায়ালা মানুষের হিসাব-নিকাশ নেবেন ও তাদের মাঝে ফয়সালা করবেন।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- কিয়ামতের দিন মানুষের পুনরুজ্জীবন হবে হঠাৎ করে; ধীরে ধীরে দীর্ঘ সময় ধরে এ প্রক্রিয়া সম্পন্ন হবে না।

২- কাফির ও মুশরিকারা কিয়ামতের দিন হতচকিত ও হতবিহ্বল হয়ে যাবে এবং নিজেদের করুণ পরিণতি দেখে হতাশ হবে।

৩- কাফির ও অপরাধী ব্যক্তিদের জন্য কিয়ামত হবে অনুশোচনা করার দিন। কাজেই আমাদের উচিত দুনিয়াতে এমনভাবে জীবন পরিচালনা করা যাতে কিয়ামতের দিন অনুতপ্ত হতে না হয়। কারণ, সেদিনের অনুতাপ কোনো কাজে আসবে