সূরা আস-সাফফাত: আয়াত ৩৯-৪৯ (পর্ব-৬)
পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ৩৯ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৩৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَمَا تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ (39)
“তোমরা যা করতে, তা ছাড়া অন্য কোনো প্রতিফল পাবে না।” (৩৭:৩৯)
গত আসরে নবী-রাসূলদের প্রতি কাফির ও মুশরিকদের মিথ্যা অপবাদ এবং পরকালে এই অপরাধের ভয়ানক শাস্তির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর আজকের এই আয়াতে বলা হচ্ছে: পরকালে আল্লাহর শাস্তির যে কথা বলা হয়েছে তা অপরাধীদের প্রতি কোনো বিদ্বেষ বা প্রতিশোধ পরায়ণতা থেকে নয় বরং নিছক ইহকালের কৃতকর্মের ফলস্বরূপ তাদেরকে ওই শাস্তি ভোগ করতে হবে। ইসলামি শিক্ষা অনুযায়ী, একজন মানুষের চিন্তা, আচরণ ও কথা তার অন্তরের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে এবং সেই প্রভাবের মাধ্যমে তার ব্যক্তিত্ব গঠিত হয়। পার্থিব জীবনের এই ব্যক্তিত্বের ভিত্তিতে কিয়ামতের দিন প্রতিটি মানুষের বাহ্যিক আকৃতি গঠিত হবে এবং সে অনুসারে তাকে পুরস্কার কিংবা শাস্তি দেয়া হবে। কুফর বা আল্লাহকে অস্বীকার কিংবা মানুষের ওপর জুলুম ও অত্যাচার করার অপরাধ মানুষের আত্মার ওপর এতটা ধ্বংসাত্মক প্রভাব ফেলে যে, পরকালে জাহান্নামের আগুন তার ঠিকানা হয়ে যায়।
এই আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- আল্লাহ ন্যায়বিচারক; কাজেই তিনি বান্দার কৃতকর্মের সঠিক বিচার করে তাকে পুরস্কার বা শাস্তি দেবেন।
২- পরকাল হচ্ছে পরিণাম দিবস। দুনিয়াতে আমরা যে ফসলের বীজ বপন করব কিয়ামতের দিন সেই ফসলই আমাদের ঘরে উঠবে।
সূরা সাফফাতের ৪০ থেকে ৪৪ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন-
إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ (40) أُولَئِكَ لَهُمْ رِزْقٌ مَعْلُومٌ (41) فَوَاكِهُ وَهُمْ مُكْرَمُونَ (42) فِي جَنَّاتِ النَّعِيمِ (43) عَلَى سُرُرٍ مُتَقَابِلِينَ (44)
“তবে তারা নয়, যারা আল্লাহর বাছাই করা বান্দা।” (৩৭:৪০) “তাদের জন্যে রয়েছে নির্ধারিত রিজিক।” (৩৭:৪১) “বিভিন্ন ধরনের ফল-মূল এবং তারা সম্মানিত।” (৩৭:৪২) “নেয়ামত-ভর্তি উদ্যানসমূহ।” (৩৭:৪৩) “মুখোমুখি আসনে সমাসীন।” (৩৭:৪৪)
আগের আয়াতে জাহান্নামি ব্যক্তিদের পরিণাম উল্লেখ করার পর এই আয়াতগুলোতে জান্নাতি মানুষদের পরিণতির কথা বর্ণনা করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: আল্লাহ তায়ালার বাছাই করা বান্দারা পরকালের আজাব থেকে রক্ষা পাবেন। তাদেরকে জান্নাতের অফুরন্ত নেয়ামত দান করা হবে এবং তারা সেখানে পরম শান্তি ও নিরাপত্তায় বসবাস করবেন। এখানে বাছাই করা বান্দা বোঝাতে আল্লাহ তায়ালা ‘মুখলিস’ শব্দটি ব্যবহার করেছেন। পবিত্র কুরআনের পরিভাষায় মুখলিস হচ্ছেন তারা যারা খালিস নিয়তে বা একাগ্রচিত্তে শুধুমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে ইবাদতসহ অন্যান্য কাজ করেন। তাদের অন্তরের বিশুদ্ধ নিয়তের কারণে আল্লাহ তাদেরকে আত্মিক দিক দিয়ে পরিপূর্ণতা দান করেন এবং পুরস্কার দেয়ার জন্য আল্লাহ তায়ালা নিজে অন্যদের থেকে তাদেরকে বাছাই করে আলাদা করে নেন।
পবিত্র কুরআনে এ ব্যাপারে উদাহরণও পেশ করা হয়েছে। হযরত ইউসুফ (আ.) আল্লাহর ইচ্ছায় একজন নারীর অশ্লীল আকুতি থেকে রক্ষা পেয়েছিলেন। কুরআনে হযরত ইউসুফকে আল্লাহর বাছাই করা বান্দা হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট আর তা হলো আল্লাহর বাছাই করা বান্দাদের অন্তর্ভূক্ত হওয়ার জন্য বান্দাকেই আগে পদক্ষেপ নিতে হবে। আল্লাহ তায়ালা কাউকে এই কাজে বাধ্য করবেন না। যে ব্যক্তি জীবনের প্রতিটি মুহূর্তে প্রতিটি কাজে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনকে অগ্রাধিকার দেবে আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহায্য করবেন এবং তাকে এই পথে অগ্রসর হওয়ার সুযোগ দান করবেন। এ ধরনের বান্দারা যেসব ভালো কাজের নিয়ত করার পরও তা বাস্তবায়ন করতে পারেননি কিয়ামতের দিন তাদেরকে সেসব কাজেরও পুরস্কার দেয়া হবে।
এই পাঁচ আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:
১- একাগ্রচিত্তে আল্লাহর ইবাদত মানুষকে পবিত্র করতে এবং শিরক ও কুফর থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে।
২- কিয়ামতের দিন আল্লাহ অপরাধীদেরকে তাদের কৃতকর্মের সমান শাস্তি দেবেন। কিন্তু নেককার বান্দারা পুরস্কার পাবেন তাদের কর্মের চেয়ে অনেক গুণ বেশি।
এই সূরার ৪৫ থেকে ৪৯ নম্বর আয়াতে আল্লাহ তায়ালা বলেছেন:
) يُطَافُ عَلَيْهِمْ بِكَأْسٍ مِنْ مَعِينٍ (45) بَيْضَاءَ لَذَّةٍ لِلشَّارِبِينَ (46) لَا فِيهَا غَوْلٌ وَلَا هُمْ عَنْهَا يُنْزَفُونَ (47) وَعِنْدَهُمْ قَاصِرَاتُ الطَّرْفِ عِينٌ (48) كَأَنَّهُنَّ بَيْضٌ مَكْنُونٌ (49)
“তাদেরকে ঘুরে ফিরে পরিবেশন করা হবে স্বচ্ছ (পবিত্র ও বিশুদ্ধ পানীয়ের) পানপাত্র।” (৩৭:৪৫)
“সুশুভ্র ও উজ্জ্বল পানীয়, যা পানকারীদের জন্যে সুস্বাদু।” (৩৭:৪৬)
“(যে পানীয়তে) মস্তিস্ক বিকৃতির উপাদান নেই এবং তারা তা পান করে মাতালও হবে না।” (৩৭:৪৭)
“তাদের কাছে থাকবে (সুন্দরী ও) আয়তলোচনা স্ত্রীগণ যাদের দৃষ্টি থাকবে অবনত।” (৩৭:৪৮)
“মনে হবে যেন তারা (মুরগীর ডানার নীচে) সুরক্ষিত ডিম (যেগুলোর ওপর কখনো কারো হাত পড়েনি)।” (৩৭:৪৯)
এই পাঁচ আয়াতে বলা হচ্ছে: জান্নাতের অধিবাসীদের চারপাশে প্রহরীরা পানপাত্র হাতে সুস্বাদু ও পবিত্র পানীয় নিয়ে ঘুরতে থাকবে। এসব পানীয়র সঙ্গে দুনিয়ার পানীয় ও মদের তুলনা করে আল্লাহ তায়ালা বলছেন: জান্নাতের মদ পান করলে মানুষের মধ্যে যেমন মাতলামি দেখা দেবে না তেমনি তার মুখ থেকে কোনো অন্যায় কথাও বের হবে না। সূরা ইনসান বা দাহারের ২১ নম্বর আয়াতে এই মদ বা পানীয়কে ‘শারাবান তহুরা’ বলে উল্লেখ করা হয়েছে।
এই আয়াতগুলোর শেষাংশে জান্নাতের আরেকটি নেয়ামতের বর্ণনা দিয়ে বলা হচ্ছে: জান্নাতের স্ত্রীগণ তাদের স্বামীদের ছাড়া অন্য কারো দিকে চোখ তুলে তাকাবে না এবং শুধু নিজেদের স্বামীদেরই ভালোবাসবেন। সূরা আর-রহমানের ৭৪ নম্বর আয়াতে বলা হয়েছে, এসব নারীকে পূর্বে কোন জিন ও মানব স্পর্শ করেনি। মুরগী যেমন নিজের ডানার নিচে তার ডিমগুলোকে সুরক্ষিত রাখে তেমনি এসব নারী তাদের শরীরকে পোষাকের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছেন।
এই পাঁচ আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:
১- পরকালের জীবন হবে পৃথিবীর মতোই শারিরীক জীবন। জান্নাতিদের জন্য সেখানে এই শরীরের চাহিদা পূরণের জন্য নানা আয়োজন থাকবে। অন্যদিকে জাহান্নামিদের শরীরের ওপর চলবে ভয়াবহ আজাব বা নির্যাতন।
২- জান্নাতি রমণীগণ যেমন সুন্দরী ও আকর্ষণীয় হবেন তেমনি তারা থাকবেন সতী ও পুতপবিত্র। #