ফেব্রুয়ারি ১৬, ২০২০ ১৭:১০ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ৬৯ থেকে ৭৮ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ৬৯ থেকে ৭১ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

إِنَّهُمْ أَلْفَوْا آَبَاءَهُمْ ضَالِّينَ (69) فَهُمْ عَلَى آَثَارِهِمْ يُهْرَعُونَ (70) وَلَقَدْ ضَلَّ قَبْلَهُمْ أَكْثَرُ الْأَوَّلِينَ (71)

“তারা তাদের পূর্বপুরুষদেরকে পেয়েছিল গোমরাহ বা বিপথগামী।”(৩৭:৬৯)

“অতঃপর (তা সত্ত্বেও) তারা তদের পদাংক অনুসরণে তৎপর ছিল।”(৩৭:৭০)

“এবং নিঃসন্দেহে তাদের আগে পূর্ববর্তীদেরও অধিকাংশ বিপথগামী হয়েছিল।”(৩৭:৭১)

এই তিন আয়াতে জাহান্নামবাসীর করুণ পরিণতির কারণ উল্লেখ করে বলা হচ্ছে: তারা কোনো চিন্তাভাবনা ও গবেষণা ছাড়াই অন্ধভাবে তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করেছিল; যদিও তারা বুঝতে পেরেছিল এই বিশ্বাসের কোনো যৌক্তিক ভিত্তি নেই। পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: দুঃখজনকভাবে যুগ যুগ ধরে বিভিন্ন জাতি এই পন্থা অনুসরণ করে এসেছে। বেশিরভাগ মানুষ মনে করে, তাদের পূর্বপুরুষরা যে আচার আচরণ ও ধর্মীয় বিধান পালন করে এসেছে তাই সঠিক। কখনো যদি এসব রীতিনীতি তাদের কাছে ভুলও প্রমাণিত হয় তারপরও তারা সঠিক বিশ্বাস খুঁজে বের করার চেষ্টা করে না।

আসল কথা হচ্ছে, পূর্বপুরুষদের অনুসৃত পথ অন্ধভাবে অনুসরণ করতেই হবে এমন কোনো কথা নেই। যেমন, মানুষ যদি তাদের পূর্বপুরুষদের সেকেলে জীবনপদ্ধতি অনুসরণ করাকে যথেষ্ট মনে করত তাহলে জ্ঞান-বিজ্ঞানের এত উন্নতি হতো না। পূর্বপুরুষদের অনুসরণ ততটুকু করা যাবে যতটুকু সঠিক প্রমাণিত হবে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ইসলামে ধর্মীয় বিশ্বাসকে অন্ধভাবে অনুসরণ করার সুযোগ নেই। পূর্বপুরুষ কিংবা আলেমদের কথায় ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করা যাবে না। আল্লাহর একত্ববাদ, রিসালাত ও আখিরাতের মতো বিষয়গুলো সম্পর্কে গভীর চিন্তাভাবনা ও বিচার-বিশ্লেষণ করে স্থির সিদ্ধান্তে উপনীত হওয়ার পরই তা গ্রহণ করতে হবে।

২. কোনো যুক্তি ও বিচার-বিশ্লেষণ ছাড়া ধর্মীয় বিশ্বাস গ্রহণ করলে দুনিয়া ও আখিরাতে মানুষকে নানা সমস্যার মুখে পড়তে হয়।

সূরা সাফফাতের ৭২ থেকে ৭৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا فِيهِمْ مُنْذِرِينَ (72) فَانْظُرْ كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُنْذَرِينَ (73) إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ (74)

“এবং নিঃসন্দেহে আমি তাদের মধ্যে ভীতি প্রদর্শনকারী প্রেরণ করেছিলাম।”(৩৭:৭২)

“অতএব লক্ষ্য করুন, যাদেরকে ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছিল, তাদের পরিণতি কি হয়েছে।” (৩৭:৭৩)

“(তারা সবাই ধ্বংস হয়েছে) তবে তারা ছাড়া যারা আল্লাহর বাছাই করা বান্দা।” (৩৭:৭৪)

এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: পথভ্রষ্ট ব্যক্তিরা এজন্য বিপথগামী হয়নি যে, তাদের কাছে কোনো নবী-রাসূল আসেননি। কারণ, আল্লাহ তায়ালা যুগে যুগে সব জাতির কাছে ঐশী পথ প্রদর্শক পাঠিয়েছেন যারা তাদেরকে খারাপ কাজের পরিণতি সম্পর্কে সতর্ক করেছেন। দ্বীন-ইসলাম প্রচারের জন্য যুগে যুগে অসংখ্য নবী পৃথিবীতে এসেছেন। কোনো কোনো হাদিসে তাঁদের সংখ্যা প্রায় এক লাখ ২৪ হাজার বলে উল্লেখ করা হয়েছে।

নবী-রাসূলদের প্রধান দায়িত্ব ছিল মানুষকে অজ্ঞতা ও কুসংস্কারের অন্ধকার থেকে মুক্ত করে আলোর পথ দেখানো এবং তাদেরকে শিরক, কুফর ও জুলুমের হাত থেকে রক্ষা করা। কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ এই মহান ঐশী শিক্ষকদের সতর্কবাণীর প্রতি কর্ণপাত করে না। ফলে তারা পার্থিব জীবনে যেমন ক্ষতিগ্রস্ত হয় তেমনি পরকালীন জীবনে চিরস্থায়ী জাহান্নামে যাওয়ার ক্ষেত্র প্রস্তুত করে।

অবশ্য আল্লাহর খাঁটি বান্দারা তাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের চেষ্টা করেন এবং দুনিয়া ও আখেরাতে নিজেদের জন্য প্রশান্তিময় জীবন বেছে নেন। এ ধরনের মানুষ চেষ্টা-সাধনা করে যদি ঈমানকে অনেক শক্তিশালী পর্যায়ে নিতে সক্ষম হন তাহলে তারা আল্লাহ তায়ালার বিশেষ অনুগ্রহণ লাভ করেন এবং পার্থিব জীবনে শয়তানের প্ররোচনা ও কুপ্রবৃত্তির ধোঁকা থেকে রক্ষা পান। ফলে পরকালীন জীবনে চরম সৌভাগ্য অর্থাৎ জান্নাত লাভ তাদের জন্য সহজ হয়ে যায়।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পৃথিবীতে আগুন লাগার হুমকিতে থাকা ঘরের অধিবাসীদের যেমন সবাই সতর্ক করে দেয় ঠিক তেমনি পরকালে জাহান্নামের আগুন থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্য মানুষকে সতর্ক করা একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব।

২. সমাজের বেশিরভাগ মানুষ যদি পথভ্রষ্ট হয়ে যায় তাহলেও তাদের অনুগামী হওয়া যাবে না বরং এসব মানুষকে সঠিক পথের দিশা দেয়ার  চেষ্টা করতে হবে।

৩. আল্লাহর ইবাদতের ক্ষেত্রে একাগ্রতা ও একনিষ্ঠতা মানুষের জন্য চরম সৌভাগ্যের পথ খুলে দিতে পারে। কিন্তু অভ্যাসবশত ইবাদত বা লোক দেখানো ইবাদতে সুফল পাওয়া যায় না। 

এই সূরার ৭৫ থেকে ৭৮ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَقَدْ نَادَانَا نُوحٌ فَلَنِعْمَ الْمُجِيبُونَ (75) وَنَجَّيْنَاهُ وَأَهْلَهُ مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ (76) وَجَعَلْنَا ذُرِّيَّتَهُ هُمُ الْبَاقِينَ (77) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآَخِرِينَ (78)  

“এবং নূহ আমাকে ডেকেছিল। (আমি তার ডাকে সাড়া দিয়েছিলাম) আর আমি কত চমৎকারভাবে ডাকে সাড়া দেই।" (৩৭:৭৫)

“আমি তাকে ও তার পরিবারবর্গকে এক মহা দুঃখ থেকে রক্ষা করেছিলাম।” (৩৭:৭৬)

“এবং তার বংশধরদেরকে আমি অবশিষ্ট রেখেছিলাম।” (৩৭:৭৭)

“এবং আমি পরবর্তীদের মধ্যে তার জন্য (সুনাম) রেখে দিয়েছি।” (৩৭:৭৮)

এর আগের আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে: আল্লাহতায়ালা অতীত জাতিগুলোর কাছে নবী-রাসূল প্রেরণ করেছিলেন। এই চার আয়াতে এরকম একজন নবী, হযরত নূহ (আ.)’র উদাহরণ টানা হয়েছে। বলা হচ্ছে: হযরত নূহ (আ.) বহু বছর তার জাতির মধ্যে দ্বীনের দাওয়াত দিয়েছেন এবং আন্তরিকতা ও ভালোবাসা নিয়ে তাদেরকে কুফর ও শিরক থেকে বিরত রাখার চেষ্টা করেছেন।  কিন্তু জাতির বেশিরভাগ মানুষ তার কথায় কর্ণপাত করেনি বরং তাঁর রিসালাতকে প্রত্যাখ্যান করেছে।

এক সময় আল্লাহর এই নবী তাঁর জাতির হেদায়াতপ্রাপ্তির ব্যাপারে নিরাশ হয়ে যান। তিনি কাফেরদের ধ্বংস করে দেয়ার পাশাপাশি মুমিন ব্যক্তিদের বাঁচিয়ে রাখার জন্য আল্লাহর সাহায্য চান। মহান আল্লাহ এই ডাকে সাড়া দেন। মহাপ্লাবনে সব কাফের ও মুশরিক ধ্বংস হয়ে যায়। শুধুমাত্র ঈমানদার ব্যক্তিরা আল্লাহর নির্দেশে হযরত নূহের তৈরি করা জাহাজে উঠে প্রাণে রক্ষা পান।

এই চার আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহর সাহায্য পাওয়ার একমাত্র উপায় হচ্ছে তাঁর কাছে দোয়া ও মুনাজাত করা। তবে এজন্য সাহায্যপ্রার্থীকে আল্লার বিধিবিধান সঠিকভাবে মেনে চলতে হবে। মুমিন ব্যক্তিরা বিপদে পড়লে আল্লাহ তায়ালাকে ডাকার মাধ্যমে বিপদ থেকে উদ্ধার পান এবং তারা জীবনে কখনো অচলাবস্থার সম্মুখীন হন না।  কিয়ামতের দিনও তারা মুক্তি পেয়ে যাবেন।

২. পৃথিবীর বুকে কোনো জাতির টিকে থাকা না থাকা সম্পূর্ণ আল্লাহর ওপর নির্ভর করছে। তিনি হযরত নূহের অনুগত বান্দাদের মহা প্লাবন থেকে রক্ষা করলেও পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদের ধ্বংস করে দিয়েছিলেন।#