এপ্রিল ২৬, ২০২০ ১৫:৩৯ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১১৪ থেকে ১২২ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১১৪ থেকে ১১৬ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلَقَدْ مَنَنَّا عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ (114) وَنَجَّيْنَاهُمَا وَقَوْمَهُمَا مِنَ الْكَرْبِ الْعَظِيمِ (115) وَنَصَرْنَاهُمْ فَكَانُوا هُمُ الْغَالِبِينَ (116)

“এবং প্রকৃতপক্ষে আমি অনুগ্রহ করেছিলাম মূসা ও হারুনের প্রতি।” (৩৭:১১৪)

“এবং তাদেরকে ও তাদের সম্প্রদায়কে উদ্ধার করেছি মহা দুর্দশা থেকে।” (৩৭:১১৫)

“আমি তাদেরকে সাহায্য করেছিলাম, ফলে তারা হয়েছিল বিজয়ী।” (৩৭:১১৬)

গত আসরে হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র প্রতি আল্লাহ তায়ালার কিছু নেয়ামত বা অনুগ্রহের কথা বর্ণিত হয়েছে। আজকের এই তিন আয়াতে হযরত মুসা ও তাঁর ভাই হারুনের প্রতি মহান আল্লাহর কিছু দয়ার কথা বলা হয়েছে। প্রথমে সার্বিকভাবে তাদের প্রতি আল্লাহর অনুগ্রহের কথা বলা হয়েছে এবং এরপর সেগুলোর বর্ণনা দেয়া হয়েছে। তাদের প্রতি আল্লাহ তায়ালা প্রথম যে অনুগ্রহ করেন তা হলো তিনি মুসা, হারুন ও বনি ইসরাইল জাতিকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে রক্ষা করেন এবং ফেরাউনের বিরুদ্ধে বিজয় দান করেন।

মিশরের অত্যাচারী ও রক্তপিপাসু শাসক ফেরাউন বনি ইসরাইল জাতির পুরুষ লোকদের ক্রীতদাসে ও নারীদের দাসীতে পরিণত করে রাখে। এ ছাড়া, তাদের পুত্র সন্তান ভূমিষ্ঠ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে তাদেরকে গলা কেটে হত্যা করছিল ফেরাউনের বাহিনী।

এরকম একটি অবস্থায় হযরত মুসা (আ.) মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বনি ইসরাইল জাতিকে ফেরাউনের অত্যাচার থেকে মুক্ত করার দায়িত্ব পান। তিনি ঈমানের বলে বলীয়ান হয়ে তাঁর জাতিকে ফেরাউনের মহা অত্যাচার থেকে মুক্তির ব্যবস্থা করেন।  

আল্লাহ তায়ালার দয়ায় বনি ইসরাইল জাতি নীল নদ অতিক্রম করে এবং ফেরাউন ও তার লোক-লস্কর এই নদীর পানিতে ডুবে মারা যায়। এভাবে বনি ইসরাইল জাতি সম্পূর্ণ খালি হাতে তৎকালীন যুগের অত্যাধুনিক অস্ত্রসস্ত্রে সজ্জিত পরাক্রমশালী ফেরাউনের বাহিনীর হাত থেকে রক্ষা পায় এবং ওই বাহিনীকে পরাজিত করে। এরপর ফেরাউনের সকল সম্পদ, রাজপ্রাসাদ, ফলমূলের বাগান ও শষ্যরাজিসহ সবকিছু বনি ইসরাইল জাতির হস্তগত হয়।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১. অতীতের নবী-রাসূলদের প্রতি আল্লাহ তায়ালার অনুগ্রহের কথা স্মরণ করে যুগে যুগে ঈমানদার বান্দারা মানসিক শক্তি অর্জন করেছেন।

২. দুঃখ-কষ্ট ও মানসিক চাপ থেকে মুক্ত হয়ে আত্মিক প্রশান্তিতে পৌঁছাতে পারা ঈমানদার বান্দার প্রতি আল্লাহ তায়ালার বড় অনুগ্রহ।

৩. নবী-রাসূল ও আওলিয়া তখনই মানসিক প্রশান্তি লাভ করেন যখন নিপীড়িত ও নির্যাতিত মানুষগুলো দুঃখ-কষ্ট ও অত্যাচারের হাত থেকে মুক্তি পায়।

সূরা সাফফাতের ১১৭ থেকে ১১৯ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَآَتَيْنَاهُمَا الْكِتَابَ الْمُسْتَبِينَ (117) وَهَدَيْنَاهُمَا الصِّرَاطَ الْمُسْتَقِيمَ (118) وَتَرَكْنَا عَلَيْهِمَا فِي الْآَخِرِينَ (119)

“আমি উভয়কে দিয়েছিলাম জ্ঞানগর্ভ কিতাব।” (৩৭:১১৭)

“এবং তাদেরকে সরল পথ প্রদর্শন করেছিলাম।” (৩৭:১১৮)

“আমি পরবর্তীদের মধ্যে তাদের জন্য (সুনাম ও সুখ্যাতি) রেখে দিয়েছি।” (৩৭:১১৯)

এই তিন আয়াতে মানব সমাজের মুক্তির মাধ্যম এবং আল্লাহ তায়ালার সবচেয়ে বড় অনুগ্রহ আসমানি কিতাব নাজিলের কথা বলা হচ্ছে। একথা বলার অপেক্ষা রাখে না যে, অত্যাচারী শাসকের হাত থেকে মুক্তিপ্রাপ্ত একটি জাতিকে সঠিক পথ প্রদর্শনের জন্য কিছু আইন এবং ঐশী দিক-নির্দেশনার প্রয়োজন রয়েছে যাতে তারা আবার কোনো অত্যাচারী শাসকের খপ্পরে না পড়ে। এ কারণে হযরত মুসা (আ.)’র প্রতি বনি ইসরাইল জাতির জন্য প্রয়োজনীয় সব আইন ও দিক-নির্দেশনা সমৃদ্ধ কিতাব ‘তাওরাত’ নাজিল করা হয়। এই কিতাবের মাধ্যমে সদ্য মুক্তিপ্রাপ্ত এই জাতিকে উন্নতি ও সমৃদ্ধিতে পৌঁছানোর উপায় বলে দেয়া হয়।

এই তিন আয়াতের কয়েকটি শিক্ষণীয় দিক হচ্ছে:

১. অত্যাচারী স্বৈরশাসকের হাত থেকে মুক্তি পাওয়ার পর একটি জাতির জন্য আল্লাহর নির্দেশিত পথে পরিচালিত হওয়া সহজ হয়ে যায়।

২. আসমানি কিতাব মানুষকে সঠিকভাবে জীবনযাপন করার উপায় বলে দেয়। তবে শর্ত হচ্ছে, এই কিতাবে কোনো পরিবর্তন, পরিবর্ধন বা বিকৃতি ঘটানো যাবে না।

৩. আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে তার প্রেরিত পুরুষদের প্রশংসা করেছেন। সব নবী-রাসূলকেই তিনি সমাজে অনেক বড় সম্মানের আসনে বসিয়েছেন এবং পরবর্তী যুগের মানুষের মধ্যে তাদের সুখ্যাতি ছড়িয়ে দিয়েছেন।

এই সূরার ১২০ থেকে ১২২ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে বলা হয়েছে:

 سَلَامٌ عَلَى مُوسَى وَهَارُونَ (120) إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ (121) إِنَّهُمَا مِنْ عِبَادِنَا الْمُؤْمِنِينَ (122)

“মূসা ও হারুনের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক।” (৩৭:১২০)

“এভাবে আমি সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি।” (৩৭:১২১)

“তারা উভয়েই ছিল আমার বিশ্বাসী বান্দাদের অন্যতম।” (৩৭:১২২)

হযরত মুসা ও হযরত হারুন আলাইহিমুস সালাম সংক্রান্ত আলোচনার শেষাংশে এসে এই তিন আয়াতে আল্লাহ তায়ালা তাদের দু’জনের প্রতি সালাম ও দরুদ পাঠিয়েছেন। সেইসঙ্গে বিষয়টিকে কুরআনে কারিমে উল্লেখ করার মাধ্যমে ঈমানদার বান্দাদেরকে এই শিক্ষা দিয়েছেন যে, তারা যেন নবী-রাসূলদের প্রতি দরুদ ও সালাম বর্ষণ করে তাদের অবদানের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে।

পরের আয়াতে আল্লাহ বলছেন: এই দুই ভাইয়ের পাশাপাশি ঈমানদার বান্দাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ ও দয়া একটি চলমান বিষয়।  যুগে যুগে যেসব ঈমানদার ব্যক্তি পুতপবিত্র চরিত্রের অধিকারী ও সৎকর্মশীল হবে এবং পরোপকারে আত্মনিয়োগ করবে তারা সবাই আমার অনুগ্রহ ও দয়া লাভ করবে।

এই দুই মহান ভ্রাতা সম্পর্কিত আলোচনার শেষ আয়াতে তাঁদের উন্নত মর্যাদা সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন: তারা দু’জনই ছিল আমার ঈমানদার বান্দাদের অন্তর্ভুক্ত। পবিত্র কুরআনে উল্লেখিত সব নবী-রাসূল সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা এই একই পরিভাষা ব্যবহার করেছেন এবং তিনি তাদের সবাইকে তাঁর আব্‌দ বা বান্দা বলে উল্লেখ করেছেন।

আব্‌দ শব্দটি মওলা শব্দের বিপরীত অর্থবোধক। আল্লাহর নির্দেশাবলীর প্রতি পরিপূর্ণভাবে আত্মসমর্পনকারী ব্যক্তিই হচ্ছেন আব্‌দ বা বান্দা। কিন্তু দুঃখজনকভাবে বেশিরভাগ মানুষ আল্লাহর সব নির্দেশের কাছে আত্মসমর্পন করে না বরং তারা ‘মন চাহি’ জিন্দেগিতে অভ্যস্ত। যেসব নির্দেশ তাদের সেন্টিমেন্ট ও রুচির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ এবং তাদের দৃষ্টিতে ভালো মনে হয় তারা শুধু সেগুলোই পালন করে এবং বাকিগুলোকে প্রত্যাখ্যান করে।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ঐশী মানবদের প্রতি সালাম ও দরুদ পাঠানো একটি উত্তম কাজ এবং আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে এই শিক্ষা দিয়ে একথা বুঝিয়েছেন যে, যাদের প্রতি সালাম বর্ষণ করা হয় তারা তা শুনতে পান।

২. সাধারণ মানুষের মধ্যে দ্বীনের দাওয়াত দেয়া উন্নতমানের সৎকর্ম এবং নবী-রাসূলদের বৈশিষ্ট্য।#