মে ১৬, ২০২০ ১৫:৫০ Asia/Dhaka

পবিত্র কুরআনের তাফসির বিষয়ক অনুষ্ঠানের 'কুরআনের আলো'র এ পর্বে সূরা আস-সাফফাতের ১৪৯ থেকে ১৬০ নম্বর আয়াতের তাফসির উপস্থাপন করা হবে। এই সূরার ১৪৯ থেকে ১৫২ আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

فَاسْتَفْتِهِمْ أَلِرَبِّكَ الْبَنَاتُ وَلَهُمُ الْبَنُونَ (149) أَمْ خَلَقْنَا الْمَلَائِكَةَ إِنَاثًا وَهُمْ شَاهِدُونَ (150) أَلَا إِنَّهُمْ مِنْ إِفْكِهِمْ لَيَقُولُونَ (151) وَلَدَ اللَّهُ وَإِنَّهُمْ لَكَاذِبُونَ (152)

“(হে নবী) তাদেরকে (অর্থাৎ মুশরিকদের) জিজ্ঞেস করুন, আপনার পালনকর্তার জন্য কি কন্যা সন্তান রয়েছে এবং তাদের জন্য কি (রয়েছে) পুত্র-সন্তান।” (৩৭:১৪৯)

“নাকি আমি তাদের উপস্থিতিতে ফেরেশতাগণকে নারীরূপে সৃষ্টি করেছি?” (৩৭:১৫০)

“জেনে রাখুন, তারা মনগড়া মিথ্যা অপবাদ দেয় যে:” (৩৭:১৫১)

“আল্লাহ সন্তান জন্ম দিয়েছেন। নিশ্চয় তারা মিথ্যাবাদী।” (৩৭:১৫২)

সূরা সাফফাতে এ পর্যন্ত কয়েকজন নবী ও তাঁদের জাতিগুলোর সত্য ঘটনা বর্ণনা করা হয়েছে। এরপর এই চার আয়াতে মক্কার মুশরিকদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাসের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হচ্ছে: তারা আল্লাহ তায়ালাকে মানুষের অনুরূপ ধরে নিয়ে ভাবছে আল্লাহরও সন্তান আছে। তারা ফেরেশতাদেরকে মহান আল্লাহর কন্যা সন্তান সাব্যস্ত করেছে। এসব আয়াতে এই বিশ্বাসকে ভ্রান্ত ও মিথ্যা অপবাদ হিসেবে উল্লেখ করো বলা হচ্ছে: তোমরা মক্কার মুশরিকরা কন্যা সন্তানকে ঘৃণা করতে এবং কন্যা সন্তানের জন্মগ্রহণকে নিজেদের জন্য অকল্যাণকর ও কলঙ্কজন মনে করতে এবং পারলে তাদেরকে জীবন্ত কবর দিতে। অথচ আল্লাহর ক্ষেত্রে তোমরা সেই কলঙ্ক আনয়নকারী কন্যা সন্তানই সাব্যস্ত করলে? আর পুত্র সন্তানকে নিজেদের জন্য নির্ধারণ করলে?

এখানে বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আল্লাহ তায়ালার কাছে কন্যা বা পুত্র সন্তানের মধ্যে প্রকৃতিগত কোনো পার্থক্য নেই। তবে এখানে মুশরিকদের যুক্তি খণ্ডনের জন্য তাদের বিশ্বাসকে ভিত্তি ধরা হয়েছে মাত্র। পরবর্তী আয়াতে বলা হচ্ছে: তোমরা মুশরিকরা যে দাবি করছো তার পক্ষে কি কোনো প্রমাণ তোমাদের কাছে আছে? তোমরা কি ফেরেশতাদের সৃষ্টির সময় সেখানে উপস্থিত ছিলে যে, তারা কন্যা নাকি পুত্র তা তোমরা দেখে ফেলেছো? যদি না দেখে থাকো, তাহলে কেন ধারনাবশত আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করছো? আর আল্লাহর কি আদৌ কোনো সন্তান আছে যে তোমরা সেই সন্তানের লিঙ্গ নির্ধারণ করে দিচ্ছো?

এই চার আয়াতের দু’টি শিক্ষণীয় বিষয় হচ্ছে:

১- নবী-রাসূলগণ কাফের ও মুশরিকদের সামনে প্রশ্ন উত্থাপনের মাধ্যমে তাদেরকে নিজেদের ভ্রান্ত বিশ্বাস সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করতে উদ্বুদ্ধ করতেন যাতে তারা সঠিক পথের সন্ধান পেতে পারে।

২- এখনো কোনো কোনো ধর্মের অনুসারীরা ফেরেশতা বা তাদের ভাষায় দেবদূতদের কাল্পনিক ছবি ও মূর্তি তৈরি করে যার বেশিরভাগ নারী চরিত্রের। কিন্তু কুরআনের এই আয়াত অনুযায়ী এই বিশ্বাস ভ্রান্ত এবং বাস্তবতার সঙ্গে এর কোনো সম্পর্ক নেই। এই ভ্রান্ত বিশ্বাস পোষণকারী সবাইকে কুরআনে মুশরিক বলে সম্মোধন করা হয়েছে।

সূরা সাফফাতের ১৫৩ থেকে ১৫৭ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলছেন:

أَصْطَفَى الْبَنَاتِ عَلَى الْبَنِينَ (153) مَا لَكُمْ كَيْفَ تَحْكُمُونَ (154) أَفَلَا تَذَكَّرُونَ (155) أَمْ لَكُمْ سُلْطَانٌ مُبِينٌ (156) فَأْتُوا بِكِتَابِكُمْ إِنْ كُنْتُمْ صَادِقِينَ (157)

“তিনি কি পুত্র-সন্তানের চেয়ে কন্যা-সন্তান বেশি পছন্দ করেছেন?”(৩৭:১৫৩)

“তোমাদের কি হল? তোমাদের এ কেমন সিন্ধান্ত?” (৩৭:১৫৪)

“তাহলে তোমরা কি অনুধাবন করবে না?” (৩৭:১৫৫)

“নাকি তোমাদের কাছে (তোমাদের দাবির স্বপক্ষে) সুস্পষ্ট কোন দলীল রয়েছে?” (৩৭:১৫৬)

“যদি তোমরা সত্যবাদী হও তাহলে তোমাদের কিতাব আন।” (৩৭:১৫৭)

আগের আয়াতগুলোর ধারাবাহিকতায় এই পাঁচ আয়াতে আরো স্পষ্ট করে বলা হচ্ছে: তোমরা কীভাবে ফেরেশতাদেরকে কন্যা সাব্যস্ত করে তাদেরকে আল্লাহর সঙ্গে জুড়ে দিচ্ছো? তোমরা কি মনে করো তিনি কন্যা সন্তানকে প্রাধান্য দিয়েছেন বলে নিজের জন্য পুত্র সন্তান গ্রহণ করেননি? তোমরা কি এখনো মনে করো না যে, এসব ভ্রান্ত কথাবার্তা বলা বন্ধ করার এবং সঠিক কথা চিন্তা করার সময় হয়েছে? তোমাদের বিশ্বাস যে ভ্রান্ত তা সহজেই উপলব্ধি করা যায় এবং এর জন্য অনেক বেশী চিন্তাভাবনার প্রয়োজন নেই।

এসব যুক্তি তুলে ধরার পর আল্লাহ তায়ালা মুশরিকদের প্রতি চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দিয়ে বলছেন: যদি পূর্ববর্তী নবী-রাসূলদের কোনো কিতাব তোমাদের কাছে থেকে থাকে যেখানে তোমাদের এই ভ্রান্ত বিশ্বাস লিপিবদ্ধ রয়েছে তাহলে তাও দেখাতে পারো। কোন্‌ নবীর কিতাবে একথা লেখা আছে যে, আল্লাহর সন্তান রয়েছে এবং ফেরেশতারা আল্লাহর সন্তান?

এই পাঁচ আয়াতের শিক্ষণীয় দু’টি দিক হচ্ছে:

১- যাদের দৃষ্টিতে পুত্র সন্তান ভালো এবং কন্যা সন্তান খারাপ তারাই আল্লাহর জন্য কন্যা সন্তান নির্ধারণ করে নিজেদের জন্য পুত্র সন্তান বাছাই করে। এর চেয়ে ভ্রান্ত ও শিরকি বিশ্বাস আর থাকতে পারে না।

২- আল্লাহর প্রতি মানুষের বিশ্বাসের দালিলিক বা যুক্তিপূর্ণ প্রমাণ থাকতে হবে। শুধুমাত্র কল্পনা ও ধারনাবশত আল্লাহ সম্পর্কে কোনো কথা বলা মারাত্মক গুনাহের কাজ।  

সূরা সাফফাতের ১৫৮ থেকে ১৬০ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَجَعَلُوا بَيْنَهُ وَبَيْنَ الْجِنَّةِ نَسَبًا وَلَقَدْ عَلِمَتِ الْجِنَّةُ إِنَّهُمْ لَمُحْضَرُونَ (158) سُبْحَانَ اللَّهِ عَمَّا يَصِفُونَ (159) إِلَّا عِبَادَ اللَّهِ الْمُخْلَصِينَ (160)

“মুশরিকরা আল্লাহ ও জ্বিনদের মধ্যে সম্পর্ক সাব্যস্ত করেছে, অথচ জ্বিনেরা খুব ভালো করে জানে যে, তারা (কিয়ামতের দিন) গ্রেফতার হয়ে আসবে।” (৩৭:১৫৮)

“তারা যা বলে তা থেকে আল্লাহ পবিত্র।” (৩৭:১৫৯)

“তবে যারা আল্লাহর নিষ্ঠাবান বান্দা (তারা নয়)।” (৩৭:১৬০)

মুশরিকদের কিছু ভ্রান্ত বিশ্বাস বর্ণনা করার পর এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে: মুশরিকরা জ্বিনদের সঙ্গেও আল্লাহর এক ধরনের সম্পর্ক সাব্যস্ত করেছে। কোনো কোনো মুশরিক গোষ্ঠী জ্বিনকে আল্লাহর স্ত্রী বলে অভিহিত করেছে (নাউজুবিল্লাহ)।  আবার কোনো কোনো মুশরিকের দল জ্বিনদেরকে আল্লাহর শরিক সাব্যস্ত করে তাদের পূজা করা শুরু করে দিয়েছে। কিন্তু পবিত্র কুরআনে এসব ভ্রান্ত বিশ্বাসকে কঠোরভাবে প্রত্যাখ্যান করে বলা হচ্ছে: জ্বিনরা যখন আল্লাহর বান্দা এবং তাদেরকে যখন কিয়ামতের দিন তাদের কৃতকর্মের জন্য আল্লাহর সামনে হাজির করা হবে বলে ঘোষণা করা হয়েছে তখন তাদের সঙ্গে আল্লাহর কীভাবে বিশেষ সম্পর্ক থাকতে পারে?

এরপর মুশরিকদের এসব বিশ্বাসকে ভ্রান্ত ও ভুল আখ্যায়িত করে বলা হচ্ছে: মুশরিকরা মনগড়া যেসব কথা বলে মহান আল্লাহ তা থেকে সম্পূর্ণ পবিত্র। নবী-রাসূল ও আউলিয়াগণ সব ধরনের গুনাহ ও শিরক থেকে মুক্ত এবং তারা ছাড়া আল্লাহ তায়ালার শান ও মর্যাদা সঠিকভাবে বর্ণনা করা কারো পক্ষে সম্ভব নয়।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১- মানুষ যদি বুদ্ধিবৃত্তি ও যৌক্তিক অবস্থান থেকে বেরিয়ে যায় তখন তার পক্ষে আল্লাহর মর্যাদাকে ক্ষুণ্ন করে চরম অবমাননাকর কথা বলাও সম্ভব।

২- জ্বিন হচ্ছে আল্লাহর এমন এক সৃষ্টি যাকে মানুষের মতো বিচারবুদ্ধি ও ভালো মন্দের পার্থক্য করার ক্ষমতা দেয়ার পাশাপাশি কর্মের স্বাধীনতা দেয়া হয়েছে। কিয়ামতের দিন তাকে পার্থিব জীবনের কৃতকর্মের হিসাব দিতে হবে।#