ইরান-ইরাক যুদ্ধের ইতিহাস (৩২ পর্ব): খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযান
১৯৮২ সালের পঞ্চম মাসের গোড়ার দিকে ইরান আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে চতুর্থ বৃহৎ অভিযান চালায় যেটি ‘বায়তুল মুকাদ্দাস’ অভিযান নামে পরিচিত।
ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় গুরুত্বপূর্ণ নৌবন্দর ‘খোররামশাহর’ ও এর আশপাশের এলাকা মুক্ত করার জন্য এ অভিযান চালানো হয়। ইরানের এই অভিযান শুধু ইরাকের বিরুদ্ধে ছিল না বরং ইরাকের পৃষ্ঠপোষক প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের সবগুলো শক্তির বিরুদ্ধে চালানো হয়েছিল। মার্কিন প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়- পেন্টাগনের তৎকালীন কর্মকর্তা হাভার্ড থ্যাচার পরবর্তীতে এ সম্পর্কে বলেন: “ইরাকি সেনারা খোররামশাহর দখল করার পর বাগদাদকে আমরা সব রকম সামরিক ও গোয়েন্দা সহযোগিতা করি। ইরাক যাতে ইরানের কাছে পরাজিত না হয় সেজন্য বাগদাদ আমাদের কাছে যা কিছু চেয়েছে আমরা তা সরবরাহ করেছি।”
১৯৮২ সালের মার্চ মাসে ইরানের ইসলামি বিপ্লবী গার্ড বাহিনী বা আইআরজিসি ও সেনাবাহিনীর শীর্ষস্থানীয় কর্মকর্তারা খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযান পরিচালনার ব্যাপারে গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকে বসেন। বৈঠকে আগ্রাসী ইরাকি বাহিনীর বিরুদ্ধে পরিচালিত বিগত তিনটি সফল অভিযানের নানা দিকের পাশাপাশি চলমান যুদ্ধ প্রস্তুতি মূল্যায়ন করা হয়। সেনা কর্মকর্তারা বলেন, যত শিগগিরই সম্ভব পরবর্তী অভিযান চালাতে হবে। তারা এ অভিমত প্রকাশ করেন যে, শীত শেষ হয়ে গ্রীষ্মকাল শুরু হয়ে গেলে ইরাকি বাহিনী নতুন করে শক্তি সঞ্চয় করে পাল্টা আঘাত হানবে। কাজেই আবহাওয়া গরম হয়ে ওঠার আগেই বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযান পরিচালনা করতে হবে। যুদ্ধ করার জন্য সব দিক বিবেচনা না করলে সুযোগ হাতছাড়া হয়ে যাবে এবং সেক্ষেত্রে অপূরণীয় ক্ষতি হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
এ ছাড়া, এর আগের অভিযানে অর্থাৎ ফাতহুল মোবিন অভিযানে ইরান বড় ধরনের সাফল্য পাওয়ায় ইরাকি বাহিনী তখন ছিল অনেকটা বিপর্যস্ত। হীন মনোবলে অধিকারী সেই আগ্রাসী বাহিনীর বিরুদ্ধে তাৎক্ষণিক আরেকটি অভিযান চালালে তাদের পক্ষে কোমর সোজা করে প্রতিরোধ গড়ে তোলা সম্ভব হবে না। আইআরজিসি ও ইরানের সেনাবাহিনীর ওই যৌথ বৈঠকে ইরানের শীর্ষস্থানীয় রণকৌশলবিদ শহীদ জেনারেল হাসান বাকেরি অবিলম্বে পরবর্তী অভিযান চালানোর পক্ষে জোরালো অভিমত প্রকাশ করেন।
অবশ্য ইরানের দক্ষিণাঞ্চলীয় প্রাকৃতিক প্রতিকূলতা এবং ইরাকি বাহিনীর যুদ্ধপ্রস্তুতি বায়তুল মুকাদ্দাস অভিযান চালানোর ক্ষেত্রে ইরানি যোদ্ধাদের কঠিন চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি করেছিল। এ অভিযান চালানোর জন্য ইরানি যোদ্ধাদেরকে দেশের সবচেয়ে খরস্রোতা ও গভীর ‘কারুন’ নদী পার হতে হতো।
বর্তমানে এই নদীতে চারটি বাঁধ ও চারটি সেতু থাকলেও সে সময় এই নদীর উপর একটি মাত্র সেতু ছিল এবং সেটি ইরাকি বাহিনী দখল করে কড়া পাহারা বসিয়েছিল। ইরানি যোদ্ধারা ওই সেতু ছাড়া বিকল্প উপায়ে অন্য কোনো স্থান দিয়ে কারুন নদী পার হতে পারে- এমন কথা ইরাকি বাহিনী কল্পনাও করেনি।

এদিকে ইরানি কমান্ডাররা শুরু থেকেই যে কৌশলটিকে প্রাধান্য দিচ্ছিলেন তা হলো- আগ্রাসী বাহিনীকে হতবাক করে দিতে হবে এবং ইরাকি সেনা কমান্ডারদের কল্পনার বাইরে গিয়ে অভিযান চালাতে হবে। অবশ্য এই অভিযান পরিচালনার বিষয়ে ইরানের সেনাবাহিনী ও আইআরজিসি’র কমান্ডারদের মধ্যে কিছুটা মতপার্থক্য দেখা দেয়। দুই বাহিনীর পক্ষ থেকে দু’টি প্রস্তাব আসে। একটি প্রস্তাবে সড়কপথে আহওয়াজ খোররামশাহর মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাওয়ার কথা বলা হয়। দ্বিতীয় প্রস্তাবে কারুন নদী পার হয়ে শত্রুকে কিংকর্তব্যবিমূঢ় করে দেয়ার দাবি জানানো হয়। দু’টি প্রস্তাবেরই বেশ কিছু ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিক ছিল এবং সেগুলো বিবেচনা করে কারুন নদী পার হওয়ার প্রস্তাব চূড়ান্ত কৌশল হিসেবে গৃহিত হয়।
কারুন নদী পার হওয়ার প্রস্তাবের সবচেয়ে বড় নেতিবাচক দিক ছিল এই নদীর ওপর তাৎক্ষণিকভাবে সেতু নির্মাণ করে যোদ্ধাদেরকে নদীর ওপারে নিয়ে যাওয়া। অন্যদিকে ইতিবাচক দিক ছিল এই যে, এই নদী পার হতে পারলে অতি দ্রুততম সময়ের মধ্যে শত্রুকে বুঝে উঠতে দেয়ার আগেই তার সমরসজ্জার মূল কেন্দ্রে আঘাত হানা সম্ভব। মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাওয়র যে প্রস্তাব সেনাবাহিনী দিয়েছিল সেটি ছিল প্রচলিত রণকৌশল। স্বাভাবিকভাবেই ইরাকি সেনাদের পক্ষে প্রচলিত রণকৌশল উপলব্ধি করে তার জবাব দেয়াও ছিল সহজ। কিন্তু আইআরজিসি’র পক্ষ থেকে নদী পার হওয়ার যে প্রস্তাব দেয়া হয় তা ছিল অপ্রচলিত ধারনা। কোনো সামরিক বাহিনীই যেহেতু এ ধরনের পরিকল্পনা করে না তাই ইরাকি বাহিনীও এ ধরনের আক্রমণ ঠেকানোর প্রস্তুতি নেবে না এটাও ছিল স্বাভাবিক।
আইআরজিসি’র তৎকালীন কমান্ডার মোহসেন রেজায়ি এ সম্পর্কে বলেন: “আমাদের দক্ষ ও পরীক্ষিত সেনা কমান্ডাররা কোনোভাবেই নদী পার হওয়ার পরিকল্পনা মেনে নিতে চাননি। তারা আহওয়াজ-খোররামশাহর মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাওয়ার পক্ষপাতী ছিলেন। কিন্তু আমরা নদী পার হওয়ার ওপর জোর দেই।”
সম্ভাব্য এ অভিযান সম্পর্কে আইআরজিসি’র রণকৌশলবিদ শহীদ জেনারেল হাসান বাকেরি বলেন: “আমরা তাৎক্ষণিকভাবে কারুন নদীর উপর নির্মাণ করার মতো দুই ধরনের সেতু নিয়ে আলোচনা করি। আমরা ব্যাপক আলোচনা-পর্যালোচনার করার পর এই সিদ্ধান্তে উপনীত হই যে, সেতু নির্মাণ করে নদী পার হওয়া ঝুঁকিপূর্ণ হলেও এতে সফলতার সম্ভাবনা অনেক বেশি।
ওদিকে, ইরাকি বাহিনী জানত যে, ইরান আরেকটি অভিযান পরিচালনার প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু কখন কীভাবে ওই অভিযান চালানো হবে সে সম্পর্কে কোনো ধারনা আগ্রাসী বাহিনীর ছিল না। এ কারণে তারা সম্ভাব্য প্রতিটি ফ্রন্টের প্রতিরোধ ক্ষমতা শক্তিশালী করেছিল। খোররামশাহরের আবাসিক এলাকা গুঁড়িয়ে দিয়ে সেনা ছাউনি নির্মাণের কাজে জোরেসোরে চালাচ্ছিল ইরাকের সাদ্দাম বাহিনী। ফলে ডিনামাইট দিয়ে আবাসিক ভবনগুলো ধ্বংস করে ফেলার বিকট শব্দ কারুন নদীর পূর্ব পার্শ্বে বসে ইরানি যোদ্ধারা স্পষ্ট শুনতে পেতেন। সেইসঙ্গে ইরাকি বাহিনী শহরের পূর্ব ও উত্তর অংশে ব্যাপকভাবে মাইন বসানোর কাজ চালিয়ে যায় যাতে ওই দুই অংশ দিয়ে ইরানি যোদ্ধারা শহরে প্রবেশ করতে না পারে।
পাশাপাশি ইরানি যোদ্ধারা যাতে রাতের অন্ধকারে হেলিকপ্টারে করে এসে বিপুল সংখ্যায় সেনা সমাবেশ ঘটাতে না পারে সেজন্যও ইরাকি সেনারা প্রস্তুতি নিয়েছিল। ইরানি যোদ্ধারা যাতে কোনোভাবেই খোরররামশাহর পুনরুদ্ধার করতে না পারে সেজন্য সাদ্দাম বাহিনী গোটা শহরকে সেনানিবাসে পরিণত করে ফেলেছিল।
তো শ্রোতাবন্ধুরা, আজকের আসরের সময়ও ফুরিয়ে এসেছে। এবার বিদায় নিতে হবে। আগামী আসরে আমরা খোররামশাহর মুক্ত করার অভিযানের প্রস্তুতি নিয়ে আরো কথা বলব। সেইসঙ্গে সময় থাকলে ইরাকি বাহিনীর শহর রক্ষার প্রস্তুতি নিয়েও খানিকটা আলোচনা করব। সে আসরেও আপনাদের সঙ্গ পাওয়ার আশা রাখছি। #
পার্সটুডে/মুজাহিদুল ইসলাম/ মো: আবু সাঈদ / ৩
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।