পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব (পর্ব-২)
ইরানের বিখ্যাত ব্যক্তিত্বদের পরিচিতি তুলে ধরার আগে আমরা বিশ্ব সভ্যতায় ইরানের ঐতিহাসিক অবস্থান ও গুরুত্ব সংক্রান্ত সংক্ষিপ্ত পটভূমি এবং বিশেষ করে ইরানের আধ্যাত্মিক ও বস্তুগত ঐতিহ্য তুলে ধরার চেষ্টা করেছি 'পারস্যের প্রতিভা বিশ্বের গর্ব' শীর্ষক ধারাবাহিকের গত পর্বে। এ পর্বে আমরা ইরানের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের পটভূমিসহ প্রাসঙ্গিক আরো কিছু গুরুত্বপূর্ণ কথা তুলে ধরব।
বিশ্বসভ্যতায় ইরানের প্রভাব ও অবদানকে দু'ভাগে ভাগ করা যায়। প্রথমত: নানা দেশের ভৌগোলিক গণ্ডিতে প্রত্যক্ষ শাসনের ফলে সৃষ্ট প্রভাব। দ্বিতীয়ত: ইরানি মনীষীদের মাধ্যমে বিশ্বের সাংস্কৃতিক অঙ্গনে প্রভাব বা অবদান রাখা যার কোনো নির্দিষ্ট ভৌগোলিক বা সময়ের সীমারেখা নেই।
অনেকের মতে, ইরানের প্রাচীন যুগের হাখামানেশিয় সাম্রাজ্য ছিল বিশ্বের প্রথম বৃহৎ সাম্রাজ্য। ইরান এক হাজার একশত বছরেরও বেশি সময় পর্যন্ত ছিল বিশ্বের প্রধান পরাশক্তি। ইরানের হাখামানেশিয় রাজারা শাসন করেছেন ২২০ বছর, আশকানিয়ান শাসকরা শাসন করেছেন ৪৭৬ বছর এবং সাসানিয়দের শাসন টিকে ছিল ৪২৮ বছর পর্যন্ত। ইরান প্রাচীনকাল থেকেই ছিল বিশ্বের অন্যতম প্রধান সভ্যতা ও অন্যান্য সভ্যতাগুলোর কেন্দ্রস্থলের আশপাশের দেশ। আর তাই এটি হতে পেরেছে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য এবং বিশ্বের উত্তর ও দক্ষিণাঞ্চলের সাংস্কৃতিক বন্ধনসহ নানা বিষয়ের সংযোগ সেতু। হাখামানেশীয় সম্রাটরা যখন বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য প্রতিষ্ঠা করেন তখন থেকেই ইরানিরা বিশ্বরাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার স্বপ্ন দেখেছে। বিষয়টি কেবল হাখামানেশীয় সম্রাট কুরুশ বা সাইরাস দ্য গ্রেটের নীতিতেই নয় ইরানিদের আধ্যাত্মিক রহস্যবাদেও ফুটে উঠেছে।
ইরানিরা ইসলামের আবির্ভাবের পর রাজনৈতিক সাম্রাজ্যের পরিবর্তে সাংস্কৃতিক সাম্রাজ্যের বিস্তার ঘটায়। এই নতুন সাম্রাজ্য বিস্তৃত হয়েছিল একদিকে চীন থেকে ভূমধ্যসাগরীয় অঞ্চল এবং অন্যদিকে ভারত উপমহাদেশ থেকে দক্ষিণে রাশিয়া পর্যন্ত। এই সাম্রাজ্যের নানা ক্ষেত্রে বিশেষ করে শিল্প-সাহিত্য এবং চিন্তাগত ক্ষেত্রে ইরানি মনীষীরা উপহার দিয়েছেন বিশ্বে বৃহ্ত্তম নানা অবদান। ইরানিরা প্রাচীন যুগ থেকেই ছড়িয়ে পড়ে বিশ্বের নানা অঞ্চলে। তারা সব যুগেই তাদের এই গতিশীলতা বজায় রেখেছে এবং বিনিময়ে পেয়েছে ব্যাপক প্রাণ-প্রাচুর্য।
ইরানিরা জাতিগতভাবে আর্য। ইরানি আর্যদের একটি শাখা ভারতেও রয়েছে। ইরানিদের পূর্বপুরুষরা খ্রিস্টপূর্ব দ্বিতীয় সহস্রাব্দের শেষের দিকে তাদের মূল ভূখণ্ড তথা মধ্য-এশিয়ার সর্ব-উত্তরের শীত-প্রধান অঞ্চল থেকে ধীরে ধীরে অপেক্ষাকৃত উষ্ণতর অঞ্চলের দিকে অর্থাৎ উত্তর থেকে ক্রমেই দক্ষিণের দিকে অভিবাসন করতে থাকে। তারা কাস্পিয়ান সাগরের উত্তর-পূর্ব দিক ও পশ্চিম দিক দিয়ে ইরান উপত্যকায় প্রবেশ করে। ফরাসি ইতিহাসবিদ (Roman Ghirshman) রোমান গিরশম্যানের মতে অন্যান্য জাতিগুলোর মতো ইরানিদের এই হিজরত স্বেচ্ছায় ঘটেনি, বরং প্রবল শীত ও অন্য জাতিগুলোর চাপ ছিল এর কারণ।
আর্যরা প্রথমে সুগ্বদিনা তথা সমরখন্দ, বোখারা ও মুর্গিয়ানা বা মার্ভ অঞ্চলে আসে। কিন্তু শত্রু বা প্রতিদ্বন্দ্বি গোত্রগুলো ও পঙ্গপালের উপদ্রুপের কারণে তারা আরো দক্ষিণে তথা বালখ এবং এরপর খোরাসানে পৌঁছে। আর এখান থেকেই তারা ইরানের নানা অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়ে।
আর্যদের একটি গ্রুপ ইরান অঞ্চলে আসলেও তাদের আরেকটি গ্রুপ বা শাখা ছিল শক জাতি। এরা ছিল অত্যাচারি ও লুটেরা এবং সভ্যতাগুলোর ওপর হামলা চালাতে অভ্যস্ত। তারা সাধারণত একই অঞ্চলে তাঁবুতে বসবাস করত। এই অঞ্চলগুলো ছিল অপেক্ষাকৃত বেশি দক্ষিণে ও পশ্চিমে। যুদ্ধ ও লুটপাটই ছিল তাদের মূল পেশা। কিন্তু বহিরাগত আর্যরা তথা বর্তমান ইরানিদের পূর্বপুরুষরা ইরানের প্রাচীন অধিবাসীদের আধা-কৃষি-ভিত্তিক এবং ইরানের একই অঞ্চলে বসবাসের সংস্কৃতিকে মেনে নেয়। তারা স্থানীয়দের অনার্য সংস্কৃতিগুলোও মেনে নেয় এবং এসবের সহযোগী হয়। ফলে লুটেরা ও মরুচারি শকদের পরিণতির চেয়ে তাদের পরিণতি হয় ভিন্ন। উল্লেখ্য শকদের মধ্যেও আর্য-রক্তের প্রাধান্য ছিল।
ইরানে আর্যদের প্রবেশ শুরু হয়েছিল ‘মদ’ গোত্রের প্রবেশের মধ্য দিয়ে। তারা প্রথমে তেহরান-সংলগ্ন রেই শহর এবং হামেদানে বসবাস করতে থাকে। তারা খুজিস্তানের ইলামি সভ্যতা এবং মেসোপটেমিয়া বা ইরাক অঞ্চলের সঙ্গেও সম্পর্ক গড়ে তোলে। মদদের মূল অংশ প্রথম দিকেই অনার্যদের সঙ্গে মিশে যায় এবং তারা স্থানীয় গোত্রগুলোর সঙ্গে যুদ্ধ করার পরিবর্তে তাদেরকে নিজেদের দিকে আকৃষ্ট করে।
আর্যরা ইরানের প্রাচীন আদিবাসীদেরকে উন্নত শহুরে ও কৃষি-সভ্যতার অধিকারী হিসেবে দেখতে পেয়েছিল। তাদের সেচ-ব্যবস্থাও ছিল উন্নত। কয়েক হাজার বছর পর্যন্ত তারা এ ধরনের উন্নত সেচ-ব্যবস্থাকে টিকিয়ে রেখেছিল। ইরানের ইতিহাস শীর্ষক কেমব্রিজের একটি বইয়ে বলা হয়েছে, ইরানে আর্যদের আগমনের বহু আগেই স্থানীয় অধিবাসীরা খ্রিস্টপূর্ব ৮ সহস্রাব্দ পর্যন্ত একই অঞ্চলে বসবাসের সংস্কৃতিতে অভ্যস্ত ছিল।
ইরান উপত্যকার আদিবাসীরা পশু পালন করত ও নানা ধরনের গাছ বা উদ্ভিদ রোপণ করত। ইরানের জবুল অঞ্চলের পোড়া শহরটির ধ্বংসাবশেষ থেকেও এইসব তথ্যের সত্যতা প্রমাণিত হয়েছে। প্রায় চার হাজার বছরের পুরনো এই শহরটি বিস্তৃত ছিল কয়েক হাজার হেক্টর জুড়ে। সেখানে ছিল পোড়া মাটির পাইপযোগে পানি সরবরাহের ব্যবস্থা ও শ্রম-বিভাজন। আর্থার পোপের মত গবেষকদের মতে, সে সময় কৃষি-শিল্প, মাটির পাত্র নির্মাণ ও বুনন শিল্পও বিকশিত হয়েছিল। ইরানের সেই সভ্যতা ছিল মিশরীয় সভ্যতার চেয়ে ৫০০ বছরেরও বেশি পুরনো এবং ভারতীয় সভ্যতার চেয়ে ১ হাজার বছরেরও বেশি ও চীনের সভ্যতার চেয়ে দুই হাজার বছরের বেশি পুরোনো।
অতীতে ইরানের আধা-মরুময় অঞ্চলে এখনকার চেয়ে অনেক বেশি মানুষ বসবাস করত। একই অঞ্চলে বসবাসের সংস্কৃতি জোরদার হওয়ায় এবং কৃষি ও পশুপালনের সুবিধার জন্য ইরান অঞ্চলে সরকার ও নানা শহর গড়ে ওঠে। কৃষি-ভিত্তিক এইসব সমাজ বা শহর গোত্রগুলোর ওপর নির্ভরশীল থাকেনি, বরং একই রাষ্ট্রের জাতীয় চেতনা লালন করত।
খ্রিস্টপূর্ব প্রথম সহস্রাব্দে পারসিকরা বিশ্বের বৃহত্তম সাম্রাজ্য গড়ে তুলেছিল। তারা বসবাস করত পশ্চিম ইরানের উরুমিয়া হ্রদের আশপাশে। অবশ্য পরে তারা ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে বা বর্তমান ফার্স অঞ্চলে হিজরত করে। তাদের এই হিজরতের কারণ এখনও জানা যায়নি। যাই হোক তারা ‘মদ’দের দিয়ে এক পুতুল সরকার গড়ে তোলে। জাতিগত ও সাংস্কৃতিক- এ উভয় দিক থেকেই মদদের সঙ্গে পর্স বা পারসিকদের আত্মীয়তা ছিল। এ উভয় গোত্রের মধ্যেই নানা ধরনের বিপুল বন্ধন থাকায় অনেক ঐতিহাসিকই মদ ও পর্সদের শাসনামলকে একই যুগ হিসেবে বর্ণনা করে থাকেন।
মদ ও পর্স বা পারসিকরা ইরানে আসার পর স্থানীয় সভ্যতাগুলোকে ধ্বংসের চেষ্টা করেনি, বরং স্থানীয় সভ্যতাগুলোর সহযোগী হয় যা ছিল প্রচলিত প্রথার বিপরীত। তারা স্থানীয়দের জন্য সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলে। ইলামিরা হাখামানেশীয় সাম্রাজ্যের স্বর্ণযুগে ‘মদ’দের মতোই পারসিকদের সহযোগী ছিল বলে জানা যায়।#