ইমাম হাসান (আ)’র বেদনাবিধুর শাহাদাত
https://parstoday.ir/bn/radio/religion_islam-i74779-ইমাম_হাসান_(আ)’র_বেদনাবিধুর_শাহাদাত
২৮ সফর ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে শোকাবহ দিন। কারণ দশম হিজরির এই দিনে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং চল্লিশ বছর পর ৫০ হিজরির একই দিনে শাহাদত বরণ করেন তাঁরই প্রথম নাতি হযরত ইমাম হাসান (আ)।
(last modified 2025-11-28T10:09:50+00:00 )
অক্টোবর ২৬, ২০১৯ ১৮:৩০ Asia/Dhaka

২৮ সফর ইসলামের ইতিহাসের সবচেয়ে শোকাবহ দিন। কারণ দশম হিজরির এই দিনে দুনিয়া থেকে বিদায় নেন সর্বকালের সর্বশ্রেষ্ঠ মহামানব বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ (সা) এবং চল্লিশ বছর পর ৫০ হিজরির একই দিনে শাহাদত বরণ করেন তাঁরই প্রথম নাতি হযরত ইমাম হাসান (আ)।

মহানবী (সা.)-এর প্রিয় প্রথম নাতি তথা আমিরুল মুমিনীন হযরত আলী (আ.) ও হযরত ফাতেমা (সালামুল্লাহি আলাইহার.)-এর প্রথম সন্তান জন্ম নিয়েছিলেন তৃতীয় হিজরির পবিত্র রমজান মাসের ১৫ তারিখে। নবী করীম (সা.) অভিনন্দন জানাতে হযরত আলীর ঘরে এসেছিলেন। তিনি এ নবজাত শিশুর নাম আল্লাহর পক্ষ থেকে রাখেন হাসান যার আভিধানিক অর্থ সুন্দর বা উত্তম।

মহানবী (সা.)-এর সাথে তাঁর নাতীর জীবনকাল কেটেছে প্রায় সাত বছর। দয়াল নানা তাঁকে অত্যন্ত ভালবাসতেন। বহু বার তিনি নাতিকে কাঁধে নিয়ে বলেছেন : “হে প্রভু,আমি তাকে ভালবাসি। তুমিও তাকে ভালবাস।” তিনি আরো বলতেন : “যারা হাসান ও হুসাইনকে ভালবাসবে তারা আমাকেই ভালবাসলো। আর যারা এ দুজনের সাথে শত্রুতা করবে তারা আমাকেই তাদের শত্রু হিসাবে গণ্য করলো।”   “হাসান ও হুসাইন বেহেশতের যুবকদের নেতা।”   তিনি আরো বলেছেন,“আমার এই দু’নাতি উভয়ই মুসলমানদের ইমাম বা নেতা চাই তারা তাগুতি শক্তির বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়াক বা না দাঁড়াক।”

হযরত ইমাম হাসান (আ) এতটা মহান ব্যক্তিত্বের অধিকারী ছিলেন এবং তাঁর রুহ এতটা নিষ্কলুষ ছিল যে রাসূল (সা.) তাঁকে শৈশবেই অনেক চুক্তি-পত্রের মধ্যে সাক্ষী হিসেবে মনোনীত করতেন। ঐতিহাসিক ওয়াকেদী তার কিতাবে লিখেছেন : “রাসূল (সা.) ছাকিফ গোত্রের সাথে ‘জিম্মি চুক্তি’ স্বাক্ষর করেন। এ চুক্তিপত্র খালিদ বিন সাঈদ লিখেন আর ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইন (আ.) সে পত্রে স্বাক্ষর করেন।” 

 যখন আল্লাহর নির্দেশে মহানবী (সা.) নাজরানের খৃস্টানদের সাথে মুবাহিলা করার সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন তখনও তিনি ইমাম হাসান,ইমাম হুসাইন,হযরত আলী ও হযরত ফাতেমাকে আল্লাহর নির্দেশক্রমে সঙ্গে নেন এবং সুরা আহজাবের ৩৩ নম্বর আয়াত তথা তাতহীরের আয়াত তাদের পবিত্রতা ও নিষ্পাপতার ব্যাপারেই অবতীর্ণ হয়।

ইমাম হাসান (আ.) তাঁর পিতার পথে চলতেন এবং তাঁর সাথে ঐক্যমত্য পোষণ করতেন। পিতার সাথে তিনিও অত্যাচারীদের সমালোচনা এবং মজলুমদের সমর্থন করতেন।হিজরি ছত্রিশ সনে উষ্ট্রের যুদ্ধের আগুন নেভাতে  পিতার সাথে মদীনা হতে বসরায় আসেন ইমাম হাসান। বসরাতে প্রবেশের আগে তিনি হযরত আলীর নির্দেশে সম্মানিত সাহাবী হযরত আম্মার বিন ইয়াসিরকে সাথে নিয়ে জনগণকে সংঘবদ্ধ করতে কুফায় যান। এরপর জনগণকে সাথে নিয়ে ইমাম আলীকে সাহায্যের জন্যে বসরায় ফিরে আসেন। ইমাম হাসান তাঁর সুদৃঢ় ও প্রাঞ্জল বক্তৃতার মাধ্যমে 'ওসমান হত্যার সাথে হযরত আলী জড়িত'- এ অপবাদের  দাঁতভাঙ্গা জবাব দেন। ওই অপবাদ প্রচার করা হয়েছিল আবদুল্লাহ বিন যুবাইরের পক্ষ থেকে। তিনি এ যুদ্ধের শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত নানা বিষয়ে ব্যাপক সহযোগিতা করেন ও পরিশেষে বিজয়ী হয়ে কুফায় ফিরে যান।

ইমাম হাসান (আ) সিফফিনের যুদ্ধেও তাঁর পিতার সাথে অসামান্য ভূমিকা পালন করেছেন। এ যুদ্ধে মুয়াবিয়া তাঁর কাছে আবদুল্লাহ বিন ওমরকে এ কথা বলে পাঠায় যে,“যদি আপনার পিতার অনুসরণ থেকে বিরত থাকেন তাহলে আমরা আপনার পক্ষে খেলাফত ছেড়ে দেবো। কারণ,কোরাইশ গোত্রের লোকজন আপনার পিতার প্রতি তাদের পিতৃপুরুষদের হত্যার কারণে অসন্তুষ্ট। তবে তারা আপনাকে গ্রহণ করতে কোন আপত্তি করবেন না...।”

ইমাম হাসান (আ.) উত্তরে বলেন : “কোরাইশরা ইসলামের পতাকা ভূলুণ্ঠিত করতে দৃঢ়চিত্ত ছিল। তবে আমার বাবা আল্লাহর সন্তুষ্টি ও ইসলামের জন্যে তাদের মধ্যেকার অবাধ্য ও বিদ্রোহী ব্যক্তিদের হত্যা করে তাদের চক্রান্তকে নস্যাৎ করে দিয়েছিল। তাই তারা আমার পিতার বিরুদ্ধে শত্রুতার ঝাণ্ডা উত্তোলন করেছে।”

নবী করীম (সা.)-এর জীবিত অবস্থায় তাঁরই নির্দেশ অনুযায়ী হযরত আলী (আ.)  নিজের ইন্তেকালের সময় ইমাম হাসানকে তাঁর খেলাফতের উত্তরাধিকারী হিসেবে মনোনীত করেন। তিনি ইমাম হুসাইন (আ.) ও তাঁর অন্যান্য সন্তানদের এবং তাঁর উচ্চপদস্থ অনুসারীদের এ বিষয়ে সাক্ষী রাখেন।

মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআনে বলেছেন: 'তিনিই তাঁর রাসূলকে পথনির্দেশ ও সত্যধর্মসহ প্রেরণ করেছেন যাতে একে সমুদয় ধর্মের ওপর বিজয়ী করেন, যদিও অংশীবাদীরা তা অপছন্দ করে। সূরা সাফ:৯

আল্লাহর রাসূল(সা.)এর তিরোধানের পর মহান ইমামগণ এ লক্ষ্যকে সামনে রেখেই তাঁদের কর্ম নির্ধারণ করেছেন। তাই যদিও ইমামদের কর্মপদ্ধতির মধ্যে পার্থক্য ছিল কিন্তু সেটি তার পরিবেশ ও পরিস্থিতির দাবিতেই ছিল, কখনও তা তাদের বৈশিষ্ট্যগত তফাত থেকে উদ্ভূত ছিল না। তাই এ ধারণা ঠিক নয় যদি ইয়াজিদের সময় ইমাম হাসান জীবিত থাকতেন তবে তিনি সন্ধির নীতি গ্রহণ করতেন কিংবা এমনও নয় যে, তিনি যুদ্ধ পছন্দ করতেন না বলে শান্তিপূর্ণ পথকে প্রাধান্য দিতেন। 

আসলে মৌলিক বৈশিষ্ট্যের দিক থেকে ইমাম হাসান ও ইমাম হোসাইন উভয়েই একরূপ ছিলেন এবং নীতির ক্ষেত্রেও তাঁদের মধ্যে অভিন্নতা ছিল। তাঁরা উভয়েই একদিকে অত্যন্ত সাহসী ও অন্যদিকে বীর যোদ্ধা ছিলেন। নাহজুল বালাগার ২০৭ নং খুতবায় হজরত আলীর বক্তব্য থেকে বোঝা যায় যে, তিনি সিফফিনের যুদ্ধে ইমাম হাসানের দুঃসাহসিকতায় এতটা শঙ্কিত হন যে স্বীয় সঙ্গীদের বলেন : ‘হাসানকে এভাবে মরিয়া হয়ে যুদ্ধ করা থেকে নিবৃত কর আমি তাকে হারানোর আশঙ্কা করছি।’ তাই নিঃসন্দেহে বলা যায় মুয়াবিয়ার সাথে তিনি সঙ্গীদের অসহযোগিতার কারণে সন্ধি করতে বাধ্য হন, ভীরুতার কারণে নয়। ঐতিহাসিক মাসউদী তার ‘ইসবাতুল ওয়াসিয়া’ গ্রন্থে ইমাম হাসানের যে বক্তব্যটি উল্লেখ করেছেন তাতে তিনি বলেছেন : ‘আমি যদি উপযুক্ত সঙ্গী পেতাম তবে খেলাফত লাভের জন্য এমন বিপ্লব ও আন্দোলন করতাম যে কেউ তার নজির দেখেনি।’

দ্বিতীয়ত মুয়াবিয়ার বাহ্যিক ধার্মিকতার বিষয়টি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার বৈধতাকে জনগণের সামনে স্পষ্ট করা বেশ কঠিন ছিল। একারণে আমরা দেখি ইমাম হাসানের মৃত্যুর পর মুয়াবিয়া দশ বছর জীবিত থাকলেও ইমাম হুসাইন তার বিরুদ্ধে আন্দোলনের আহ্বান জানাননি। এর বিপরীতে ইয়াজিদের সময় যেভাবে অধার্মিকতা প্রকাশ্য রূপ লাভ করেছিল ইমাম হাসানের জীবদ্দশায় এরূপ অবস্থার সৃষ্টি হলে সেক্ষেত্রে তিনিও বিন্দুমাত্র দ্বিধা না করে ইমাম হুসাইনের মতই বিদ্রোহ করতেন।

আল্লাহ রাব্বুল আ’লামিনের প্রতি ইমাম হাসানের এক বিশেষ অনুরাগ ছিল। এই আসক্তির বহিঃপ্রকাশ ওযুর সময় অনেকে তাঁর চেহারায় দেখেছেন। যখন তিনি ওযুতে মগ্ন হতেন তখন তাঁর চেহারা বিবর্ণ হয়ে যেতো, তিনি ভয়ে কাঁপতে থাকতেন। যখনি তিনি মৃত্যু ও কিয়ামতের কথা স্মরণ করতেন,তখনি ক্রন্দন করতেন এবং বেহুঁশ হয়ে পড়তেন।   তিনি পদব্রজে আবার কখনো নগ্নপদে পঁচিশ বার আল্লাহর ঘর যিয়ারত তথা হজ করেন।

ইমাম হাসান (আ) ছিলেন খুবই দানশীল। তিনি জীবনে তিনবার তাঁর যা কিছু ছিল, এমন কি জুতো পর্যন্ত দু’অংশে ভাগ করে আল্লাহর পথে দান করে দেন।

ইমাম হাসান (আ) ছিলেন ধৈর্য ও সহনশীলতার প্রতীক। 

মারওয়ান বিন হাকাম, যে ব্যক্তি ইমামকে বিরক্ত ও কষ্ট দেয়ার ব্যাপারে কোন কিছুই বাকী রাখেনি ইমাম হাসান (আ.)-এর ইন্তেকালের সময় তাঁর জানাযায় অংশ গ্রহণ করে। হযরত ইমাম হুসাইন (আ.) বলেন : আমার ভাইয়ের জীবদ্দশায় তাঁর সাথে আপনি যা মন চেয়েছে তাই করেছেন আর এখন তাঁর জানাযায় অংশ গ্রহণ করেছেন এবং কাঁদছেন?

মারওয়ান উত্তর দেয় : “যা কিছু করেছি তা এমন এক মহান ব্যক্তির সঙ্গে করেছি যার সহনশীলতা মদীনার এই পাহাড়ের চেয়েও অনেক বেশি ছিল।”

মুয়াবিয়া ইমামের বয়সের স্বল্পতার অজুহাত দেখিয়ে খেলাফত ইমামের হাতে সোপর্দ করতে প্রস্তুত ছিল না, সে তার নাপাক ও নোংরা পুত্র ইয়াজিদের জন্যে পরবর্তী শাসন কর্তৃত্ব পাকা-পোক্ত করতে কোমর বেঁধে লেগে যায় যেন তার খেলাফতের ক্ষেত্রে কোন অসুবিধা দেখা না দেয়। কিন্তু সে তার এই অভিসন্ধি চরিতার্থ করার পথে ইমাম হাসানকে এক মস্ত বড় বাধা হিসেবে মনে করে। কারণ সে ধারণা করেছিল যদি তার মৃত্যুর পর ইমাম হাসান জীবিত থাকেন তাহলে সম্ভবত জনগণ যেহেতু মুয়াবিয়ার পরিবারের ব্যাপারে অসন্তুষ্ট তাই তারা ইমাম হাসানের দিকে ঝুঁকে যেতে পারে। তাই সে কয়েক বার ইমামকে হত্যার চেষ্টা করে। অবশেষে চক্রান্ত করে পবিত্র ইমামকে বিষ প্রয়োগে শহীদ করে। তিনি পঞ্চদশ হিজরির সফর মাসের আটাশ তারিখে শাহাদাতের সুধা পান করে চির-নিদ্রায় শায়িত হন। তাঁকে জান্নাতুল বাকীর কবরস্থানে দাফন করা হয়। আল্লাহর অফুরন্ত দরুদ তাঁর উপর বর্ষিত হোক।#

পার্সটুডে/মু.আ.হুসাইন/মো.আবুসাঈদ/  ২৬

খবরসহ আমাদের ওয়েবসাইটে প্রকাশিত সব লেখা ফেসবুকে পেতে এখানে ক্লিক করুন এবং নোটিফিকেশনের জন্য লাইক দিন