ভারতে কুরআন-বিদ্বেষী রিট ও বাংলাদেশে ফের্কাবাজী একই ষড়যন্ত্রের অংশ?!
https://parstoday.ir/bn/radio/religion_islam-i88920-ভারতে_কুরআন_বিদ্বেষী_রিট_ও_বাংলাদেশে_ফের্কাবাজী_একই_ষড়যন্ত্রের_অংশ_!
ভারতে পবিত্র কুরআনের জিহাদ সংক্রান্ত ২৬ আয়াত বাদ দেয়ার ধৃষ্টতাপূর্ণ উদ্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আলেম সমাজের প্রতিবাদ ও নিন্দা অব্যাহত রয়েছে। এ পদক্ষেপের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি একে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের উস্কানিমূলক তৎপরতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম মুনীর হুসাইন খান।
(last modified 2026-03-14T11:23:49+00:00 )
মার্চ ২০, ২০২১ ১২:২৪ Asia/Dhaka
  • ভারতে কুরআন-বিদ্বেষী রিট ও বাংলাদেশে ফের্কাবাজী একই ষড়যন্ত্রের অংশ?!

ভারতে পবিত্র কুরআনের জিহাদ সংক্রান্ত ২৬ আয়াত বাদ দেয়ার ধৃষ্টতাপূর্ণ উদ্যোগের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের আলেম সমাজের প্রতিবাদ ও নিন্দা অব্যাহত রয়েছে। এ পদক্ষেপের নিন্দা জানানোর পাশাপাশি একে কেন্দ্র করে বাংলাদেশে শিয়া-সুন্নি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্টের উস্কানিমূলক তৎপরতার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ ও আলেম মুনীর হুসাইন খান।

 এ বিষয়ে তার একটি বিশেষ সাক্ষাৎকার এখানে তুলে ধরা হল: 

প্রশ্ন: জনাব মুনীর হুসাইন খানভারতে পবিত্র কুরআনের ২৬টি আয়াত বাদ দেয়ার যে উদ্যোগ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টে রিট হয়েছে সে বিষয়ে আপনার বক্তব্য শুনতে চাই। এই উদ্যোগের লক্ষ্য বা উদ্দেশ্যগুলো কি হতে পারে?

উত্তরে জনাব মুনীর হুসাইন খান: বিসমিল্লাহির রাহমানির রাহিম। ভারতে পবিত্র কুরআন থেকে ( ইসলাম-বিদ্বেষী একদল লোকের মতে ) সন্ত্রাসবাদের প্রসারে সহায়ক এমন ২৬ আয়াত ( জিহাদের আয়াত সমূহ ) বাদ দেয়ার জন্য সুপ্রিম কোর্টে রিট করেছে জনৈক ওয়াসিম রিযভী নামের  এক পথভ্রষ্ট অভিশপ্ত ( মাল'ঊন ) ধর্মচ্যুত মুরতাদ এক ব্যক্তি। তার ( রিযভী ) মতে এই ২৬ আয়াত প্রথম, ২য় ও ৩য় খলিফা পবিত্র কুরআনে সংযোজন করেছিলেন ইসলাম ধর্মকে জোর করে প্রচার করার লক্ষ্যে। আর এই ২৬ আয়াত নাকি সন্ত্রাসবাদের শিক্ষা, লালন ও বিস্তৃতির জন্য অত্যন্ত সহায়ক ও উপযোগী !!!!

 আসলে এটা হচ্ছে এক নতুন ষড়যন্ত্র ইসলামের বিরুদ্ধে যা কতিপয় মুসলমান নামধারী পথভ্রষ্ট  সেক্যুলার তথা রাষ্ট্রীয় ক্ষেত্রে ধর্মকে উপেক্ষা করার নীতিতে বিশ্বাসী একদল  ব্যক্তির মাধ্যমে বাস্তবায়নের চেষ্টা চালাচ্ছে দুশমনরা। তাদের লক্ষ্য হচ্ছে পবিত্র কুরআনকে বিকৃত বা তাহরীফ-হওয়া ধর্মগ্রন্থ বলে প্রচার করা। এ ছাড়াও এটা প্রচার করা যে শিয়া মুসলমানরা বিশেষ করে পাক ভারত উপমহাদেশে শিয়া মুসলমানরা কুরআন তাহরীফে ( বিকৃতি ) বিশ্বাসী এবং বিশ্বব্যাপী ও বিশেষ করে এই অঞ্চলে শিয়া সুন্নী সাম্প্রদায়িক দ্বন্দ্ব-সংঘাত খুব ভালোভাবে উস্কে দেয়া তাদের অন্যতম লক্ষ্য। আর সার্বিকভাবে ইসলাম ধর্ম ও পবিত্র কুরআন মজীদকে সন্ত্রাসবাদের হোতা ও দোসর এবং মুসলমানদেরকে সন্ত্রাসী ও সন্ত্রাসবাদী দেখিয়ে বিশ্বব্যাপী ইসলামের উত্থান, অগ্রযাত্রা ও প্রসার স্তব্ধ করে দিতে চাচ্ছে ইসলামের দুশমনরা।

আর এসব অশুভ লক্ষ্যেই ভারতের সুপ্রিম কোর্টে পবিত্র কুরআন থেকে ২৬ আয়াত বাদ দেয়ার রিট করানো হয়েছে। ইসলাম ও মুসলমানদের বিরুদ্ধে এ ষড়যন্ত্রের পিছনে রয়েছে ইসলামের চির-দুশমন পাশ্চাত্য বিশেষ করে ব্রিটেন ও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইহুদিবাদী ইসরাইল ও ভারতের উগ্র হিন্দুত্ববাদী চক্র। ইসরাইলের সাথে হিন্দুত্ববাদী মোদী প্রশাসনের রয়েছে অত্যন্ত মধুর ঘনিষ্ঠতা। এমনকি এই রিট ভারতে শিয়া সুন্নী নির্বিশেষে সংখ্যালঘু বিশাল মুসলিম জনগোষ্ঠীকে সন্ত্রাসবাদী বলে চিহ্নিত করে তাদেরকে নাগরিক সুযোগ-সুবিধা ও অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অশুভ চেষ্টাও হতে পারে। তাই ভারতে ভবিষ্যতে হয়তো সার্বিকভাবে মুসলিম নিধন ও নির্যাতন ভয়ানকভাবে বাড়তে পারে। এ ব্যাপারে সবার উচিত সজাগ দৃষ্টি রাখা ও অত্যন্ত সতর্ক হওয়া।

নিঃসন্দেহে অনেকটা অভিনব বা নতুন ধরনের এই ষড়যন্ত্র ইসলামের শত্রুদেরই পরিকল্পিত ষড়যন্ত্র । অতএব সাবধান।

প্রশ্ন: জনাব মুনীর হুসাইন খান, পবিত্র কুরআন যে অবিকৃত তার কি কোনো প্রমাণ ও যুক্তি দেখাতে পারবেন এবং এ ব্যাপারে শিয়া ও সুন্নি  উভয় মাযহাবেই কি ঐক্যমত্য রয়েছে? 

উত্তরে জনাব মুনীর হুসাইন খান: শিয়া - সুন্নী নির্বিশেষে সকল ইসলামী ফির্কা ও মাযহাব অকাট্য ঐকমত্য ( ইজমা ও ইত্তিফাক ) পোষণ করে যে পবিত্র কুরআন অবিকৃত ( বিশুদ্ধ , অক্ষত , সহীহ্ ও পবিত্র ) আসমানী কিতাব যা মহানবীর ( সা.) উপর যেভাবে নাযিল বা অবতীর্ণ হয়েছিল ঠিক হুবহু সেভাবে বিন্দুমাত্র পরিবর্তন, পরিবর্ধন , সংযোজন ও বিয়োজন অর্থাৎ কোনো ধরণের বিকৃতি ও তাহরীফ ছাড়াই  অকাট্য  মুতাওয়াতির তথা নিশ্চিত সূত্রে আমাদের কাছে পৌঁছেছে ।

তাই পৃথিবীর সকল মুসলিম ও অমুসলিম দেশে বিদ্যমান রাসূলুল্লাহর ( সা.) যুগ থেকে শুরু করে আজ হিজরী পঞ্চদশ শতাব্দী ( খ্রীষ্টীয় ২১শ শতাব্দী ) পর্যন্ত প্রতিটি শতাব্দীর লিখিত ও প্রকাশিত পবিত্র কুরআনের সব কপি বা অনুলিপি হুবহু একই অর্থাৎ এক ও অভিন্ন এবং এ সব কপির কোনো একটিতেও 'মত্‌ন্‌' বা মূল টেক্টৈর ভিন্নতা ও ইখতিলাফ বিদ্যমান নেই । আর এ থেকে প্রমাণিত হয় যে পবিত্র কুরআনের 'মত্‌ন্‌'  বা মূল টেক্সট  সব ধরণের তাহরীফ ( বিকৃতি অর্থাৎ পরিবর্তন, পরিবর্ধন, সংযোজন ও বিয়োজন ) থেকে মুক্ত, পবিত্র ও সংরক্ষিত ( মাহফূয্  ও মা'সূম )।  আর এটা হচ্ছে এ আসমানী গ্রন্থের ব্যবহারিক ও ঐতিহাসিক অবিকৃতি, পবিত্রতা ও বিশুদ্ধতা ( সিহ্‌হাত  ও সালামত )। সকল মহাদেশ অর্থাৎ এশিয়া, আফ্রিকা, ইউরোপ, আমেরিকা ও অস্ট্রেলিয়ায় পনেরো শতাব্দীর বিদ্যমান সকল কুরআনের 'মত্‌ন্‌'  বা মূল টেক্সট হুবহু এক ও অভিন্ন ।

এ ছাড়াও পবিত্র কুরআনের অবিকৃত ও বিশুদ্ধ থাকার ব্যাপারে বহু অগণিত সুনিশ্চিত বুদ্ধিবৃত্তিক তাত্ত্বিক যুক্তি ( বুরহান ) ও অকাট্য বৈজ্ঞানিক দলীল-প্রমাণ বিদ্যমান। এর জন্য উলূমুল কুরআনের ( পবিত্র কুরআন সংক্রান্ত জ্ঞান ও বিদ্যা সমূহ ) গ্রন্থাদি দ্রষ্টব্য। এ স্বর্গীয় গ্রন্থের বিশুদ্ধতা ও অবিকৃত থাকার জন্য ব্যস এতটুকুই যথেষ্ট যে এ গ্রন্থটির মূল টেক্সট বা 'মত্‌ন্‌' মহানবীর ( সা.) যুগ থেকে আমাদের যুগ পর্যন্ত সুদীর্ঘ এই ১৫ শতাব্দী যাবত বিশুদ্ধ, সম্পূর্ণ, অবিকৃত ও অপরিবর্তিত রয়েছে তা আমরা ইতোমধ্যে উল্লেখ করেছি। এ গ্রন্থের অনুপম, অভিনব, অপূর্ব - অলৌকিক ভাষা-শৈলী, সাহিত্যিক ও অলংকার শাস্ত্রীয় মান,  অন্তর্নিহিত বিষয়বস্তু, বিধি বিধান, শিক্ষা ও আদর্শের তাত্ত্বিক ও ব্যবহারিক গভীরতা, ব্যাপকতা,  চির-নবীনত্ব , বৈজ্ঞানিকত্ব ( ইল্মীয়ত ), যৌক্তিকতা, শৃঙ্খলা, সামঞ্জস্য, ভারসাম্য ও এ আসমানী গ্রন্থে মানব জীবনের সৌভাগ্যের সমুদয় সার্বিক দিক অর পর্যায়সহ এ সংক্রান্ত যাবতীয় সমস্যা সমাধানের মূল নীতিমালার বিদ্যমানতা প্রমাণ করে যে এ গ্রন্থটি বিশ্ব জগতের স্রষ্টা মহান আল্লাহরই গ্রন্থ তথা ঐশী বা ঐশ্বরিক গ্রন্থ যা মহান আল্লাহ কর্তৃক সর্বদা সংরক্ষিত ও  অবিকৃত ( মাহফূয ও মাসূম ) আছে ও থাকবে এবং দুনিয়ার কোনো শক্তি এর ধ্বংস ও বিকৃতি সাধন ( তাহরীফ ) করতে পারবে না। মহান আল্লাহর বাণী : নিশ্চয়ই আমরা এ গ্রন্থ ( পবিত্র কুরআন ) নাযিল করেছি এবং আমরাই এর সংরক্ষণকারী ( হাফিয )  ( সূরা  হিজর : ৯ )

إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّکْرَ وَ إِنَّا لَهُ لَحَافِظُوْنَ .

আর এ আয়াত থেকে স্পষ্ট প্রমাণিত হয় যে পবিত্র কুরআন থেকে কোনো সূরা, আয়াত, শব্দ বা  কালিমা এবং বর্ণ বা হরফ বাদ দেয়া ও বাদ পড়া অসম্ভব। কারণ সর্বশক্তিমান আল্লাহ পাক এ ঐশী আসমানী কিতাবের সংরক্ষণ ও হিফাযতের দায়িত্ব ও প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন ।

পবিত্র কুরআন সকল মানব ও জিন্ন্ জাতিকে এ গ্রন্থের ( পবিত্র কুরআন ) অনুরূপ গ্রন্থ, ১০ টি সূরা অথবা অন্ততঃ একটি সূরা রচনা করে আনার চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছে । পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে : 

قُلْ لَئِنِ اجْتَمَعَتِ الإِنْسُ وَ الْجِنُّ عَلَیٰ أَنْ یَأْتُوْا بِمِثْلِ هٰذَا الْقُرْآنِ لَا یَأْتُوْنَ بِمِثْلِهٖ وَ لَوْ کَانَ بَعْضُهُمْ لِبَعْضِهِمْ ظَهٍیْراً .

 বল : যদি এই কুরআনের অনুরূপ গ্রন্থ আনয়নের জন্য মানুষ ও জিন্ন্ জাতি সমবেত হয় এবং তারা পরস্পরকে সাহায্য করে তবুও তারা এর অনুরূপ (গ্রন্থ ) আনয়ন করতে পারবে না । ( সূরা বনী ইসরাইল : ৮৮ )

এবং 

وَ إِنْ کُنْتُمْ فِيْ رَیْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَیٰ عَبْدِنَا  فَأْتُوْا بِسُوْرَةٍ مِّنْ مِّثْلِهٖ ، وَ ادْعُوْا شُهَدَاءَکُمْ مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ إِنْ کُنْتُمْ صَادِقِیْنَ .

 فَإِنْ لَّمْ تَفْعَلُوْا وَ لَنْ تَفْعَلُوْا فَاتَّقُوْا النَّارَ الَّتِیْ وَقُوْدُهَا النَّارُ وَ الْحِجَارَةُ ، أُعِدَّتْ لِلْکَافِرِیْنَ . 

আমরা আমাদের বান্দার ( মুহাম্মদ সা. ) উপর যা অবতীর্ণ করেছি তাতে ( পবিত্র কুরআন ) তোমাদের কোনো সন্দেহ থাকলে তোমরা তার অনুরূপ কোনো সূরা আনয়ন কর এবং তোমরা যদি সত্যবাদী হও ( তোমাদের দাবীতে ) তবে আল্লাহ ছাড়া তোমাদের সকল সাক্ষীদেরকে বা সাহায্যকারীদের আহ্বান করা। যদি তোমরা ( আনয়ন ) না কর এবং কখনোই করতে পারবে না তবে সেই আগুনকে ভয় কর মানুষ এবং পাথর হবে যার ইন্ধন, সত্য প্রত্যাখ্যানকারীদের জন্য যা প্রস্তুত রয়েছে । ( সূরা বাক্বারা : ২৩ - ২৪ )

এবং  

أَمْ یَقُوْلُوْنَ افْتَرَاهُ ، قُلْ فَأْتُوْا بِسُوْرَةٍ  مِّثْلِهٖ وَ ادْعُوْا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ مِنْ دُوْنِ  اللّٰهِ إِنْ کُنْتُمْ صَادِقِیْنَ .

 

তারা কি বলে : " সে ( হযরত মুহাম্মদ সা. ) এটা তথা এই কুরআন নিজে রচনা করে মহান আল্লাহর ওপর মিথ্যা আরোপ করেছে ( এবং মুহাম্মাদ বলেছে : এটা - পবিত্র কুরআন - তাঁর উপর মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে নাযিল হয়েছে ) ? " বল: তবে তোমরা এর অনুরূপ একটি সূরাই আনয়ন বা রচনা কর এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য যাকে পার আহ্বান কর, যদি তোমরা সত্যবাদী হও । ( সূরা ইউনুস : ৩৮ )

 

এবং 

أَمْ یَقُوْلُوْنَ افْتَرَاهُ ، قُلْ فَأْتُوْا بِعَشْرِ سُوَرٍ  مِّثْلِهٖ مُفْتَرَیَاتٍ وَّ ادْعُوْا مَنِ اسْتَطَعْتُمْ  مِّنْ دُوْنِ اللّٰهِ إِنْ کُنْتُمْ صَادِقِیْنَ .

 

তারা কি বলে : " সে ( হযরত মুহাম্মদ  সা .) এটা ( পবিত্র কুরআন নিজে রচনা করে মহান আল্লাহর নামে চালিয়ে দিয়েছে অর্থাৎ ) মহান আল্লাহর উপর মিথ্যা

আরোপ করেছে ? " বল: তোমরা এর (পবিত্র কুরআন) অনুরূপ দশটি স্বরচিত সূরা আনয়ন কর এবং আল্লাহ ছাড়া অন্য যাকে পার ডেকে আন । (সূরা - ই হূদ: ১৩)

 

দীর্ঘ ১৫ শতাব্দী ধরে ইসলামের দুশমনরা বহু চেষ্টা চালিয়ে আজও মহান আল্লাহর এই চিরন্তন চ্যালেঞ্জকে বিন্দুমাত্র ম্লান করতে পারেনি। অথচ এই ১৫ শতাব্দীতে আরবী ভাষাভাষী মুসলিম কবি সাহিত্যিক ও পণ্ডিত ছাড়াও আরবী ভাষাভাষী বিপুল সংখ্যক খ্রীষ্টান, ইহুদী, সাবিয়ী ও নাস্তিক কবি, সাহিত্যিক ও পণ্ডিত আবির্ভূত ও গত হয়েছেন । কিন্তু তাদের কেউ পবিত্র কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও খণ্ডন করে পবিত্র কুরআনের সূরার অনুরূপ ও সদৃশ অন্ততঃ একটি সূরাও রচনা করে দেখাতে পারেননি । অথচ পবিত্র কুরআন ১৫ শতাব্দী ধরে মুসলমান, খ্রীষ্টান,  ইহুদী, সাবিয়ী ও নাস্তিক নির্বিশেষে সকল ( ৫০ কোটি ) আরবী ভাষাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে আরবী ভাষা, সাহিত্য ও অলংকার শাস্ত্রের সর্বোচ্চ নিদর্শন ও স্ট্যান্ডার্ড  বলে বিবেচিত।

ভারতে কুরআনের ২৬ আয়াত পরিবর্তনের রিট আবেদনকে বহুমুখী ষড়যন্ত্র বলে মনে করেন মুনীর হুসাইন খান 

 

 শুধু তাই নয় সমগ্র খ্রীষ্টান ইউরোপও এই দীর্ঘ ১৫ শতাব্দী ধরে ইসলাম ও পবিত্র কুরআনের সাথে পরিচিত। কৈ কোনো ইউরোপীয় খ্রীষ্টান, ইহুদী  ও নাস্তিক কবি, সাহিত্যিক ও পণ্ডিত পবিত্র কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ খণ্ডন করে এ গ্রন্থটির  আয়াত ও সূরার  সদৃশ ও অনুরূপ অন্তত একটি সূরাও রচনা করে দেখাতে পারেনি। আর এটা করতে পারলে তো তাদের জন্য সব ল্যাঠা ও ঝামেলাই চুকে যেত !!

আর তাই পবিত্র কুরআনের এ চ্যালেঞ্জ মোকাবেলা ও খণ্ডন করতে না পারা থেকে বুদ্ধিবৃত্তিকভাবে প্রমাণিত যে পবিত্র কুরআনের অনুরূপ সূরা বা আয়াত রচনা করা সম্ভব নয়। সুতরাং বিদ্যমান এই পবিত্র কুরআনের যাবতীয় আয়াত ও সূরা মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অবতীর্ণ ( নাযিল ) এবং সেগুলোর কোনো একটিও মানব রচিত নয় । আর এ থেকে এটাও প্রমাণিত যে পবিত্র কুরআন হযরত রাসূলুল্লাহর ( সা .) নুবুওয়ত ও রিসালাতের চিরস্থায়ী মুজিযা বা অলৌকিক নিদর্শন। তাই ২৬ টি আয়াত পরে এ গ্রন্থের সাথে সংযোজন করা হয়েছে বলে যে দাবী অভিশপ্ত কুলাঙ্গার ও ইসলাম থেকে খারিজ তথা মুর্তাদ মহাশয়তান ওয়াসীম রিযভী করেছে তা সম্পূর্ণ অসার, বানোয়াট ও ভিত্তিহীন দাবি মাত্র।

বহু নিরপেক্ষ অমুসলিম মনীষী ও পণ্ডিত পবিত্র কুরআনের তাত্ত্বিক জ্ঞানগত ( বৈজ্ঞানিক ) শ্রেষ্ঠত্ব, এর অন্তর্নিহিত অনুপম সাহিত্যিক মান ও সৌন্দর্য এবং বিষয়বস্তুগত তাৎপর্যের গভীরতা ও ব্যাপকত্ব এবং নির্মল বা পবিত্র-পরিশুদ্ধ মানব চরিত্র ও জীবন গঠন অর্থাৎ মানব জাতির হিদায়তে এর অপরিসীম গুরুত্ব ও কার্যকরী প্রভাবের কথা অকপটে স্বীকার করেছেন। এ কারণেই অনেক অমুসলিম মনীষী ও পণ্ডিত ব্যক্তি বিভিন্ন সময় ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছেন এবং বর্তমানেও তা অব্যাহত রয়েছে। অগণিত প্রতিবন্ধকতা ও প্রতিকূলতা সত্ত্বেও পাশ্চাত্যে  ইসলাম  ক্রমপ্রসারমান ধর্ম। ইসলামের শত্রুরা এ দ্বীনের আলো ফুৎকার দিয়ে নিভিয়ে দিতে চায়। কিন্তু আল্লাহ পাক তাঁর ঐশী  দ্বীনের আলো প্রজ্বলিত রাখবেনই যদিও কাফির মুশরিকরা তা পছন্দ করে না। পবিত্র কুরআনে এরশাদ হচ্ছে :

 

یُرِیْدُوْنَ أَنْ یُطْفِئُوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَ  یَأْبَی اللّٰهُ إِلَّا أَنْ یُتِمَّ نُوْرَهُ وَ لَوْ کَرِهَ  الْکَافِرُوْنَ .

তারা তাদের মুখের ফুৎকারে আল্লাহর নূর ( জ্যোতি ) নির্বাপিত করতে চায় । কাফিররা অপ্রীতিকর মনে করলেও আল্লাহ তাঁর নূরের ( জ্যোতি ) পূর্ণ উদ্ভাসন ছাড়া আর কিছুই চান না। ( সূরা তওবা : ৩২ )

 

এবং

یُرِیْدُوْنَ لِیُطْفِئُوْا نُوْرَ اللّٰهِ بِأَفْوَاهِهِمْ وَ اللّٰهُ مُتِمُّ نُوْرِهٖ وَ لَوْ کَرِهَ الْکَافِرُوْنَ .

 

  তারা চায় আল্লাহর নূর ( জ্যোতি ও আলো ) নিভাতে । কিন্তু আল্লাহ তাঁর নূর (জ্যোতি ও আলো) পূর্ণরূপে উদ্ভাসিত করবেন যদিও কাফিররা তা অপছন্দ করে। ( সূরা সাফ্‌ : ৮ )

এবং 

هُوَ الَّذِيْ أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدَیٰ وَ دِیْنِ  الْحَقِّ لِیُظْهِرَهُ عَلَی الدِّیْنِ کُلِّهِ وَ لَوْ کَرِهَ  الْمُشْرِکُوْنَ .

 

তিনিই ( মহান আল্লাহ ) তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হুদা ( পথনির্দেশ ) ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীন বা ধর্মের ওপর একে বিজয়ী ও শ্রেষ্ঠত্ব দান করার জন্য, যদিও মুশরিকরা তা অপছন্দ করে। ( সূরা সাফ্‌ : ৯ এবং সূরা তওবা : ৩৩ )

এবং 

هُوَ الَّذِيْ أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدَیٰ وَ دِیْنِ الْحَقِّ لِیُظْهِرَهُ عَلَی الدِّیْنِ کُلِّهِ ، وَ کَفَیٰ بِاللّٰهِ شَهِیْدَاً .

 

তিনিই ( মহান আল্লাহ ) তাঁর রাসূলকে প্রেরণ করেছেন হুদা ( পথ - নির্দেশ ) ও সত্য দ্বীনসহ সকল দ্বীনের উপর একে বিজয়ী শ্রেষ্ঠত্ব দান করার জন্য। আর সাক্ষী ( শহীদ ) হিসেবে মহান আল্লাহই যথেষ্ট। ( সূরা - ই ফাত্হ্ : ২৮ )

 

এটাই হচ্ছে মহান আল্লাহর সত্য ওয়াদা ( অঙ্গীকার ) যা তিনি অবশ্যই পূর্ণ করবেন ।  তাই ওয়াসিম রিযভীর মতো ইসলাম বিদ্বেষী ধর্মচ্যুত বিভ্রান্ত কুলাঙ্গার কমীন ব্যক্তিরা এ ধরণের ঘৃণ্য কাজ করে আসলে নিজেদেরই ক্ষতি ও ধ্বংস বয়ে এনেছে।

প্রশ্ন: জনাব মুনীর হুসাইন খান,  ওয়াসীম রিযভী কি শিয়া মুসলমানদের প্রতিনিধি? তার ইসলাম-বিদ্বেষী পদক্ষেপকে কি শিয়া মাযহাবের সঙ্গে জড়ানো যায়?  আর বাক-স্বাধীনতার সঙ্গেও এর সম্পর্ক রয়েছে কী? রিযভীর ওই কাজের কারণে কি শিয়া মুসলমানদের কাফের বলা যাবে?

উত্তরে জনাব মুনীর হুসাইন খান: এ ধরণের ব্যক্তি কখনো কোনো ইসলামী মাযহাবেরও প্রতিনিধিত্ব করে না এবং এর অন্তর্ভুক্তও নয়। তাই ভারতের সুন্নী মুসলিম ব্যক্তিত্ব ও সংগঠনগুলোর মতো ভারতীয় শিয়া মুসলিম সংগঠনগুলো এবং শিয়া আলিম ও ব্যক্তিত্বরাও এই ওয়াসিম রিযভীর এ জঘন্য ঘৃণ্য কার্যকলাপ ও পদক্ষেপের তীব্র নিন্দা ও প্রতিবাদ জানিয়েছেন এবং তা জানানো অব্যাহত রেখেছেন।

আর মালউন মুরতাদ ওয়াসীম রিযভীর এ জঘন্য ঘৃণ্য পদক্ষেপ ব্যক্তির বাক ও মত প্রকাশের স্বাধীনতা এবং মানবাধিকারের বিষয় নয়। এ সবের দোহাই দিয়ে এ ধরণের মুরতাদ কুলাঙ্গার পথভ্রষ্ট ব্যক্তিদেরকে আস্কারা দেওয়া মোটেও ঠিক হবে না। তাই  আমরাও এর তীব্র নিন্দা করছি এবং সেইসাথে এ বিশৃঙ্খলা ও ফাসাদ সৃষ্টিকারী মালউন শয়তান পথভ্রষ্ট ওয়াসীম রিযভীকে উপযুক্ত শাস্তি দিয়ে অচিরেই এ ফিৎনার অগ্নি নেভানোর আহ্বান জানাচ্ছি ভারত সরকারের প্রতি।

গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল, ওয়াসীম রিয্ভী শিয়া মুসলিম পরিবারের সন্তান হলেও সে এখন আর  মুসলমানই নেই। সে ইসলাম থেকে খারিজ তথা মুর্তাদ হয়ে গেছে। তাই তাকে শিয়া মুসলমান বলা যাবে না। সে এখন শিয়া সুন্নী নির্বিশেষে সব মুসলমানেরই শত্রু । তাই তাকে উপলক্ষ করে শিয়া মাযহাবের অনুসারী মুসলমানদেরকে কাফির মুশরিক বলা যাবে না এবং এটা করা নেহায়েত অন্যায়, ইসলামী শরিয়ত পরিপন্থী ও হারাম। কারণ আহলে ক্বিবলাকে  কাফির বলা শরিয়তে বৈধ ( জায়েয ) নয়। শিয়া মুসলমানরাও সুন্নী মুসলমানদের মতো আহলে ক্বিবলা ( পবিত্র কা'বার অনুসারী )। কিন্তু দু:খজনক হলো যে কতিপয় ব্যক্তি মুরতাদ, মালউন ধর্মত্যাগী পথভ্রষ্ট ওয়াসীম রিয্ভী ইস্যুকে কেন্দ্র করে শিয়া মুসলমানদেরকে কাফির বলে বেড়াচ্ছে। তাই তাদের প্রতি আহ্বান আপনারা এ কাজ থেকে বিরত থাকুন। কারণ এতে করে ইসলামের চিরদুশমন ইসরাইল, পাশ্চাত্য ও মুশরিক চক্র লাভবান হবে মুসলমানদের ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট হওয়ার কারণে। স্যাটানিক ভার্সেসের লেখক মুরতাদ সালমান রুশদী এবং ধর্মত্যাগী মুরতাদ লেখিকা তসলিমা নাসরিন সুন্নী মুসলিম পরিবারের সন্তান। সেজন্য শিয়া মুসলমানরা কি সুন্নী মুসলিম ভাইদেরকে কাফির বলবে? আর এটা যেমন অবশ্যই জায়েয হবে না ঠিক তেমনি মুরতাদ ওয়াসীম রিয্ভীর কারণে শিয়া মুসলমানদেরকে কাফির বলাও জায়েয হবে না।

প্রশ্ন: মদিনায় মহানবীর যুগ থেকেই কি শিয়া মুসলমান ও মুসলিম মাজহাবের অস্তিত্ব ছিল? 

উত্তরে জনাব মুনীর হুসাইন খান: পবিত্র মক্কা ও মদীনায় বিধর্মী কাফির মুশরিকদের প্রবেশ নিষিদ্ধ ( হারাম )। তাই শিয়ারা কাফির হলে কিভাবে তারা ১৫ শতাব্দী যাবৎ ইসলামের এ দুই পবিত্রতম নগরীতে প্রবেশ ও বসবাস করছেন ?!! স্মর্তব্য যে মহানবী ( সা. ) এর সময় থেকে ১৫ শতাব্দী যাবৎ শিয়া মুসলমানরা পবিত্র মক্কা ও মদীনায় এবং হিজাযসহ ইসলামের সূতিকাগার সৌদি আরব এবং মধ্যপ্রাচ্যের সব দেশে বসবাস করছেন। উল্লেখ্য ইসলামের সূতিকাগার সৌদি আরব ও মধ্যপ্রাচ্যের বাসিন্দা শিয়াদের সংখ্যা ও শতাংশ মুসলিম বিশ্বের অন্য সকল অঞ্চলের শিয়াদের সংখ্যা ও শতাংশের চেয়ে  অনেক বেশি ।  পবিত্র মক্কা ও মদিনার স্থানীয় অধিবাসীদের এক উল্লেখযোগ্য অংশ হচ্ছে ইমামীয়া ( বারো ইমামী ) শিয়া  মুসলমান।

পবিত্র মদীনা নগরীর অধিবাসী ও বাসিন্দা ছিলেন মদীনার আনসার খাযরাজ গোত্রীয় ইমামীয়া শিয়া আলিম ও ফকীহ্ মরহুম আয়াতুল্লাহ শেখ মুহাম্মদ আলী আল-আমরী ( ১৩২৭/ ১৯০৯ - ১৪৩২ হিজরী / ২০১১ ) যিনি ১৯০৯ সালে মদীনায় জন্মগ্রহণ করেন এবং ১০২ বছর বয়সে ১৪৩২ হিজরী সালে ( ২৯ জানুয়ারি , ২০১১ ) ইন্তেকাল করলে মদীনা নগরীতে স্মরণাতীতকালের সবচেয়ে বড় নামায-ই জানাযা ও দাফনের অনুষ্ঠান করে মদীনাবাসীরা তাঁকে জান্নাতুল বাকী গোরস্তানে দাফন ও সামাহিত করে (( দেখুন :https://en.wikishia.net/view/Muhammad_Ali_al-Amri ))। স্মর্তব্য যে তিনি পবিত্র মদীনায় শিয়া ধর্মীয় শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও মাদ্রাসা, মসজিদ ও হুসাইনীয়ার ( ইমামবাড়া ) প্রতিষ্ঠাতা। এ ছাড়া তিনি ছিলেন সৌদি আরবের শিয়া মুসলমানদের জন্য ইসলামী বিপ্লবের নেতা আয়াতুল্লাহিল উযমা ইমাম খামেনেয়ি  এবং পবিত্র কোম ও নাজাফের শিয়া মারজা-ই তাকলীদদের  ধর্মীয় প্রতিনিধি। আর সকল সুন্নী ফিকহ ও মাযহাবে শিয়া মাযহাবের অনুসারীদেরকে মুসলমান ও আহলই ক্বিবলা বলা হয়েছে। আর শিয়া মুসলমানরা রাসূলুল্লাহ ( সা . ) এর সময় থেকে আজ পর্যন্ত প্রতি বছর পবিত্র মক্কায় হজ্জব্রত পালন করছেন। সুতরাং প্রমাণিত সত্য হচ্ছে এই যে শিয়া মাযহাবের অনুসারীরা আহলে ক্বিবলা ও মুসলমান। তাই বাংলাদেশের সরকার ও জনগণের প্রতি একান্ত আবেদন উদ্ভূত এ পরিস্থিতিতে কতিপয় দায়িত্ব-কাণ্ডজ্ঞানহীন অর্বাচীন ব্যক্তি যেন এ দেশের সাম্প্রদায়িক ও মাযহাবী সৌহার্দ্য ও সম্প্রীতি নষ্ট করার  সুযোগ না পায়।

(উল্লেখ্য বিশিষ্ট ইসলামী চিন্তাবিদ, লেখক ও গবেষক মুহাম্মদ মুনীর হুসাইন খান 'পার্সটুডেডটকম'কে লিখিত এ সাক্ষাৎকার দিয়েছেন গত ৫ শা'বান, ১৪৪২ হিজরী মোতাবেক গত বৃহস্পতিবার, ১৮ মার্চ, ২০২১ ) #

পার্সটুডে/এমএএইচ/২০

বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।