খুন ও গুম নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগের অর্থপূর্ণ জবাব দিন: বাংলাদেশ সরকারকে এইচআরডব্লিউ
জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকে র্যাবকে বাদ দেয়া উচিত: এইচআরডব্লিউ
বাংলাদেশে নির্যাতন, গুম ও বিচার-বহির্ভূত হত্যার গুরুতর অভিযোগ নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগের বিষয়ে সরকারের অর্থপূর্ণ জবাব দাবী করেছে নিউইয়র্ক-ভিত্তিক আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থা হিউম্যান রাইটস ওয়াচ (এইচআরডব্লিউ)
গতকাল বৃহস্পতিবার ( মার্চ ১৭) এ-সংক্রান্ত একটি বিবৃতি এইচআরডব্লিউর ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা হয়েছে। এতে বলা হয়, যুক্তরাষ্ট্র ইতিমধ্যে গুরুতর মানবাধিকার লঙ্ঘনের জন্য বাংলাদেশের র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব ) ওপর নিষেধাজ্ঞা দিয়েছে। এই প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রম থেকে র্যাবকে বাদ দেওয়া উচিত বলে মন্তব্য করেছে এইচআরডব্লিউ।
সংস্থাটির এশিয়া অঞ্চলের পরিচালক ব্র্যাড অ্যাডামস বলেন, বাংলাদেশ সরকার জাতিসংঘে বৃহত্তর প্রভাব অর্জন করতে চাইছে। একই সঙ্গে তারা বাংলাদেশের নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক মানবাধিকার লঙ্ঘনের বিষয়ে জাতিসংঘের তদন্তকে উপেক্ষা করছে। নির্যাতনের অভিযোগ উপেক্ষা ও সুনির্দিষ্ট আইনকানুন মেনে চলতে ব্যর্থতার মাধ্যমে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে দেশটির অবস্থানকে বিপন্ন করছে।
বাংলাদেশের মানবাধিকার গোষ্ঠীগুলোর ভাষ্যমতে, ২০০৯ সাল থেকে এ পর্যন্ত প্রায় ৬০০ ব্যক্তিকে নিরাপত্তা বাহিনী গুম করেছে। তবে নিরাপত্তা বাহিনী কর্তৃক নিয়মিত গুমের অভিযোগ বাংলাদেশ সরকার বারবার অস্বীকার করে আসছে।
মানবাধিকার পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের উদ্বেগ উপেক্ষা করার অভ্যাস বাংলাদেশ সরকারের রয়েছে বলে বিবৃতিতে মন্তব্য করেছে এইচআরডব্লিউ।
এর আগে, গত নভেম্বরে জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনে র্যাপিড অ্যাকশন ব্যাটালিয়নের (র্যাব) সদস্যদের নিষিদ্ধ করতে জাতিসংঘের আন্ডার সেক্রেটারি জেনারেল জিন পিয়েরে ল্যাক্রোইক্সের কাছে চিঠি দিয়েছে আন্তর্জাতিক ১২টি মানবাধিকার সংস্থা। এ প্রসঙ্গে এখন পর্যন্ত আনুষ্ঠানিকভাবে কোনো উত্তর দেয়নি জাতিসংঘের পিস কিপিং অপারেশন্স।
জাতিসংঘের প্রক্রিয়ার পাশাপাশি আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর সঙ্গে সক্রিয়তা-সহযোগিতার কারণে গুমের শিকার ব্যক্তিদের আত্মীয়স্বজন ও মানবাধিকারকর্মীদের বিরুদ্ধে প্রতিহিংসামূলক কর্মকাণ্ড দ্রুত বন্ধে বাংলাদেশের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে। জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক বিশেষজ্ঞরা এই আহ্বান জানিয়েছেন।
জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক হাইকমিশনারের কার্যালয়ের ওয়েবসাইটে প্রকাশ করা এ-সংক্রান্ত সংবাদ বিজ্ঞপ্তি বলা হয়, গত ১০ ডিসেম্বর রাবের কর্মকর্তাদের ওপর যুক্তরাষ্ট্রের নিষেধাজ্ঞা ঘোষণার পর গুমের শিকার ব্যক্তিদের পরিবারের সদস্য, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের কর্মীদের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের কর্তৃপক্ষ হুমকি, চাপ প্রয়োগ ও হয়রানি শুরু করেছে বলে খবর পাওয়া যায়।
২০২১ সালের ডিসেম্বর থেকে ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারির মধ্যে ভুক্তভোগী অন্তত ১০টি পরিবারের বাড়িতে গভীর রাতে অভিযান চালানো হয়েছে বলে বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়। বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিযানকালে ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যদের হুমকি ও ভয় দেখানো হয়। সাদা কাগজে বা আগে থেকেই লিখে রাখা বিবরণে তাঁদের সই করতে বাধ্য করা হয়। আগে থেকে লিখে রাখা বিবরণে উল্লেখ করা থাকে যে পরিবারের সদস্য গুমের শিকার হননি বরং তাঁরা উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে পুলিশকে বিভ্রান্ত করেছেন। এটি অগ্রহণযোগ্য।
বিশেষজ্ঞরা উদ্বেগের সঙ্গে পরিবার, মানবাধিকারকর্মী ও নাগরিক সমাজের ওপর ক্রমবর্ধমান প্রতিকূল অবস্থা লক্ষ করেছেন। সরকারের জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তারা বারবার নাগরিক সমাজের কিছু সংগঠনের বিরুদ্ধে জাতিসংঘের কাছে মিথ্যা তথ্য দেওয়ার অভিযোগ করছেন, যা নাগরিক সমাজের মূল কাজকে ঝুঁকিপূর্ণ করে তুলেছে।
বিশেষজ্ঞরা জোর দিয়ে বলেন, আত্মীয়স্বজন ও মানবাধিকার কর্মীরা যাতে তাঁদের বৈধ কাজকর্ম নিরাপদ ও উৎসাহব্যঞ্জক পরিবেশে কোনো হুমকি, চাপ বা প্রতিহিংসার ভীতি ছাড়া করে যেতে পারেন, বাংলাদেশকে অবশ্যই তা নিশ্চিত করতে হবে।#
পার্সটুডে/এআরকে/১৮