করোনা মোকাবিলায় টাস্কফোর্স গঠনসহ ৯ দফা প্রস্তাব বিএনপির
-
মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর
বাংলাদেশে করোনা পরিস্থিতিতে আর্থিক সংকট মোকাবিলায় অবিলম্বে প্রখ্যাত অর্থনীতিবিদদের সমন্বেয়ে একটি টাস্কফোর্স গঠন করার প্রস্তাব করেছে বিরোধী দল বিএনপি। একইসাথে মনিটরি ও ফিসক্যাল ব্যবস্থাপনায় সংস্কার আনারও দাবি করেছে দলটি।
আজ (মঙ্গলবার) দলীয় চেয়ারপাসনের গুলশান কার্যালয়ে এক সংবাদ সম্মেলনে সার্বিক পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিএনপি’র মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর নয়-দফা প্রস্তাবনা তুলে ধরেন।
করোনা পরিস্থিতি সামাল দিতে সরকারের ‘ব্যর্থতা’, ‘সময়ন্বয়হীনতা’ এবং ‘তুঘলকি সিদ্ধান্তের’ সমালোচনা করে মির্জা ফখরুল বলেন, “শুরু থেকেই সরকারের পক্ষ থেকে এক ক্ষমাহীন উদাসীনতা পরিলক্ষিত হয়েছে। শুরুর দিকেই যারা দেশের বাইরে থেকে এসেছেন বিশেষ করে চীন, কোরিয়া, সৌদি আরব তাদের কোয়ারেন্টাইনে রাখার বিষয়টি সরকার নিশ্চিত করতে পারেনি। সে সময় সরকারের মন্ত্রীরা যেসব গলাবাজি, দম্ভোক্তি করে বেড়িয়েছে তাতেই বোঝা যায় তারা কতটা অযোগ্য ও অদূরদর্শী। সরকার যথেষ্ট সময় ও সুযোগ পেয়েও কোনো কার্যকর প্রস্তুতি গ্রহণ না করেই বরং মিথ্যা ঘোষণা দিয়েছিল যে, করোনা প্রতিরোধে সার্বিক প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছে যা পরবর্তীকালে ভিত্তিহীন প্রমাণিত হয়েছে।“
তিনি উল্লেখ করেন, "করোনা পরিস্থিতির অবনতির এক পর্যায়ে ঘোষিত লকডাইন বা সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার পরামর্শ কার্যকরভাবকে প্রয়োগ করতে পারে নি সরকার। করোনা যুদ্ধের ‘সম্মুখ সারির যোদ্ধা’ ডাক্তার-স্বাস্থ্য সেবা কর্মী, পুলিশ ও সাংবাদিকদের যথাযথ সুরক্ষা সামগ্রী না দেবার কারণে তারা ব্যাপক হারে আক্রান্ত হচ্ছেন। এদিকে স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ এমনকি সরকারের স্বাস্থ্য অধিদপ্তর আশঙ্কা করেছেন মাসের তৃতীয় এবং চতুর্থ সপ্তাহ হবে বাংলাদেশের জন্য করোনার পিক সময়। এ অবস্থায় সাধারণ ছুটির মেয়াদ আরও ১০ দিন বাড়ানো হলেও লকডাউনকে কার্যত আরো শিথিল করা হয়েছে। এদিকে পোশাক কারখানা খুলে দেওয়া এবং বাজার-ঘাট-মার্কেট খোলার ঘোষণা দিয়ে পরিস্থিতিকে যেমন হাল্কা করা দেয়া হয়েছে তেমনি করোনা ঝুঁকি আরো বাড়িয়ে দেয়া হয়েছে।"
বিএনপি মহাসচিব বলেন, "মানুষের জীবন ও জীবিকা দুটোই ঠিক রাখতে হবে এটা যেমন ঠিক, সংক্রমণ যেহেতু এখনও ঊর্ধ্বমুখী সেহেতু আরো কিছুদিন ধরে অবরুদ্ধ অবস্থা ও সামাজিক দূরত্ব বজায়ের নীতিমালা কঠোরভাবে পালন করে সংক্রমণ পরিস্থিতি সহনীয় পর্যায়ে এলে, একটি সুষ্ঠু পরিকল্পিত ব্যবস্থার মাধ্যমে শ্রমিকদের ধীরে ধীরে কাজে যোগ দেয়ার ব্যবস্থা করা উচিত ছিল।"
তিনি বলেন, "জীবন ও জীবিকার মধ্যে নিঃসন্দেহে জীবন প্রাধান্য পাবে। কেবলমাত্র আর্থিক দিক বিবেচনা করে জীবনের গুরুত্ব গৌণ করা সঠিক নয়। এখন স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে পালন না করা হলে পুরো জাতিকেই চরম ঝুঁকির মধ্যে ঠেলে দেয়া হলো। আর স্বাস্থ্যবিধি কতটা পালন করা হবে বা পালন করা সম্ভব হবে, তা নিয়ে আমাদের আশঙ্কার যথেষ্ট কারণ রয়েছে।"
মির্জা ফখরুল বলেন, "এ সময় ত্রাণ বিতরণে ব্যাপক দুর্নীতি ও অনিয়মের খবর তুলে ধরায় সাংবাদিকদের গলা চেপে ধরছে সরকার। অন্যদিকে সমালোচনাকারীদের কণ্ঠরোধে প্রয়োগ করা হচ্ছে বিতর্কিত ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন। তাছাড়া, স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের প্রশ্ন করার সুযোগ বন্ধ করায় সাধারণ মানুষের উদ্বেগ বাড়ছে। করোনা সংকটের শুরু থেকেই স্বাধীন মতের দমন, তথ্য গোপনের মানসিকতা, সংক্রমণ বিষয়ে করণীয় বিষয়ে নীতি-নির্ধারর্ণী পর্যায়ে অদূরদর্শিতা, সমন্বয়হীনতা, অস্বচ্ছতা এবং করোনা চিকিৎসায় চরম অব্যবস্থাপনা পুরো জাতিকে বিপদের মধ্যে ঠেলে দিয়েছে।"
বিএনপি মহাসচিব বলেন, "গার্মেন্টস শ্রমিকদের বেতন পরিশোধের জন্য ৫০০০ কোটি টাকার ঋণ প্যাকেজ ঘোষণা করা হলেও অধিকাংশ শ্রমিকরাই এখনো তাদের বেতন পায়নি। শ্রমিকদের বেতন না পাওয়া এবং চাকুরিচ্যুতির হুমকিতে অনেকেই দিশেহারা হয়ে মরিয়া হয়ে উঠেছে। অঘোষিত আংশিক লকডাউনের কারণে এই দেশের দিন আনে দিন খায় এমন লক্ষ লক্ষ দরিদ্র মানুষ কর্মহীন হয়ে পড়ে অবর্ণনীয় কষ্টে দিন কাটাচ্ছে।"
তিনি উল্লেখ করেন, "সরকার কয়েকদফায় এ পর্যন্ত ৯৫ হাজার ৬১৯ কোটি টাকার আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ ঘোষণা করলেও এর সিংহভাগই ব্যাংক নির্ভর ঋণ প্যাকেজ যা ব্যবসায়ীদের দেয়া হবে প্রচলিত ব্যাংক গ্রাহক সম্পর্কের ভিত্তিতে। এতে সরকারের প্রণোদনা নিতান্তই অপ্রতুল। তাও আবার প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্তরা না পেয়ে সরকারের আশীর্বাদপুষ্ট কিছু নব্য ধনী এতে লাভবান হবে। তাছাড়া ব্যাংকগুলো নিজেরাই বর্তমানে নগদ অর্থের সংকটে ভুগছে। অর্থের অভাবে ব্যাংকগুলো শেষ পর্যন্ত ঋণ প্রদানে কতটুকু সফল হবে তা এখনই প্রশ্নবিদ্ধ। সরকারের এই আর্থিক প্রণোদনা প্যাকেজ যে প্রকৃতপক্ষে একটি শুভংকরের ফাঁকি সেটি আমরা আগেও তুলে ধরেছি।"
মির্জা ফখরুল বলেন, আমরা বর্তমানে একটি যুদ্ধ পরিস্থিতিতে রয়েছি। এ যুদ্ধ সাধারণ যুদ্ধের চেয়েও অতি ভয়ঙ্কর। কারণ এ যুদ্ধ অদৃশ্য শক্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধ। বিশ্বব্যাপী উন্নত দেশসমূহ এমনকি পার্শ্ববর্তী ভারত দলমত নির্বিশেষে সব রাজনৈতিক দল, বিষয়ভিত্তিক বিশেষজ্ঞ ও সকল শ্রেণী পেশার মানুষদের নিয়ে সমন্বিতভাবে এই মহাসংকট মোকাবেলা করার চেষ্টা করছে। বাংলাদেশেও আমরা এবং অন্যসব রাজনৈতিক দল, এহেন জাতীয় সন্ধিক্ষণে ১৯৭১ সনের ন্যায় সম্মিলিতভাবে জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে এ মহাদুর্যোগ মোকাবেলার আহবান জানিয়েছিলাম। কিন্তু দুঃখের বিষয় এহেন বিভীষিকাময় পরিস্থিতিতেও ঐক্যের আহ্বানে সাড়া না দিয়ে সরকার একদলীয় ভিত্তিতে কর্মকাণ্ড পরিচালনা করতে গিয়ে সবকিছু লেজেগোবরে একাকার করে ফেলেছে। জাতীয় ঐকমত্যের ভিত্তিতে সম্মিলিতভাবে এ মহাদুর্যোগ মোকাবিলা সময়ের দাবি। অন্যথায় এর অবশ্যম্ভাবী পরিণতির জন্য এককভাবে বর্তমান সরকারকেই দায়ভার বহন করতে হবে বলে সতর্ক করে দেন মির্জা ফখরুল।#
পার্সটুডে/আশরাফুর রহমান/আবদুর রহমান খান/৫
বিশ্বসংবাদসহ গুরুত্বপূর্ণ সব লেখা পেতে আমাদের ফেসবুক পেইজে লাইক দিয়ে অ্যাকটিভ থাকুন।