খালেদা জিয়া কথা বলেছেন, তবে এখনো সংকট কাটেনি
https://parstoday.ir/bn/news/event-i154562-খালেদা_জিয়া_কথা_বলেছেন_তবে_এখনো_সংকট_কাটেনি
বাংলাদেশে জাতীয়তাবদী দল বা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবস্থার সামন্য উন্নতি হয়েছে। কথা বলেছেন তবে এখনো সামগ্রিক সংকট কাটেনি।
(last modified 2025-11-30T07:56:12+00:00 )
নভেম্বর ৩০, ২০২৫ ১৩:৫০ Asia/Dhaka
  • বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া
    বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়া

বাংলাদেশে জাতীয়তাবদী দল বা বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার অবস্থার সামন্য উন্নতি হয়েছে। কথা বলেছেন তবে এখনো সামগ্রিক সংকট কাটেনি।

গত বুধবার থেকে প্রায় সাড়াহীন ছিলেন। তিন দিন পর গতকাল শনিবার তিনি কথা বলেছেন। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গত তিন দিনের চেয়ে সামান্য উন্নতি হয়েছে তবে এখনো সামগ্রিক সংকট কাটেনি। টানা চার দিন ডায়ালাইসি চলেছে। দলের পক্ষ থেকে হাসপাতালের সামনে নেতা–কর্মীদের ভিড় না করার অনুরোধ জানানো হয়েছে।

রাজধানী ঢাকার এভারকেয়ার হাসপাতালের চিকিৎসক এবং খালেদা জিয়ার পরিবার-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র গতকাল এ তথ্য নিশ্চিত করে বলেছে, সকালের দিকে সিসিইউতে খালেদা জিয়ার শয্যা পাশে থাকা ছোট ছেলে প্রয়াত আরাফাত রহমান কোকোর স্ত্রী শামিলা রহমানের সঙ্গে তিনি সামান্য কথা বলেন।

সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে, খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা গত বুধ, বৃহস্পতি ও শুক্রবারের চেয়ে গতকাল সামান্য উন্নতি দেখা গেছে। তবে সামগ্রিক সংকট কাটেনি। বিশেষত কিডনির কার্যকারিতা মারাত্মকভাবে কমে যাওয়ায় তাঁকে টানা চার দিন ডায়ালাইসিস করতে হয়েছে।

চিকিৎসকেরা পরিস্থিতিকে এখনো ‘গুরুতর’ হিসেবে বিবেচনা করছেন। তাঁদের পর্যবেক্ষণ হচ্ছে, আগামী কয়েকটি দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিডনি কার্যক্ষমতায় স্থিতিশীলতা ছাড়া তাঁর সামগ্রিক শারীরিক অবস্থায় স্থায়ী উন্নতি আসা কঠিন।

এই পরিস্থিতিতে খালেদা জিয়ার চিকিৎসায় যুক্ত দেশের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক, আমেরিকার জনস হপকিনস হাসপাতালের চিকিৎসক এবং লন্ডন ক্লিনিকের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে গঠিত মেডিকেল বোর্ড তাঁর উন্নত চিকিৎসার জন্য আবার বিদেশে নেওয়ার নীতিগত সিদ্ধান্ত নিয়েছে। তবে এ ক্ষেত্রে তাঁর শারীরিক অবস্থা বিমান যাত্রার ধকল সামলানোর জন্য কতটা সক্ষম, তার ওপর নির্ভর করে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানিয়েছে, চিকিৎসকেরা আগামী এক-দুই দিন খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা দেখবেন। সম্ভব হলে তাঁকে আবার লন্ডন ক্লিনিকে নেওয়া হবে, যেখানে তাঁর চিকিৎসা হয়েছিল। সেটি সম্ভব না হলে কম দূরত্বের সিঙ্গাপুরের মাউন্ট এলিজাবেথ হাসপাতালে নেওয়ার চেষ্টা করা হতে পারে। তবে বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর গতকাল এক সংবাদ সম্মেলনে বলেছেন, এই মুহূর্তে অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার মতো তাঁর শারীরিক অবস্থা নেই।

জানা গেছে, খালেদা জিয়ার কিডনির কার্যকারিতা কমে যাওয়ায় তাঁর শরীরে, বিশেষ করে ফুসফুসে মাত্রাতিরিক্ত পানি জমে যায় এবং ভীষণ শ্বাসকষ্ট দেখা দেয়। এ পরিস্থিতিতে গত বুধবার থেকে তাঁকে ডায়ালাইসিস দেওয়া হচ্ছে। শরীরের পানি কমানো যাচ্ছিল না। তাঁর শারীরিক অবস্থার অবনতি হয়। সচেতন থাকলেও তিনি সাড়া-শব্দহীন হয়ে পড়েন।

তবে শুক্রবার রাত থেকে খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থার সামান্য অগ্রগতি দৃশ্যমান হয়। গতকাল সকালে তিনি একটু কথা বলেন। গতকাল সারা দিন খালেদা জিয়া ডায়ালাইসিসে ছিলেন। কয়েক দিনের ডায়ালাইসিস পরবর্তী শারীরিক অবস্থা দেখে মেডিকেল বোর্ড নতুন চিকিৎসাব্যবস্থা নেবে।

পরিবার-ঘনিষ্ঠ একটি সূত্র জানিয়েছে, গতকাল খালেদা জিয়ার সামান্য কথা বলার বিষয়টি চিকিৎসকেরা ইতিবাচক লক্ষণ হিসেবে দেখছেন। তবে তাঁরা এ-ও বলছেন, এখনো যেকোনো সময় পরিস্থিতির পরিবর্তন ঘটতে পারে।

৮০ বছর বয়সী খালেদা জিয়া দীর্ঘদিন ধরে হৃদ্‌রোগ, ডায়াবেটিস, আর্থ্রাইটিস, লিভার সিরোসিস, কিডনির জটিলতাসহ নানা শারীরিক জটিলতায় ভুগছেন। গত রোববার শ্বাসকষ্ট দেখা দিলে দ্রুত তাঁকে এভারকেয়ার হাসপাতালে নেওয়া হয়। তিনি এখন হাসপাতালের করোনারি কেয়ার ইউনিটে (সিসিইউ) রয়েছেন। মেডিকেল বোর্ডের দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তত্ত্বাবধানে সাবেক এই প্রধানমন্ত্রীর চিকিৎসা চলছে। গত শুক্রবার রাতে তাঁর অবস্থা অত্যন্ত সংকটাপন্ন হওয়ার কথা জানিয়েছিলেন বিএনপি নেতারা।

বিদেশে নেওয়া কি সম্ভব

শুক্রবার রাতেই আলোচনা ওঠে উন্নত চিকিৎসার জন্য খালেদা জিয়াকে বিদেশে নেওয়ার চিন্তা। এরপর গতকাল দুপুরে বিএনপির ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমানের উপদেষ্টা মাহদী আমিন নিজের ফেসবুক পেজে জানান, খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য লন্ডন নেওয়ার পরিকল্পনা করছে তাঁর পরিবার। এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের ব্যবস্থা করা হচ্ছে। শারীরিক অবস্থার কিছুটা উন্নতি হলে তাঁকে বিদেশে নেওয়া হবে। দলের শীর্ষ নেতৃত্বের অভিপ্রায়ে মাহদী ফেসবুকে এ তথ্য জানান বলে জানা গেছে।

যদিও খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা বিবেচনায় এই মুহূর্তে সেটি সম্ভব নয় বলে জানান বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম। তিনি গতকাল বিকেলে গুলশানের কার্যালয়ে বিজয় দিবস উপলক্ষে বিএনপির উদ্‌যাপন কমিটির সংবাদ সম্মেলনে এ বিষয়ে কথা বলেন।

মির্জা ফখরুল বলেন, দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকদের সমন্বয়ে মেডিকেল বোর্ড গঠন করে খালেদা জিয়ার চিকিৎসা চলছে। শুক্রবার রাতে প্রায় আড়াই ঘণ্টা বৈঠক করে মেডিকেল বোর্ড জানিয়েছে, খালেদা জিয়াকে চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়া প্রয়োজন। তিনি জানান, অসুস্থ খালেদা জিয়াকে উন্নত চিকিৎসার জন্য বিদেশে নেওয়ার সব ব্যবস্থা করে রাখলেও তাঁর শারীরিক অবস্থা সেই ধকল সামলানোর মতো নেই।

মির্জা ফখরুল বলেন, বিদেশে নেওয়ার জন্য প্রয়োজনীয় ভিসা, যেসব দেশে নেওয়া হতে পারে, তাদের সঙ্গে যোগাযোগ এবং এয়ার অ্যাম্বুলেন্সের বিষয়ে আলোচনা হয়েছে। কাজ এগিয়ে রাখা হয়েছে। যেন প্রয়োজন হলেই দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া সম্ভব হয়।

প্রেসিডেন্ট দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন

প্রধান উপদেষ্টার পর গতকাল রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন বিএনপির চেয়ারপারসন ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করে দেশবাসীর কাছে দোয়া চেয়েছেন। রাষ্ট্রপতির সহকারী একান্ত সচিব মোহাম্মদ সাগর হোসেন এক বার্তায় এ তথ্য জানান।

প্রেসিডেন্ট বলেন, ‘গণতন্ত্র উত্তরণের এই সন্ধিক্ষণে সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়ার দ্রুত আরোগ্য কামনা করি। মহান আল্লাহর নিকট তাঁর সুস্থতা এবং একই সঙ্গে দেশবাসীর কাছে তাঁর জন্য দোয়া প্রার্থনা করি।’

ইতিমধ্যে খালেদা জিয়ার প্রতি সবার আন্তরিক দোয়া ও ভালোবাসার জন্য পরিবারের পক্ষ থেকে তাঁর ছেলে ও দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান সবার প্রতি কৃতজ্ঞতা জানিয়েছেন।

এদিকে গতকাল বিএনপিসহ বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নেতারা হাসপাতালে যান খালেদা জিয়াকে দেখতে। সকালে খালেদা জিয়াকে হাসপাতালে দেখতে যান জাতীয় নাগরিক পার্টির (এনসিপি) নেতারা। তাঁদের মধ্যে ছিলেন মুখ্য সমন্বয়কারী নাসীরুদ্দীন পাটওয়ারী, জ্যেষ্ঠ যুগ্ম সদস্যসচিব তাসনিম জারা ও মুখ্য সংগঠক (দক্ষিণাঞ্চল) হাসনাত আবদুল্লাহ।

খালেদা জিয়াকে দেখতে হাসপাতালে যান বাংলাদেশ খেলাফত মজলিসের আমির মাওলানা মামুনুল হক। হেফাজতে ইসলামের আমির আল্লামা মুহিব্বুল্লাহ বাবুনগরী ও মহাসচিব সাজেদুর রহমান গুরুতর অসুস্থ বেগম খালেদা জিয়ার সুস্থতা কামনায় দেশব্যাপী দোয়ার আহ্বান করেছেন।

হাসপাতালে ভিড় না করার অনুরোধ

বিএনপি মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর

খালেদা জিয়ার অসুস্থতার খবরে এভারকেয়ার হাসপাতালের সামনে ভিড় করছেন নেতা-কর্মীরা। কেউ কেউ বিভিন্ন ব্যানারে গণমোনাজাত কর্মসূচি করেছেন। এতে ওই এলাকায় যান চলাচলে ব্যাঘাত সৃষ্টি করছে।

বিএনপির মহাসচিব নেতা-কর্মীদের সেখানে ভিড় না করার অনুরোধ জানিয়েছেন। তিনি গতকাল সংবাদ সম্মেলনে বলেন, ‘আমি আপনাদের (সাংবাদিকদের) মাধ্যমে গোটা দেশবাসীর কাছে জানাতে চাই যে স্বাভাবিকভাবে দেশনেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এই দেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় নেত্রী এবং তাঁর অসুস্থতায় সব মানুষই উদ্বিগ্ন-উৎকণ্ঠিত এবং অসংখ্য মানুষ হাসপাতালে ভিড় করছেন। এতে হাসপাতালের কর্তৃপক্ষ এবং চিকিৎসকেরা অত্যন্ত বিব্রত বোধ করছেন। অন্য যাঁরা রোগী আছেন…সেখানে বিঘ্ন সৃষ্টি করা হচ্ছে।’

মির্জা ফখরুল বলেন, ‘সংশ্লিষ্ট সবার কাছে অনুরোধ জানাতে চাই, আপনারা কেউ দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না। অনুগ্রহ করে বিএনপি নেতা-কর্মী, তাঁর শুভাকাঙ্ক্ষী বা দেশের মানুষ, তাঁরা দয়া করে হাসপাতালে ভিড় করবেন না।’#

পার্সটুডে/জিএআর/৩০