এপস্টেইন কেলেঙ্কারি: ক্ষমতা, ভোগ ও পাশবিকতার অন্ধকার সাম্রাজ্য
-
এপস্টেইন ফাইল নিয়ে কার্টুন
যুক্তরাষ্ট্রের কুখ্যাত যৌন অপরাধী জেফরি এপস্টেইনের প্রকাশিত নথিপত্র ও তদন্তসংক্রান্ত তথ্য সামনে এলে আজও বিবেকবান মানুষের গা শিউরে ওঠে। এপস্টেইন এমন একটি নাম, যা আধুনিক বিশ্বের ক্ষমতা, প্রভাব ও নৈতিকতার ভণ্ডামিকে নগ্নভাবে উন্মোচন করেছে। গণমাধ্যমে তার কুখ্যাত “নারকীয় দ্বীপ” (Epstein Island) বন্ধ হওয়ার খবর প্রকাশ পেলেও প্রশ্ন থেকেই যায়- তা কি সত্যিই বন্ধ হয়েছে, নাকি কেবল স্থানান্তরিত হয়েছে অন্য কোনো অন্ধকার ভূগোলে?
এই ঘটনা যেন কোনো সিনেমার কাহিনিকেও হার মানায় বরং আরও বেশি ভয়াবহ ও বাস্তব। এক বিত্তবান ব্যক্তি, একটি ব্যক্তিগত দ্বীপ, কয়েকটি ব্যক্তিগত জেট বিমান এবং কয়েক দশক ধরে গড়ে ওঠা এক অদৃশ্য নেটওয়ার্ক- যার মাধ্যমে বিশ্বের ক্ষমতাধর ব্যক্তিদের জন্য গড়ে তোলা হয়েছিল এক গোপন অপরাধচক্র। অভিযোগ অনুযায়ী, এই নেটওয়ার্কের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট ছিলেন প্রেসিডেন্ট, প্রধানমন্ত্রী, কংগ্রেস সদস্য, কূটনীতিক, আরব যুবরাজ, রাজপরিবারের সদস্য, শিল্পপতি, প্রযুক্তি খাতের প্রভাবশালী ব্যক্তি, নোবেলজয়ী, বিনোদন জগত ও ক্রীড়াঙ্গনের তারকারা। এটি ছিল এমন এক “এলিট ক্লাব”, যেখানে নৈতিকতা, মানবতা ও আইনের কোনো স্থান ছিল না- ছিল শুধু ক্ষমতা, ভোগ ও পাশবিক লালসার নিষ্ঠুর বাস্তবতা। এই অন্ধকার ব্যবস্থার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন জেফরি এপস্টেইন।
এই কেলেঙ্কারির মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রসহ পশ্চিমা বিশ্বের তথাকথিত “ক্ষমতা–সম্পদের নেটওয়ার্ক”-এর প্রকৃত চেহারা প্রকাশ পায়। ন্যায়বিচার, মানবাধিকার ও সভ্যতার বুলি আড়ালে লুকিয়ে থাকা ভণ্ডামি, দুর্নীতি, প্রভাব খাটানো, আইনের অপব্যবহার ও নৈতিক অধঃপতনের বাস্তব রূপ সামনে আসে।
লাখ লাখ নথি প্রকাশের পরও উত্তর পাওয়ার চেয়ে প্রশ্নই বেশি তৈরি হয়েছে। এই অপরাধচক্র কীভাবে গড়ে উঠেছিল?
একজন অভিযুক্ত ব্যক্তিকে গ্রেফতারের পর অল্প সময়ের মধ্যে কারাগারে তার রহস্যজনক মৃত্যুকে কীভাবে ব্যাখ্যা করা যায়?
শক্ত প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও কেন বহু প্রভাবশালী ব্যক্তি আইনি বিচারের আওতার বাইরে থেকে গেলেন?
এই নেটওয়ার্কের আন্তর্জাতিক সংযোগ কতটা গভীর?
কীভাবে তথাকথিত আধুনিক সমাজে এই ধরনের অপরাধকে আড়াল করা হয়, স্বাভাবিকীকরণ করা হয় এবং রাজনৈতিক-আইনি জটিলতার ভেতর হারিয়ে যেতে দেওয়া হয়?
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নটি হলো—
এপস্টেইনের মৃত্যু এবং তার দ্বীপের কার্যক্রম বন্ধ হওয়া কি সত্যিই এই বৈশ্বিক অপরাধচক্রের সমাপ্তি নির্দেশ করে? নাকি এটি কেবল একটি অধ্যায়ের সমাপ্তি, পুরো কাহিনির নয়?
বাস্তবতা হলো- একটি সরবরাহব্যবস্থা ভেঙে পড়লেও চাহিদা যদি থেকে যায়, তবে নতুন সরবরাহব্যবস্থা তৈরি হওয়া সময়ের ব্যাপার মাত্র। এপস্টেইনের মৃত্যুতে একটি নেটওয়ার্ক দুর্বল হয়েছে, কিন্তু সেই চাহিদা- ক্ষমতা, ভোগ, অপরাধ ও বিকৃত লালসার অবসান ঘটেছে- এমন কোনো দৃশ্যমান প্রমাণ নেই। বরং আগের গ্রাহকগোষ্ঠী এখনও বিদ্যমান, কেবল পদ্ধতি আরও গোপন, আরও সতর্ক ও আরও সংগঠিত হয়েছে।
যখন বিশ্বের সবচেয়ে ধনী ও প্রভাবশালী শ্রেণিকে এই ধরনের অপরাধমূলক কাঠামোর মাধ্যমে প্রভাবিত করা সম্ভব হয়, তখন প্রশ্ন ওঠে- আগামী দিনে কেন আরেকজন “এপস্টেইন” তৈরি হবে না? কে এই পুনর্গঠিত নেটওয়ার্কের বিরুদ্ধে কার্যকরভাবে দাঁড়াবে? পৃথিবীতে ব্যক্তিগত দ্বীপের অভাব নেই, গোপন আকাশপথের অভাব নেই, আর ক্ষমতার অন্ধকার জোটেরও অভাব নেই।
পরিশেষে সত্যটি নির্মম হলেও বাস্তব—
এপস্টেইনের মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে এপস্টেইনের দ্বীপের ভয়াবহ অপকর্ম শেষ হয়ে যায়নি। বরং তা হয়তো আরও নিঃশব্দে, আরও গোপনে, আরও সংগঠিতভাবে অন্য কোথাও স্থানান্তরিত হয়েছে। সভ্যতার মুখোশের আড়ালে যে পাশবিকতা লুকিয়ে আছে, তা নির্মূল না হলে পৃথিবী সত্যিকার অর্থে মানুষের বসবাসের জন্য নিরাপদ হয়ে উঠবে না।
এই সংকট কেবল একজন ব্যক্তির নয়- এটি একটি ব্যবস্থার, একটি সভ্যতার নৈতিক দেউলিয়াত্বের প্রতিচ্ছবি এবং এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করা নয়—স্বীকার করাই আজ সবচেয়ে বড় দায়বদ্ধতা।#
লেখক: তামান্না ইসলাম, কোম, ইরান।
পার্সটুডে/এমএআর/৯