মার্কিন-সৌদি আগ্রাসনের মুখে ইরাকি প্রধানমন্ত্রীর রিয়াদ সফর বাতিল
https://parstoday.ir/bn/news/event-i161782-মার্কিন_সৌদি_আগ্রাসনের_মুখে_ইরাকি_প্রধানমন্ত্রীর_রিয়াদ_সফর_বাতিল
কয়েকটি ইরাকি প্রদেশে 'পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটস' (পিএমইউ) বা বা 'হাশদ আশ-শাবি'র ঘাঁটিতে যৌথ মার্কিন-সৌদি হামলার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির নির্ধারিত সৌদি আরব সফর স্থগিত করা হয়েছে। একই সাথে দেশটির কর্মকর্তা ও আইনপ্রণেতারা এই হামলার সামরিক জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
(last modified 2026-07-29T13:31:31+00:00 )
জুলাই ২৯, ২০২৬ ১৯:২৬ Asia/Dhaka
  • ইরাকে মার্কিন-সৌদি আগ্রাসন (ইনসেটে) প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি
    ইরাকে মার্কিন-সৌদি আগ্রাসন (ইনসেটে) প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদি

কয়েকটি ইরাকি প্রদেশে 'পপুলার মোবিলাইজেশন ইউনিটস' (পিএমইউ) বা বা 'হাশদ আশ-শাবি'র ঘাঁটিতে যৌথ মার্কিন-সৌদি হামলার পর ইরাকের প্রধানমন্ত্রী আলী আল-জাইদির নির্ধারিত সৌদি আরব সফর স্থগিত করা হয়েছে। একই সাথে দেশটির কর্মকর্তা ও আইনপ্রণেতারা এই হামলার সামরিক জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

এই হামলাগুলো এমন এক সময়ে সংঘটিত হলো যখন ইরাক, ইরান, পাকিস্তান, আজারবাইজানসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে লাখ লাখ মুসলিম 'আরবাঈন' উপলক্ষে ইরাকের কারবালা শহরে সমবেত হচ্ছিলেন। আরবাঈন বিশ্বের অন্যতম বৃহৎ ধর্মীয় সমাবেশ হিসেবে পরিচিত।

কয়েকজন পর্যবেক্ষক এই হামলার টাইমিং বা সময় নির্বাচনকে সমাবেশটির প্রতি আক্রোশ হিসেবে দেখছেন। তাদের দাবি, প্রতিরোধ অক্ষের প্রতি সংহতি এবং যুক্তরাষ্ট্র-ইসরায়েলের যুদ্ধ ও সম্প্রসারণবাদী নীতির বিরুদ্ধে সমাবেশে উচ্চারিত অবস্থানের প্রতিক্রিয়া হিসেবেই এই হামলা চালানো হয়েছে।

ইরাকি মিডিয়ার তথ্য অনুযায়ী, এই হামলার পর আল-জাইদির সৌদি আরব সফর অনির্দিষ্টকালের জন্য পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। দেশটির নিরাপত্তা পরিস্থিতি এবং বিভিন্ন এলাকায় বিমান হামলার পর প্রধানমন্ত্রী জাতীয় নিরাপত্তা পরিষদকে এক জরুরি বৈঠক ডাকার নির্দেশ দিয়েছেন।

ইরাকের সাবেক প্রধানমন্ত্রী মোহাম্মদ শিয়া আল-সুদানি বলেছেন, "পপুলার মোবিলাইজেশন ফোর্সেসের সদর দপ্তরে এই সৌদি-মার্কিন আগ্রাসনের আমরা তীব্র নিন্দা জানাই।"

সুদানি বলেন, "এই আগ্রাসন ইরাকের সার্বভৌমত্বের স্পষ্ট লঙ্ঘন এবং আন্তর্জাতিক আইন ও জাতিসংঘ সনদের এক প্রকাশ্য অবমাননা।"

তিনি আরও যোগ করেন, "ইরাক আন্তর্জাতিক আইনের অধীনে প্রাপ্ত তার সার্বভৌমত্ব, ভূখণ্ড এবং জনগণকে রক্ষা করার অধিকারসহ সমস্ত বৈধ অধিকার সংরক্ষণ করে।" তিনি স্পষ্ট জানান, "ইরাকের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার যেকোনো লঙ্ঘন অগ্রহণযোগ্য এবং এতে চুপ থাকা যায় না।"

ইরাকের সরকারি বার্তা সংস্থা প্রচারিত এক বিবৃতিতে পিএমইউ জানিয়েছে, ক্ষয়ক্ষতির বর্তমান তথ্যটি প্রাথমিক এবং বিশেষ কমিটিগুলো মাঠপর্যায়ে তথ্য সংগ্রহ ও মূল্যায়ন চালিয়ে যাওয়াতে নিহতের সংখ্যা আরও বাড়তে পারে।

সংগঠনটি তাদের বাগদাদ, ওয়াসিত, নিনাওয়া, বসরা, কির্কুক, কারবালা এবং দিয়ালা প্রদেশের অফিসিয়াল সদর দপ্তরগুলোকে লক্ষ্য করে চালানো এই হামলাকে "যৌথ মার্কিন-সৌদি সন্ত্রাসী হামলা" হিসেবে আখ্যা দিয়ে তীব্র নিন্দা জানিয়েছে।

বিবৃতিতে বলা হয়, এই হামলায় লক্ষ্যবস্তু স্থানগুলোতে পিএমইউ-এর সদর দফতর, সামরিক যানবাহন, যন্ত্রপাতি ও সরঞ্জামাদির ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

ইরাকি প্রতিরোধ আন্দোলন আরও জানিয়েছে, হতাহতের পূর্ণাঙ্গ বিবরণ এবং ক্ষয়ক্ষতির মাত্রা নির্ধারণে তাদের তদন্তকারী দলগুলো কাজ করছে। উদ্ধার ও মূল্যায়ন অভিযান অব্যাহত থাকায় নিহতের সংখ্যা বাড়তে পারে বলে তারা ইঙ্গিত দিয়েছে।

এর আগে পিএমইউ জানিয়েছিল যে, ইরাকের বিভিন্ন অংশে তাদের বেশ কয়েকটি ঘাঁটিতে হামলা চালানো হয়েছে। তারা এই হামলাকে "সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড" হিসেবে বর্ণনা করে এবং তাদের বেশ কয়েকজন সদস্য হতাহত হয়েছে বলে জানায়।

পিএমইউ এই হামলাকে "একটি অত্যন্ত বিপজ্জনক উসকানি, ইরাকের আঞ্চলিক অখণ্ডতার ওপর প্রকাশ্য আক্রমণ এবং দেশের অফিসিয়াল নিরাপত্তা প্রতিষ্ঠানের ওপর হামলা" হিসেবে দেখছে।

এই হামলার জেরে ইরাকি আইনপ্রণেতাদের পক্ষ থেকে কঠোর জবাব দেওয়ার দাবি জোরালো হচ্ছে।

ইরাকের দুই আইনপ্রণেতা সরকারকে এর একটি চূড়ান্ত ও জোরালো জবাব দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন। এর মধ্যে একজন সামরিক পাল্টা জবাব দেওয়ার তাগিদ দিয়েছেন এবং অন্যজন রিয়াদে আল-জাইদির সফর বাতিলের দাবি জানিয়েছেন।

ইরাকি পার্লামেন্টের সদস্য এবং হুকুক আন্দোলনের নেতা সাউদ আল-সাদি সশস্ত্র বাহিনীর সর্বাধিনায়ককে তার দায়িত্ব পালন এবং এই সৌদি-মার্কিন আগ্রাসনের বিরুদ্ধে সামরিক জবাবের আদেশ দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।

তিনি আরও বলেন, "ইরাকিদের রক্ত মোটেও সস্তা নয়। জবাব ছাড়া আমাদের প্রিয় মাতৃভূমিতে ওয়াশিংটন ও রিয়াদের এই কালো ইতিহাস মুছে যাবে না। শুধু অপমানজনক বিবৃতি দিয়ে ক্ষান্ত থাকা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।"

আরেক ইরাকি আইনপ্রণেতা ফালিহ আল-খাজালি এই হামলাকে "সৌদি ও আমেরিকার শত্রুদের চালানো সন্ত্রাসী হামলা" হিসেবে বর্ণনা করে বলেন,  তারা কয়েকটি প্রদেশে ইরাকি নিরাপত্তা অবস্থানগুলোকে লক্ষ্যবস্তু করেছে।

আল-খাজালি বলেন, "আমাদের নিরাপত্তা ঘাঁটিতে আক্রমণ সুস্পষ্ট আগ্রাসন এবং ইরাকের সার্বভৌমত্বের লঙ্ঘন।" তিনি যোগ করেন যে, "ইরাকি জনগণ এবং দেশের জাতীয় স্বার্থ সাহসের সাথে রক্ষা করার দায়িত্ব ইরাকি সরকার ও তার প্রধানমন্ত্রীর।"

ইরাকি আইনপ্রণেতা হুসেইন নিমা আল-বাতাতও এই হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়ে একে "ইরাকের সার্বভৌমত্ব ও আন্তর্জাতিক আইন ও নিয়মনীতির উলঙ্গ লঙ্ঘন" বলে অভিহিত করেছেন। তিনি সতর্ক করে বলেন, এটি দেশের নিরাপত্তা ও স্থিতিশীলতার জন্য হুমকি স্বরূপ একটি বিপজ্জনক সংঘাত সৃষ্টি করছে।

আল-বাতাত সরকারকে ইরাকের সার্বভৌমত্ব ও জনগণকে রক্ষা করার জন্য প্রয়োজনীয় সমস্ত সামরিক, রাজনৈতিক, কূটনৈতিক ও আইনি পদক্ষেপ নেওয়ার তাগিদ দেন। একই সাথে এই হামলার বিরুদ্ধে ইরাকের প্রত্যাখ্যান জাহির করার জন্য প্রধানমন্ত্রীর প্রস্তাবিত রিয়াদ সফর বাতিলের আহ্বান জানান।

এর আগে সৌদি আরব দাবি করেছিল যে তাদের তেল স্থাপনাগুলোতে ইরাক থেকে হামলা চালানো হয়েছে। রিয়াদের এমন দাবির পর ইরাকি প্রতিরোধ গোষ্ঠী সৌদি আরবকে ইরাকি ভূখণ্ডে কোনো ধরনের হামলা চালানো থেকে সতর্ক করে দিয়েছিল।

গত সোমবারে প্রকাশিত এক বিবৃতিতে প্রতিরোধ বাহিনী সৌদির এই অভিযোগকে "ভিত্তিহীন" বলে খারিজ করে দেয়। রিয়াদকে ইরাকের ওপর দোষ চাপানো বন্ধ করে বরং ইয়েমেনের ওপর আরোপিত অবরোধ তুলে নেওয়ার আহ্বান জানায় তারা।

রাজনৈতিক বিশ্লেষক জুমা আল-আতওয়ানি লেবাননের আল মায়াদিন টেলিভিশনকে জানান, এই যৌথ মার্কিন-সৌদি হামলার মূল উদ্দেশ্য ছিল পিএমইউ-কে দুর্বল করা এবং ইরানের সাথে সংহতি প্রকাশের জন্য ইরাকের ওপর প্রতিশোধ নেওয়া।

তিনি বলেন, "ইরানের সাথে সংহতি প্রকাশে ইরাকের অবস্থানের কারণে মার্কিন চাপ কয়েকগুণ বেড়ে গেছে, বিশেষ করে উম্মাহর শহীদ নেতার বিশাল জানাজা মিছিলের পর থেকে।"

আতওয়ানি উল্লেখ করেন, সম্প্রতি কারবালা ও নাজাফে ইসলামী বিপ্লবের শহীদ নেতা আয়াতুল্লাহ সাইয়্যেদ আলী খামেনেয়ীর স্মরণে আয়োজিত জানাজা অনুষ্ঠানে কোটি কোটি মানুষের অংশগ্রহণ 'অক্ষশক্তি প্রতিরোধে' ইরাকের ভূমিকারই প্রতিফলন।

আল-আতওয়ানি বলেন, সৌদি আরব যুক্তরাষ্ট্রের সাথে ঘনিষ্ঠ সমন্বয় বজায় রাখছে এবং ওয়াশিংটনের জন্য পিএমইউ একটি "প্রধান সমস্যা" হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তিনি আরও ইঙ্গিত করেন যে, ইরাকি সামরিক অবস্থানগুলোতে আক্রমণের অজুহাত তৈরি করতে সৌদি আরব ও সুরিয়াকে কেন্দ্র করে আঞ্চলিক পরিকল্পনা আলোচনা করা হয়েছে।#

পার্সটুডে/এমএ‌আর/২৯