স্বাধীন ফিলিস্তিনের পক্ষে অবিচল বাংলাদেশ
জাতিসংঘে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ: ৩-আর কৌশলে বাংলাদেশ পুনর্গঠনের বার্তা
-
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনে ভাষণ দেন তারেক রহমান
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা ও আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশের অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে বিশ্বে চলমান সংঘাতের অবসানে যুদ্ধ ও মারণাস্ত্রের পরিবর্তে আলোচনা, কূটনীতি, পারস্পরিক সহযোগিতা ও মানবতাকে প্রাধান্য দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি।
বৃহস্পতিবার (২৪ সেপ্টেম্বর) নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সদর দপ্তরে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সাধারণ বিতর্কে দেওয়া প্রথম ভাষণে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের পররাষ্ট্রনীতি, বৈশ্বিক শান্তি ও নিরাপত্তা, ফিলিস্তিন ও রোহিঙ্গা সংকট, জলবায়ু পরিবর্তন, নিরস্ত্রীকরণ, নারীর ক্ষমতায়ন, প্রযুক্তি ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং বাংলাদেশের উন্নয়ন পরিকল্পনার বিভিন্ন দিক তুলে ধরেন। এটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তারেক রহমানের প্রথম ভাষণ এবং তিনি বাংলায় বক্তব্য দেন।
সংঘাতের সমাধান আলোচনায়, কূটনীতিতে
ভাষণের শুরুতে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের শহীদদের প্রতি গভীর শ্রদ্ধা জানান। একই সঙ্গে ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণঅভ্যুত্থানে নিহত ও আহতদের এবং স্বাধীনতার পর গণতন্ত্র, ন্যায়বিচার ও জনগণের অধিকার প্রতিষ্ঠার সংগ্রামে আত্মত্যাগকারীদের স্মরণ করেন।
বিশ্বের বর্তমান পরিস্থিতি তুলে ধরে তিনি বলেন, মানবসৃষ্ট সংঘাতের কারণে বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে অশান্তি, ব্যাপক বাস্তুচ্যুতি ও মানবিক সংকট তৈরি হচ্ছে। যুদ্ধ ও সংঘাতের প্রভাব পড়ছে বৈশ্বিক অর্থনীতিতেও। জ্বালানি নিরাপত্তা সংকট, বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থায় বিঘ্ন এবং ক্রমবর্ধমান মূল্যস্ফীতি পরিস্থিতিকে আরও কঠিন করে তুলছে।
তারেক রহমান বলেন, যেকোনো সংঘাতের সমাধান আলোচনা, কূটনৈতিক প্রক্রিয়া ও পারস্পরিক সহযোগিতার মাধ্যমেই হওয়া উচিত। বিবদমান রাষ্ট্রগুলোর সম্পর্কের ভিত্তি হওয়া উচিত সমতা, ন্যায্যতা, পারস্পরিক স্বার্থ, সম্মান ও মর্যাদা।
তিনি বলেন, বাংলাদেশ এমন একটি শান্তিময় ও মানবিক বিশ্ব সমাজ দেখতে চায়, যেখানে মারণাস্ত্র নয়; বরং যুক্তি-তর্ক, কূটনীতি, শিক্ষা ও মানবতা পরিবর্তনের হাতিয়ার হবে।
সমঝোতাভিত্তিক এমন একটি বিশ্বব্যবস্থা প্রতিষ্ঠার কেন্দ্রবিন্দু হিসেবে জাতিসংঘকে দেখতে চায় বাংলাদেশ বলেও জানান প্রধানমন্ত্রী। বিশ্বের এক প্রান্তের সংঘাত অন্য প্রান্তেও অর্থনীতি, জ্বালানি, খাদ্য ও নিরাপত্তার ওপর প্রভাব ফেলতে পারে—এমন বাস্তবতায় বহুপাক্ষিক সহযোগিতার গুরুত্বও তুলে ধরেন তিনি।
স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্রের পক্ষে বাংলাদেশের সমর্থন
ফিলিস্তিন ইস্যুতে বাংলাদেশের দীর্ঘদিনের অবস্থান পুনর্ব্যক্ত করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, স্বাধীনতাকামী ফিলিস্তিনি জনগণের দুর্দশা নিয়ে বাংলাদেশের গণতন্ত্রকামী জনগণের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে।
তিনি বলেন, আত্মনিয়ন্ত্রণের অধিকার এবং একটি স্বাধীন ফিলিস্তিন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার অধিকারসহ ফিলিস্তিনি জনগণের ন্যায্য দাবির প্রতি বাংলাদেশ তার অবিচল সমর্থন পুনর্ব্যক্ত করছে।
ফিলিস্তিনের পাশাপাশি বিশ্বের অন্যান্য সংঘাতের ক্ষেত্রেও আলোচনার মাধ্যমে রাজনৈতিক সমাধানের ওপর গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী। তার বক্তব্যে যুদ্ধের পরিবর্তে কূটনীতি এবং শক্তি প্রয়োগের পরিবর্তে পারস্পরিক সহযোগিতার প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে উঠে আসে।
নিরস্ত্রীকরণ ও পরমাণু অস্ত্র বিস্তার রোধ
শান্তিপ্রিয় জাতি হিসেবে বাংলাদেশ পূর্ণাঙ্গ ও সাধারণ নিরস্ত্রীকরণ, পারমাণবিক অস্ত্রের বিস্তার রোধ এবং অস্ত্র নিয়ন্ত্রণের লক্ষ্যের প্রতি প্রতিশ্রুতিবদ্ধ বলে জানান তারেক রহমান।
বিশ্বের বিভিন্ন দেশে উন্নয়ন খাতের অর্থ সামরিক ব্যয়ে সরিয়ে নেওয়ার প্রবণতাকে বিশ্বশান্তির পথে বাধা হিসেবেও উল্লেখ করেন তিনি। তার ভাষণে জাতিসংঘের শান্তিরক্ষা কার্যক্রমে বাংলাদেশের অবদান এবং শান্তি প্রতিষ্ঠায় বাংলাদেশের অব্যাহত ভূমিকার কথাও উঠে আসে।
বাংলাদেশ পুনর্গঠনে ‘থ্রি-আর’ কৌশল
ভাষণের গুরুত্বপূর্ণ একটি অংশজুড়ে ছিল বাংলাদেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠনের পরিকল্পনা। তারেক রহমান জানান, দীর্ঘ সময়ের শাসন-শোষণে ক্ষতিগ্রস্ত বাংলাদেশকে পুনর্গঠনে তার সরকার ‘থ্রি-আর’—Recovery, Restoration and Reconstruction, অর্থাৎ ‘পুনরুদ্ধার, পুনর্বহাল ও পুনর্গঠন’ কৌশল অনুসরণ করছে।
তার ভাষ্য অনুযায়ী, গুম, খুন, অপহরণ, দুর্নীতি, লুটপাট ও অর্থ পাচারের মতো সমস্যার অবসানের পর বাংলাদেশ আবার গণতন্ত্রের পথে যাত্রা শুরু করেছে। এই অংশে তিনি সরকারের রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক পুনর্গঠনের পরিকল্পনা এবং জনগণের ক্ষমতায়নের ওপর গুরুত্ব দেন।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু নির্বাচনী গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা নয়, অর্থনীতিরও গণতন্ত্রায়ন—যাতে উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক অগ্রগতির সুফল প্রতিটি পরিবার ও নাগরিকের কাছে পৌঁছায়।
রোহিঙ্গা সংকটের সমাধান মিয়ানমারেই
রোহিঙ্গা সংকটকে বাংলাদেশের জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানবিক, অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নিরাপত্তাগত চাপ হিসেবে তুলে ধরেন প্রধানমন্ত্রী।
তিনি বলেন, নয় বছরেরও বেশি সময় ধরে বাংলাদেশ মিয়ানমার থেকে জোরপূর্বক বাস্তুচ্যুত ১২ লাখের বেশি রোহিঙ্গাকে আশ্রয় দিয়ে আসছে। এর ফলে বাংলাদেশের সম্পদ, পরিবেশ, নিরাপত্তা এবং স্থানীয় জনগোষ্ঠীর ওপর ব্যাপক চাপ তৈরি হয়েছে।
তারেক রহমানের ভাষায়, রোহিঙ্গা সংকটের উৎস ও উৎপত্তি মিয়ানমারে; তাই এর সমাধানও সেখানেই নিহিত। বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের নিজ মাতৃভূমি মিয়ানমারে নিরাপদে ফিরিয়ে নেওয়াকেই তিনি এই সংকটের একমাত্র সমাধান হিসেবে উল্লেখ করেন।
জাতিসংঘ ও আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রতি তিনি রোহিঙ্গাদের নিরাপদ প্রত্যাবাসনের জন্য দৃঢ় ও কার্যকর সমর্থন দেওয়ার আহ্বান জানান। একই সঙ্গে প্রত্যাবাসন না হওয়া পর্যন্ত রোহিঙ্গাদের জীবন রক্ষাকারী মানবিক সহায়তা অব্যাহত রাখার আহ্বান জানান তিনি।
প্রধানমন্ত্রী সতর্ক করেন, বাস্তুচ্যুত রোহিঙ্গাদের ন্যায়বিচার ও স্থায়ী সমাধান নিশ্চিত করতে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় ব্যর্থ হলে সংকটটি ভবিষ্যতে আরও বড় মানবিক বিপর্যয়ে রূপ নিতে পারে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার সুফল সবার জন্য নিশ্চিত করার আহ্বান
বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দ্রুত পরিবর্তনের প্রসঙ্গও গুরুত্ব পায় প্রধানমন্ত্রীর ভাষণে। তিনি বলেন, বিশ্ব কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, বায়োটেকনোলজি ও বিজ্ঞানের নতুন যুগে প্রবেশ করছে। কিন্তু প্রযুক্তির সুবিধা এখনো সবার জন্য সমানভাবে পৌঁছায়নি।
বাংলাদেশের বিপুল তরুণ জনগোষ্ঠী ও ক্রমবর্ধমান ডিজিটাল সক্ষমতাকে নতুন সম্ভাবনা হিসেবে উল্লেখ করে তিনি উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান ও গবেষণার সুযোগ সবার নাগালের মধ্যে আনার ওপর জোর দেন।
‘সবার আগে বাংলাদেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ’
ভাষণের শেষ পর্যায়ে প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের ভবিষ্যৎকে তরুণ, প্রযুক্তিনির্ভর, মানবিক ও অন্তর্ভুক্তিমূলক হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয় ব্যক্ত করেন।
তিনি বলেন, সরকারের লক্ষ্য এমন একটি সমৃদ্ধ, স্বনির্ভর, কল্যাণমূলক ও গণতান্ত্রিক রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা করা, যেখানে জনগণ নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের নিশ্চয়তা পাবে।
এই লক্ষ্যকে সংক্ষেপে তুলে ধরে তিনি বলেন—‘সবার আগে বাংলাদেশ—সবার জন্য বাংলাদেশ।’
জাতিসংঘে দেওয়া ভাষণে একদিকে যেমন ফিলিস্তিন, রোহিঙ্গা সংকট, নিরস্ত্রীকরণ, জলবায়ু পরিবর্তন ও বৈশ্বিক সংঘাতের মতো আন্তর্জাতিক ইস্যুতে বাংলাদেশের অবস্থান তুলে ধরেছেন প্রধানমন্ত্রী, অন্যদিকে দেশের অভ্যন্তরীণ পুনর্গঠন, অর্থনৈতিক ক্ষমতায়ন, নারী শিক্ষা, সামাজিক সুরক্ষা, প্রযুক্তি ও বিনিয়োগের বিষয়ে সরকারের পরিকল্পনাও বিশ্ব সম্প্রদায়ের সামনে তুলে ধরেছেন।#
পার্সটুডে/এমএআর/২৫