মে ২৩, ২০১৭ ১২:৪৪ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা কাসাসের ৭০ থেকে ৭৫ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৭০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 وَهُوَ اللَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ لَهُ الْحَمْدُ فِي الْأُولَى وَالْآَخِرَةِ وَلَهُ الْحُكْمُ وَإِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (70)

“তিনিই আল্লাহ। তিনি ব্যতীত কোনো উপস্য নেই, ইহকাল ও পরকালে প্রশংসা তাঁরই, বিধান তাঁরই; তোমরা তাঁরই দিকে প্রত্যাবর্তিত হবে।” (২৮:৭০)

আগের পর্বে বলা হয়েছে, পবিত্র কুরআনে মহান আল্লাহর সঙ্গে যেকোনো ধরনের শরিক নির্ধারণ করতে নিষেধ করা হয়েছে। সৃষ্টিকর্তা হিসেবে কিংবা ইবাদতের যোগ্য হিসেবে কোনো অবস্থায়ই আল্লাহর সঙ্গে কাউকে শরীক করা যাবে না। আজকের এই আয়াতে আল্লাহ তায়ালার একত্ববাদের প্রতি ইঙ্গিত করে বলা হয়েছে, আল্লাহ ছাড়া আর কে তোমাদেরকে নেয়ামত দান করতে পারেন! বস্তুবাদী ও আত্মিক সব ধরনের নেয়ামত তোমাদের কাছে আসে একমাত্র তাঁরই কাছ থেকে। কাজেই সব প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা হতে হবে কেবলমাত্র তারই জন্য। এই দুনিয়া ও পরকালের একমাত্র অধিপতি ও মালিক তিনি। তিনি ছাড়া এই বিশাল সৃষ্টিজগত পরিচালনার নির্দেশ দেয়ার ক্ষমতা আর কারো নেই। জীবনের শেষপ্রান্তে তোমাদের সবাইকে তাঁর কাছেই ফিরে যেতে হবে। তাঁকে বাদ দিয়ে মুশরিকরা যাদের উপাসনা করে তাদের কাছে ফিরে যাওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

এই আয়াতের একটি শিক্ষণীয় দিক হলো: মানুষ ও সৃষ্টিজগতের শুরু ও সমাপ্তি যার হাতে প্রশংসা ও কৃতজ্ঞতা শুধুমাত্র তাঁরই হওয়া উচিত।

সূরা কাসাসের ৭১, ৭২ ও ৭৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ اللَّيْلَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِضِيَاءٍ أَفَلَا تَسْمَعُونَ (71) قُلْ أَرَأَيْتُمْ إِنْ جَعَلَ اللَّهُ عَلَيْكُمُ النَّهَارَ سَرْمَدًا إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ مَنْ إِلَهٌ غَيْرُ اللَّهِ يَأْتِيكُمْ بِلَيْلٍ تَسْكُنُونَ فِيهِ أَفَلَا تُبْصِرُونَ (72) وَمِنْ رَحْمَتِهِ جَعَلَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ لِتَسْكُنُوا فِيهِ وَلِتَبْتَغُوا مِنْ فَضْلِهِ وَلَعَلَّكُمْ تَشْكُرُونَ (73)

“(হে রাসূল, আপনি মুশরিকদের) বলুন- তোমরা ভেবে দেখেছ কি, আল্লাহ যদি রাত্রির অন্ধকারকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের দিবালোক দান করতে পারে? তবুও কি তোমরা শুনবে না?” (২৮:৭১)

“বলুন- তোমরা ভেবে দেখেছো কি- আল্লাহ যদি দিবসকে কিয়ামতের দিন পর্যন্ত স্থায়ী করেন, আল্লাহ ব্যতীত কোনো উপাস্য আছে কি, যে তোমাদের জন্য রাত্রির আবির্ভাব ঘটাবে, যখন তোমরা বিশ্রাম করতে পারবে, তবুও কি তোমরা ভেবে দেখবে না?” (২৮:৭২)

“তিনিই নিজের দয়ায় তোমাদের জন্য রাত ও দিন সৃষ্টি করেছেন; যাতে রাতে তোমরা বিশ্রাম করতে এবং দিবসে তার অনুগ্রহ (অর্থাৎ রুজির) সন্ধান করতে পারো। এর মাধ্যমে হয়তো তোমরা তাঁর কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করবে।” (২৮:৭৩)

এই তিন আয়াতে সৃষ্টিজগতের ওপর মহান আল্লাহর একচ্ছত্র আধিপত্যের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে: তিনি যদি এখন পৃথিবীর ঘুর্ণয়ন থামিয়ে দেন তাহলে এই মুহূর্তে পৃথিবীর যে অংশে  দিন আছে কেয়ামত পর্যন্ত সেখানে দিন থাকবে এবং যে অংশে রাত আছে কিয়ামত পর্যন্ত সেখানে কেউ দিনের আলো দিতে পারবে না। আল্লাহ তায়ালা যদি এটা করেন তাহলে তোমরা যেসব উপাস্যের উপাসনা করো তাদের কেউ কি পৃথিবীর ঘুর্ণয়নকে আবার চালু করতে পারবে? তারা কি আবার দিন ও রাতের পরিবর্তন ঘটাতে পারবে?

আমরা কি কখনো ভেবে দেখেছি পৃথিবীর ঘুর্ণয়নের কারণে দিন ও রাতের যে সৃষ্টি হয় তা আমাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে কত বড় নেয়ামত? যদি সূর্যের আলো ও তাপ পৃথিবীর অর্ধেক অংশে না পড়ত তাহলে ওই অর্ধেক অংশের সব উদ্ভিদ ও প্রাণীর মৃত্যু হতো। অন্যদিকে যদি অপর অংশে সারাক্ষণ সূর্যের তাপ ও আলো নিপতিত হতো তাহলে প্রচণ্ড উত্তাপে সেখানকার সব উদ্ভিদ ও প্রাণীরও জীবনাবসান ঘটতো। নিজ অক্ষের ওপর পৃথিবী ঘুরছে বলেই নির্দিষ্ট সময় পরপর একটি বিশেষ প্রক্রিয়ায় পৃথিবীতে দিন ও রাতের সৃষ্টি হচ্ছে। দিনের বেলা ভূপৃষ্ঠের তাপমাত্রা বেড়ে যাচ্ছে এবং রাতে কমে যাচ্ছে; আর এভাবেই এখানকার সব উদ্ভিদ ও প্রাণী স্বাচ্ছন্দ্যে জীবনযাপন করছে।

সূর্যের আলো ও তাপ প্রতিটি প্রাণী ও উদ্ভিদের জন্য অতি প্রয়োজনীয় হলেও রাতের অন্ধকার ও কম তাপমাত্রা বেশিরভাগ প্রাণীর বিশ্রামের জন্য অতি জরুরি। আমরা প্রতি মুহূর্তে দিন ও রাতের আবির্ভাব দেখি বলে এই মস্তবড় নেয়ামতটির গুরুত্ব উপলব্ধি করি না। এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. বিশ্বজগত সৃষ্টি ও নির্দিষ্ট নিয়মে তা পরিচালনার রহস্য উপলব্ধি করার দাওয়াত হচ্ছে কাউকে মহান আল্লাহ ও তার একত্ববাদ বোঝানোর অন্যতম সহজ উপায়। নির্দিষ্ট অক্ষের ওপর পৃথিবীর ঘুর্নয়নের পাশাপাশি বছরে একবার সূর্যের চারদিকে এটির ঘুরে আসা মহান আল্লাহর শক্তি ও ক্ষমতার একটি বড় নিদর্শন।

২. মহান আল্লাহ দিনকে কাজ করার ও জীবিকা অর্জনের এবং রাতকে বিশ্রামের জন্য সৃষ্টি করেছেন।

৩. আল্লাহর নেয়ামতকে চিনতে পারার মধ্যে তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানোর বিষয়টি নির্ভর করছে। কিশোর ও যুবকদের সামনে এসব নেয়ামতের গুরুত্ব বেশি বেশি করে তুলে ধরতে হবে যাতে তারা আরো বেশি আগ্রহ নিয়ে এক আল্লাহর ইবাদতে মশগুল হয়।

সূরা কাসাসের ৭৪ ও ৭৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَيَوْمَ يُنَادِيهِمْ فَيَقُولُ أَيْنَ شُرَكَائِيَ الَّذِينَ كُنْتُمْ تَزْعُمُونَ (74) وَنَزَعْنَا مِنْ كُلِّ أُمَّةٍ شَهِيدًا فَقُلْنَا هَاتُوا بُرْهَانَكُمْ فَعَلِمُوا أَنَّ الْحَقَّ لِلَّهِ وَضَلَّ عَنْهُمْ مَا كَانُوا يَفْتَرُونَ (75)

“(স্মরণ করুন) সেইদিনের কথা যেদিন (আল্লাহ) ওদের আহ্বান করে বলবেন- তোমরা যাদেরকে আমার শরিক করতে তারা কেথায়?” (২৮:৭৪)

“এবং প্রত্যেক সম্প্রদায় হতে আমি একজন (বিজ্ঞ ও ন্যায়পরায়ণ) সাক্ষী দাঁড় করাবো এবং (মুশরিকদের) বলবো-(শিরকের পক্ষে তোমরা) নিজেদের প্রমাণ উপস্থিত করো। তখন ওরা জানতে পারবে- উপাস্য হবার অধিকার আল্লাহরই এবং ওরা যা উদ্ভাবন করত তা ওদের কাছ থেকে উধাও হয়ে যাবে।” (২৮:৭৫)

এই সূরার ৬২ নম্বর আয়াতে যে প্রশ্ন করা হয়েছিল এখানে আবারো সেই একই প্রশ্ন উত্থাপন করা হয়েছে। বলা হচ্ছে: দুনিয়ায় আল্লাহকে বাদ দিয়ে নিজেদের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যারা বিভিন্ন ব্যক্তি বা বস্তুর কাছে যেত তাদেরকে কিয়ামতের দিন ভর্ৎসনা করা হবে। তাদেরকে নিজ নিজ নবী-রাসূলদের সামনে জিজ্ঞাসা করা হবে- এক আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপস্থিতি সত্ত্বেও কেন তোমরা কল্পিত উপাস্যদের কাছে গিয়েছিল তার উপযুক্ত ব্যাখ্যা দাও।

পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: মুশরিকরা ঠিক তখন তাদের নিজ নিজ কল্পিত উপাস্যের অসারতা সম্পর্কে জানতে পারবে এবং উপলব্ধি করবে এসব কথিত উপাস্য কিছুই করতে পারে না। তারা আরো বুঝবে, একমাত্র আল্লাহই ইবাদতের যোগ্য এবং তাঁর প্রেরিত পুরুষরা সত্য বলেছিলেন।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

. ঈমানদার মানুষের সামনে কিয়ামতের দৃশ্য তুলে ধরে তাকে এই মর্মে হুঁশিয়ার করা হয়েছে যে, শিরকের বিপদ ভয়াবহ এবং সাবধান না হলে তারাও এই বিপদে পড়ে যেতে পারেন।

. কিয়ামতের দিন আল্লাহর আদালতে নবী-রাসূলরা নিজ নিজ উম্মতের মুশরিক ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্যদাতা হিসেবে উপস্থিত হবেনআমরা যেহেতু শেষ নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)র উম্মত কাজেই আমাদেরকে কথা ও কাজে এমনভাবে সতর্ক থাকতে হবে যেন কিয়ামতের দিন তিনি আমাদের বিরুদ্ধে সাক্ষ্য না দিয়ে বরং আমাদের পক্ষে আল্লাহর কাছে শাফায়াত বা সুপারিশ করেন।

. শিরকের পক্ষে সাধারণত তেমন কোনো যুক্তি বা দর্শন থাকে না।

. কিয়ামতের দিন মানুষের চোখের সামনে থেকে সব গায়েবি পর্দা উঠে যাবে এবং সবাই সেদিন সত্য ও মিথ্যার পার্থক্য সুস্পষ্টভাবে উপলব্ধি করতে পারবে।#