মে ২৮, ২০১৭ ১৩:২১ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ১ থেকে ৭ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১ থেকে ৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

الم (1) أَحَسِبَ النَّاسُ أَنْ يُتْرَكُوا أَنْ يَقُولُوا آَمَنَّا وَهُمْ لَا يُفْتَنُونَ (2) وَلَقَدْ فَتَنَّا الَّذِينَ مِنْ قَبْلِهِمْ فَلَيَعْلَمَنَّ اللَّهُ الَّذِينَ صَدَقُوا وَلَيَعْلَمَنَّ الْكَاذِبِينَ (3)

"আলিফ-লাম-মীম" (২৯:১)

"মানুষ কি মনে করে যে, শুধু আমরা বিশ্বাস স্থাপন করেছি বললেই আমাদের ছেড়ে দেয়া হবে এবং তাদের পরীক্ষা করা হবে না?" (২৯:২)

"নিশ্চয় আমি তাদের পূর্ববর্তীদের পরীক্ষা করেছিলাম; আল্লাহ অবশ্যই প্রকাশ করে দেবেন- কারা (তাঁর প্রতি ঈমান আনার ব্যাপারে) সত্যবাদী ও কারা মিথ্যাবাদী।" (২৯:৩)

পবিত্র কুরআনের আরো কয়েকটি সূরার মতো এই সূরাটিরও নামকরণ করা হয়েছে প্রাণীর নামে। আরবি ভাষায় আনকাবুতের বাংলা অর্থ মাকড়সা। এই সূরার ৪১ নম্বর আয়াতে শিরকের ভিত্তিকে মাকড়সার জালের সঙ্গে তুলনা করা হয়েছে যা অত্যন্ত দুর্বল ও ধ্বংসশীল।

কুরআনুল কারিমের ২৯টি সূরা মুকাত্তায়া হরফ দিয়ে শুরু হয়েছে। এই সূরাটিও এ ধরনের হরফ অর্থাৎ আলিফ-লাম-মিম দিয়ে শুরু হয়েছে। এর আগেও আমরা বলেছি, এই হরফগুলোর অর্থ শুধুমাত্র মহান আল্লাহই জানেন। সেইসঙ্গে এই হরফগুলো পবিত্র কুরআনের অন্যতম মুজিযা বা ঐশী নিদর্শন হিসেবে বিবেচিত হয়। এর মাধ্যমে কাফেরদের উদ্দেশ করে বলা হচ্ছে, এ ধরনের সাধারণ কিছু হরফের সমষ্টিতে কুরআন রচিত হয়েছে। তোমাদেরও যদি সামর্থ্য থাকে তাহলে এই হরফগুলো দিয়ে কুরআনের মতো একটি কিতাব রচনা করে বিশ্ববাসীর সামনে তুলে ধরো।

সূরা আনকাবুতের প্রথম কয়েকটি আয়াতে মহান আল্লাহর একটি সার্বজনীন নিয়মের কথা উল্লেখ করে বলা হয়েছে; মানব সৃষ্টির শুরু থেকে এ পর্যন্ত সব মানুষকে পরীক্ষা করা হয়েছে। মহান আল্লাহ এই পরীক্ষার মাধ্যমে মানুষের অন্তরে কী আছে তা প্রকাশ করে দিয়েছেন এবং সত্যবাদীদেরকে মিথ্যাবাদীদের থেকে আলাদা করেছেন। পৃথিবীর সব যুগে সব জায়গায় এমন কিছু লোক থাকে যারা নিজেদেরকে প্রকৃত মুমিন হিসেবে পরিচয় দেন। তারা নিজেরাও ভাবেন, তারা আল্লাহর খাঁটি বান্দা। কিন্তু যখন আল্লাহর রাস্তায় চলতে গিয়ে কঠিন অবস্থার মধ্যে বা আল্লাহর পরীক্ষায় পড়েন তখন অতি সহজে ঈমান বিসর্জন দিয়ে দেন। তখন সবার সামনে প্রমাণ হয়ে যায়, এই ব্যক্তি সত্যিকারের মুমিন ছিল না।

পাশাপাশি মুনাফিক চরিত্রের কিছু মানুষ আছে যারা অন্তরে আল্লাহর প্রতি ঈমান না আনলেও সমাজে স্বার্থসিদ্ধির জন্য নিজেদেরকে ঈমানদার হিসেবে পরিচয় দেয়। তারা বাহ্যিকভাবে ইসলামের আদেশনিষেধও মেনে চলে।  এ ধরনের মানুষও কঠিন সময় আসলে নিজেদের আসল চেহারা মানুষের সামনে প্রকাশ করে দেন। কারণ, তখন আর ঈমানদারিত্বের দাবি রক্ষা করা তাদের পক্ষে সম্ভব হয় না।

এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ঈমান, শুধুমাত্র মুখে দাবি করার মতো কোনো বিষয় নয়; বরং এর সঙ্গে থাকে নানা ধরনের খোদায়ী পরীক্ষা। ঈমানদার ব্যক্তিকে কাজে-কর্মে একথা প্রমাণ করতে হবে যে, ঈমান রক্ষার জন্য সে যেকোনো ধরনের ত্যাগ স্বীকার করতে প্রস্তুত।

২. ইতিহাসের নানা পরিক্রমায় মহান আল্লাহ তার বান্দাদের পরীক্ষা নিয়েছেন। প্রত্যেক ব্যক্তিকেই জীবনের কোনো না কোনো সময় ঐশী পরীক্ষায় পড়তে হয়। ধনি ব্যক্তিকে ধন দিয়ে, গরীবকে দারিদ্র দিয়ে, ক্ষমতাসীনকে ক্ষমতা দিয়ে এবং দুর্বলকে অক্ষমতা দিয়ে পরীক্ষা করা হয়।

সূরা আনকাবুতের ৪ ও ৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

 أَمْ حَسِبَ الَّذِينَ يَعْمَلُونَ السَّيِّئَاتِ أَنْ يَسْبِقُونَا سَاءَ مَا يَحْكُمُونَ (4) مَنْ كَانَ يَرْجُو لِقَاءَ اللَّهِ فَإِنَّ أَجَلَ اللَّهِ لَآَتٍ وَهُوَ السَّمِيعُ الْعَلِيمُ (5)

" যারা মন্দকাজ করে, তারা কি মনে করে যে, তারা আমার আয়ত্তের বাইরে চলে যাবে? তাদের ধারণা অত্যন্ত মন্দ।" (২৯:৪)

" যে আল্লাহর সাথে সাক্ষাৎ কামনা করে (সে জেনে রাখুক) আল্লাহর নির্ধারিত কাল আসবেই। তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ।" (২৯:৫)

আগের আয়াতে বান্দাদের পরীক্ষা নেয়ার কথা উল্লেখের পর এই দুই আয়াতে আল্লাহ তায়ালা প্রথমে কাফির ব্যক্তিদের উদ্দেশ করে বলছেন: তারা যেন একথা মনে না করে যে, তারা আমার শাস্তি থেকে পালিয়ে বাঁচতে পারবে। তাদের পক্ষ থেকে আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ এবং মুমিন ব্যক্তিদের কষ্ট দেয়ার বিষয়গুলি রেকর্ড করে রাখা হচ্ছে এবং কিয়ামতের দিন ন্যায়বিচারক আল্লাহর আদালতে তাদের বিচার ও শাস্তি হবে। অন্যদিকে ঈমানদার ব্যক্তিকে সাধ্যমতো আল্লাহর ইবাদত করতে হবে। শত্রুদের ষড়যন্ত্র বা অন্য কোনো কারণে কখনো বিপদে পড়লেও ঈমান ত্যাগ করা যাবে না। কারণ, মহান আল্লাহ কিয়ামত দিবসের যে প্রতশ্রুতি দিয়েছেন তা সত্য।  সেদিন মানুষের চোখের সামনে থেকে পার্থিব জীবনের পর্দা সরে যাবে এবং আল্লাহ ও তাদের মধ্যে কোনো প্রতিবন্ধকতা থাকবে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. অনবরত পাপকাজ করতে থাকলে তা মানুষের চিন্তাধারার ওপর নেতিবাচক প্রভাব ফেলে। ফলে সে আল্লাহ ও তার সৃষ্টিজগত সম্পর্কে ভ্রান্ত ধারণা পোষণ করতে থাকে।

২. পাপী ব্যক্তিরা আল্লাহর পক্ষ থেকে সময় পাওয়ার কারণে যেন আত্মঅহমিকায় না ভোগে। কারণ আল্লাহ প্রদত্ত সময়ের নির্ধারিত সীমা একদিন শেষ হয়ে যাবে এবং কিয়ামতের দিন তাঁর দরবারে হাজির হতে হবে। অন্যদিকে সৎকর্মশীল ঈমানদারদেরও কখনো অধৈর্য হয়ে পড়া চলবে না। কারণ, আল্লাহর প্রতিশ্রুতি অবশ্যই বাস্তবায়িত হবে এবং একদিন তারা ধৈর্যের পুরস্কার পাবে।

সূরা আনকাবুতের ৬ ও ৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَمَنْ جَاهَدَ فَإِنَّمَا يُجَاهِدُ لِنَفْسِهِ إِنَّ اللَّهَ لَغَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ (6) وَالَّذِينَ آَمَنُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ لَنُكَفِّرَنَّ عَنْهُمْ سَيِّئَاتِهِمْ وَلَنَجْزِيَنَّهُمْ أَحْسَنَ الَّذِي كَانُوا يَعْمَلُونَ (7)  

"যে কেউ চেষ্টা ও সংগ্রাম করে সে তো তা করে নিজের জন্য; আল্লাহ বিশ্বজগতের উপর নির্ভরশীল নন।" (২৯:৬)

"এবং যারা বিশ্বাস করে ও সৎকাজ করে আমি নিশ্চয়ই তাদের মন্দ কর্মগুলো ঢেকে দেবো এবং তাদের কর্মের উৎকৃষ্টতর প্রতিদান দেব।" (২৯:৭)

আল্লাহতায়ালার প্রতি যার ঈমান আছে সে নিষ্কর্মা অবস্থায় বসে থাকে না বরং সারাক্ষণ চেষ্টা ও সংগ্রাম করে। ইসলাম ও মুসলমানদের উন্নতি ও অগ্রগতির জন্য তাকে পরিশ্রম করতে হয়। প্রয়োজন হলে ইসলামের শত্রুদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ও সংগ্রাম করতে হয়। এখানে একটি বিষয় স্পষ্ট করে দিয়ে বলা হয়েছে, ধর্ম টিকিয়ে রাখার জন্য ঈমানদার ব্যক্তিদের চেষ্টা ও সংগ্রামের কোনো প্রয়োজন আল্লাহর নেই। তারা যে কর্ম ও প্রচেষ্টা চালায় তার ফল তারাই ভোগ করে।

মহান আল্লাহ ঈমানদার ও সৎকর্মশীল বান্দাদেরকে বিশেষ দয়া করার ও নেয়ামত দেয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। এ ধরনের বান্দার ভুলত্রুটি আল্লাহ ক্ষমা করে দেন এবং কৃত সৎকর্মের প্রতিদান দেন তার চেয়ে ভালো পুরস্কার দিয়ে।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. এখানে জিহাদের যে কথা উল্লেখ করা হয়েছে তার অর্থ সব সময় তলোয়ার নিয়ে শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়া নয়। এখানে জিহাদের অর্থ চেষ্টা ও সংগ্রাম করা। নিজের নফস বা কুপ্রবৃত্তির বিরুদ্ধে যুদ্ধের পাশাপাশি রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনে শত্রুর ষড়যন্ত্রের বিরুদ্ধে সংগ্রাম উভয়কেই এই জিহাদের অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এই দুই ধরনের জিহাদেই লাভ হবে মুসলমানদের।

২. আল্লাহর রাস্তায় চেষ্টা ও সংগ্রাম করলে তিনি আমাদের ভুল-ত্রুটিগুলো ক্ষমা করে দেবেন এবং আমাদের প্রচেষ্টার উৎকৃষ্টতর প্রতিদান দেবেন।#