সূরা আনকাবুত; আয়াত ১৪-১৮ (পর্ব-৩)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ১৪ থেকে ১৮ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১৪ ও ১৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا نُوحًا إِلَى قَوْمِهِ فَلَبِثَ فِيهِمْ أَلْفَ سَنَةٍ إِلَّا خَمْسِينَ عَامًا فَأَخَذَهُمُ الطُّوفَانُ وَهُمْ ظَالِمُونَ (14) فَأَنْجَيْنَاهُ وَأَصْحَابَ السَّفِينَةِ وَجَعَلْنَاهَا آَيَةً لِلْعَالَمِينَ (15)
"এবং নিশ্চয় আমি নূহকে তার সম্প্রদায়ের নিকট (নবীরূপে) পাঠিয়েছিলাম। সে ওদের মধ্যে অবস্থান করেছিল- পশ্চাশ কম হাজার বছর। (কিন্তু বেশিরভাগ মানুষ তার প্রতি ঈমান আনেনি) অতঃপর প্লাবন ওদের গ্রাস করে, কারণ ওরা ছিল- সীমালঙ্ঘনকারী।" (২৯:১৪)
"অতঃপর আমি তাকে এবং যারা তরণীতে আরোহণ করেছিল তাদেরকে রক্ষা করলাম এবং বিশ্বজগতের জন্য একে একটি নিদর্শন করলাম।" (২৯:১৫)
এই দুই আয়াত ও এর পরবর্তী আয়াতগুলোতে হযরত নূহ, ইব্রাহিম ও মূসা আলাইহিমুস সালামের যুগের জাতিগুলোর ঘটনা বর্ণিত হয়েছে। এসব জাতি আল্লাহর পাঠানো নবী-রাসূলদের দাওয়াতের বাণী কবুল করেছিল নাকি নাফরমানি করেছিল- এসব আয়াতে তা বর্ণনা করা হয়েছে। এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: হযরত নূহ (আ.) তার জাতির লোকদের মধ্যে ৯৫০ বছর ধরে দাওয়াতের বাণী প্রচার করা সত্ত্বেও হাতেগোণা কিছু মানুষ তাঁর প্রতি ঈমান এনেছিল। বাকি সবাই নিজেদের কুফরির পথে চলা অব্যাহত রাখে। এ কারণে আল্লাহ তায়ালা শাস্তি হিসেবে মহাপ্লাবন পাঠান যাতে সব কাফের ডুবে মারা যায়। তবে বিশেষ জাহাজে চড়ে ঈমানদার ব্যক্তিরা ওই প্লাবন থেকে রক্ষা পান। ফলে পরবর্তী জাতিগুলো জন্য এটি একটি শিক্ষণীয় ঘটনা হিসেবে থেকে যায়। শিক্ষাটি হচ্ছে- যদি কোনো জাতি আল্লাহর প্রতি বিদ্রোহ ঘোষণা করে জুলুমের পথ বেছে নেয় তাহলে সেটি ধ্বংস হয়ে যাবে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. এই দুনিয়াতে কোনো জাতির ধ্বংস ও মুক্তি নির্ভর করছে তার ঈমান ও কুফরের ওপর।
২. পবিত্র কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের এক হাজার বছর পর্যন্ত বাঁচা সম্ভব। এ কারণে হযরত মাহদি (আ.)’র এক হাজার ২০০ বছর বেঁচে থাকা অসম্ভব কোনো বিষয় নয়।
৩. ধর্ম প্রচারের ক্ষেত্রে ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা বজায় রাখতে হবে। মনে মনে এই প্রস্তুতি থাকতে হবে যে, বেশিরভাগ লোক ঈমান নাও আনতে পারে।
সূরা আনকাবুতের ১৬ ও ১৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِبْرَاهِيمَ إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَاتَّقُوهُ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُونَ (16) إِنَّمَا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْثَانًا وَتَخْلُقُونَ إِفْكًا إِنَّ الَّذِينَ تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ لَا يَمْلِكُونَ لَكُمْ رِزْقًا فَابْتَغُوا عِنْدَ اللَّهِ الرِّزْقَ وَاعْبُدُوهُ وَاشْكُرُوا لَهُ إِلَيْهِ تُرْجَعُونَ (17)
"এবং (স্মরণ করো তখনকার কথা) ইব্রাহিম যখন তার সম্প্রদায়কে বলেছিল- তোমরা আল্লাহর উপসনা করো এবং তাঁকে ভয় করো। তোমাদের জন্য এটিই উত্তম, যদি তোমরা জানতে।" (২৯:১৬)
"তোমরা তো আল্লাহ ব্যতীত কেবল মূর্তির পূজা করছো এবং মিথ্যা উদ্ভাবন করছো, তোমরা আল্লাহ ব্যতীত যাদের পূজা করো তারা তোমাদের জীবনোপকরণ দানে অক্ষম। সুতরাং তোমরা জীবনোপকরণ কামনা করো আল্লাহর নিকট এবং তাঁরই উপাসনা করো ও তাঁর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করো। তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।" (২৯: ১৭)
হযরত নূহ (আ.)’র পর হযরত ইব্রাহিম (আ.) ছিলেন আল্লাহর দ্বিতীয় নবী যিনি মানুষকে মূর্তিপূজা করতে নিষেধ করার পাশাপাশি তাদেরকে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানিয়েছেন। তিনি মূর্তিপূজার অন্যতম কারণ হিসেবে মানুষের অর্থনৈতিক প্রয়োজনের কথা উল্লেখ বলেন, তোমরা যদি দারিদ্র থেকে মুক্তি ও অর্থনৈতিক সংকট মেটানোর জন্য মূর্তিপূজা করে থাকো তাহলে জেনে রাখো তোমাদের কোনো প্রয়োজন মেটানোরই সাধ্য এসব মূর্তির নেই।
কিন্তু যদি তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো এবং তাঁর শুকরিয়া আদায় করো তাহলে এসব প্রাণহীন মূর্তির উপাসনা থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি এমন একজনের সামনে সিজদা করবে যার হাতে রয়েছে তোমাদের রুটি-রুজি। এ ছাড়া, কিয়ামতের দিন তোমাদের জান্নাত ও জাহান্নাম নির্ধারিত হবে তাঁরই হাতে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:
১. তাকওয়া বা খোদাভীরুতা অবলম্বন না করে এবং পাপকাজ থেকে দূরে না থেকে ইবাদত বন্দেগি করার কোনো মূল্য আল্লাহর কাছে নেই।
২. যারা পার্থিব জীবনের সুযোগ সুবিধা পাওয়ার জন্য আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো ওপর নির্ভর করে তারা প্রকারান্তরে আল্লাহর সঙ্গে শিরক করছে।
৩. ইসলাম একদিকে পার্থিব জীবনের চাহিদা মেটানোর জন্য প্রচেষ্টা ও সংগ্রাম করার আহ্বান জানিয়েছে অন্যদিকে তাদেরকে আল্লাহর দেয়া নেয়ামতের শোকর আদায় করতে বলেছে। সেইসঙ্গে বলেছে, তোমরা একমাত্র তাঁরই ইবাদত করো।
সূরা আনকাবুতের ১৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ কি বলেছেন:
وَإِنْ تُكَذِّبُوا فَقَدْ كَذَّبَ أُمَمٌ مِنْ قَبْلِكُمْ وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ (18)
"এবং তোমরা যদি আমাকে মিথ্যাবাদী বলো- তবে জেনে রেখো, (এতে বিস্ময়ের কিছু নেই, কারণ) তোমাদের পূর্ববর্তীগণও (নবীদের) মিথ্যবাদী বলেছিল। সত্যকে স্পষ্টভাবে প্রচার করে দেয়াই রাসূলের কাজ।" (২৯:১৮)
আগের আয়াতের ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে হযরত ইব্রাহিম (আ.) মূর্তিপূজকদের উদ্দেশ করে বলছেন: সব মানুষ আল্লাহর প্রতি ঈমান আনবে- এ আশা আমি করি না। কারণ, অতীত জাতিগুলিও আল্লাহর নবী-রাসূলদের মিথ্যাবাদী বলেছিল এবং তাদের সত্যের আহ্বান প্রত্যাখ্যান করেছিল। আমিসহ সব নবী-রাসূলের দায়িত্ব হচ্ছে, ধর্মের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দেয়া। কিন্তু মানুষ তা গ্রহণ করল নাকি প্রত্যাখ্যান করল তা আমার দেখার বিষয় নয় এবং এজন্য আমাকে আল্লাহর কাছে জবাবদিহীও করতে হবে না। আমাকে শুধু জিজ্ঞাসা করা হবে আমি ইসলামের প্রচার ঠিকমতো করেছি কিনা। যদি সব মানুষ কাফের থেকে যায় তাহলেও সেজন্য আমাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে না।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. নবী রাসূলরা কখনো মানুষকে ঈমান আনতে বাধ্য করতেন না। তারা মনে করতেন দাওয়াতের বাণী মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে হবে। তবে তা গ্রহণ করার জন্য জোরজবরদস্তি করা যাবে না।
২. মুমিন ব্যক্তিদের একথা ভাবা ঠিক হবে না যে, সমাজের সব লোক তাদের মতো ঈমান আনবে। যদি তারা ধর্ম প্রচারের দায়িত্ব সঠিকভাবে পালন করে তাহলে কাফের ব্যক্তিদের কোনো দায় তাদেরকে নিতে হবে না।#