মে ২৮, ২০১৭ ১৫:০৮ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ১৯ থেকে ২৩ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ১৯ ও ২০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

   أَوَلَمْ يَرَوْا كَيْفَ يُبْدِئُ اللَّهُ الْخَلْقَ ثُمَّ يُعِيدُهُ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ (19) قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانْظُرُوا كَيْفَ بَدَأَ الْخَلْقَ ثُمَّ اللَّهُ يُنْشِئُ النَّشْأَةَ الْآَخِرَةَ إِنَّ اللَّهَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ (20)

"ওরা কি লক্ষ্য করে না, কিভাবে আল্লাহ সৃষ্টিকে অস্তিত্বদান করেন, অতঃপর তা পুনরায় সৃষ্টি করেন? এ তো আল্লাহর জন্য সহজ (কাজ)।" (২৯:১৯)

"(হে রাসূল, আপনি) বলুন- পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো এবং অনুধাবন করো কীভাবে তিনি সৃষ্টি আরম্ভ করেছেন? অতঃপর আল্লাহ পুনরায় পরকালীন জগত সৃষ্টি করবেন। আল্লাহ সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান।" (২৯:২০)

আগের পর্বে মুশরিকদের সঙ্গে হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র কথোপকথন তুলে ধরা হয়েছে। সেখানে আল্লাহর নবী মুশরিকদেরকে মূর্তিপূজা বন্ধ করার পাশাপাশি মূর্তির কাছে রিজিক চাইতে নিষেধ করেছিলেন। আজকের এই দুই আয়াত এবং এর পরবর্তী কয়েকটি আয়াতে মৃত্যু পরবর্তী জীবন বা পরকালের অস্তিত্ব থাকার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহিমের যুগের মুশরিক থেকে শুরু করে বিশ্বনবী হযরত মুহাম্মাদ মুস্তফা (সা.)’র যুগের মুশরিকরা পরকালে বিশ্বাস করত না এবং মৃত্যুর পরে আবার পুনরুজ্জীবনকে অসম্ভব বলে মনে করত।

এই দুই আয়াতে মুশরিকদেরকে তাদের চিন্তাশক্তিকে কাজে লাগানোর আহ্বান জানিয়ে বলা হচ্ছে- যে আল্লাহ একবার অস্তিত্বহীন অবস্থা থেকে এই বিশ্বজগতকে অস্তিত্ব দিতে পেরেছেন তার জন্য আরেকবার আরেকটি জগতের অস্তিত্ব সৃষ্টি করা কঠিন কাজ নয়। সেইসঙ্গে তোমরা এই বিশাল সৃষ্টিজগতের চারদিকে গভীর দৃষ্টিতে তাকাও। দেখতে পাবে, তোমাদের প্রতিপালক সর্বশক্তিমান, তিনি যা ইচ্ছা তাই সৃষ্টি করতে পারেন। যে মানুষকে তিনি একবার সৃষ্টি করতে পেরেছেন সে মরে যাওয়ার পর তাকে আবার জীবিত করা তার জন্য কঠিন কোনো কাজ হবে না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. পবিত্র কুরআনে বহুবার মানুষকে সৃষ্টিজগত সম্পর্কে চিন্তাভাবনা করার আহ্বান জানানো হয়েছে।

২. প্রাণের অস্তিত্ব দান ও তার মৃত্যুর ক্ষেত্রে মহান আল্লাহর ক্ষমতার নিদর্শনস্থল হচ্ছে এই সৃষ্টিজগত।

৩. প্রকৃতিতে বিচরণ করে মহান আল্লাহর সৃষ্টির নিদর্শন প্রত্যক্ষ করার জন্য ইসলামে পর্যটনকে উৎসাহিত করা হয়েছে। আমরা যত বেশি আল্লাহর সৃষ্টি দেখব তত বেশি তাঁকে চিনতে পারব এবং এর ফলে আমাদের ঈমান তত বেশি দৃঢ় হবে।

সূরা আনকাবুতের ২১ ও ২২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

يُعَذِّبُ مَنْ يَشَاءُ وَيَرْحَمُ مَنْ يَشَاءُ وَإِلَيْهِ تُقْلَبُونَ (21) وَمَا أَنْتُمْ بِمُعْجِزِينَ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي السَّمَاءِ وَمَا لَكُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ مِنْ وَلِيٍّ وَلَا نَصِيرٍ (22)

"(আল্লাহ) যাকে ইচ্ছা শাস্তি দেন এবং যার প্রতি ইচ্ছা অনুগ্রহ করেন (ও ক্ষমা করে দেন) এবং তোমরা তাঁরই নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে।" (২৯:২১)

"তোমরা জমিনে ও আসমানে আল্লাহকে ব্যর্থ করতে পারবে না, আল্লাহ ব্যতীত তোমাদের কোনো অভিভাবক ও সাহায্যকারী নেই।" (২৯:২২)

আগের আয়াতে মানুষের মৃত্যু পরবর্তী জীবন সম্পর্কে আলোকপাত করার পর এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে: পার্থিব জীবনে মানুষকে চেষ্টা ও পরিশ্রম করার সুযোগ দেয়া হলেও কিয়ামতের দিন তার পক্ষে নতুন করে নেক আমল করা সম্ভব হবে না। সেদিন শুধু পার্থিব জীবনের কর্মের হিসাব দিতে হবে। পৃথিবীর জীবনে আমরা যে বীজ বপন করেছি কিয়ামতের দিন সেই ফসলই আমাদের ঘরে উঠবে। সেদিন বিচারক হবেন একমাত্র আল্লাহ তায়ালা যিনি দুনিয়াতে আমাদের প্রতিটি কর্ম প্রত্যক্ষ করছেন। এই জ্ঞানের ভিত্তিতে তিনি কিয়ামতের দিন আমাদেরকে পুরস্কার  কিংবা শাস্তি দেবেন।

কেউ যেন একথা না ভাবে যে, সে আল্লাহর সৃষ্টিজগত থেকে বেরিয়ে গিয়ে তাঁর আয়ত্বের বাইরে চলে যাবে। মানুষ যেখানেই যাকনা কেন, যত উচ্চ মহাকাশেই পাড়ি জমাক না কেন তার পক্ষে আল্লাহর সৃষ্টিজগতের বাইরে যাওয়া সম্ভব হবে না। মানুষ যেন এটা না ভাবে যে, ভূপৃষ্ঠে অবস্থান করলেই বুঝি শুধু আল্লাহর কাছে পাকড়াও হতে হবে। আসমানে চলে যেতে পারলে তিনি আর আমাকে ধরতে পারবেন না।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. আল্লাহর অনুগ্রহ ও আজাব পাশাপাশি অবস্থান করে। সৎকর্মশীল ঈমানদার বান্দারা তাঁর অনুগ্রহের আশায় থাকে এবং মন্দ কর্মশীল ব্যক্তিদের জন্য অপেক্ষা করে কঠোর আজাব।

২. এই আয়াতে আল্লাহ যাকে খুশি শাস্তি দেন ও যাকে খুশি অনুগ্রহ করেন বলা হলেও কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, আল্লাহ কারো প্রতি বিন্দুমাত্র জুলুম করেন না। অর্থাৎ যে ব্যক্তি ঈমান এনে সৎকাজ করবে তাকে আল্লাহ শাস্তি দেবেন না। এখানে তিনি নিজের ইচ্ছার প্রতিফলন ঘটিয়ে বান্দার প্রতি কোনো জুলুম করবেন না।

৩. জ্ঞান-বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির দিক দিয়ে মানুষ যতই উন্নতি করুক তার ইচ্ছা কখনো আল্লাহর ইচ্ছাশক্তির ওপর প্রভাব বিস্তার করতে পারবে না।

এই সূরার ২৩ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَالَّذِينَ كَفَرُوا بِآَيَاتِ اللَّهِ وَلِقَائِهِ أُولَئِكَ يَئِسُوا مِنْ رَحْمَتِي وَأُولَئِكَ لَهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ (23)   

"যারা আল্লাহর নিদর্শন ও (কিয়ামতের দিন তার সঙ্গে) সাক্ষাৎ অস্বীকার করে তারাই আমার অনুগ্রহ হতে নিরাশ হয়। তাদের জন্য আছে মর্মন্তুদ শাস্তি।" (২৯:২৩)

আগের দুই আয়াতে বলা হয়েছে, কিয়ামতের দিন কিছু মানুষ আল্লাহর অনুগ্রহ লাভ করে জান্নাতে প্রবেশ করবে এবং কিছু মানুষ তার আজাবের সম্মুখীন হবে। আর এই আয়াতে সেইসব মানুষের কথা বলা হয়েছে, যারা আল্লাহর অনুগ্রহের প্রতি নিরাশ হয়ে গেছে এবং মনে করছে তারা আল্লাহর অনুগ্রহ পাবে না। বলা হচ্ছে: যারা এই সৃষ্টিজগতে আল্লাহর নিদর্শনাবলী উপেক্ষা করে কিংবা কুরআনের আয়াত অস্বীকার করে তারা এ ব্যাপারে নিশ্চিন্ত থাকতে পারে যে, কিয়ামতের দিন তাদেরকে কঠিন শাস্তি পেতে হবে।  সেদিন তারা কোনো অবস্থায়ই আল্লাহর ক্ষমা পাবে না। কারণ, তারা মহান স্রষ্টার নিদর্শন অস্বীকার করার পাশাপাশি পরকালীন জীবনকেও অস্বীকার করেছে।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. মহান আল্লাহর অনুগ্রহের ভাণ্ডার অনেক বিশাল এবং যে কেউ তার ধারণক্ষমতা অনুযায়ী এখান থেকে দয়া লাভ করতে পারে। কিন্তু আল্লাহর নিদর্শন অস্বীকার করলে এবং তার আয়াত প্রত্যাখ্যান করলে এই অনুগ্রহ লাভের পথ বন্ধ হয়ে যায়। একটি ফুটবল যেমন বিশাল সমুদ্রে ছেড়ে দিলে এর ভেতর কোনো পানি প্রবেশ করতে পারে না তেমনি কুফরি করলে আল্লাহর অনুগ্রহের ভাণ্ডার বিশাল হওয়া সত্ত্বেও কাফের সেখান থেকে কোনো কিছুই লাভ করতে পারে না।

২. যারা কাফের একমাত্র তারাই আল্লাহর অসীম রহমতের ব্যাপারে হতাশ হয়।#