মে ২৮, ২০১৭ ১৫:৪৪ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ২৪ থেকে ২৬ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৪ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا اقْتُلُوهُ أَوْ حَرِّقُوهُ فَأَنْجَاهُ اللَّهُ مِنَ النَّارِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآَيَاتٍ لِقَوْمٍ يُؤْمِنُونَ (24)

"উত্তরে ইব্রাহিমের সম্প্রদায় শুধু এই বলল যে- একে হত্যা করো অথবা আগুনে পোড়াও, কিন্তু আল্লাহ তাকে আগুন থেকে রক্ষা করলেন। এই (ঘটনায়) বিশ্বাসী সম্প্রদায়ের জন্য অবশ্যই নিদর্শন আছে।" (২৯:২৪)

এই সূরায় হযরত নূহ (আ.)’র ঘটনা বলার পর হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র কথা এসেছে। গত আসরে আমরা বলেছি, হযরত ইব্রাহিম তাঁর জাতিকে মূর্তিপূজা ত্যাগ করে এক আল্লাহর ইবাদত করার আহ্বান জানান। তিনি তাদেরকে মৃত্যু পরবর্তী জীবনের জন্য প্রস্তুতি নিতে বলেন। আজকের এ আয়াতে আল্লাহর নবীর আহ্বানের মোকাবিলায় তাঁর জাতির মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। বলা হচ্ছে: হযরত ইব্রাহিমের যুক্তিপূর্ণ বক্তব্যের জবাবে তার জাতি উপযুক্ত কোনো কথা খুঁজে পাচ্ছিল না। এ কারণে তারা সহিংস উপায়ে আল্লাহর নবীর শান্তিপূর্ণ আহ্বানের জবাব দিতে চায়। কেউ তার শরীরে আগুন ধরিয়ে দেয়ার প্রস্তাব দেয় আবার কেউবা বলল- ওকে হত্যা করো যাতে আর কোনোদিন আমাদের মূর্তিপূজায় ব্যাঘাত সৃষ্টি করতে না পারে।

সূরা আম্বিয়ার ৬৮ থেকে ৭০ নম্বর আয়াতে এ সম্পর্কে বিস্তারিত বলা হয়েছে। সেখানে এসেছে: তারা বিশাল অগ্নিকুণ্ড তৈরি করে হযরত ইব্রাহিমকে তার মধ্যে নিক্ষেপ করেছিল। সূরা আনকাবুতের এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মহান আল্লাহ নিজের অলৌকিক ক্ষমতাবলে হযরত ইব্রাহিমকে ওই আগুন থেকে রক্ষা করেন। কুরআনের অন্যত্র এসেছে- ওই বিশাল আগুন হযরত ইব্রাহিমের জন্য ঠাণ্ডা ও আরামদায়ক হয়ে উঠেছিল; ফলে তাঁর কোনো ক্ষতি হয়নি। যারা মহান আল্লাহকে সর্বশক্তিমান মনে করে এবং পার্থিব ক্ষমতাধরদের সামনে মাথানত করে না- এ ঘটনায় তাদের জন্য রয়েছে শিক্ষা।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় বিষয়গুলো হচ্ছে:

১. বিরুদ্ধবাদীদের দমনের ক্ষেত্রে হত্যা ও নির্যাতন হচ্ছে ধর্মদ্রোহীদের প্রধান অস্ত্র। তারা বাস্তবতা উপলব্ধি করার পরিবর্তে নিজেদের ক্ষমতা, ঐশ্বর্য ও সম্পদ রক্ষাকে প্রাধান্য দেয়।

২. মুমিন ব্যক্তিরা সংখ্যায় কম হলেও অত্যাচারী ও জালিম শাসকের সামনে মাথানত করে না। হযরত ইব্রাহিম একা হওয়া সত্ত্বেও পথভ্রষ্ট ও কাফেরদের সামনে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন এবং এ কারণে মহান আল্লাহ তাঁকে সাহায্য করেন।

৩. যেকোনো পরিস্থিতির ওপর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করার ক্ষমতা আল্লাহর রয়েছে। আগুন সবকিছুকে পুড়িয়ে ছারখার করে দেয়া সত্ত্বেও আল্লাহর আদেশে হযরত ইব্রাহিমের জন্য তা ফুলবাগানে পরিণত হয়েছিল।

সূরা আনকাবুতের ২৫ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

  وَقَالَ إِنَّمَا اتَّخَذْتُمْ مِنْ دُونِ اللَّهِ أَوْثَانًا مَوَدَّةَ بَيْنِكُمْ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا ثُمَّ يَوْمَ الْقِيَامَةِ يَكْفُرُ بَعْضُكُمْ بِبَعْضٍ وَيَلْعَنُ بَعْضُكُمْ بَعْضًا وَمَأْوَاكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُمْ مِنْ نَاصِرِينَ (25)

"এবং ইব্রাহিম বলল- পার্থিব জীবনে তোমাদের পারস্পরিক বন্ধুত্ব রক্ষা করার জন্য তোমরা আল্লাহর পরিবর্তে মূর্তিগুলিকে উপাস্যরূপে গ্রহণ করেছো, কিন্তু কিয়ামতের দিন তোমরা একে অপরকে অস্বীকার করবে এবং পরস্পরকে অভিশাপ দেবে। তোমাদের আবাস হবে জাহান্নাম এবং তোমাদের কোনো সাহায্যকারী থাকবে না।" (২৯:২৫)

আগুন থেকে প্রাণে রক্ষা পাওয়ার পরও দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যান হযরত ইব্রাহিম (আ.)। তিনি আবারো মূর্তিপূজার অসারতা প্রমাণ করার চেষ্টা করেন। ইতিহাসে এসেছে, অতীতের মূর্তিপূজক জাতিগুলো তাদের এই উপাস্যগুলো নিয়ে গর্ব করত এবং এগুলোর পরিচয় দিয়ে অহঙ্কারবোধ করত। একটি গোত্রের লোকজন নির্দিষ্ট মূর্তির পূজা করে পরস্পরের প্রতি সংহতি প্রকাশ করত। এছাড়া, তারা মনে করত যেকোনো মূল্যে পূর্বপুরুষদের ধর্মে অটল থাকতে হবে এবং এটিই হচ্ছে সঠিক ইবাদত।

কিন্তু হযরত ইব্রাহিম (আ.) তাঁর জাতির লোকদের বললেন: পূর্বপুরুষদের প্রতি শ্রদ্ধা এবং পরস্পরকে সহংতি জানাতে তোমরা আজ মূর্তিপূজা করলেও কিয়ামতের দিন এই সম্পর্কের বন্ধন আর থাকবে না। সেদিন তোমরা একে অন্যের কাঁধে মূর্তিপূজা করার দোষ চাপানোর চেষ্টা করবে। সেদিন সাধারণ মানুষ তাদের শাসক ও সমাজপতিদেরকে দোষারোপ করে বলবে: আমাদের পথভ্রষ্টতার জন্য এরাই দায়ী। কেউ এই মহা পাপের দায় স্বীকার করবে না। তোমাদের পূর্বপুরুষরাও সেদিন তোমাদেরকে বলবে: চিন্তাভাবনা করে সঠিক পথ অনুসন্ধান না করে কেন অন্ধভাবে আমাদের পথ অনুসরণ করেছিলে?

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. একটি সমাজের ঐক্য ও সংহতির উপকরণ হওয়া উচিত যুক্তিপূর্ণ ও সঠিক। মূর্তিপূজকদের মতো প্রতিমাকে ঐক্যের প্রতীক করা ঠিক নয়।

২. যেকোনো বিষয়ে যুক্তি ও বিচারবিবেচনাকে আবেগের ঊর্ধ্বে স্থান দেয়া উচিত। আবেগপূর্ণ সিদ্ধান্ত বেশিরভাগ ক্ষেত্রে ভুল ও অনুশোচনার কারণ হয়।

৩. বাতিলের ওপর ভিত্তি করে দুনিয়াতে যে বন্ধুত্ব স্থাপিত হয় কিয়ামতের দিন তা কোনো কাজে আসে না বরং সেদিন এই বন্ধুত্ব শত্রুতা ও অভিসম্পাতের কারণ হবে।

সূরা আনকাবুতের ২৬ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

    فَآَمَنَ لَهُ لُوطٌ وَقَالَ إِنِّي مُهَاجِرٌ إِلَى رَبِّي إِنَّهُ هُوَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ (26)

"অতঃপর লুত তার প্রতি বিশ্বাসস্থাপন করল। ইব্রাহিম বলল- আমি আমার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করছি, তিনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাময়।" (২৯:২৬)

অত্যাচারী শাসক নমরুদ ও তার অনুসারীদের দেয়া আগুন থেকে সুস্থ শরীরে বেঁচে যান হযতর ইব্রাহিম (আ.)। আল্লাহর এই মুজিযা বা অলৌকিক ক্ষমতা দেখে সর্বপ্রথম যে ব্যক্তি হযরত ইব্রাহিমের প্রতি ঈমান এনেছিলেন তিনি হলেন লুত (আ.)। পরবর্তীতে তিনি নিজেও আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন। হযরত ইব্রাহিমের দ্বীনের দাওয়াত মানুষের মাঝে প্রচার করতেন হযরত লুত (আ.)।

হযরত ইব্রাহিম যখন দেখলেন এত বড় মুজিযা দেখার পরও লুত ছাড়া অন্য কেউ তাঁর প্রতি ঈমান আনছে না তখন তিনি নিজের পিতৃপুরুষদের ভূমি ত্যাগ করে আল্লাহর উদ্দেশ্যে অন্য কোনো জনপদে হিজরত করার ঘোষণা দেন। তিনি বলেন, তোমরা যখন ঈমান আনলে না তখন আমি অন্য কোনো জনপদের মানুষকে আল্লাহর দিকে আহ্বান জানাব। এই হিজরতের ফলে আল্লাহর নবী একদিকে নমরুদ বাহিনীর অত্যাচার থেকে বেঁচে যান এবং অন্যদিকে অন্যান্য দেশের মানুষের কাছে আল্লাহর দাওয়াতের বাণী পৌঁছে দিতে সক্ষম হন। আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মাদ (সা.)ও মক্কা থেকে মদীনায় হিজরতে করে মক্কার মুশরিকদের অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার পাশাপাশি মদীনার মানুষের কাছে দাওয়াতের বাণী পৌঁছে দিতে পেরেছিলেন।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. রাজা-বাদশাদের মতো নবী-রাসূলরা বিরুদ্ধবাদীদের ধ্বংস করে আরো বেশি ক্ষমতা লাভের চেষ্টা করেন নি। তারা শুধুমাত্র আল্লাহর ধর্ম প্রচার এবং পরস্পরকে সহযোগিতা করেন। হযরত লুত যেমন হযরত ইব্রাহিমের প্রতি ঈমান আনেন এবং তাকে ধর্ম প্রচারের কাজে সহযোগিতা করেন।

২. আল্লাহর প্রেরিত পুরুষরা কোনো নির্দিষ্ট দেশ ও জাতির গণ্ডিতে সীমাবদ্ধ নন। যখনই প্রয়োজন তখনই তারা হিজরত করে মাতৃভূমি ছেড়ে অন্য কোনো জনপদে চলে যান।#