মে ২৯, ২০১৭ ১৪:১৬ Asia/Dhaka

কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ২৭ থেকে ৩০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ২৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَوَهَبْنَا لَهُ إِسْحَاقَ وَيَعْقُوبَ وَجَعَلْنَا فِي ذُرِّيَّتِهِ النُّبُوَّةَ وَالْكِتَابَ وَآَتَيْنَاهُ أَجْرَهُ فِي الدُّنْيَا وَإِنَّهُ فِي الْآَخِرَةِ لَمِنَ الصَّالِحِينَ (27)

“এবং আমি ইব্রাহিমকে দান করলাম ইসহাক ও ইয়াকুবকে এবং তার বংশধরদের জন্য নবুওয়াত ও কিতাব স্থির করলাম এবং আমি তাকে দুনিয়ায় পুরস্কৃত করেছিলাম; পরকালেও সে নিশ্চয়ই সৎকর্মশীলদের অন্যতম হবে।” (২৯:২৭)

এই সূরার এর আগের কয়েকটি আয়াতে সংক্ষেপে আল্লাহর নবী হযরত ইব্রাহিম (আ.) এর জীবনী তুলে ধরা হয়েছে। সে আলোচনার ধারাবাহিকতায় এই আয়াতে বলা হচ্ছে: মানুষকে সত্যের পথে দাওয়াত দেয়ার লক্ষ্যে ইব্রাহিম মাতৃভূমি ত্যাগ করার পর আল্লাহ তায়ালা তাকে অনেক বড় পুরস্কার দান করেন। তাকে এমন কিছু সন্তান ও বংশধরের সুসংবাদ দেন যারা পরবর্তীতে নবুওয়াতপ্রাপ্ত হন এবং নিজ সম্প্রদায়ের মধ্যে ঈমানের আলো জ্বালিয়ে রাখেন। ইসহাক, তাঁর সন্তান ইয়াকুব এবং তাঁর সন্তান ইউসুফের পাশাপাশি মূসা, হারুন, দাউদ ও সোলায়মান আলাইহিমুস সালাম হযরত ইব্রাহিমের বংশধর ছিলেন। এদের সবাইকে মহান আল্লাহ নবুওয়াত দান করেছিলেন।

আল্লাহর পক্ষ থেকে এই পুরস্কার ছিল দুনিয়া ও আখেরাত দুই জীবনের জন্যই হযরত ইব্রাহিমের জন্য সুসংবাদ। একজন নেক সন্তান তার পিতার জীবদ্দশায় পিতার জন্য গর্বের কারণ এবং মৃত্যুর পরে তার মাগফেরাতের অসিলা হয়।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নেক সন্তান হচ্ছে ঐশী পুরস্কার যা মহান আল্লাহ তার নেক বান্দাদেরকে দান করেন।

২. পৃথিবীতে আল্লাহর দেয়া অন্যতম পুরস্কার হচ্ছে নেক সন্তান ও বংশধর।

৩. একজন মানুষের পক্ষে দুনিয়া ও আখেরাত- দুই জীবনেই খোদায়ী পুরস্কার পাওয়া সম্ভব। তবে ইসলামে আখেরাতের জীবনকে বাদ দিয়ে দুনিয়াপুজারি হতে যেমন নিষেধ করা হয়েছে তেমনি আখেরাতকে পেতে গিয়ে দুনিয়ার জীবনকে ধ্বংস করতেও নিরুৎসাহিত করা হয়েছে।  

সূরা আনকাবুতের ২৮ ও ২৯ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

وَلُوطًا إِذْ قَالَ لِقَوْمِهِ إِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الْفَاحِشَةَ مَا سَبَقَكُمْ بِهَا مِنْ أَحَدٍ مِنَ الْعَالَمِينَ (28) أَئِنَّكُمْ لَتَأْتُونَ الرِّجَالَ وَتَقْطَعُونَ السَّبِيلَ وَتَأْتُونَ فِي نَادِيكُمُ الْمُنْكَرَ فَمَا كَانَ جَوَابَ قَوْمِهِ إِلَّا أَنْ قَالُوا ائْتِنَا بِعَذَابِ اللَّهِ إِنْ كُنْتَ مِنَ الصَّادِقِينَ (29)

“এবং (স্মরণ করুন) যখন লুত তার সম্প্রদায়কে বলেছিল- নিশ্চয়ই তোমরা অশ্লীলতা করছো, যা তোমাদের পূর্বে এ জগতে কেউই করেনি।” (২৯:২৮)

“তোমরা কি পুরুষে উপগত হচ্ছো এবং (বংশ বৃদ্ধির) পথকে ধ্বংস করে দিচ্ছো এবং নিজেদের মজলিসে প্রকাশ্যে ঘৃণ্যকর্ম করছো? উত্তরে তার সম্প্রদায় শুধু এই বলল যে,আমাদের উপর আল্লাহর শাস্তি আনয়ন করো- যদি তুমি সত্যবাদী হও।” (২৯:২৯)

হযরত ইব্রাহিম (আ.) সংক্রান্ত আলোচনার পর এই দুই আয়াতে আল্লাহর আরেক নবী হযরত লুত (আ.)’র সম্প্রদায় সম্পর্কে সংক্ষেপে আলোচনা করা হয়েছে। হযরত ইব্রাহিমের জামানায়ই লুত (আ.) আল্লাহর দ্বীন প্রচারের কাজে আত্মনিয়োগ করেছিলেন। আল্লাহর নবী তার জাতির লোকদেরকে সমকামিতার মতো জঘন্য কাজ বন্ধ করার আহ্বান জানান। কিন্তু পাপিষ্ঠ লোকেরা ইসলামের দাওয়াত গ্রহণ না করে উল্টো হযরত লুতকে দেশ থেকে বহিস্কার এবং হত্যা করার হুমকি দেয়।

এই আয়াতে মানুষ যেসব জঘন্য পাপ কাজ করে তার একটির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। এই নিকৃষ্ট কাজটি কোনো পশুকেও করতে দেখা যায় না। আল্লাহর নবী তার জাতির লোকদেরকে বারবার একথা বোঝানোর চেষ্টা করেন, সমকামিতা অত্যন্ত জঘন্য কাজ। এর ফলে নারীর প্রতি পুরুষের আকর্ষণ কমে যায় এবং নারী-পুরুষের স্বাভাবিক সম্পর্কের মাধ্যমে বংশ বিস্তারের যে বিধান আল্লাহ দিয়েছেন তা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এমনকি এর মাধ্যমে বংশবিস্তার না হওয়ার কারণে একটি জাতি বিলুপ্তও হয়ে যেতে পারে।

লুত জাতি এই জঘন্য কাজটি করত প্রকাশ্য স্থানে। সমকামিতার মতো জঘন্য কাজ লোকচক্ষুর অন্তরালে গোপনে করারও প্রয়োজন মনে করেনি তারা। প্রকাশ্য স্থানে বহু মানুষের সামনে এই কাজ করতে তাদের লজ্জাবোধ হতো না বরং এটিকে  স্বাভাবিক বিনোদন ও গর্বের বিষয় বলে মনে করত।

পরের আয়াতে বলা হচ্ছে: হযরত লুত (আ.) এর আহ্বানে সাড়া দিয়ে এই জঘন্য পাপাচার থেকে বিরত থাকার পরিবর্তে আল্লাহর নবীকে ঠাট্টা করে বলল: যদি তোমার আল্লাহ আমাদের এই কাজে অসন্তুষ্ট হয়ে থাকে এবং আমাদেরকে শাস্তি দিতে চায় তাহলে তাকে বলো এই দুনিয়াতেই আমাদেরকে শাস্তি দিক ও আমাদেরকে ধ্বংস করুক। তারা প্রকারান্তরে হযরত লুতকে একথাই বলতে চেয়েছিল যে, তুমি আসলে আল্লাহর নবী নও এবং অনর্থক আমাদের কাজে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করতে চাও।

এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. নবী-রাসূলদের কাজ শুধু মানুষকে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত দেয়া নয়। সেইসঙ্গে সমাজে প্রচলিত অন্যায় অপকর্মের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করে সমাজকে সংশোধন করাও তাদের কর্তব্য।

২. সমাজে একটি অপকর্ম প্রচলিত হয়ে যাওয়ার অর্থ এই নয় যে, যেহেতু সৎকাজের আদেশ ও অসৎ কাজে নিষেধ  করা সংক্রান্ত আল্লাহর বিধান এখানে কাজ করবে না তাই এই অপকর্ম বন্ধ করার আহ্বান জানানোর প্রয়োজন নেই।

৩. নবী-রাসূলগণ মানুষকে স্বাভাবিক ও সঠিক উপায়ে কামবাসনা চরিতার্থ করার আহ্বান জানিয়েছেন। সেইসঙ্গে তারা অবাধ যৌনতা, ব্যাভিচার ও সমকামিতার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছেন।

৪. কোনো পাপকাজ যতক্ষণ প্রকাশ্যে করা না হচ্ছে এবং সমাজের বেশিরভাগ মানুষ তাতে জড়িয়ে না পড়ছে ততক্ষণ এই কাজের জন্য ব্যক্তি দায়ী থাকবে; গোটা সমাজ নয়। কিন্তু যখন অপকর্মটি গোটা সমাজে ছড়িয়ে পড়ে তখন তার বিরুদ্ধে সংগ্রাম করা আল্লাহর সৎ বান্দাদের জন্য অবশ্য পালনীয় কর্তব্য হয়ে যায়।

৫. সব ঐশী ধর্মে সমকামিতাকে জঘন্য পাপাচার বলে উল্লেখ করা হয়েছে। কিন্তু তারপরও বর্তমান সময়ে অনেক পশ্চিমা দেশে এই অপকর্মকে আইন করে বৈধতা দেয়া হয়েছে।

সূরা আনকাবুতের ৩০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:

قَالَ رَبِّ انْصُرْنِي عَلَى الْقَوْمِ الْمُفْسِدِينَ (30)  

“লুত বলল- হে আমার প্রতিপালক! দুষ্কার্যকারী সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে আমাকে সাহায্য করো।” (২৯:৩০)

পাপাচারী জাতির লোকজন যখন হযরত লুতকে ভণ্ড নবী বলে আখ্যায়িত করে তখন  তিনি মহান আল্লাহর কাছে সাহায্য চান। তিনি কোনো একটি অলৌকিক ঘটনা প্রদর্শন করে তাঁর নবুওয়াতের বিষয়টি জনগণের সামনে প্রমাণ করে দেয়ার জন্য আল্লাহর কাছে আবেদন জানান। এমন একটি অলৌকিক ঘটনা যার মাধ্যমে তার নবুওয়াতের বিষয়টি প্রমাণিত হওয়ার পাশাপাশি সীমালঙ্ঘনকারী সম্প্রদায়কে শাস্তি দেয়ার কাজটিও সম্পন্ন হবে। হযরত লুতের জাতি পাপকাজে এত বেশী সীমালঙ্ঘন করেছিল যে, ভালো মানুষ ও উন্নত চরিত্রের অধিকারী লোকদেরকে তারা সম্মান করার পরিবর্তে উল্টো অপমান-অপদস্থ করত।

এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:

১. ইসলামি আইনে সমকামিতাকে সমাজে ফেতনা বা বিশৃঙ্খলা সৃষ্টির সমতুল্য বলে মনে করা হয়। কেউ প্রকাশ্যে এই কাজ করলে তার শাস্তি মৃত্যুদণ্ড।

২. সমাজে এ ধরনের পাপাচার ছড়িয়ে পড়তে গেলে কঠোরভাবে তার মোকাবিলা করার পাশাপাশি পাপিষ্ঠ ব্যক্তিদের ওপর বিজয় অর্জনের জন্য আল্লাহর সাহায্য চাইতে হবে।#