সূরা আনকাবুত; আয়াত ৩১-৩৫ (পর্ব-৭)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৩১ থেকে ৩০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩১ ও ৩২ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَمَّا جَاءَتْ رُسُلُنَا إِبْرَاهِيمَ بِالْبُشْرَى قَالُوا إِنَّا مُهْلِكُو أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ إِنَّ أَهْلَهَا كَانُوا ظَالِمِينَ (31) قَالَ إِنَّ فِيهَا لُوطًا قَالُوا نَحْنُ أَعْلَمُ بِمَنْ فِيهَا لَنُنَجِّيَنَّهُ وَأَهْلَهُ إِلَّا امْرَأَتَهُ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ (32)
"এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ (সন্তান ভুমিষ্ট হওয়ার) সুসংবাদসহ ইব্রাহিমের নিকট এলো, তারা বলেছিল- আমরা এই জনপদবাসীকে ধ্বংস করবো; কারণ এর অধিবাসীরা জালেম।" (২৯:৩১)
"(ইব্রাহিম) বলল- এই জনগদে তো লুত আছে; (ফেরেশতারা) বলল- সেখানে কারা আছে তা আমরা ভালো জানি, আমরা লুতকে ও তার পরিজনকে রক্ষা করবই, তার স্ত্রী ব্যতীত। সে ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্গত।" (২৯:৩২)
গত আসরে আমরা বলেছি, হযরত লুত (আ.)’র জাতির লোকেরা সমকামিতার মতো জঘন্য অপকর্মে লিপ্ত হয়েছিল। আল্লাহর নবীর নিষেধ না শুনে তারা বরং হযরত লুতকে ভণ্ড নবী বলে প্রত্যাখ্যান করে। এ অবস্থায় তিনি এ পাপাচারী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে জয়লাভের জন্য আল্লাহর সাহায্য কামনা করেন। অতীতে মহান আল্লাহ একই সময়ে আলাদা আলাদা জাতিকে হেদায়েত করার জন্য আলাদা আলাদা নবী প্রেরণ করতেন। হযরত লুত ও হযরত ইব্রহিম (আ.) ছিলেন এরকম দু’জন নবী যারা একই সময়ে মানব জাতিকে সত্যের দাওয়াত দেয়ার কাজে নিয়োজিত হয়েছিলেন।
এই দুই আয়াতে বলা হচ্ছে- মহান আল্লাহ হযরত ইব্রাহিম (আ.)’র কাছে ফেরেশতা পাঠিয়ে তাঁকে বৃদ্ধ বয়সে সন্তান লাভের সুসংবাদ দেন এবং লুত (আ.)’র জাতিকে যে ধ্বংস করা হবে সে খবর জানিয়ে দেন। ঐশী আজাব অত্যাসন্ন জেনে হযরত ইব্রাহিম উদ্বেগ প্রকাশ করে ফেরেশতাদের বলেন: ওই জনপদে তো লুত বাস করে; কাজেই আজাব আসলে তার কি হবে? তখন ফেরেশতারা তার উদ্বেগ প্রশমন করে বলেন: আল্লাহর নির্দেশে লুতসহ ওই জনপদের সৎকর্মশীল ব্যক্তিরা ঐশী আজাব থেকে রক্ষা পাবেন। হযরত লুতের স্ত্রী সে সময় মুমিন ব্যক্তিদের কাছ থেকে আলাদা হয়ে কাফেরদের দলে যোগ দিয়েছিল। ফলে নবীর স্ত্রী হওয়ার পরও সে ওই আজাব থেকে রক্ষা পায়নি।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. ফেরেশতাদের মাধ্যমে আল্লাহ তাঁর প্রেরিত পুরুষদের কাছে সুসংবাদ পাঠান এবং কোনো জনপদে শাস্তি দিতেও তিনি ফেরেশতাদের ব্যবহার করেন।
২. যৌন লালসা চরিতার্থ করার ক্ষেত্রে প্রকৃতি বিরোধী পথ অবলম্বনকে ইসলামে জুলুম বলে উল্লেখ করা হয়েছে। এই জুলুম করা হয় নিজের, পরিবার ও সমাজের বিরুদ্ধে।
৩. কোনো সমাজে জুলুম অত্যধিক মাত্রায় ছড়িয়ে পড়লে সেটি ধ্বংসের কাছাকাছি পৌঁছে যায়।
৪. স্ত্রী ও সন্তান তাদের চলার পথ বাছাই করার ক্ষেত্রে স্বাধীন। হযরত লুতের স্ত্রী কাফেরদের দলে যোগ দিয়েছিল; পক্ষান্তরে তার সন্তানরা ছিল মুত্তাকিদের অন্তর্ভূক্ত।
সূরা আনকাবুতের ৩৩ থেকে ৩৫ নম্বর পর্যন্ত আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَلَمَّا أَنْ جَاءَتْ رُسُلُنَا لُوطًا سِيءَ بِهِمْ وَضَاقَ بِهِمْ ذَرْعًا وَقَالُوا لَا تَخَفْ وَلَا تَحْزَنْ إِنَّا مُنَجُّوكَ وَأَهْلَكَ إِلَّا امْرَأَتَكَ كَانَتْ مِنَ الْغَابِرِينَ (33) إِنَّا مُنْزِلُونَ عَلَى أَهْلِ هَذِهِ الْقَرْيَةِ رِجْزًا مِنَ السَّمَاءِ بِمَا كَانُوا يَفْسُقُونَ (34) وَلَقَدْ تَرَكْنَا مِنْهَا آَيَةً بَيِّنَةً لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ (35)
"এবং যখন আমার প্রেরিত ফেরেশতাগণ লুতের নিকট এলো তখন তাদের আগমনে সে বিষণ্ন হয়ে পড়ল এবং নিজেকে তাদের রক্ষায় অসমর্থ মনে করল; (ফেরেশতারা) বলল- ভয় পেয়ো না ও দুঃখ করো না; আমরা তোমাকে ও তোমার পরিজনবর্গকে রক্ষা করব- তোমার স্ত্রীকে ব্যতীত। সে তো ধ্বংসপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।" (২৯:৩৩)
"আমরা এই জনপদবাসীর উপর আকাশ হতে শাস্তি নাজিল করব, কারণ তারা দুষ্কর্মকারী" (২৯:৩৪)
"এবং আমি বোধশক্তিসম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য এতে একটি স্পষ্ট নিদর্শন রেখেছি।" (২৯:৩৫)
পবিত্র কুরআনের অন্য আয়াতে এসেছে, হযরত লুত (আ.) প্রথমে ফেরেশতাদের চিনতে পারেননি। কারণ, তারা সুদর্শন যুবকের বেশে এসেছিল। তাদেরকে দেখে হযরত লুত এই কারণে উদ্বিগ্ন হয়ে পড়েন যে, তার জাতির লোকেরা এই যুবকদের দেখে তাদের ওপর চড়াও হতে পারে। এ কারণে আল্লাহর নবী বিমর্ষ হয়ে পড়েন। সুদর্শন অতিথিদের সম্মান রক্ষা করার ব্যাপারে নিজেকে অসহায় ভাবতে থাকেন হযরত লুত (আ.)।
কিন্তু ফেরেশতারা নবীর কাছে নিজেদের পরিচয় তুলে ধরে তাকে এই নিশ্চয়তা দেন যে, দুষ্কর্মকারীরা তাদের কোনো ক্ষতি করতে পারবে না। কারণ, এই জাতিকে অচিরেই এমন শাস্তি দেয়া হবে যে, তাদের কারো অস্তিত্ব থাকবে না। এই জনপদে অবশিষ্ট থাকবে শুধু তাদের ধ্বংসপ্রাপ্ত ঘরবাড়ি।
এই তিন আয়াতে বলা হচ্ছে- পাপকাজ বন্ধ না করে সমাজে তার বিস্তার ঘটানো একটি ভয়াবহ বিপজ্জনক কাজ যার কারণ মহান আল্লাহ শুধু অপকর্মকারী ব্যক্তিদের নয় বরং গোটা সমাজকে শাস্তি দিতে পারেন। আর এই শাস্তির বিষয়টি অন্যান্য জাতির জন্য শিক্ষণীয় হয়ে থাকতে পারে।
পবিত্র কুরআনের অন্যত্র বলা হয়েছে, প্রথমে ভয়াবহ ভূমিকম্পে লুত জাতির বসবাসের স্থান স্যাডোম শহর পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যায়। এরপর সেখানে আকাশ থেকে পাথর বৃষ্টি হয় যার ফলে প্রাণের যেসব অস্তিত্ব তখনও অবশিষ্ট ছিল সেগুলিও ধ্বংস হয়ে যায়।
এই তিন আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. অঙ্কুরেই পাপাচার বন্ধ করা না হলে তা এক সময় গোটা সমাজকে গ্রাস করে। এ অবস্থায় নিরপরাধ পরিবারগুলিও নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে। এ ধরনের পরিবারের সন্তানরাও এক সময় পাপকাজে লিপ্ত হয়ে যায়।
২. অতিথির সম্মান রক্ষা করা গৃহকর্তার দায়িত্ব। কোনো অবস্থায়ই যাতে অতিথির সম্মানহানি না হয় গৃহকর্তাকে সে ব্যবস্থা করতে হবে।
৩. প্রতিটি মুমিন ব্যক্তি ধর্ম রক্ষার ক্ষেত্রে স্পর্শকাতর হয়। যে সমাজে যে অবস্থায়ই ধর্মীয় বিধান লঙ্ঘিত হোক অথবা পাপকাজের প্রচলন চোখে পড়ুক, মুমিন তার প্রতিবাদ করবেই। একজন মুমিনের পক্ষে খারাপ কাজ মেনে নেয়া সম্ভব নয়।
৪. শুধুমাত্র পুন্যবান ব্যক্তিদের সঙ্গে আত্মীয়তার সম্পর্ক ইহকালীন ও পারলৌকিক মুক্তির জন্য যথেষ্ট নয়। অনেক সময় লুত (আ.)’র স্ত্রীর মতো আল্লাহর নবীদের স্ত্রীরাও জাহান্নামে যাবে এবং ফেরাউনের মতো জালেম শাসকদের স্ত্রীরাও জান্নাতবাসী হয়ে যেতে পারে।#