সূরা আনকাবুত; আয়াত ৩৬-৪০ (পর্ব-৮)
কুরআনের আলো অনুষ্ঠানের এই পর্বে সূরা আনকাবুতের ৩৬ থেকে ৪০ নম্বর আয়াত নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। এই সূরার ৩৬ ও ৩৭ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَإِلَى مَدْيَنَ أَخَاهُمْ شُعَيْبًا فَقَالَ يَا قَوْمِ اعْبُدُوا اللَّهَ وَارْجُوا الْيَوْمَ الْآَخِرَ وَلَا تَعْثَوْا فِي الْأَرْضِ مُفْسِدِينَ (36) فَكَذَّبُوهُ فَأَخَذَتْهُمُ الرَّجْفَةُ فَأَصْبَحُوا فِي دَارِهِمْ جَاثِمِينَ (37)
"এবং আমি মাদায়েনবাসীর প্রতি তাদের ভ্রাতা শোয়েবকে পাঠিয়েছিলাম। সে বলেছিল- হে আমার সম্প্রদায়! তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, শেষ দিবসের প্রতি আশা রাখো এবং পৃথিবীতে অশান্তি সৃষ্টি করো না।" (২৯:৩৬)
"কিন্তু ওরা তার প্রতি মিথ্যা আরোপ করল; অতঃপর ওরা ভূমিকম্প দ্বারা আক্রান্ত হলো, ফলে ওরা ভোরবেলা নিজ নিজ গৃহে অধোমুখে পড়েছিল (অর্থাৎ মারা গেল)।" (২৯:৩৭)
এই দুই আয়াতে আল্লাহর আরেক নবী হযরত শোয়াইব (আ.) সম্পর্কে বলা হচ্ছে: তিনিও অন্য সব নবীর মতো মানুষকে এক আল্লাহর ইবাদত করার এবং কিয়ামতের বিচার দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করার আহ্বান জানান। তিনি বলেন, পাপকাজ এবং আল্লাহর নাফরমানি করলে জমিনে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয়। এর ফলে সমাজে জুলুম ও অন্যায় কাজের ক্ষেত্র তৈরি হয় এবং পরিণতিতে সবার ধ্বংস অনিবার্য হয়ে ওঠে। কিন্তু দুঃখজনকভাবে অতীতের আরো বহু জাতির মতো শোয়াইব (আ.)’র জাতির লোকেরাও তাকে প্রত্যাখ্যান করে। পথভ্রষ্ট জাতিকে সত্য পথে ফিরিয়ে আনার জন্য আল্লাহর নবীর শোনানো উপদেশবাণী গ্রহণ করতে তারা অস্বীকৃতি জানায়। পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে: শোয়াইবের জাতির পক্ষ থেকে সত্য প্রত্যাখ্যান এবং তাদের পাপকাজের পরিণতিতে তারা মহান আল্লাহর ক্রোধের শিকার হয় এবং ভয়াবহ ভূমিকম্পে তাদের সবার মৃত্যু হয়।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. আল্লাহর নবীদের দাওয়াতের মূলবাণী ছিল তৌহিদ বা একত্ববাদে বিশ্বাস এবং কিয়ামতের জন্য প্রস্তুতি।
২. সাধারণ মানুষের সঙ্গে আল্লাহর নবী-রাসূলদের আচরণ ছিল ভ্রাতৃপ্রতীম ও বন্ধুসুলভ। তাদেরকে সত্যের দাওয়াত দেয়ার সময় নবী-রাসূলরা অত্যন্ত নমনীয় আচরণ করেছেন।
৩. শুধুমাত্র পাপকাজের জন্য মহান আল্লাহ কোনো জাতিকে ধ্বংস করেননি। তবে উপদেশবাণী পাওয়ার পরও যারা গোনাহর কাজ ত্যাগ করেনি এবং আল্লাহর বিরোধিতা করেছে তারাই খোদায়ী আজাবের শিকার হয়েছে।
সুরা আনকাবুতের ৩৮ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَعَادًا وَثَمُودَ وَقَدْ تَبَيَّنَ لَكُمْ مِنْ مَسَاكِنِهِمْ وَزَيَّنَ لَهُمَ الشَّيْطَانُ أَعْمَالَهُمْ فَصَدَّهُمْ عَنِ السَّبِيلِ وَكَانُوا مُسْتَبْصِرِينَ (38)
"এবং আমি আদ ও সামুদদের ধ্বংস করেছিলাম, ওদের (ধ্বংসপ্রাপ্ত) বাড়িঘরই তোমাদের জন্য এর সুস্পষ্ট প্রমাণ। শয়তান ওদের কাজকে ওদের দৃষ্টিতে শোভন করেছিল এবং ওদের সৎপথ অবলম্বনে বাধা দিয়েছিল, যদিও ওরা ছিল বিচক্ষণ।" (২৯:৩৮)
এই আয়াতে অতীতে ধ্বংসপ্রাপ্ত আদ ও সামুদ জাতির কথা বলা হয়েছে। এই দুই জাতিকে হেদায়েত করার জন্য মহান আল্লাহ যথাক্রমে হযরত হুদ ও হযরত সালেহ (আ.)কে পাঠিয়েছিলেন। পবিত্র কুরআনের অন্যত্র এই দুই জাতির কর্মকাণ্ড বর্ণনা করা হয়েছে। এরা তাদের নবীদের প্রত্যাখ্যান করে এবং জেনেবুঝে আল্লাহর আইন মানতে অস্বীকৃতি জানায়।
পবিত্র কুরআন এরপর মক্কার কাফেরদের উদ্দেশ করে বলছে: এই দুই জাতি খোদায়ী আজাবের স্বীকার হয়ে ধ্বংস হয়ে যায়। তাদের ধ্বংসাবশেষ এখনো মক্কার উত্তর ও দক্ষিণে- সিরিয়া ও ইয়েমেনে যাওয়ার পথে রয়েছে। ওই দু’টি দেশ ভ্রমণে যাওয়ার সময় তোমরা সেসব ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাও। কিন্তু তারপরও তোমরা তা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করো না।
আয়াতের পরবর্তী অংশে শয়তানকে অনুসরণ করাকে আল্লাহর এ আজাব নেমে আসার কারণ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। শয়তান দুনিয়ার ভোগ-বিলাসের প্রতিশ্রুতি দিয়ে তাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছে। মানুষের বিবেক যেমন তাকে সত্য অনুসরণে উদ্বুদ্ধ করে তেমনি নবী-রাসূলরাও এই পথে চলার জন্যই মানুষকে আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াত দেন। কিন্তু আদ ও সামুদ জাতিকে বিচার-বুদ্ধি দেয়ার পাশাপাশি তাদের কাছে নবী পাঠানো সত্ত্বেও তারা শয়তানের কুমন্ত্রণায় পড়ে পথভ্রষ্ট হয়েছে।
এই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলা হলো:
১. অতীত জাতিগুলোর যেসব ধ্বংসাবশেষ বর্তমান ও ভবিষ্যত প্রজন্মগুলোর জন্য শিক্ষণীয় হতে পারে সেগুলো সংরক্ষণ করতে হবে।
২. শয়তানের কাজই হলো খারাপ ও কুৎসিত বিষয়গুলোকে মানুষের চোখে চমৎকার করে তুলে ধরা। মানুষের প্রবৃত্তি এবং বিবেক যে বিষয়গুলোকে অত্যন্ত খারাপ বলে মনে করে, শয়তান নানা ধরনের প্রতারণা ও কৌশল প্রয়োগ করে সে বিষয়গুলোকে সুন্দর ও মনোরম করে মানুষের সামনে তুলে ধরে।
সূরা আনকাবুতের ৩৯ ও ৪০ নম্বর আয়াতে মহান আল্লাহ বলেছেন:
وَقَارُونَ وَفِرْعَوْنَ وَهَامَانَ وَلَقَدْ جَاءَهُمْ مُوسَى بِالْبَيِّنَاتِ فَاسْتَكْبَرُوا فِي الْأَرْضِ وَمَا كَانُوا سَابِقِينَ (39) فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ (40)
"এবং আমি সংহার করেছিলাম কারুন, ফেরাউন ও হামানকে; মূসা ওদের নিকট স্পষ্ট নিদর্শনসহ এসেছিল, তারপরও তারা দেশে অহংকার ও দম্ভ করেছিল; কিন্তু ওরা আমার শাস্তি এড়াতে পারেনি।" (২৯:৩৯)
"আমি ওদের প্রত্যেককে তার অপরাধের জন্য শাস্তি দিয়েছিলাম; ওদের কারো প্রতি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড ঝটিকা প্রেরণ করেছি, কাউকে মহানাদ আঘাত করেছিল, কাউকে আমি ভূগর্ভে প্রোথিত করেছিলাম এবং কাউকে (দরিয়ায়) নিমজ্জিত করেছিলাম। আল্লাহ তাদের প্রতি জুলুম করতে চাননি, বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।" (২৯:৪০)
আগের আয়াতগুলোতে অতীতের কিছু জাতির পরিণতির কথা বর্ণনা করার পর এই দুই আয়াতে হযরত মূসা (আ.)’র জীবদ্দশায় কারুন, ফেরাউন ও হামান নামের তিন দাম্ভিক ব্যক্তির কথা উল্লেখ করা হয়েছে। প্রচুর ধন-সম্পদ থাকার কারণে কারুণ অহংকার করেছিল এবং ক্ষমতার দম্ভে ফেরাউন মানুষের প্রতি জুলুম ও অবিচার করেছিল। আর ফেরাউনের উজির হিসেবে হামান ছিল ফেরাউনের সব অপরাধের অংশীদার। হযরত মূসা (আ.) এই তিন ব্যক্তিকেই উপদেশবাণী শুনিয়েছেন এবং অহংকার ও দম্ভ ত্যাগ করে সত্য পথ অবলম্বনের আহ্বান জানিয়েছেন। কিন্তু তারা আল্লাহর নবীর উপদেশবাণী প্রত্যাখ্যান করে অন্যায় পথে চলা অব্যাহত রাখে। এমনকি তারা আল্লাহর এই মহান নবীকে হত্যা করতে উদ্যত হয়। তারা ভেবেছিল তারা খোদাদ্রোহিতা করেও পার পেয়ে যাবে।
কিন্তু আল্লাহর নির্দেশে কারুন তার ধন-সম্পদসহ ভূগর্ভে ডেবে যায় এবং ফেরাউন ও হামান নীল দরিয়ায় ডুবে মারা যায়। আয়াতের পরবর্তী অংশে পৃথিবীতে আল্লাহর পক্ষ থেকে আসা কয়েকটি আজাবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে যার বিস্তারিত বর্ণনা পবিত্র কুরআনের অন্যত্র দেয়া হয়েছে। আদ জাতি প্রচণ্ড তুফান এবং পাথর ও বালুঝড়ে আক্রান্ত হয়েছিল। টানা সাত দিন ধরে এই ঝড় চলে এবং জাতির সব লোক ধ্বংস হয়ে যায়। সামুদ জাতির লোকজন প্রচণ্ড ভূমিকম্প এবং বজ্রপাতে ধ্বংস হয়ে যায়। অনেকে ভূগর্ভে ডেবে যায় এবং কেউ কেউ পানিতে ডুবে মারা যায়। এসব ঐশী গজব আসে ওই জাতিগুলোর কর্মফলের কারণে।
এই দুই আয়াতের শিক্ষণীয় দিকগুলো হলো:
১. দম্ভ ও অহংকারের পরিণতি ধ্বংস। সম্পদ ও ক্ষমতা পাপী ব্যক্তিদেরকে ধ্বংস থেকে রক্ষা করতে পারে না।
২. আল্লাহ সবাইকে এক ধরনের শাস্তি দেন না। অপরাধের ধরন অনুযায়ী তিনি বিভিন্ন অপরাধীকে আলাদা আলাদ শাস্তি দেন।
৩. প্রত্যেক ব্যক্তিকে তার নিজের কর্ম অনুযায়ী ফল পেতে হবে।#